আমি আগেই বলেছি, রান্নাবান্না আমার তেমন একটা আসে না, তাও সাহস করে একবার একটা রান্নার পোস্ট করে ফেলেছিলাম আর কিভাবে যেন সেটা মে মাসের বাছাই পোস্ট হয়ে গেছে। আমি জানি না, বাছাই হতে গেলে কি কি শর্ত পূরণ করতে হয়, আমার পোষ্টটা সে সব করতে পেরেছিল কিনা আদৌ (একবার মনে হল, খবারের পোস্ট, প্যানেল জুরিরাও তো বাঙালি, বাছাই না করে পারে!!!), তবুও বাছাই হয়ে আমি যারপরনাই আনন্দিত; টিভিতে দেখানো অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের প্রাপকদের মত বলতে ইচ্ছে করছে, এই প্রাপ্তি আমার দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিল, আমি চেষ্টা করব আপনাদের সাথে আরো সুন্দর সুন্দর রেসিপি ভাগ করে নিতে। কিন্তু বলতে ইচ্ছে হলে হবে কি, সে গুড়ে বালি!! রান্নার ভাঁড়ার আমার খালি!!
আমি তো তেমন গৌরী নই…
যাকগে নাই বা হলাম গৌরী কিম্বা অন্নপূর্ণা… রোজকার রান্না তো করি, তাই কিছু ভাগ করে নিই না কেন। এখানে যারা নিয়মিত আসেন, তারা অনেকেই বাড়ির বাইরে একা একা থাকেন, হয়ত পেটের স্বার্থেই এই রেসিপিগুলো তারা জানেন, তবুও যারা জানেন না, এবং ২মিনিটের ম্যাগির শোকে কাতর, তাদের জন্যে আরও একবার থাকল কয়েকটা সহজ এবং দ্রুত তৈরি করা যায় এমন রেসিপি ওটস দিয়ে, কারণ একার সংসারে ওটস, করনফ্লেক্স, মুসেলি থাকে না—এটা হয় না। এগুলো সবই নিউট্রন-এর জন্যে বানানো, তেনার মুখে আবার একঘেয়ে খাবার বেশি রোচে না, আমার ছেলে হয়ে এত স্বাদ-প্রবণ হয় কি করে কে জানে বাপু…
১। ওটস পরিজ
উপকরণঃ দুধ, ওটস, চিনি/মধু।
প্রণালীঃসহজতম ওটস রেসিপি। দুধ গরম করতে দিয়ে তাতে স্বাদমত চিনি মেশাও। হাল্কা গরম হলে ওটস ভালো করে মিশিয়ে ২/৩ মিনিট ফোটালেই রেডি পায়েসের মত ওটস পরিজ। রান্নার পরে ওটস পরিমাণে বেশ বেড়ে যায় তাই দুধটা সেই বুঝে একটু বেশি দিতে লাগে, না হলে তলা ধরে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। ইচ্ছেমত শুকনো মেওয়া অথবা তাজা ফল ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে ওটসের উপর। মাইক্রোওভেনে করতে চাইলে হাল্কা গরম দুধে চিনি আর ওটস ভালো করে মিশিয়ে মিডিয়াম পাওয়ারে ৩ মিনিট মাইক্রো করে নেওয়া যেতে পারে। আমি সাধারনত চিনি দি না, তাই পরিজ তৈরি হয়ে গেলে অতে মধু মিশিয়ে ভালো করে ঘেঁটে নি।
২। ওটস উপমা
উপকরণঃ ওটস, তেল, গোটা জিরে, গোটা সর্ষে, কারি পাতা (ঐচ্ছিক),নুন, চিনি, পিঁয়াজ, টমেটো এবং ইচ্ছামত অন্যান্য সব্জি (সাধারণত শীতের সব্জি অর্থাৎ যেগুলো ভেজ ফ্রায়েড রাইস-এ দেওয়া যায়, সেগুলো সবই দেওয়া যায়; পটল, বেগুন, লাউ, কুমড়ো ইত্যাদি তেমন ভালো লাগে না )
প্রনালীঃ পিঁয়াজ, টমেটো, বিন, গাজর, ফুলকপি, পিয়াজশাক ইত্যাদি ছোট করে কেটে রাখতে হবে, কড়াইশুঁটি ছাড়িয়ে রাখতে হবে। সমস্ত সব্জি কেটে ধুয়ে নিতে হবে। শুকনো খোলায় ওটস ভেজে রঙ খয়েরি মতন হলে তুলে নিয়ে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে রাখতে হবে।
কড়া বা ফ্রাইং প্যানে তেল গরম করতে দিয়ে তাতে সর্ষে আর জিরে ফোড়ন দিতে হবে। গন্ধ উঠলে প্রথমে পিঁয়াজ এবং একটু পরে টমেটো ভাজতে হবে, এগুলি একটু রসা মত হয়ে এলে, বাকি সব্জি গুলি দিয়ে মিডিয়াম আঁচে ৪/৫ মিনিট সতে করতে হবে। এবার নুন, মিষ্টি দিয়ে ব্লেন্ড করা ওটস মিশিয়ে জল দিয়ে ভালো করে নাড়তে হবে। দু-তিন মিনিট ঢাকা দিয়ে মিডিয়াম আঁচে রাখলেই তৈরি আমাদের ওটস উপমা। উপরে কারিপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করতে হবে।
৩। ওটস প্যানকেকঃ
উপকরণঃ ওটস, নুন, চিনি, চাট মশলা, টমেটো সস, জল, তেল।
প্রণালীঃ তেল ছাড়া বাকি উপকরণ গুলি ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে, প্রথমে জলের পরিমাণ একটু কম দেওয়া উচিৎ, কারণ খুব বেশি ‘runny’ (বাংলা কি? প্রবহমান??) হয়ে গেলে প্যানকেক মন্ড পাকিয়ে যাবে, মুচমুচে হবে না : আর খুব বেশি ঘন হয়ে গেলে প্যানকেকের ভিতরটা ভালো ভাবে তৈরি হবে না। ঘনত্বটা একটু লস্যির মত হওয়া উচিত, অর্থাৎ ঢালতে গেলে হুট করে গড়িয়ে পড়বে না, আবার আটকেও থাকবে না। আমি নিজে জলের ব্যাপারে হাতের আন্দাজ মেনে চলি গোটা ভারতবর্ষের ৯০% রাঁধুনির মত। যাই হোক, এক-দুবার বানালে আপনিও পেয়ে যাবেন আন্দাজ। এবার ফ্রাইং প্যানে তেল দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিন, তেল গরম হলে ব্যাটারটা দিয়ে বেশি আঁচে ভেজে নিন, এক পিঠ ভাজা হয়ে এলে উলটে দিয়ে অন্য পিঠটাও ভাজা ভাজা করে নিন, মাঝের সময়টাতে আঁচ কমিয়ে মিডিয়াম করতে হবে, না হলে ভেতরটা কাঁচা কাঁচা থেকে যাবে। ব্যাটারটা দেওয়ার সময় একটু সমান ভাবে ছড়িয়ে দিন, আর একটু পাতলা করে ছড়ান। ভাজা হয়ে গেলে গরম গরম পরিবেশন করুন। ওটসের যেকোনো রান্নাই ঠাণ্ডা হয়ে গেলে একটু বিস্বাদ খেতে লাগে।
৪। ওটস-গাজর প্যানকেকঃ
উপকরনঃ ৩ নম্বর রেসিপির মতই, টমেটো সস দেওয়ার দরকার নেই, আর অতিরিক্ত লাগবে একটা গাজর।
প্রণালীঃ রেসিপির সব থেকে সময় নেওয়া কাজটা হল গাজর গ্রেট করা বা ছেলা। প্রথমে আমি হাতে গাজর ছিলতাম ক্রাশারে করে, কিন্তু এখন আর হাতে করি না। যাদের ফুড প্রসেসর আছে, তাদের অসুবিধা নেই, না হলে গাজর কে বড় বড় টুকরো করে সাধারন মিক্সিতে মিনিমাম স্পিডে ২০/৩০ সেকন্ড মত চালিয়ে নিলেই গাজর ছিলা তৈরি। মিক্সিতে ওটস, নুন, চিনি, চাট মশালা, জল দিয়ে ব্লেন্ড করে নিয়ে ছিলে রাখা গাজরের সাথে মিশিয়ে নিলেই তৈরি আমাদের ব্যাটার। এবার আগের রেসিপির মতই ভেজে নিলেই তৈরি ওটস-গাজরের গোলারুটি।
৫। ওটসএর হোয়াইট সসঃ
উপকরনঃ ওটস, মাখন, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, দুধ, চিজ (ঐচ্ছিক)
প্রণালীঃ ছোট সসপ্যানে কম থেকে মাঝারি আঁচে মাখন গরম করতে দিতে হবে, মাখন গলে গেলে তাতে নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো এবং মিক্সিতে ব্লেন্ড করে রাখা গুঁড়ো ওটস মিশিয়ে দ্রুত নাড়তে হবে, যাতে মণ্ড পাকিয়ে না যায়। লেই তৈরি হয়ে গেলে ১ মিনিট মত আঁচে রাখতে হবে নাড়তে নাড়তে। এবার গরম করে রাখা দুধ মেশাতে হবে ধীরে ধীরে এবং নাড়তে নাড়তে। ধীরে ধীরে মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে, নামিয়ে গ্রেট করা চিজ এবং গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে পরিবেশন করতে হবে ওটসের হোয়াইট সস। বেশি মাখন খেতে না চাইলে মাখনের সাথে অল্প সাদা তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে; তবে স্বাদে হেরফের হবেই। আর চিজটাও ঐচ্ছিক আগেই বলে রেখেছি। সাধারনত মাখন, চিজ থাকে বলে এটি একটু ভারি হয়, তাই একটু কম পরিমাণে ওটস নিলেও চলে আর কি।
৬। ওটস বাটারমিল্ক বা ওটসের ঘোলঃ
উপকরণঃ ওটস, দই, চিনি, নুন, ভাজা মশলা (গোটা জিরে এবং শুকনো লঙ্কা শুকনো চাটুতে ভেজে গুঁড়ো করা), জল পরিমান মত।
প্রনালিঃ সমস্ত উপকরণ ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালো করে ব্লেন্ড করে নিলেই তৈরি ওটসের ঘোল। উপরে ভাজা মশলা ছড়িয়ে ঢকঢকিয়ে খেয়ে ফেলুন দেখি। দইএর সাথে সাথে ওটসের পুষ্টিও শরীরে যাবে এই গরমের দিনে।
৭। লেবু ওটস (লেমন ওটস)
দক্ষিণ ভারতের লেমন-রাইসের অনুরূপে বানানো এই পদটি। আমার তো বেশ ভালো লেগেছে, আপনাদের কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন।
উপকরনঃ ওটস(শুকনো খোলায় হাল্কা খয়েরি করে ভেজে রাখা),হলুদ, লেবুর রস, নুন, বাদাম (শুকনো খলায় ভেজে রাখা), তেল, সর্ষে, শুকনো লঙ্কা, কাঁচা লঙ্কা, হিং, বিউলি ডাল, কারিপাতা (ঘরে হিং, বিউলিডাল না থাকলে বাদ দিয়ে দেবেন)।
প্রনালিঃ তেল গরম করে তাতে সর্ষে, শুকনো লঙ্কা, ডাল ফোড়ন দিন, গন্ধ বের হলে কাঁচা লঙ্কা, কারিপাতা এবং হিং দিয়ে ভালো করে নেড়ে নিন। হলুদ, নুন এবং জল দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নিন। এবার ওটস দিয়ে আঁচ কমিয়ে ঢাকা দিয়ে ৪/৫ মিনিট রান্না হতে দিন। রান্না হয়ে গেলে লেবুর রস মিশিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকুন।উপরে বাদাম, কারিপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

সাতকাহন তো শেষ। সবগুলোই অত্যন্ত সহজ এবং তাড়াতাড়ি বানানোর রেসিপি। আশা করব সাতটার মধ্যে অন্তত একটা বানিয়ে মন্তব্য করবেন কেমন লাগলো। আর সত্যি যদি সবকটা রেসিপি আগেই জানা থাকে, তাহলেও জানাতে ভুলবেন না; তাহলে বুঝবো চর্যাপদে এরকম ফাঁকিবাজি চলবে না…

ওটসের সাতকাহন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments