গ্রামের স্কুল মাষ্টার প্রদীপ মোহান্তির একমাত্র মেয়ে দীপালি। পারিবারিক জমিজিরেত পুকুর নিয়ে বেশ সচ্ছল পরিবার মোহান্তিবাবুর। একমাত্র ছেলে কটকে ডাক্তারি পড়ছে আর দীপালি দু’বারের চেষ্টায় এবারই নাইন থেকে টেনে উঠল। পড়াশুনায় মতি না থাকলেও মেয়েটা মায়ের মতই সুন্দরী হয়েছে। তাই সম্বলপুরের ছোট শালা যখন সম্বন্ধটা আনল মোহান্তিবাবু আর না করেন নি। ছেলে মস্ত-বড় ঠিকাদার, একেবারে কোটিপতি বলতে যা বোঝায় তাই। মেয়ের সাথে বয়েসের ফারাকটা বছর পনেরো হলেও নিজের বাড়ি গাড়ি সমেত বিধবা মা আর ছেলের ছোট্ট সংসার। বিয়েটা ধূমধাম করেই দিলেন মোহান্তিবাবু। ছেলের মায়ের দাবিদাওয়াকেও ছাপিয়ে বিশ ভরি সোনার গহনা আর নগদ পাঁচ লাখ যৌতুক দিয়ে কন্যাদায় সারলেন।

সম্বলপুর শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে জনবহুল এলাকায় তিনতলা বিশাল অট্টালিকায় বিধবা শাশুড়ি আর সরকারি ঠিকাদার স্বামীর সঙ্গে ছোট্ট সংসার দীপালির। একটু রগচটা স্বভাবের হলেও বিভু পণ্ডা লোকটাকে স্বামী হিসেবে শুধু মেনেই নেয়নি বোধহয় ভালবাসতেও শুরু করেছে। উটি থেকে হনিমুন সেরে এসে নতুন প্রেমের সুখ সাগরে ভাসতে ভাসতেই মাস তিনেকের মাথাতেই নিজের শারীরিক পরিবর্তনটা অনুভব করল দীপালি। ডাক্তারখানা থেকে চেক আপ করিয়ে নিশ্চিত হতেই শাশুড়িমার নির্দেশে কমপ্লিট বেডরেষ্ট। আরও মাস দুয়েক পরে কি যেন সব মেশিনে দীপালিকে পরীক্ষা করলেন ডাক্তারবাবু। ক্লিনিকের বেডে শুয়ে শুয়েই দীপালি দেখল দুরে ডাক্তারের সঙ্গে গম্ভীর মুখে কি যেন আলোচনা করছে বিভু পণ্ডা। ফেরার পথে রাস্তায় একটাও কথা হল না দুজনের। আজকাল শরীরটা যেন একটুতেই ক্লান্ত লাগে। বাড়ি ফিরেই বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে বেরিয়ে আসতেই দীপালি লক্ষ্য করল শাশুড়িমা আর স্বামী, দুজনেরই মুখটা কেমন যেন থমথমে। ঘরে গিয়ে শুয়ে পরল, ক্লান্তিতে বোধহয় ঘুমিয়েই পরেছিল। চমকে তাকাল শাশুড়িমার ডাকে,
- “বৌমা! দুধটা খেয়ে নাও..”
দুধটা খেয়ে আবার শুয়ে পরল দীপালি। মাত্রই কয়েক মিনিট, শুরু হল অসহ্য পেটব্যথা। দৌড়ে বাথরুমে গেল, শরীরের ভেতর যেন সবকিছু ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। দীপালির শরীরে বেড়ে ওঠা বাচ্চাটা কি তাহলে……

প্রথমবার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেছিল দুর্ঘটনাটা। তাই মাস চারেক পরে দীপালির শরীরে আবার নবাঙ্কুরের অনুভূতি জাগতেই শুরু হয়ে গেল সেই প্রথম বারের পুনরাবৃত্তি। একটাই খালি পার্থক্য, এবার আর মেশিনে দীপালির শারীরিক পরীক্ষার দিনেই নয়, তিনদিনের মাথায় শাশুড়িমার দেওয়া দুধ খেয়ে শুরু হল সেই চেনা অসহ্য পেটব্যথা এবং এবারও সেই প্রথমবারের মতই ওর শরীরে বেড়ে ওঠা বাচ্চাটা……

বছর ঘুরলো, গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষা নামলো। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। স্বামী টেণ্ডার জমা দিতে গেছে ভুবনেশ্বরে। শাশুড়িমা দিবানিদ্রায় মগ্ন। শরীরে নতুন প্রাণের উন্মেষ অনুভব করেছে দিন কয়েক হল। এবার আর কোনও ঝুঁকি নেয়নি দীপালি। স্বামী আর শাশুড়ির গোপন আলোচনার যে টুকরো টাকরা ওর কানে এসেছে তাতে একটা কথা ও বুঝে গেছে যে গত দুবারই ওর পেটে ওরই নিজের মেয়ে বেড়ে উঠছিল। ছোট সাইড ব্যাগে দুচারটে শাড়ি সায়া ব্লাউজ আর পার্সে হাজার দুয়েক টাকা নিয়ে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টিতে মনের জমে থাকা সব গ্লানি ধুতে ধুতে দীপালি পা বাড়াল নিজের সেই ফেলে আসা কৈশোরের গ্রামের পথে।

সব শুনে মোহান্তিবাবু আর মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি ফিরে যেতে জোরাজুরি করেন নি। কয়েক মাস পরে দীপালির কোল আলো করে জন্ম হল ছেলের। আদর করে দীপালি ছেলের নাম রাখল কর্ণ। ছেলে হওয়ার খবর পেয়ে ছেলের হাত ধরে বিভু পণ্ডার মা এসেছিল, সোনার চেন দিয়ে নাতির মুখ দেখতে আর সঙ্গে করে নাতিসহ বৌমাকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে। এবার আর মুখ আর মুখোশের পার্থক্য বুঝতে ভুল করেনি। স্বভাব শান্ত দীপালি শাশুড়ির গদগদ আবদারে দৃঢ় অথচ নিঃস্পৃহ স্বরে জবাব দিয়েছিল,
- “ছেলেটা তো আমার একার, আমার সাথে ও এখানেই থাকবে। আমার মেয়ে দুটোকে তো তোমার ঘরে ফেলে এসেছি, তোমরা মা-ব্যাটায় বরং ওদের নিয়ে থেকো…..”

কর্ণ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments