এ’ কদিন মাটিতে জল পড়েছে তেড়ে । আকাশ এখন অকৃপণ । বা হয়তো অতটাও উদার নয়, নিজের দায়ভার ঝেড়ে ফেলছে চমরী গাই বা একাধিকবার দার পরিগ্রহ করা জমিদার বাবুর বড় ছেলের মতো । বেসামাল বৃষ্টিতে মাঝে মাঝেই গোড়ালি ডোবানো জল জমে থেকেছে একরাত , বা ঘড়ির হিসেবে কমবেশি একটা গোটা দিন । জল নিকাশি পাইপে এখন ভেজা মাটির আস্তানা । অতএব জল গড়াতে যে বাড়তি সময়টুকু লেগে যাচ্ছে তার মধ্যে ঘাস ফড়িঙেরা এখন ঘাস- চোরকাঁটার আগাতেই বসে বিশ্রাম নিচ্ছে , আর তেমনি বিপদেও পড়ছে বেশি করে । কবোষ্ণ , মেঘে ছেঁকে আসা রোদের সঙ্গে যেমন মুলাকাত হচ্ছে ওদের , তেমনি দেখা হচ্ছে শালিকের সঙ্গে। তারপর , নিয়ম পালন হচ্ছে। খাদ্য পিরামিডের একেবারে নীচে থাকার বিড়ম্বনা আছে বেশ কিছু , পাশাপাশি দায়িত্বও তো আছে ।
মাঠচরা সাদা গো-বক গুলোর পিঠ –বুক- গলা এসময়ে হলদেটে কমলা বাহারি পালকে ঢেকে থাকে । এ বড় সুখের সময় ওদের । সুখের কি আর একটা কারণ থাকে ! অনেক উঁচু থেকে দল বেঁধে উড়ে এসে হঠাৎ মাঠের বুকে বলাকার মিশে যাবার দৃশ্যটি নেমন্তন্ন বাড়ির কথা মনে পড়িয়ে দেয়। এমন খোলা নিমন্ত্রণ আর বড় একটা দেখিনা ।


এরই মধ্যে একদিন দুপুর নাগাদ বৃষ্টি নামবে নামবে করছে । আকাশ পূর্ণ গর্ভাবস্থায় অপেক্ষমাণ । হঠাৎ চোখ চলে গেল মাঠের মাঝের দিকে । দেখলাম ছোট ছোট সাদা সাদা নুড়ির মতো যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কারা । এমন সুন্দর , নিটোল গড়ন যে দেখে মনে হবে যেন বানিজ্যিক চাহিদামতো মেশিনে কাটা , পালিশ করা শিলাবৃষ্টির শিল । কাছে গিয়ে দেখতেই সে ভ্রম ভাঙলো । সাদা সাদা ছত্রাকগুলো কালো মেঘের নীচে শুয়ে চকিতে যে অমরত্ব পাবে, এ কথা তারা নিজেও কি জানতো কোনোদিন?
সেদিন সত্যিই শিলাবৃষ্টি হয়েছিল । শিলাবৃষ্টির পরে আসল – নকল সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতি তো প্রপঞ্চেই ভুলিয়ে রাখতে চায় দুদণ্ড। সমান্তরাল ভাবনার আঁতুড়ঘর বুনে দেয় নিজেরই একপাশে । বৃষ্টির দুদিন পর থেকে ছত্রাক গুলি ক্রমশঃ ঢেকে যেতে থাকল নতুন সবুজের আড়ালে । যেন বয়োজ্যেষ্ঠের দল সাক্ষী হয়ে রইল নবজন্মের। একসময়ে নবজাতকেরা যুবক হয়ে উঠলে ‘গ্রাস কাটার’ নিয়ে আসা হল । ব্লেডের সামনে ঘাস ফড়িঙের যে প্রাণপণ দৌড় দেখা তা অনায়াসে ফেল পড়িয়ে দেবে স্পিলবারগের দৃশ্যগ্রহণ কে। এক সময়ে আর ঘাস রইল না, কিন্তু ঘাস ফড়িঙেরা রয়ে গেল কিনা জানার উপায় নেই । তাদের প্রকাশ যে ঘাসেই।

“ক্লিন শেভ” করে কাপড়ে বেঁধে ঘেসুড়েরা পোষ্য গাইবাছুরের জন্যে জীবনের ধন গুছিয়ে নিয়ে যাবার পর যা পরে রইল তার নাম সোমবার । প্রকৃতির কোলে নিয়ত জন্মে চলে জীবন, আর যে কোনও আঁতুড়ঘর মাত্রেই তো অপরিচ্ছন্নতা । অতিথিদের কাছে মান রাখতে সোমবারের আগেই চত্বর বেমালুম সাফ করে ফেলার কথা ছিল। পেশাদার দুনিয়ায় ক্লিন শেভ – ফর্মালিটিরই রমরমা ; সেখানে ইনফর্মাল বিশুদ্ধতা বা বিশুদ্ধ ইনফর্মালিটিগুলো ঘাসে ঢেকে যাওয়া ছত্রাকের মতোই থেকে যায় কিনা জানার উপায় নেই । থাকে নিশ্চয়ই , নাহলে আর উপযুক্ত পরিবেশে মাথা চাড়া দেয় কিভাবে? প্রতিটি ক্লিন শেভের পরে আসলে জীবন আবার করে বেঁচে ওঠে , জেগে থাকে, বেড়ে ওঠে । কাঁচির আঘাত ওতে শুধু একটা আকার দিয়ে যায় ।

“ ও বারিশ কা পানি…” (২)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments