উলস্‌, চাকুম চাকুম।

যা খেতে না! ভাবতেই পারবেন না।

ঝালটা একটু বেশি হয়েছে আজকে। সে যাক গে, মোটের উপর রান্নাটা মন্দ হয়নি- ভালোই।

আমি আগে খেতুম না, কিন্তু একবার যখন খাওয়া ধরলুম তখন এইডস্‌, যক্ষ্মা, টিবি- কিছুই বাদ দিই না। জলে ডোবা, আগুনে পোড়া- কিছুই না।

খাওয়ার সময় অত কিছু মনেই থাকে না।

তাছাড়া, মানুষ তো মানুষের জন্যে। জীবন তো জীবনের জন্যে। এটুকু সহানুভূতি যদি তাদের উপরে দেখাতে না পারি তাহলে তারা তো মরেও শান্তি পাবে না।

কোনোদিন খাননি বুঝি? আহা! শুরু করুন। নইলে পরে পস্তাবেন। পরে যখন দেখবেন আপনার পড়শি আপনাকে শিকে বেঁধে ঝলসাচ্ছে, তখন আপনিই ভাব্ববেন, ধুর! এর চেয়ে যদি আমিই ওকে ঝলসাতে পারতাম!

তাই আর লজ্জা না করে খেতে শুরু করে দিন। লজ্জা, ঘৃণা, ভয়- এই তিন থাকতে নয়- শোনেননি? তাহলে? আর সব কিছুই প্রথমে একটু বাধো-বাধো ঠেকে, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তাছাড়া, লজ্জার’ই বা কি আছে শুনি? অনেক মহান লোকেই তো খেয়ে গেছেন, বলা চলে খেয়েই মহাপ্রাণ হয়ে গেছেন।

যেমন ধরুন, স্বর্গীয় পরশুরামবাবু। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়- কাদের মাংস কতো রকম খেতে তার একটা ফিরিস্তি দিয়ে গেছেন (অবশ্য, নিজের জবানীতে বলেননি- শূর্পণখাকে দিয়ে বলিয়েছেন)। আমার গুরুদেব, শ্রীযুক্ত শিব্রাম চকরবরতীমশাই ঘোমটার নিচে গুড়ুক খাওয়া পছন্দ করতেন না, তিনি নিজের মুখে বলে গেছেন। তাঁর লেখা পড়েই আমি এবিষয়ে অনুপ্রাণিত হই। তার আগে মানুষ এমন উপাদেয় খাদ্য আমার জানা ছিল না।

তবে আমি না জানলেও আগে আরও অনেকেই জানতেন- যুগে যুগে কালে কালে কত গাথা-কাহিনী রচিত হয়েছে সেইসব পরোপকারী মানুষদের উদ্দেশ্যে- যাঁরা অপরের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমি একজন মহান এবং মহাপ্রাণ কবিকে জানি (নাম মনে পড়ছে না) যিনি লিখেছিলেন- উদরের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই, ওরে ভয় নাই/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই (বা এইরকমই একটা কিছু)। অবশ্য কাকে পেটে পুরে এরকম অনির্বচনীয় তৃপ্তি তাঁর ঢেঁকুরের সঙ্গে এসেছিল তা লেখেননি। আবার একজন দেড়শ’ বছর বয়স্ক যুবককে জানি, যিনি বলেছিলেন, জিভে প্রেম করে যেইজন/ সেইজন সেবিছে উদর (অথবা এর কাছাকাছি কিছু একটা)- একথাটাও তো মানুষকে লক্ষ্য করেই বলা। এই শেষ বাণীটা আমি পড়েছি ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের একটা কবিতায়। সুতরাং কারোর যদি এই বাণীটা নিয়ে আপত্তি বা কৌতূহল থাকে, তাহলে শ্রীমজুমদারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তবে, অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলার আগে তিনবার ভাববেন; কারণ, …বুঝলেন না?

ভাবুন তো, পৃথিবীটা কত সুন্দর হবে! আজ থেকে সবাই যদি অন্তত একজনকে খাওয়া শুরু করে, তাহলে কালকেই পৃথিবীর জনসংখ্যা এক ধাক্কায় সাতশ’ কোটি থেকে সাড়ে তিনশ’ কোটিতে পৌঁছে যাবে। বিশ্বাস করুন, মানুষের মত এমন পুষ্টিকর, সস্তা এবং টেস্টি খাদ্য শুধু গোটা পৃথিবী কেন বড়বাজার-নিউমার্কেট খুঁজলেও পাবেন না। মরা হাতি যেখানে লাখ টাকা কিলো, সেখানে মরা মানুষ মোটে দু’টাকা, তাও আগে যখন আট আনা পাওয়া যেত তখন দেড় টাকা ছিল (আমি নিজে কিনেছি)। মানুষ তো আর পাঁঠা নয় যে গুঁতোবে- বাঘ নয় যে কামড়াবে- সাপ নয় যে ছোবল মারবে। শুধু পছন্দ করুন আর খান। কোনো ঝামেলা নেই- ঝঞ্ঝাট নেই- বাড়ী থেকে বেরোনোর সময় টিফিন ক্যারিয়ার দরকার নেই। রাস্তায় বেরিয়ে কাউকে ভালো লাগলো অমনি তাকে ধরে-বেঁধে, রেঁধে-বেড়ে, দিয়ে-থুয়ে, হাত ধুয়ে, খেয়ে নিন। নিজে খেলেন, আবার যাকে খেলেন তাঁর পরিবারকেও খাওয়ালেন। সম্পূর্ণ নিখরচায়। আরও আছে, শুনবেন? ধরুন অফিসের বস প্রোমোশন আটকে দিয়েছে- কলিগদের উস্কে দিন- তারপরে ভয় দেখান; দিন প্রোমোশন- নয়তো হালুম- এই খেলুম বলে। এই তো কিছুদিন আগেই শুনছিলাম একটি ক্রিশ্চিয়ান দেশের একটি শহরের মেয়র ফতোয়া জারী করেছেন- নিজের কবরের জায়গা ঠিক না করে মরা চলবে না। ওরে হাঁদা, কবর দেওয়ার কি দরকার, খেয়ে ফেল না! ল্যাটা চুকে যায়। মানুষ তো স্মৃতিতেই বেঁচে থাকে- যত ভালো স্বাদ, তত ভালো স্মৃতি। হিন্দুদের ব্যাপার-স্যাপার তো আরো ভালো, ভালো করে ঝলসানো হয়েই যায়। খই ছড়ান, হরিবোল হরিবোল করে খাটিয়ায় তুলে শ্মশানে নিয়ে যান। যাবার সময় মনে করে অল্প নুন আর মরিচ নিয়ে যান।

কেউ ভেবে দেখেছেন একটা স্বর্গত (বা নরকস্থ বা ত্রিশঙ্কু) লোকের পার্থিব দেহটা – যেটা আর কোনো কাজে লাগবে না – সেটা রাঁধলে কতজন লোক পেটপুরে খেয়ে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করবে? এখন কেউ মরলে বা মরবো-মরবো ভাবলে গোটা বাড়ী আর বাড়ীর সামনের ফুটপাথ আত্মীয়-কুটুম-বন্ধু-শত্রু-পাওনাদারে ছেয়ে যায়, ডেকরেটর আর ক্যাটারারদের কথা বাদ দিলাম। সবাই দুঃখ-দুঃখ মুখ করে চা-বিস্কুট খায় নয়তো রুমাল দিয়ে চোখের জল আর আঁচল দিয়ে নাকের জল মোছে। সেই মৃত অথবা মরণোন্মুখ লোকটার কি এগুলো কি ভালো লাগার কথা নাকি ভালো লাগে? নিশ্চয় না। এবার ভাবুন সবাই এসেছে বাড়ীতে, মুখে ভর্তি হাসি, গামলাভর্তি মশলা- মরলেই কড়ায় চাপিয়ে দেবে। যিনি মরছেন, তাঁর কতো আনন্দ হয় ভাবুন তো! আহা, কবে থেকে আশা করে আছে- আমি মরলেই এরা দুটো খেতে পাবে। বেশি হলে গরীব দুঃখী ভাগ পাবে। খাও, ভালবেসে খাও। বেঁচে থাকো, বেঁচে থাকো, অন্যকে খাও, অন্যকে খাওয়াও। অন্যকে খেতে দাও। ভাবতে গেলে জিভে জল আর হাঁড়িতে গরম ভাত আসে না?

সবাইকে এইজন্য মানুষের মত মানুষ হতে হবে। ওঠো, জাগো, এগিয়ে চলো। খাদ্য না হওয়া পর্যন্ত থেমো না; খেয়ে যাও। খেয়ে খেয়ে খোদার খাসী হও। খাদ্য চাই, খাদ্য চাই, চাই সাহস বিস্তৃত বক্ষপট। যত বিস্তৃত বক্ষপট তত বেশি খাদ্য। সেদিন আমার একটি স্পেনীয় বন্ধু নিয়ানডারথাল মানুষের মাংস খাওয়ালো। কী স্বাদ! তাঁর তার এখনো মুখে লেগে আছে। তবে, আমার প্রথম পছন্দ বৌদিদের। তারা মরে প্রমাণ করে তারা মরেনি। খেতে বসলে মনে পড়ে যায়, বৌদিগো তোমায় আমি কতো ভালোই না বাসতুম, সরি, এখনো বাসি। যেমন তুলতুলে মাংস, তেমনি তার গড়ন। কাঁচা’ই খেয়ে নিতে পারি, কেবল আমার বুকের ডানদিকটায় কেমন ব্যথা হয় (মানে, কষ্ট হয়) বলে খাই না। আর গলার হার বা কানের দুল তো উপরি পাওনা। এর মধ্যে মুখটা হলো গিয়ে সবচে’ বেশি ডেলিকেট। আমি মাংসটা আলতো করে তুলে নিয়ে মাখন লাগিয়ে খাই। খেয়েই দেখুন না; অমৃতের মত লাগবে, তবে টাটকা অমৃতের মত নয়- বছর তিনেক বাসী হলে যে’রকম হয়, সে’রকম। হাত-পা’গুলো সেদ্ধ করে মিট মশলা মাখিয়ে আধঘণ্টা রাখুন। এবার গরম জল ঢেলে খান। শুধু শুধু খেতে পারেন, আবার মুড়ির সঙ্গে চপ-কাটলেটের বদলেও খেতে পারেন ভালোই লাগবে। কনুই থেকে হাতটা আলাদা করে রাখতে পারেন- এবার চা’য়ে ভিজিয়ে খান। তবে সবচেয়ে ভালো খেতে বুক আর পাছা। কেমন খেতে সেটা বলার চেষ্টা করে বিশেষণের অপব্যবহার করতে চাই না, না খেলে আপনি বুঝবেন না। সত্যি বলছি, বাঙালী মেয়েদের মত এমন বুক আর পাছা অন্য কোনো জাতির মেয়েদের হয় না। দেখতে কেমন জানি না (অবিবাহিত এবং গৃহী সন্ন্যাসী), তবে খেতে একেবারে তোফা। বয়স বেশি হয়ে গেলে (মানে, কাকিমাদের) মাংস ছিবড়ে’র মত হয়ে যায়। তখন কুচি কুচি করে কেটে গরম তেলে ভেজে নিয়ে খাওয়া যেতে পারে। পুরুষের মাংস অতোটা ভালো খেতে হয় না। তবে টম্যাটো সস মাখিয়ে খেতে মন্দ লাগে না। হার্ট, লিভার, কিডনি এগুলো খাওয়া যায় না, বরং কুলের বা তেঁতুলের আচারের মধ্যে চুবিয়ে রাখতে পারেন। তবে আর যাই করুন, জাফরান দেবেন না- ওটা মানুষের মাংসের পক্ষে খুব খারাপ। চাইলে আরশোলা গুঁড়ো করে দিতে পারেন। আমি দু’টো বই লিখছি, ‘মানুষ খাওয়ার সহজপাঠ’ (চলিত ভাষায়) আর ‘মনুষ্য ভক্ষণ করিবার সহজপাঠ’ (সাধু ভাষায়)- এখানে আরো ভালোভাবে পেয়ে যাবেন।

সত্যি, মানুষের মত এমন উপকারী প্রাণী আর দেখা যাবে না। খেতে এবং খাওয়াতে- সবদিকেই সেরা। সেই কবে থেকে এই ট্রাডিশন শুরু হয়েছে (কিন্তু এখন আর সমানে চলছে না)। গান শোনেননি- এবার কালী তোমায় খাবো (অর্থাৎ, খুব খিদে পেয়েছে), আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা/ কাজ কি মোর মাংস কিনে (এখন গায়ে হলুদ আর কড়াইতে তেল ঢালা চলছে)। আবার যদি শুরু করা যায় কি গ্র্যাণ্ড হয় বলুন তো? তাহলে বন্ধু, আর দেরী নয়। আজ থেকেই শুরু হোক আপনার খাদ্য অভিযান। হাঁউ মাঁউ খাঁউ। মানুষের গন্ধ পাঁউ। শুরু করুন বাঙালীর মাংস দিয়ে। বাঙালীর প্রাণ, বাঙালীর আশা, বাঙালীর ঘরে যতো মাংস ঠাসা- তার উপরে নজর দেওয়া শুরু হোক আজ থেকেই। কেউ বেশি মাংস লুকিয়ে রেখেছে? মামলা আর হামলা শুরু করুন। আগে তাকে খান তার পরে তার জমানো খাদ্য। বেশি হলে আমি আছি।

এখনো কিন্তু কিন্তু করছেন! আচ্ছা, আপনি কি মানুষ? মানুষের প্রতি ভালবাসা আছে আপনার? আপনি কি ছাগল বা মুরগী খান না? তারা কি মানুষ নয়? আচ্ছা, আসল মানুষ না হোক- নকল মানুষ তো বটে। আর তারা যদি নকল মানুষ হতে পারে তাহলে আপনিই বা আসল মানুষ খাবেন না কেন? মানুষ ধরার কতো সুবিধা। কাটার সুবিধা। রান্না করার সুবিধা। ভাগ করার সুবিধা। আর খাওয়ার কতো সুবিধা সেতো অনেকক্ষণ ধরেই বলছি। ধরুন আপনি কাউকে খেতে গেলেন। সবচেয়ে খারাপ কি হবে? সে আপনাকে ধরে খেয়ে ফেলবে; এই তো? সে তো একদিক থেকে ভালোই হলো। গড খোদা কালীর দিব্যি এমন খাদ্য কোথাও খুঁজে পাবে না’কো তুমি। আমি অনেক কিছু খেয়েছি, ডাইনোসরের ঘিলু থেকে মশার ডিম- সব খেয়েই বলছি সবার উপরে মানুষ খাদ্য/ তাহার উপরে নাই।

এতো কিছুর পরেও যদি ভাবেন খাওয়া ঠিক হবে কিনা, তাহলে আপনি একটা রামগরুড়ের ডিম। ডিম ফুটে ছানা বেরোবার আগেই আপনাকে ফ্রাই বানিয়ে খাওয়া দরকার। কচমচ কচমচ।

বি. দ্র.- বিশ্বায়নের প্রভাবে মানুষ এখন সঙ্কীর্ণমনা হয়ে যাচ্ছে। নিজের খাওয়া পরার দিকেই এদের নজর, অন্য লোকে কি খেলো সেদিকে মন নেই। কে বা প্রাণ আগে করিবেক দান- এখন আর দেখা যায়না। তাই বলছি, আপনি বা আপনার পরিচিত যদি এমন বিপুলহৃদয় (সেই সঙ্গে বিপুলদেহী হলে ভালো হয়) ব্যক্তি থাকেন যিনি নিজেকে অপরের সেবায় লাগাতে চান, তাহলে আপনি বা সেই তিনি সত্ত্বর (অন্য কেউ খোঁজ পাবার আগেই) আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সঙ্গে বায়ডাটা এবং পছন্দসই অবিচুয়ারী থাকা বাঞ্ছনীয়। ব্রাহ্মণকুলে জন্মানো সুন্দরী তরুণীর আবেদন সবার আগে বিবেচিত হবে।

কচমচ কচমচ
  • 3.00 / 5 5
1 vote, 3.00 avg. rating (71% score)

Comments

comments