‘কর্মরতা নয় এরকম মা’ – সোনার পাথরবাটির সামিল। ফেসবুকে একবার পোস্ট দেখেছিলাম “ লোকে বেকার জিজ্ঞেস করে ‘নর্মাল ডেলিভারি’ কিনা? নর্মাল হোক বা সিজারিয়ান, একবার মা হওয়ার পরে আপনি ভুলেই যাবেন, নর্মাল কাকে বলে!!!” । গত দেড় বছরে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি কথাটা, নর্মাল বলে সত্যি কিছু নেই অথবা উল্টো ভাবে বলা যায়, যা ঘটছে, তাই নর্মাল। যাই হোক, এখানে কর্মরতা মা বলতে আমরা সেই সব মায়েদের নিয়ে আলোচনা করছি, যারা মায়ের দায়িত্ব সামলানোর পরে পেশাগত কোন দায়িত্ব নিয়েছেন, অরথাৎ নিয়মিত অন্য কোন কাজ করেন।
দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে গত কয়েকমাস ধরে উঠে পড়ে লেগেছি একখান চাকরি জোগাড় করতে, কিন্তু এখনো ভাগ্যলাভ হয়নি। নিউট্রনকে ছেড়ে চাকরি করতে যাব, এই ভাবনাটাই প্রাকৃতিক ভাবে কিছু অপরাধবোধ-এর জন্ম দিয়েছে আমার মধ্যে, আর তার ফলশ্রুতি ‘working moms’ dilemma’ খুজে বেড়ানো। অবশ্য, এর আগে গবেষণার কাজে নিউট্রনকে রেখে ইউনিভার্সিটি যেতাম, তাই কিছুটা অভিগ্যতা আছে, তবে তখন বাড়িতে ছিলাম, তাই অত কিছু দায়িত্ব নিতে হয়নি; নিউক্লিয়ার পরিবারে এসে সম্যক ধারণা লাভ হল এ ব্যাপারে। নিজের প্রয়োজনে পুরাতন অফিস-কলিগ, সিনিয়রদের, আত্মীয় পরিজনদের সাথে কথা বলে কিছু টিপস জোগাড় করলাম, ভাগ করে নিচ্ছি আপনাদের সাথে।

১। নিজের জীবন নিজে গোছান/ পরিকল্পনা
রিমাইন্ডার
যদিও আমরা জানি যে সমস্ত কিছু পরিকল্পনা মাফিক চলবে না, কিন্তু এটাও জানি যে পরিকল্পনা ছাড়া আরো কঠিন হবে সব কিছু সামলানো। তাই পরিকল্পনা করুন। সব থেকে ভালো হয় যদি স্মার্টফোনের যথাযথ ব্যাবহার করতে পারেন, অফিসের to-do তালিকা, বাচ্চাদের সময়সারণী, কর্তার বিশেষ কিছু সময়সারণী, নেমন্তন্ন এবং অন্যান্য ইভেন্ট সমস্ত কিছু ক্যালেন্ডারে লিখে রাখুন, এবং রিমাইন্ডার সেট করুন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, নেমন্তন্নের উপহার কেনার রিমাইন্ডার সেট করুন দিন থেকে বেশ কয়েকদিন আগের কোন এক সপ্তাহান্তে এবং অবশ্যই মাসের শেষের দিকে নয় (যখন হাতে টাকাপয়সা থাকবে, তখনি কিনে ফেলুন ার কি!)
খাবার মেনু
সপ্তাহের খাবার মেনু সপ্তাহের শেষ দিনে রাত্রে ঠিক করে ফেলুন, যাতে সেই অনুযায়ী বাজার করতে পারেন সপ্তাহান্তে।
ঘরের অন্যান্য জিনিষপত্রের পরিকল্পনা
যখন যে জিনিষ ফুরিয়ে যাবে, তৎক্ষণাৎ লিখে রাখুন ফোনের শপিং লিস্ট-এ। ভালো হয়, অডিও অপশন থাকলে, রান্না করতে করতেই মুখে বলে লিখে ফেলতে পারেন জিরা কিম্বা সরষে ফুরিয়ে গেছে কিনা।
অনলাইন? আপনার জন্যেই তো
বিল পরিশোধ করা, কিছু কেনা কাটা করা, ব্যাঙ্কিং এসব কাজ যতটা সম্ভব অনলাইন করে ফেলুন। ভয় পান অনলাইনে? সুরক্ষা বিধি মেনে চলুন। আর একটা টিপস মেনে চলতে পারেন, অনলাইনের জন্যে একটা আলাদা ব্যাঙ্ক আকাউন্ট রাখুন, যেখানে খুব বেশি টাকা রাখবেন না, কিন্তু মোটামুটি ভাবে সব বিল দেওয়া যাবে, এরকম কিছু টাকা সেভিংস আকাউন্টে পড়ে থাকবে।

২। নিজের সীমা জানুন
মাল্টিটাস্কার? সীমা টানুন
আপনি টিভির বিজ্ঞাপনে দেখানো সুপারমম নন (অথবা আমরা সবাই সুপারমম, দু-এক্টা কাজ কম করলে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না)। তাই নিজে বুঝুন কতটা আপনি করতে পারবেন, কতটা নয়। দরকারে কিছু কাজ লোক দিয়ে করান, কিছু কাজের জন্যে মেসিনের সাহায্য নিন। আমি হলফ করে বলতে পারি, গ্যাস-ওভেন, মিক্সার-গ্রাইন্ডার না থাকলে আমাদের মধ্যে অনেকেই কেরিয়ারকে অনেক আগে বিদায় জানাতাম। তাই দরকার মত মিক্সি, অয়াশিং মেসিন, ডিসওয়াশার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ফুড প্রসেসরের সাহায্য নিন। আধুনিক ফ্ল্যাটে তো সুবিধামত সব কিছু লাগানোর ব্যবস্থা থাকেই, যাদের নেই, তাদের জন্যে বলব, দরকারি মেসিনগুলিকে ঠিক জায়গায় রাখা কিন্তু একান্ত দরকার। আমি নিজে অনেক বাড়িতে দেখেছি, মিক্সি জায়গায় না লাগানো থাকায়, ‘আবার বের করতে হবে?’ ভেবে অনেকে ব্যবহার করেন না।
গুরুত্ব বিচার করুন
একটা জিনিষ মেনে নেওয়াই ভালো- আপনার সর্বোচ্চ ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করেও দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মা, এবং কেরিয়ারের শীর্ষে আরোহণ একসাথে সম্ভবপর হয়না; অন্তত বেশিরভাগ মায়েদের পক্ষেই হয় না। তাই কাজ এবং পরিবার—কাকে কতটা গুরুত্ব দেবেন, আগে থেকেই স্থির করে রাখুন। কারণ এরকম দিন আসবেই যেদিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাচ্চার স্কুলের পেরেন্ট মিটিং/ অনুষ্ঠান-ে যাবেন নাকি ক্লায়েন্ট মিটিং-এ।
কোনটা আগে, কোনটা পরে, কোনটা না করলেও চলে
বিভিন্ন কাজের মধ্যে কোনটা এক্ষুনি করতে হবে, কোনটা সপ্তাহের শেষে করলেও চলে, কোনটা অন্য কাউকে দিয়ে (কর্তা বা বাচ্ছারাও কিন্তু কিছু কাজ করতে পারে!) করানো যেতে পারে, ভেবে দেখুন। বাচ্চাদের ছোট থেকেই স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করুন। উদাহরণঃ জামাকাপড় তুলে আনার পরে ভাঁজ করার কাজটা ছোটরাও করতে পারে, অথবা বাড়িতে অতিথি এলে টেবিলে জলের গ্লাস ভরার কাজটাও বাচ্চারা করতে পারে।

৩। অপরাধবোধ থেকে নিজে বাঁচুন অন্যদেরও বাঁচান
খুশি থাকুন- এটা জরুরি স্বাস্থ্যকর পরিবারের জন্যে
চাকরি করবেন না করবেন না, এই সিদ্ধান্ত একবার নেওয়া হয়ে গেলে, অযথা অপরাধবোধে ভুগবেন না; কারণ খুশি খুশি মায়েরাই তৈরি করতে পারে খুশি খুশি পরিবার। শুধুমাত্র অপরাধবধে ভুগে নিজের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে কর্তা এবং বাচ্ছাদের শোনানো যে আপনি তাদের জন্যে কত কিছু ত্যাগ করেছেন, খুব ভালো ব্যাপার নয়। এবং নিজের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলি জোর করে সন্তানের উপর চাপিয়ে দেওাও কোন কাজের কথা নয়।
সময় দরকার, কিন্তু সে অভাব পূরন করা যায়
বাচ্চারা সবথেকে বেশি ভয় পায় অন্ধকার এবং একাকিত্ব। যতটা বেশি সময় আপনি বাচ্চাদের দিতে পারবেন, তা নিঃসন্দেহে উপকারে আসবে। কিন্তু না যদি দিতে পারেন, এত চিন্তার কিছু নেই; যেটুকু সময় পাবেন, ওর সাথে থাকুন, কথা বলুন, গল্প করুন, নিজের কর্মস্থলের কথা যতটা ওকে বোঝান সম্ভব, বোঝান। ওকে সাথে নিয়ে রান্নাঘরে যান, জামাকাপড় ভাঁজ করুন ওকে পড়াতে পড়াতে। সময়ের থেকেও বড় কথা, ওকে বোঝান আপনি ওকে কতটা ভালোবাসেন, কতটা চান। মায়ের সারাদিন বাড়িতে না থাকাটা যেন বাড়িটাকে বাড়ি না হয়ে উঠতে দেয়-সেটা দেখুন। টিন-এজ সন্তানদের জন্যে বিশেষত জরুরি এই রোজকার জীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলি ভাগ করে নেওয়া, আপনাকে দেখেই তো অ শিখবে, আপনি যদি ওকে গল্প বলেন, ও-ও আপনাকে বলবে স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা, ভালোলাগা, ভালবাসার কথা।
মানুষ হবে তো?
মা কর্মরত বা কর্মরত নয়- এর উপরে বাচ্চাদের মানুষ হওয়া নির্ভর করে না, নির্ভর করে সুখী পরিবারের উপর। আমরা প্রত্যকেই আমাদের সাধ্য মত চেষ্টা করি বাচ্চাদের সবথেকে ভালো জিনিষ শেখানোর, কিছু ও শিখবে, কিছু ও শিখবে না, কিছু নিজের মত করে ভাববে। তাও যদি ভয় পান, মাদাম কুরির মেয়ে আইরিন কে দেখুন! অথবা রবীন্দ্রনাথ-এর কথা ভাবুন, যিনি মায়ের সাহচর্য কতটা পেয়েছেন, জীবনস্মৃতি তে লিখে গেছেন।
আদর দিন, উপহার নয়
অপরাধবোধ থেকে বাচ্চাকে বেশি বেশি উপহার কিনে দেবেন না অযথা; চাহিদা তৈরি হবে। সময় দিন, ছুটির দিন একসাথে ঘুরে বেড়ান। বাচ্চারা কিন্তু ভীষণ দামি খেলনার থেকেও কখনো বেশি ভালবাসে মা-বাবার সাথে মাটি ঘাঁটতে।

৪। পারিবারিক জীবন বজায় রাখুন
বাচ্ছারা
চেষ্টা করুন ওদের কিছু আবদার রাখতে, কখনো একটা ফোন-কল অনেক ভাললাগার জন্ম দেয়। স্কুলের পরীকশা-হয়ত ভালো হয়নি, ফোন করে আপনি যদি বলেন ‘চিন্তা করিস না, পরের পরীক্ষার জন্যে পড়’ – কাজে দেবে।
নিউক্লিয়ার পরিবার
ডিনার-এর সময়টুকু no-tv-time করতে চেষ্টা করুন; দিনের কিছুটা সময় নিজেদের মত করে কাটান। me-time কিছুটা কম হতে পারে, চেষ্টা করুন কিছু কিছু কাজ ক্লাব করতে। বাচ্চাকে পার্কে নিয়ে যান, ওর সাথে আপনিও ব্রিস্ক ওয়াক করে নিন। বাচ্চাকে সি-স তে চড়িয়ে করে নিন কিছু পুশ-আপ্স।
বৃহত্তর পরিবার
দাদু-ঠাকুমা, দাদামশাই-দিদা দের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখুন। আপনার সাথে শ্বসুরবাড়ির না পটতেও পারে, কিন্তু নাতিনাতনির কাছে তারা দাদু-ঠাকুমাই, ওদের আপনার মত অনুযায়ী প্রভাবিত করবেন না।
বন্ধু-বান্ধব
যোগাযোগ রাখুন, ইগো ভুলে গিয়ে; নিজে ভালো থাকবেন, সবাইকে ভালো রাখতে পারবেন। ফোনে হ্যান্ডস-ফ্রি ব্যবহার করুন, যাতে অয়াশিং মেসিন চালাতে চালাতে কথাবারতা সেরে নিতে পারেন।
সামাজিক পরিবার
বাচ্চাদের উতসাহিত করুন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখান; প্রতিবেশীদের সাহতে সম্পর্ক বজায় রাখুন। অন্যদের প্রশ্নে/সমালোচনায় বিচলিত হবেন না, যথাসম্ভব কম সমালোচনা করুন।

৫। সুস্থ থাকুন
শারীরিক
সময়োচিত পরীক্ষানিরীক্ষা করিয়ে নিন, বিনা প্রয়োজনেও কখনো কিছু শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে নিন; কারণ আপনি সুস্থ না থাকলে বাচ্ছারাও ভালো থাকবে না। জীবন-বিমা, স্বাস্থ্য-বিমায় নজর দিন।
একটু আধটু ব্যায়াম করুন, ফিট থাকুন।
খাওয়াদাওয়া করুন, সকালের জলখাবার বাদ দেবেন না, ব্যাগে রাখুন শুকনো খাবার।
মানসিক
কথা বলুন সমমনস্কদের সাথে
ইন্টারনেট ফোরাম, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বন্ধুদের সাথে দারুন সাহায্য করে স্ত্রেস-ফ্রি থাকতে। ব্যবহার করুন
ফ্লেক্সিবল হন
যতই প্রস্তুতি থাক না, কিছু না কিছু বিগড়োতেই পারে, সেটা মেনে নিন, উপভোগ করুন।
ধীরে চলুন
কখনো কখনো ধীরে চলুন, দু-মিনিট বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খান বা তারা গুনুন। জল কিন্তু খুব ভালো চিন্তানাশক। কখনো একটু ভালো করে স্নান, অথবা অফিসের কিউবিক্ল থেকে দেখা ঝরনা, সবি সাহায্য করে চিন্তামুক্ত হতে। খুব বেশি চাপে থাকলে মনে করুন সন্তানের মুখটা, অনেক চিন্তা ভুলে যাবেন।

৬। প্রস্তুতি রাখুন
ব্যাক-আপ রাখুন
একদিন আপনার ন্যানি হঠাত করে কাজে দুব দিতেই পারে, আগে থেকে প্রস্তুতি রাখুন, যাতে কিছু বিকল্প ব্যবস্থা করে ফেলতে পারেন।
ঘরের কাজের প্রস্তুতি
বাসন মাজার লোক দুদিন না এলে, কাগজের প্লেট-বাটি ব্যবহার করুন
ফ্রিজে অন্তত একটা মিল অতিরিক্ত রাখুন; কখনো রান্না না করতে পারলে সাহায্য হবে।
কিছু চটজলদি রেসিপি শিখে রাখুন, one-pot-meal যাকে বলে, সব্জি-পোলাও, কুকার বিরিয়ানি ইত্যাদি।
শাক-পাতা জাতীয় জিনিস
সপ্তাহের ছুটির দিনে শাক, রসুন, আদা ইত্যাদি ছাড়িয়ে কেটে/বেটে রাখুন অথবা রেডি-মিক্স ব্যবহার করুন। শপিং মল থেকে প্রয়োজনে কেটে রাখা সবজি কিনতে পারেন।
ফোন-আপনার বন্ধু
পাড়ার মুদি দোকানের/আয়রন দোকানের ফোন নাম্বার রাখুন, অনেক সময়েই তারা বাড়িতে এসে সার্ভিস দেয়। ব্যবহার করুন।

আপনাদের ঝুলিতে আছে নাকি আরো কিছু টিপস? ভাগ করে নিন না, আমাদের সাথে; একমাত্র জ্ঞান-ই তো সকলের সাথে ভাগ করে নিলে, বেড়ে যায়, কমে না একটুও। ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।

কর্মরতা মায়েদের জন্যে কিছু পরামর্শ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments