চারিদিকে নানা ঝামেলা। একদল মানুষ ভেবে ভেবে বের করেছে যে আদিম যুগই ভালো ছিল, সেই যুগেই ফিরে যেতে হবে। আধুনিক সমাজের বোরডম তাদের আর সহ্য হচ্ছেনা। মারদাঙ্গাধর্মজাতপাতঘৃণা এসব মেনস্ট্রীমে ফিরিয়ে আনা জরুরী। ভায়োলেন্স ছাড়া মানবসভ্যতা ভাত ভাত লাগে, আলুনী ঠেকে। সারাদিন ফেসবুক আর এক্সভিডিও কাঁহাতক ভালো লাগে! ভারতীয় বৈজ্ঞানিকরা নাকি সেই কারনে স্যাটেলাইট-ফাইট ছেড়ে টাইম মেশিন বানানোয় মনোনিবেশ করেছেন। তা ভালো। টাইম মেশিন স্যাটেলাইটের চেয়ে ঢের কাজের জিনিষ। স্যাটেলাইট যখন ওড়ানো হয় তখনই যত হাইপ। উড়ে চলে গেলেই খেলা শেষ। তারপর আর পাবলিক ওদিকে ফিরেও তাকায় না। কিন্তু টাইম মেশিনটা যদি একবার বানিয়ে ফেলা যায় তাহলে আমোদগেঁড়েদের ফুর্তির আর শেষ থাকবে না। প্রত্যেক দিন একটা করে নতুন নিউজ। কে আজ চেঙ্গিস খাঁ-কে আফগান থেকে ভারতের শর্টকাট রাস্তা চিনিয়ে দিলো, কে হিটলারকে গালিবের কোবতে শুনিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিলো, কে স্তালিনকে গুলাগ ট্যুরিজমের পরিকল্পনা বাতলে মিলিয়ন রুবল কামালো, এইসব নানাবিধ চক্কর চলতেই থাকবে চলতেই থাকবে। আর পাবলিকও এইসব নিয়ে প্রত্যেক দিন উন্নত থেকে উন্নততর গন্দগী মচাবে।   

 

তো এই হলো ব্যাপার। এইসব ঢব্বাজি চলতেই থাকবে। একদিকে এইসব, আর অন্যদিকে আমার মত ব্যর্থ আঁতেলদের আত্মমৈথুনের এই সব পাতলা রস জমতে জমতে ইন্টারনেটও ক্রমে বারানসীর গঙ্গা হয়ে উঠবে। তারপর মোদীজি’র মত কেউ এসে সেই গঙ্গাকে পরিষ্কার করার শপথ নেবেন। সে আবার আরো বড়ো এক ঢব্বাজি। সেও চলবে। সেই গঙ্গার নীচ দিয়ে আবার মেট্রোর টানেল খোঁড়া হবে। খোঁড়া বানানটা কি ঠিক লিখলাম? কে জানে! আমি আবার বানান-খোঁড়া। এইরকম বাঙলা বানান-জ্ঞান নিয়ে কোন সাহসে বাঙলায় লেখালিখি করি সেটা আরেক রহস্য! এরপর একটা বিস্ময়ের স্মাইলি দিতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু উপায় নেই। জীবনটা ফেসবুকময় হয়ে গেলে যা হয়! ফেসবুকে বিপ্লব থেকে রেলাবাজি, আঁতলামি থেকে সাহিত্যচর্চা, মানবকল্যান থেকে ধান্দাবাজি, সবই মোটামুটি করে থাকি। নিজেকে নিয়ে এই যে একটু বেশীই যেন সততার ভান করছি, যেন খুব আত্মসমালোচনা গোছের হচ্ছে, সেটাও আবার আরেক রকমের ঢব্বাজি! বাঙলায় যাকে বলে স্ক্যাম। এটা পড়ে যতটা মনে হচ্ছে অতোটাও আসলে নয়। কিম্বা হয়ত তারচেয়েও অনেক বেশী! আসলে গোটাটাই একটা গ্র্যান্ড ঢব্বাজির অংশমাত্র, পুরো জগত সংসারটাই এই ঢপের ওপরেই চলছে, আসলে সবই… ধুত্তোর নিকুচি করেছে!

 

এখন দুপুর দেড়টা মত বাজে। কিম্বা দুপুর না হয়ে রাতও হতে পারে। বস্তুত দুপুর কোনো নির্দিষ্ট সময় নয়। দুপুর মানে দ্বিতীয় প্রহর। সে রাত-দুপুরও হয়, ভোর-দুপুরও হয়। যেমন সন্ধ্যে। ভোর-সন্ধ্যে হয়, বিকেল-সন্ধ্যেও হয়। সময়ের ইন্ট্রিকেসি গুলো, সময়ের চাপেই, ক্রমশ ভুলতে বসেছি। ভাষা ক্রমশ পাতলা হচ্ছে। যেমন হয়। আকাশ অংশত মেঘলা। জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি। নাকি আষাঢ় শেষ হয়ে এলো? পিঠ হেলিয়ে বসার কারনে চেয়ারের তোয়ালেটা ভিজে গামছার মত হয়ে গেছে। রাতে ভাল ঘুম হচ্ছেনা গরমে। ফলে সারাদিন ঘামছি, হাই তুলছি আর হ্যালুসিনেট করছি। আগেরদিন রাস্তায় একটা কচ্ছপ দেখলাম। প্রথমে রীতিমত অবাক হয়েছিলাম। চুঁচড়োর রাস্তায় কচ্ছপ! তারপর নিজেকে বোঝালাম, এটা হ্যালুসিনেসান। তখন নির্ভয়ে কচ্ছপটার কাছে গেলাম। ব্যাপারটা আসলে কী সেটা দেখা দরকার। যাওয়া মাত্র কচ্ছপটা ঘ্যাঁক করে আমার পা কামড়ে ধরলো। সেই যে ধরেছে আর ছাড়েনা। মেঘ না ডাকলে নাকি কচ্ছপ কামড় ছাড়েনা। কি বিচিত্র সাইকো প্রানী মাইরি। সেই থেকে পায়ে একটা দামড়া কচ্ছপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। রাস্তা দিয়ে এই ভাবে বাড়ি এলাম। রাস্তায় যে দেখছে বলছে, “দাদা, আপনার পায়ে কচ্ছপ”। আমিও “ও পোষা” বলে ম্যানেজ দিতে দিতে ফিরলাম। কী উৎপাত ভাবুন! একে গরম, তার ওপর এই র‍্যান্ডম প্রাগৈতিহাসিক উৎপাত! তিন দিন ধরে পায়ে কচ্ছপ নিয়ে ঘুরছি। এখন এই লেখাটা লিখে পোস্ট করছি আর কচ্ছপটা বিরস বদনে আমার চেয়ারের পায়ার কাছে বসে রয়েছে। বসে বসে ঝিমোচ্ছে আর মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। ব্যাটা নিজেও বোধহয় বোর হয়ে গেছে। নিজের কচ্ছপত্বকে মনে মনে শাপশাপান্ত করছে হয়ত। "কেন আমি কচ্ছপ হয়ে জন্মালাম, কেনই বা মেঘ না ডাকলে কামড় ছাড়তে পারবো না, এ কি স্যাড লাইফ আমার"… এইসব একরাশ এগজিস্টেনশিয়াল প্রশ্ন তার ছোট্ট সুর‍্যিয়াল কচ্ছপমস্তিস্কে ঘুরছে। এখন একটু মেঘ ডেকে বৃষ্টি নামলে ও বেচারিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। আমিও বাঁচি। আর আপনারাও বাঁচেন এই অদ্ভুত অর্থহীন গদ্য পাঠের হাত থেকে।   

 

কচ্ছপ
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments