বাংলা মিডিয়াম ইস্কুলে না পড়ার দরুন আমার বাংলা ভাষা শেখাটা সেরকম সাবেকি ভাবে হয়ে ওঠেনি। শৈশবে অক্ষরজ্ঞানের মুলে আমার দাদু ও কৈশোরকালে ভাষাজ্ঞানের পেছনে আমার জনৈক বন্ধুদের অবদান অনস্বীকার্য।তাদের সাথে বাংলা ভাষায় আলোচনা, গল্পের বই ও কমিক্সের আদান প্রদান আমাকে অনেকটাই মাতৃভাষামুখী করে তোলে। আর ননী ভৌমিক অনুবাদিত রুশ সাহিত্য সম্ভার আমাকে প্রথম শেখায় যে ভাষার বাঁধটা ভাবের গতির সামনে কিসুই না। এর পর যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বর মাঝখানে মিলেমিশে রয়েছে বইমেলা,নাটক,ফিল্ম, ইন্টারনেট ও বন্ধুদের চিঠি লেখালেখির মত খুচরো কিছু ব্যাপার স্যাপার।দীর্ঘদিন ধরে বাংলার বাইরে থেকে কিংবা মাঝে মধ্যে বাংলায় ফিরে এলেও আমি মনে করি আমার বাঙালিয়ানা মোটের ওপর ওই একইরকম রয়ে গেছে – পরবাসে স্বদেশী ও নিজভূমে প্রবাসী। মানে সহজ ভাষায় ঘটি আছে তো জল নেই আর পুকুরে নেমে খুঁজি কলসি কই? আমার সব পিসিদের বিবাহসূত্রে বাংলার বাইরে যেতে হয়। তাদের সন্তানদের সাথে আমার আলাপচারিতা থেকেই আমার প্রবাস সম্বন্ধে প্রথম স্বচ্ছ ধারণা গড়ে ওঠে। আমাদের বসার ঘরে টাঙানো রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখে যখন আমার পিসতুতো দাদা প্রথম জিজ্ঞেস করেছিল, ” এ দাড়িওয়ালা লোকটা যে আছে সে কি কোনো বড় সাধু-সন্ত হচ্ছে?” তখন আমি বুঝেছিলাম যে মাতৃভাষা সংক্রান্ত জ্ঞানাভাব নিয়ে আমার চেয়েও লজ্জা পাওয়ার মতো অনেক লোকজন আছে। আবার আমার এক পিসতুতো দিদি দিল্লিতে বড় হয়েছে রাইসিনা হিলসের এক ইস্কুলে পড়াশুনা করে যেখানে বাংলা বংশোদ্ভূত পড়ুয়াদের ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বাংলা সেখানো হয়। পরবর্তী কালে ক্রমে সে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকত্তোর ডিগ্রী পায়। গবেষণা চলাকালীনই সে ইউনিভার্সিটিতে বাংলা অধ্যাপনা শুরু করে কেননা পড়ানোর লোকের সেখানে বেজায় অভাব। তখন বাংলায় থাকা বাঙালি অধ্যাপকরা দিল্লিতে অধ্যাপনা করাটাকে বেশ নেক নজরে দেখতেন। তখন বেশ অবাক লেগেছিলো যে একজন যে কোনোদিন বাংলায় থাকেনি, যার বেশির ভাগ বন্ধুই অবাঙালি ও সারাদিন মূলত সে হিন্দি ও ইংরেজিতেই কথা বলে সে কি করে বাংলাভাষা চর্চা নিয়ে এতো নিষ্ঠা দেখতে পারে। ” কেন পারেনা, এতো বাঙালি যদি কোনোদিনও লন্ডনে না গিয়ে কলকাতায় বসে শেক্সপীয়ার নিয়ে গবেষণা করতে পারে তাহলে দিল্লিতে বসে রবীন্দ্রনাথ চর্চায় দোষ কোথায়?” – সেই সময় উত্তরটা দিয়েছিলো আদ্যোপান্ত নিরক্ষর আমার ঠাকুমা ।
এক কালে পাটনা-গয়া থেকে শুরু এলাহাবাদ-লখনৌ-বেনারস হয়ে দিল্লি-হরিদ্বার অব্দি বাঙালি পশ্চিমে স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির খোঁজে পাড়ি দিতো। সপরিবারে তীর্থ করতে গিয়ে পাকাপাকি ভাবে রয়ে গেছে এরকম উদাহরণও কম নয়। কারণ যাই হোক না কেন সময়ের সাথে সাথে দেশ জুড়ে সর্ব দিশায় ছড়িয়ে পরে এই বিস্তারিত ‘বং ট্রেইল’। আস্তে আস্তে এই ছোট ছোট আস্তানাগুলোয় বাঙালিদের নিজস্ব একটা ঘেটো তৈরী হওয়া শুরু হয়। কালক্রমে স্থায়ী কালীবাড়ি ও অস্থায়ী দুর্গাপুজো কে কেন্দ্র করে সেই আইডেন্টিটিটা একটা নিজস্ব স্বাধীন রূপ নেয় ও পরবর্তী কালে সাহিত্য, সংগীত ও নাট্য চর্চার মাধ্যমে তা হয়ে ওঠে এক পুরো দস্তুর প্রবাসী কারবার। এছাড়া মধ্যপ্রদেশে পূর্ববঙ্গীয়দের রেফিউজি কলোনী গড়ে উঠেছিল দেশভাগের পরে ও অনেকে বাঙালি মুম্বাই ছুটেছিল রুপোলি পর্দায় নিজের প্রতিভা মেলে ধরার তাগিদে। এই প্রবাসে বাঙালিরা অনেকেই পাঁচ ছয় পুরুষের ওপর আছেন। ভাষায় টান এসেছে , চেহারাতেও সেই বাঙালিসুলভ আলুভাতেপনাটা নেই কিন্তু তা সত্ত্বেও রয়ে গেছে অবাঙালিদের কাছে পরিচিতি হিসেবে ‘দাদা’ নামের ডাকটা। কড়াইশুঁটির কচুরি হয়তো মটর কচৌরি কিংবা আলুর দম হয়ে গেছে দম-আলু। মাছ কিংবা মিষ্টি প্রীতিও অনেকখানি থেকেও নেই মানে খানিকটা সিম্বলিক ভাবে টিকে আছে ফিশ টিক্কা ও ডেয়ারিমিল্কের লেজ ধরে, সেতো খাস কলকাতায় চশমা পড়া ক্ষুদেরা মাছে ভাজার চেয়ে কেএফসি বেশি পছন্দ করে। এখনও দেশ কিংবা আনন্দবাজার দেখতে পাওয়া যায় বসার ঘরের টেবিলে।ড্রেসিং টেবিলে উঁকি মারে বোরোলিন কিংবা কেওকার্পিনের শিশি আর রান্নাঘরে পাওয়া যেতে পারে পাটালি গুড় কিংবা দুলালের তালমিছরি। ও হ্যাঁ আরেকটা জিনিস লক্ষণীয় আর সেটা হলো এদের তিথি নক্ষত্র বাছতে বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা ও ছোট খাটো অসুখ বিসুখে হোমিওপ্যাথির প্রতি প্রচ্ছন্ন পক্ষপাতিত্ব। বাংলা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হবার জন্যে যারা কাগজ পত্রিকায় চোখ রাখেন না তারা হয়তো দেখা হলে জিজ্ঞেস করে, ” আচ্ছা এখন কলকাতায় কে আগে হচ্ছে , মোহন বাগান না ইস্ট বেঙ্গল ?” কিংবা ” মমতা সিএম হলো কেন? জ্যোতি বাসুর ছেলেটা কি নালায়েক আছে?”
শিকড় ছেড়ে বেরোনো মানে শিকড় ছিড়ে যাওয়া নয়। শিকড় তো অনেকেরই ছিঁড়েছে এক জায়গায় গ্যাঁট হয়ে বসে থেকেও। নব্বই দশকের মাঝামাঝি এক অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে ছেলের বাড়িতে গিয়ে তার নাতি নাতনিদের বাংলা শেখানো শুরু করেন। এখন তার ইস্কুলে প্রায় দেড়শো মূল-উৎপাটিত বঙ্গসন্তানদের ছেলে মেয়েরা নিয়মিত বাংলা শেখে। দুটো পত্রিকা ছাপা হয় -একটা মাসিক ও অন্যটি পাক্ষিক। গানের ক্লাসে রবীন্দ্রসংগীত নজরুলগীতি নিয়মিত শেখানো হয় ও এ ছাড়া রয়েছে এক নিজস্ব ভঙ্গিতে গড়ে ওঠা কিশোর কিশোরীদের বাংলা ব্যান্ড , নাম শিকড়ের সন্ধানে। বিদেশে বড় হওয়া ভারতীয়দের যেরকম হ্যাটা করে এবিসিডি মানে আমেরিকান বর্ন কনফিউসড দেশি বলা হয় প্রবাসী বাঙ্গালীদের ক্ষেত্রে কিন্ত সেরকম কিছু এখনো কয়েনেজ করা হয়নি। অনেকেই অবশ্য তাদেরকে বাংলায় থাকা অবাঙালিদের সমতুল্য ধরে নিয়ে খোট্টা-মেড়ো হিসেবে গণ্য করে থাকেন, সহজাত বাঙালি আঁতেলপনা ঘিরে বেরিয়ে আসে ঘেন্নার দাঁত নখ। এসবের উর্ধে উঠলেই বোঝা যাবে যে আদপে তাদের মাতৃভাষার প্রতি টান বেজায় অর্গানিক ও সঙ্গে আছে নয়া জমানার বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠার প্রবল ইচ্ছে। ২১এ ফেব্রুয়ারী কিংবা ১৯এ মে নিয়ম করে পালন করে যারা তাদের মাতৃভাষা সংক্রান্ত সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার মতো ধৃষ্টতাকে আমি ধিক্কার জানাই। সবার কথা বলতে পারবোনা কিন্ত আমার কাছে এরা হলো বিবিবিবি মানে ‘বিয়ন্ড বেঙ্গল ব্যালান্সড বং’।

এ প্রবাসে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments