পূর্বনির্ধারিত নিজস্ব সূচী অনুযায়ী আমার কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০১৩ সফর গত তেসরা ফেব্রুয়ারী শেষ হয়ে গেছে। গিয়েছিলাম ২৯-শে, ৩১-শে জানুয়ারী, দোসরা এবং তেসরা ফেব্রুয়ারী। ২৬-শে জানুয়ারী, প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভ অবসরে, নির্ধারিত সময়ের চারদিন আগে বইমেলার দরজা খুলে যাওয়ায় চারিদিকে ছিছিক্কার পড়ে গেলেও, সত্যি কথা বলতে কি আমার বেশ আনন্দই হয়েছিল। অফিস থেকে যাওয়ার সময় ট্র্যাফিক জ্যামে খানিকক্ষণ আটকা পড়লেও দেখলাম বেশ সুশৃঙ্খল ভাবে ঢোকা গেল। ঢোকার আগেই বাসে বসে এক কৌতুকের মুখোমুখি হলাম। দু’জনের কথোপকথন।
প্র – এত লোক!!
দ্বি – সব বইমেলায় যাচ্ছে
প্র – যাচ্ছে তো, কটা বই কিনবে
এরপরেই দুজনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ন হাসি হাসলেন। হাসি আমারও পেল এই ভেবে যে শুধু কি বই কেনার টানে বইমেলাতে? আমি তো অন্তত বই কেনার জন্য মেলাতে আসিনি। সেই কবে বাবার হাত ধরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের পেছনে বইমেলাতে প্রবেশ করেছিলাম, তখন হয়ত সত্যি বই কেনার টানেই যেতাম, কিন্তু আস্তে আস্তে যখন বুদ্ধি খুলল, বুঝতে শিখলাম বাবা আসলে একটা নেশা ধরাতে চেয়েছিলেন। তবু কথাটাকে সর্বাংশে ভুল বলা না গেলেও বন্ধু, এত লোক তো আসছে স্রেফ বইকে ভালবেসে। এমনকি যদি ধরেও নিই যে অনেক তরুণ-তরুণী আসছেন শুধুমাত্র প্রেম করতে, তাহলেও ভেবে দেখুন, ছাপার অক্ষরের বইকে সাক্ষী রেখে প্রেম করা, সেও কি কিছু কম কথা! কাউকে তো কোনদিন বলতে শুনিনি, এত লোক দুর্গাপুজায় ঠাকুর দেখতে বের হয়, ক’জন পুজো করে? যাইহোক, ভেতরে ঢুকে বুঝলাম বাইরের পরিবর্তন যতই হোক না কেন, ভেতরের অব্যবস্থা একই রকম রয়ে গেছে। ভদ্রলোকের এক কথা – আর কি। ব্যতিক্রম মেলার মাঠে প্রচুর খাওয়ার জলের ব্যবস্থা। জানি না এটা এই বছরের অবদান নাকি গত বছরেও ছিল, কারন গতবার একদিনও যাওয়া হয়নি। প্রতিবছর একই অভিজ্ঞতা, কাজেই বিরক্ত বোধ করলাম না। ভেবেছিলাম মেলার মানচিত্র মেলা শুরু হওয়ার চার-পাঁচদিন পর থেকে পাওয়া যায়, সে হিসেবে ২৯-শে চার দিন হয়, হয়ত এসে গেছে। দেখলাম সেও অমিল। এক একবার এক এক স্টলের নাম মনে পড়ে আর আমি বারবার গিল্ড অফিসে ফেরত আসি – “দাদা অমুকটা কত নম্বর বলবেন?” অনুরোধের আসর নিয়ে। আমি ভাগ্যবান। যতবার জেনেছি ততবারই উদ্দিষ্ট স্টলটি খুঁজে পেয়েছি। কানে এল এক আগন্তুক অন্য এক আগন্তুককে প্রশ্ন করছেন – “৩০৫ নম্বরটা কোথায় হবে বলতে পারেন?” উত্তরকর্তা খিঁচিয়ে উঠলেন – “আরে মশাই আমিই তো একঘণ্টা ওইটা খুঁজে যাচ্ছি, পাচ্ছি না”। প্রথমদিন অত্যন্ত জরুরি কাজ ছিল একটি পত্রিকার সদস্যপদ নবীকরণ করা। কাজটা সেরে নিজেই দায়িত্ব নিলাম ১, ২, ৩, ৪ আর ৫-এর অংশগুলি বুঝে নেওয়ার। প্রথমদিন এভাবেই কেটে গেল। দ্বিতীয়দিন থেকে শুরু করলাম পুরনো খেলা। হাতে এসে গেছে দেশ পত্রিকার বইমেলা সংখ্যা। বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা স্টল খুঁজে বের করে শুরু করলাম, ক্যাটালগ শিকার, আর কিছু বই হাতে নিয়ে দেখা। মনের মত বই পেলেই একটু মুখটা খুশি খুশি করা, তারপর একটা আলতো বিরক্তি ভাব, এরপরেই অনিবার্য মন্তব্য কানের কাছে
– নিতে পারেন। ভাল বই
- লাভ নেই
- কুড়ি করে দিচ্ছি
এরপরেই হাতবদল। যেসব জায়গায় এই পদ্ধতিটা একেবারেই অচল সেখানে আমি শুধু ক্যাটালগ হাতিয়েই বেরিয়ে আসি। ক্যাটালগ উল্টে-পাল্টে বোঝার চেষ্টা করি, কোন বইটাকে সংগ্রহে নেওয়া যায়। মেলার শেষে কলেজস্ট্রিটে হানা দেওয়ার আগে প্রস্তুতি সেরে নিতে চাই। কখনও চুপচাপ বসে থেকে দেখি ভিড় কোনদিকে যায়। এতদিন ধরে মাঠে যাচ্ছি, ভিড়ের গতিমুখ পাল্টাতে দেখলাম না। ভিড় বয়ে চলে সেই ইংরিজি বইয়ের স্টলের দিকে আর বাংলার দিকে আনন্দ, মিত্র-ঘোষ বা দেজে। থিমেও প্রচুর মানুষ। যদিও বলা অনুচিত, তবু বলি এবারের মত এত দীন থিমের স্টল আমার আগে চোখে পড়েনি। অবশ্য আমি মিডিয়ার বিভিন্ন স্টলে ভিড়ের কথা বলছি না। অনেকেই বলেন বইমেলাতে কেন এত খাবারের স্টল? কিন্তু বন্ধু খাবারের স্টল না থাকলে খিদে পেলে খাব কোথায়? অনেকেই অনেক দূর থেকে আসেন, একদিনেই অনেকক্ষণ সময় কাটান, তাঁদের তো বেশ অসুবিধে হত যদি এইগুলো না থাকত। অবশ্য আমি যেহেতু পুরো সময়টাকে চার ভাগে ভেঙে নিয়েছিলাম, আমার খাবারের দোকানে যাওয়ার দরকার পড়েনি। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, ট্রেন্ড মেনে পুরনো, দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ঝকঝকে রিপ্রিন্ট এবং সংগ্রহ এবারও আনুপাতিক হারে বেশি বেরিয়েছে। বইগুলো নিঃসন্দেহে ভাল। যদিও এই ধরনের বই তৈরি করতে প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন তবু আরও কিছু ভাল নতুন লেখালেখি এলে ভাল হয় (মানে আমি বলতে চাইছি “রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের উদ্ধৃতি সংগ্রহ” বা “সত্যজিতের যাবতীয় গল্পের সারসংক্ষেপ” জাতীয় নতুন লেখালেখি নয়। যেমন একটা নতুন বই বেরিয়েছে যার নাম ‘আলাপ’। প্রকাশক – প্রতিক্ষণ। বইটি আসলে ‘আমার সময়’ নামক অধুনালুপ্ত একটি সাময়িকী থেকে নেওয়া বিভিন্ন প্রথিতযশা ব্যাক্তিদের সাক্ষাতকারের সংগ্রহ, এটিকে আমি নতুন বই বলে ধরছি না। কারন পত্রিকাটি যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল এবং মাত্র কয়েকমাস হল বন্ধ হয়েছে তা অভিজ্ঞ ব্যাক্তিমাত্রেই জানেন )। অবশ্য এই পুরনো বইগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকাশ করছেন নতুন প্রকাশকরা। যাঁরা প্রতিষ্ঠিত তাঁরা বেশ কিছু নতুন বই প্রকাশ করছেন। এই তথ্য আমি সংগ্রহ করেছি বিজ্ঞাপন আর ক্যাটালগ থেকেই। এর মানে এই নয় যে নতুন প্রকাশকরা নতুন বই প্রকাশ করছেন না, সে কাজটিও তাঁরা করেছেন। আর প্রতিবছরই আমার যে কথাটা মনে হয়, এবারও মনে হয়েছে, যে আমাদের হয়ত আরেকটু পরিণত হওয়ার দরকার আছে। তিন-চার ঘণ্টা ধরে আনন্দ বা মিত্র-ঘোষ বা দেজে লাইন না দিয়ে যে সমস্ত প্রকাশক সারা বছর ধরে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছানোর আর্থিক সামর্থ্য রাখেন না এবং এই মেলাকেই বেছে রাখেন তার জন্য, তাঁদের প্রতি আমরা কেন আরেকটু সদয় হইনা? ভাল কাজ পাওয়া যায় বলেই আমার বিশ্বাস।
শেষ কথা – কাগজে দেখলাম মেলা ফেরত জনতার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। প্রথম তিনদিন একেবারে মেলা শেষ করে বেরিয়েছি কিন্তু আমি এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি।

এবারের কলকাতা বইমেলাতে আমি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments