ছোটবেলা থেকে একরাশ সাদা দাড়িগোঁফওয়ালা বুড়ো বলতে দুজনের মূর্তি কিংবা ছবির কথা বেশি করে মনে পড়ে। একজন খাঁটি দেশি হয়েও বিদেশ বিভূঁইয়ে বেশ সমাদৃত ও অন্যজন পাক্কা জার্মান হয়েও আজকের দিনে বেজায় অবহেলিত, বলা চলে পশ্চিমা দেশগুলোতে যারপরনাই ধিক্কৃত। দেশি হোক বা বিদেশী, বাঙালি মাত্রেই আমরা প্রবীণ দাড়িগোঁফওয়ালা মানুষদের ঋষি-জ্ঞানী-মনীষী হিসাবে শ্রদ্ধা করে থাকি। আর তাই ২৫এ বৈশাখে দেশি দাদুর জন্মদিনের ঠিক চার দিন আগে আজ সেই বিদেশী দাদুর জন্মদিন পালন করছি। সেরকম ভাবে দেখলে আমি কিছুই করছিনা, দিব্বো নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলাম। ভোরের দিকে কারেন্ট চলে যেতেই ঘুমটা ভেঙে গেলো। গরমে অবস্থা কাহিল তাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর মালুম হলো যে এ’ত প্রায় গড়ের মাঠে পৌঁছে গেছি‼ সেখানে গিয়ে দেখি দাদুর মূর্তি ঘিরে এলাহী সব কান্ড। ভাবা যায়, দাদুর মূর্তি এই ভারতবর্ষে কলকাতা ছাড়া আর কোত্থাও নেই। দাদুর পাশে আবার তার বন্ধুর মূর্তিও আছে, এই দুই মানিকজোড় মিলে নাকি এক কালে কি সব আগডুম বাগডুম লিখেছিলো যে পুরো দুনিয়াদারির হিসেব নাকি রাতারাতি উল্টে পাল্টে গেছিলো। পরবর্তী কালে এদের সেইসব লেখাপত্র পড়ে অনেক জ্যাঠা,কাকা,মামাই উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের নিজের দেশে হাল্লা হাঙ্গামা করে মানুষ খেপিয়ে ‘কম-অনিষ্ঠ’ করেননি। এবং যারাই সেই অনিষ্ঠ কম করার পথে হেঁটেছেন তাদের চুল-দাড়ি-গোঁফ ক্রমহ্রাস্যমান হয়েছে ও মতাদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্যে বই থেকে ব্যানারে এক-এক করে তাদের সাইডফেস জুড়ে গেছে কম্যুনিষ্ট মনীষীর পরম্পরাক্রমে । প্রথমে আমাদের এই জার্মান বড়দাদু একঝাঁক সাদা চুল,গোঁফ আর দাড়ি, তারপর দাদুর বন্ধু ছোট জার্মান দাদুর চুল দাড়িটা পাশ থেকে একটু ছাঁটা। এর পর রাশিয়ান জ্যাঠার চুল প্রায় হাওয়া ও দাড়ি গোঁফ দুটোই কমের দিকেই। তারপর দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাশিয়ান ছোটকাকার শুধু গোঁফ ও সবশেষে চীনা মামা একেবারে পুরো মাকন্দো ‼ খেয়াল করে দেখবেন পরবর্তীকালে আমাদের দেশের নামজাদা কম্যুনিস্টরাও আর সেরকম ভাবে চুল দাড়ি গোঁফ রাখতে সাহস পাননি।

যাই হোক ফিরি আজকের সেই প্রথম জার্মান দাদুর জন্মদিনে তার গলায় মালা দেবার গপ্পে। একটু চোখ ঘোরাতেই দেখি সারা রাত লাইন দিয়ে সর্বহারা ‘মাকু পার্টির’ কমরেড এরোপ্লেন বসু আগে ভাগে কিছু চ্যালা চামুন্ডাদের নিয়ে দাদুর গলায় ধবধবে রজনীগন্ধার মালা দিচ্ছে আর আকাশের দিকে হাতটা হাতুড়ির মতো করে ছুঁড়ছে। ফাঁকা ময়দান মিডিয়াও এসে পৌঁছয়নি তাই তিনি জনৈক গাছতলায় ঘুমানো গৃহহীন ও মাঠে চড়া গরুদের উদ্যেশ্য তার সিগ্নেচার স্টাইলে বক্তৃতা শুরু করলেন,” এই বিশ্ববন্দিত মহাপুরুষ শুধু একজন প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্টই ছিলেন না উনি একজন প্রকৃত অর্থে মার্ক্সিস্টও ছিলেন আর তাই ওনাকে আমরা সবাই মার্ক্স্ নামেই জানি । উনি আমাদের ভাগ্যবিধাতা, ত্রাতা ,দ্রষ্টা ও আমাদের সবার প্রিয় প্রয়াতঃ কমরেড মতি বসুর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন। ১৯৫৫য়ে যখন বুলগানিন ও ক্রুশ্চেভ এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে সমগ্র বাংলার মানুষের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে তারা কি চায়, তখন এক কোটি বাংলার জনগণ সমস্বরে জানিয়েছিল ‘মার্ক্সবাদ ‘ … কিন্ত বন্ধুগণ পরের দিন এই বাংলার বামবিরোধী বুর্জোয়া পত্রিকাগুলোর খবরে তারা চক্রান্ত করে সেই ‘মার্কসবাদের ‘ চাহিদা চেপে যায়। মিথ্যা ভাবে ছাপা হয় যে বাংলার মানুষ নাকি আসলে ‘মাছভাত’ চেয়েছিলো ‼ বন্ধুগণ জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাঝে আমাদের শ্রেণীসংগ্রামের কান্ডারি হিসেবে আমরা বার বার যাদের নাম … ” দেখলাম গরুগুলো ঘাস খাওয়া থামিয়ে দিয়েছে ও গৃহহীনেরা মুখ ঘুরিয়ে লোটা হাতে শহীদ মিনারের দিকে হাঁটা লাগাতে শুরু করেছে। উনি তবুও আরো বার পঁচিশেক সমাজবাদ, শোষণ, পুঁজিবাদ, শ্রেণী ঐক্যর পার্মুটেশন কম্বিনেশন করে মিনিট দশেক গলা ফাটিয়ে ধুতি গুটিয়ে মঈনুদ্দিন ভবনের দিকে রওনা দিলেন, যাবার আগে তিনি জনশক্তি সংবাদপত্রের কেউ আসেনি দেখে কিঞ্চিৎ বিরক্তিও প্রকাশ করলেন। এর পরে বেলা বাড়লে এলো রাজ্যে ক্ষমতাসিন মা-কিউব দলের নেতা জগা। টুপ্ টুপ্ করে অমনি কোত্থেকে কোত্থেকে মিডিয়াও এসে জুট গেলো। তিনি এসেই কালীঘাটে পুজো দেওয়া লাল জবা ফুলের মালা দাদুর গলায় পরিয়ে ভক্তিভরে দু মিনিট বিড়বিড় করে কিসব মন্ত্র পড়লেন নাকি গালাগাল করলেন তা ঠিক বোঝা গেলো না। তিনি প্রথমেই মিডিয়ার উদ্দেশ্যে জানালেন যে মেনিদি নিজে আসতে পারেননি কিন্ত দিদি নিজে পুজো দিয়ে মা কালির পায়ে ঠেকানো এই মালা তার হাত দিয়ে পাঠিয়েছেন। এবার জগাদার বক্ত্যব্য চালু হলো , ” মা-কিউব আসলে হলো কাল মাক্সের দেখানো এমন এক সলিড ব্যাপার যাতে আমাদের দল পুরোপুরি বিশ্বাস করে। উনি কি বলেছিলেন? উনি বলেছিলেন পুঁজির সমবন্টন অর্থাৎ মাল্লুর সমান বাটোয়ারা হওয়া দরকার অর্থাৎ যাদের আছে তারা এমনি দিলে ভালো নাহলে কেড়ে নিতে হবে। আর সেই নীতি যখন আমরা শহর গ্রামে ফলো করি তখন বিরোধীরা বলে দাদাগিরি, তোলাবাজি, হুজ্জুতি। আবে কিসের দাদাগিরি, বেশ করবো তোলা তুলবো , কিছু করার থাকলে করে নে। ” উনি হাই পেসারের রুগী জেনেও মিডিয়ার লোকেরা আরো কিসব হারোদা-গারোদা নিয়ে জিজ্ঞেস করে উত্তক্ত করে যাচ্ছিলো । তাই উনি পরিপক্ক রাজনীতিকের মতো হাত নেড়ে সবার উদ্দেশ্যে বললো , ” বেশি কথা বলবো না , অনেক কিছুই বিচারাধীন আছে। শুধু পরের বছর থেকে এই মাক্সের মুত্তির পাশেই ওনার অনারে ‘দাস কাপালি উৎসবের’ আয়োজন করবো যাতে খাওয়া,দাওয়া,হোল নাইট ফাঙ্কশন সব কিছুরই ব্যবস্থা থাকবে। ‘ এর পরেও নাছোড়বান্দা মিডিয়ার থেকে অনেক প্রশ্ন আসছিলো কিন্তু দিদির ফোন আসতেই জরুরি মিটিং আছে বলে জগাও কেটে পড়লো।

বেলা যখন প্রায় পরন্ত তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতাধীন দল অর্থাৎ ‘মা-গোমূত্র দল ‘ গড়ের মাঠে কোথায় নির্বাচনী সভা করা যায় তা দেখতে চেয়েছিলো। এসে দেখলো মঞ্চ ফাঁকা,ভিড় বেশ ভালোই হয়েছে ও মিডিয়ার লোকেরাও ঘুর ঘুর করছে। আলটোপকে রেডিমেড এই মওকা পেয়ে দলের রাষ্ট্রীয় সভাপতি দাঙ্গাভাই মেহতা তো যারপরনাই অভিভূত। উনি তার ডান দিকে বসা রাজ্য নেত্রী রূপকুমারীকে কে জিজ্ঞেস করলেন,”ইতনা ভিড় ,ইয়ে কৌন সা বুড্ঢা বাঙালি বাবা কে জনমদিন হায় ?” রূপকুমারী মাথা চুলকিয়ে মুচকি হেসে উত্তর দিলো ,”স্যার,ইয়ে হামারা শত্রু পার্টিকা ভগবান মাফিক গুরুজী হায়…” মেহেতা বললো ,”হা হা ,ঠিক হায়, ইয়ে গুরুজীকা থোড়া ব্যাকগ্রাউন্ড হমে ভি শুনাও। ” তাতে মেহেতার বাঁ পাশে বসা অপর নেত্রী নেকলেস ব্যানার্জি বললেন, ” স্যার, ইয়ে জার্মানি কা আদমি থা, ইসকা নাম থা কার্ল মার্ক্স আউর ইয়ে এক কমিউনিস্ট থা .. .” দাঙ্গাভাই যা বোঝার বুঝে আর দেরি না করে গেরুয়া গাঁদাফুলের মালা নিয়ে দাদুর গলায় ঝুলিয়ে ওনার মাথায় রক্তচন্দনের টিকাও কেটে দিলেন। সবাই হতবাক দেখে উনি আত্মপ্রত্যয়ের সাথে বক্তৃতা শুরু করলেন , ” মিতরোঁ , এ যে বুজুর্গ সন্ত আছেন যার আজ জনমদিন আমরা মানাচ্ছি , ইনি আসলে এক প্রাচীন হিন্দু ঋষি হচ্ছেন। এর জনম অনেক সাল আগে হিমালয়ের চোটির উপর গঙ্গোত্রী তে হোলো। উনি ছিলেন আসলি ত্রিকালজ্ঞানী মোক্ষপ্রাপ্ত মানে এক কথায় ওনার নাম ‘কাল মোক্ষ’ ছিল। উনি হিমালয় থেকে এক কমণ্ডল গঙ্গাজল অর দুই শিশি গোমূত্র নিয়ে সিধা জার্মানি কে তরফ পায়দল চলতে থাকেন। তারপর উনি জার্মানি পৌঁছালে ওনার মহিমা দেখে পুরা জার্মান দেশ হয়রান হয়ে যায়। হিটলার ওনাকে ভেট করে স্বস্তিকা সম্বন্ধে জানে ও সেটা ওনার নিজের পার্টি সিম্বল বানায়। ওখানে ওনার অনেক শিষ্য বনে ও উনি সব্বাইকে ‘কর্মনিষ্ঠ’ হতে বলেন। জার্মানরা সংস্কৃত ওনার কাছ থেকে শেখেন কিন্তু ঠিক করে বলতে পারেন না তাই ওই দেশে ওনার আদর্শ কে সব্বাই কমুনিস্ট বলে। মিতরোঁ ….” এর পরে মেহতা আর কি বলেছিলো তা আর শোনা হয়নি ,শুধু দেখলাম বিকেল বেলা গৃহহীনেরা আবার গাছতলায় ফিরে মাটির মালসায় ভাত ফোটাচ্ছে। গরু গুলো ঝিমুচ্ছে আর একমনে জাবর কাটছে। ওদিকে আবার কারা যেন ভিড় বুঝে দাদুর মূর্তির তলায় একটা থালায় ধূপকাঠি জ্বালিয়ে ,দু চারটে কয়েন ছড়িয়ে গান ধরেছে,” মধুর তোমার জার্মান হাসি বাংলার বুকে পরে, মার্ক্সকে মনে পড়ে আমার মার্ক্সকে…”

কম অনিষ্টি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments