বইটা আগেও বারদুয়েক পড়া। তবু বারবার পড়তে ভালো লাগার মতই বই এটা। ছোটোবেলায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা এবং অন্যান্য কিশোর সাহিত্য পড়ে ভালো লাগেনি এমন বাঙালি বোধহয় খুব বেশি পাওয়া যাবেনা। অফুরন্ত মজার সম্ভার ওই বইগুলি। কিন্তু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সিরিয়াস গল্পের লেখক হিসেবেও যে এক দিকপাল, তা দুর্ভাগ্যবশত অনেকে জানেন না। কিশোর সাহিত্য পড়তে পড়তে লাল ঘোড়া, হলদে বাস বা সেই বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল ভদ্রলোক কেবল হাসির গল্পেরই রাজা নন, পাঠককে আবেগপ্রবণ করে দেবার অদ্ভুত ক্ষমতাও আছে তাঁর।

তারপরেই খোঁজ পড়ল তাঁর লেখা “বড়দের” বই এর। খানকয়েক ছোটোগল্প পড়ে এমন নাড়া খেলাম, বলে বোঝানো যাবেনা। ছোটোগল্প পড়তে ভালো লাগত। তদ্দিনে রবিঠাকুর, তারাশঙ্কর, বনফুল, বিভূতি বা প্রেমেন্দ্রর ছোটোগল্প পড়ে ফেলেছি অনেক, দারুণ লেগেছে অনেকগুলোই। কিন্তু এমন শক্তিশালী লেখনী এর আগে পাইনি। পরে জগদীশ গুপ্ত বা সুবোধ ঘোষের কিছু গল্পে এমন শক্তিশালী লেখনী পেয়েছি, আরো কিছু আধুনিক ছোটোগল্পকারের লেখাতেও মাঝেসাঝে, তবু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আমার কাছে এক অন্য স্থান দখল করে আছেন ছোটোগল্পকার হিসেবে।

বইটা সম্পর্কে কিছু কথা বলি। এটা ছোটোগল্প সমগ্র, অখণ্ড সংস্করণ। প্রকাশক মিত্র ঘোষ। কিন্তু আমার মতে কিছু কিছু গল্প বাদ পড়েছে এর থেকে। বছর কয়েক আগে বইমেলা থেকে কিনেছিলাম, বিদেশে আসার সময় সঙ্গে যে কটি বই এনেছিলাম, তার মধ্যে এটি একটি। বেশ মোটাসোটা বই হলেও পড়তে শুরু করলে শেষ করতে বেশি সময় লাগবেনা। কারুর রচনাবলী পড়তে গেলে কিছুটা হলেও একঘেয়ে লাগে বেশিরভাগ সময়ই। এক্ষেত্রে সেটা একেবারেই নেই বললে ভুল হবে, তবে গল্পগুলোর বৈচিত্রও প্রচুর। লেখক অল্প বয়েসে কাটিয়েছেন উত্তর ও পূর্ববঙ্গের মফঃস্বলে, প্রকৃতিকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে, আর শেষ জীবন কাটিয়েছেন কলকাতায়। তাই তাঁর লেখায় শহুরে কাহিনীও যেমন এসেছে, সমানভাবে এসেছে গ্রামবাঙলা আর মফঃস্বলের কথাও।

তাঁর অনেক গল্পই সমসাময়িক, বিশেষ যুগের হয়েও হয়ে উঠেছে চিরকালীন। যুদ্ধ মন্বন্তরের কথা বারবার ফিরে এসেছে তাঁর লেখায়। “নক্রচরিত” বা “দুঃশাসন” গল্পে সে সময়ের মজুতদারদের প্রতি ক্ষোভ গর্জে উঠেছে। কখনো ব্যঙ্গও ঝরে পরেছে। আবার হাড় গল্পে ফুটে উঠেছে মন্বন্তরের পরিবেশেও কিভাবে একদল লোক তাদের শুষে নিঙড়ে চলেছে। না খেতে পাওয়া মানুষ একদিকে ডাস্টবিনে পড়ে থাকা হাড় চুষছে, আর অন্যদিকে সেই হাড়ই ধনতান্ত্রিক শ্রেণীর কাছে কালেক্টিবল, বিলাসিতা। এ গল্প আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও সমান প্রাসঙ্গিক। এছাড়াও আছে “ভাঙা চশমা”, “দুর্ঘটনা”, “কনে দেখা আলো”, যেখানে সে সময়ের রাজনীতি উঠে এসেছে সরাসরি, নিপুণ সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে।

বিভূতিভূষণের মত মায়াবী লেখা তাঁর কলমে সেভাবে আসেনি, কিন্তু তাঁর কঠোর শক্তিশালী বর্ণনাও কি কখনো কখনো মায়াবী লাগেনা? “বনজ্যোৎস্না” গল্পটি পড়লে হয়তো বুঝবেন কি বলতে চাইছি। মনের ভাব প্রকাশ করার ব্যাপারে আমার সুনাম নেই। বেশি কথা না বলে তাই গল্পটি পড়ার অনুরোধ রেখে গেলাম।

গল্পগুলো বেশিরভাগ সময়ই অদ্ভুত আবেগ জাগিয়ে তোলে পাঠকের মধ্যে। কিন্তু সে আবেগ মাখোমাখো প্রেমের ম্যাদামারা আবেগ না, রক্ত গরম করে দেওয়া, আগুন যেভাবে ভালোবাসতে চায়, সেরকম ভালোবাসতে চাওয়ার আবেগ! সংকলনের অনেকগুলো গল্পই তো প্রেমের গল্প। কিন্তু এই প্রেম যেন আমাদের অলস প্রেমের চেয়ে অন্যরকমের! “ধস” গল্পটা পড়লে কিছুটা বোঝা যাবে এই অনুভূতির কথা, কিম্বা "প্রপাত"। “কনে দেখা আলো”তেও যে রোম্যান্টিসিজম আছে, সেখানেও সেই একই তফাত।

কিছু গল্প পড়ার পর যেমন রক্ত গরম হয়ে ওঠে, যেমন “রেকর্ড” বা “হাড়”, আবার “উস্তাদ মেহেরা খাঁ” বা “লক্ষীর পা” পড়া শেষ করে মন বিষন্ন হয়ে থাকে। নানান গল্পে এসেছে মানুষ আর পশুর সম্পর্কের কথাও, উদাহরণ – “জান্তব” বা “সৈনিক”। দুটোই অসাধারণ গল্প। “বীতংস” গল্পটি বিখ্যাত হলেও আমার ব্যক্তিগতভাবে তেমন ভালো লাগেনি। আমার খুব প্রিয় গল্প “টোপ”, “বনতুলসী”, “পুষ্করা”, “একটি শত্রুর কাহিনী”। এগুলো নিয়ে আর কিছু বলবনা, পাঠক পড়ে নেবেন। কেউ বলতে পারেন গল্পগুলো নাটকীয়। অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো সত্যি। কিন্তু তবু অতিনাটকীয় মনে হয়না।  

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পের সমালোচনা করা বা রিভিউ লেখা এ পোস্টের উদ্দেশ্য নয়, সে যোগ্যতাও আমার নেই। কেবল তাঁর কিছু কালজয়ী লেখার সঙ্গে পাঠকদের আলাপ করিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য। যাঁরা পড়েননি, পড়ুন, ঠকবেন না। ছোটোগল্পের বাইরেও তাঁর অসাধারণ কিছু উপন্যাস এবং প্রবন্ধও আছে। আমার ছোটোগল্পের প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা আছে বলেই বোধকরি সেগুলো একটু বেশিই ভালো লাগে।

বেঁচে থাকলে আজ (ফেব্রুয়ারি ৪) ভদ্রলোকের ৯৮ বছর বয়েস হত। শুভ জন্মদিন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়!

 

 

এখন যা পড়ছি (৩) – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments