এই হাল্কা হাল্কা শীতকালের সকালে যদি মর্নিং ওয়াক করতে করতে চলে যান জামরুলতলায় আমাদের সেই ছোট্টো ভাড়াবাড়িটায়, একদম কোনের ঘরটায় দেওয়ালে দেখতে পাবেন, অল্প-অল্প খসতে থাকা পলেস্তারার পাশ থেকে, শাহরুখ খান আর মধুবালার থেকে নিরাপদ দূরত্বে একটা ঢাউস বাঁধানো ছবি – আস্তে আস্তে ড্যাম্প ধরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন, ছবিটা মাটি থেকে দেখলে মাথামুন্ডু কিস্যু বোঝা যায় না, একটা ছাদে ইউনিফর্ম পরা গুচ্ছের লোকজন, লিট্যার‍্যালি-ই যাকে বলে 'দেড়শো খোকার কান্ড'। অত্যুৎসাহী দর্শকদের জন্য তলায় একটা লিস্টও দেওয়া, 'যে যেখানে দাঁড়িয়ে'। সেইটা না দেখলে বোঝা মুশকিল যে যাঁরা গাঁটের পয়সা খরচা করে এই বিশাল জিনিষটা টাঙ্গিয়ে রেখেছেন, তাঁদের পোলাপান-ও ওই ভিড়ের-ই অংশ … কোথাও একটা পিছনের দিকে লুকিয়ে আছে, চট করে ধরা মুশকিল …

 

সত্যি বলতে নরেন্দ্রপুর নিয়ে আমার দশা ওই ছবিটার মতন-ই, ঝাপসা, অন্ধকার, আস্তে আস্তে নামগুলো মুছে যাচ্ছে। তাও, হঠাৎ একটা রোববারের বিকেলে পুরোনো ছবি থেকে ধুলো ঝাড়তে কার না ভালো লাগে বলুন?

 

আজকের এই লেখাটা অনেকটা সঞ্জয় মঞ্জরেকারের কমেন্টারির মতন, ধরুন শচীন একটা দারুণ ইনিংস খেলে যখন আউট হয়ে গেলো আর অকর্মার ঢেঁকি বাকি তিনটে উইকেট মিলে সামান্য সতেরোটা রান-ও তুলতে পারলো না, অমনি ম্যাচের পরে স্যুট-টাই পরে এসে মঞ্জরেকার বলে বসলেন, 'আরেকটু চালিয়ে খেললেই পারতো'।

মনে মনে চার অক্ষর বলে টিভিটা অফ না করে দিয়ে কি ওয়েট করেছিলেন সেদিন? গ্রীক ট্রাজেডির মতন লাস্ট সিনে ম্যান অব দ্য ম্যাচটা তো শচীন-ই পাবেন আর পরের দিন হেডলাইনে বেরোবে, India snatched defeat from the jaws of victory. তাহলে সবুর করুন, মেওয়া না ফলুক, গবার ভবিষ্যৎবাণী অবিশ্যি ফলবে …

 

নরেন্দ্রপুরে যাঁরা পদধূলি বা কোমল খুলি কোনো একটা বিলিয়ে গেছেন, তাঁদের কাছে আর ভেতরের বর্ণনা দেওয়া বাহুল্য, আর যাঁরা সেমুখো হননি এজীবনে, তাদের কাছে বলে শেষ করা যাবে না, তবু চেষ্টা করতে দোষ নেই – মেইন গেট দিয়ে ঢুকে ডাইনে-বায়েঁ-আর সিধে তিনদিকেই যাওয়া যায়: যদি সোজা হাঁটেন, তাহলে কলেজ, স্কুল, একটা নালা, নালার উপরে ব্রিজ, এসব পেরিয়ে একের পর এক কলেজের হস্টেলঃ  ব্রম্ভানন্দ, গৌরাঙ্গ আর সবশেষে রামকৃষ্ণানন্দ, আমার নরেন্দ্রপুরের জীবন প্রায় পুরোটাই ওই "যে জন আছেন মাঝখানে" তার কাছেই. .. অর্থাৎ গৌরাঙ্গ ভবন এবং তার একতলা, দোতলা আর মধ্যিখানের চাতাল।

 

আর কিছু গল্প রয়েছে ঐ ডানদিকের রাস্তাটায় মিশে, যার আদরের নাম 'এক বিড়ি পথ' – সত্যি সত্যি রাস্তাটার এমুখে একটা বিড়ি ধরালে, ওমুখ অব্দি সে আপনার সঙ্গ দেবে, আর ঝড়বৃষ্টির রাতে সব আলো নিভে গেলে যদি ওই রাস্তায় পায়চারি করেন, বিড়ির সঙ্গে আরো কিছু, আরো কেউ …

           আমার বন্ধু সন্দীপ বলতো, ওকে নাকি রোপন-দা* বলেছেন, ওঁরা ঠিক পিছনে পিছনে আস্তে আস্তে হাঁটেন এই সব অন্ধকার রাত্রে। সবসময়েই মনে হয় এই বুঝি পেরিয়ে গেলো কেউ, হয়তো এক ঝটকায় পেছনে তাকালেই তিনিও চমকে যাবেন, কিন্তু তাকানোর সাহস আজ-ও হয়ে ওঠেনি, সত্যি …

 

তো মাধ্যমিকের ছুটি ফুরোলো, আর উদভ্রান্ত সেই আদিম দিবসে হঠাৎ একদিন বগলে পুঁটলি নিয়ে পৌঁছে গেলাম হোস্টেলে, দেখলাম সে এক দুরন্ত জায়গা, এক-একটা ঘরে চারটে বিছানা, চারটে করে আলমারি আর অজস্র ইরোডভ, এইচ-সি-ভার্মা, দত্ত-পাল-চৌধুরীরা গড়াগড়ি খাচ্ছেন। কোনো কোনো ঘরে স্কুলের চোখা ছেলেরা দাপিয়ে শক্ত প্রব্লেম নামাচ্ছে, আর কয়েকটায় সদ্য বাড়ি ছেড়ে আসা ধেড়ে খোকারা হাপুস নয়নে কাঁদছে …

 

এসব কান্নাকাটি আর আই-আই-টির ধাক্কা সামলে বুঝলাম, হঠাৎ লাইফ পালটে গেছে, যা আগের ষোলো বছরে ছিলো না, পরের ষোলোয় তো আরোই থাকবে না, সেই ডিসিপ্লিন এলো জীবনে। জীবন মানে তখন "চারিদিকে মোর একি কারাগার ঘোর" আর সকাল-বিকেল গগনবিদারী একটি করে ঢং – সেটা শুনে ধুতি-ফুতি সামলে কাকভোরে "খন্ডন ভব" করতে ছোটো, আর সন্ধ্যেয় মাইক্রোস্কোপিক মাছভাজা আর অড়হর ডাল খেতে। বিকেলে পাওয়া যেতো ধুলো বিস্কুট আর মাঝেসাঝে মুড়ি-ঘুগ্নি – সে আবার এমনি ঘুগ্নি নয়, কপাল খারাপ থাকলে তাতে শুধুই মান্ডেন মটরডাল, আর খুলে গেলে সে এক ভূমধ্যসাগর, এক সিনিয়র একবার পাতে একটা পোড়া বিড়ি পেয়ে খুব দুঃখ করে বলেছিলো, "আলাদা করে দিলে দুটোই খেতাম, একসাথে কেনো দিলেন দাদা?"

 

দাদা মানে অরুণদা, ভালো নাম আগা খাঁ, হপ্তায় একদিন মাংসের বাটি আর বুভুক্ষু জনতার মাঝে যিনি সাদা বেম্মচারীর ড্রেস পরে দাঁড়িয়ে বলবেন, 'কই, মন্ত্র দাও'**, তিনিই আগা। আগা আসলে অনেকটা জুজুর মতন, তফাৎ এই যে একটা বয়েসের পরে আর জুজুর ভয় লাগে না, আগা-র লাগে …

 

আর ভয় লাগে কিছু সত্যদার থাপ্পড়ের, ওরেব্বাস সে কি জোর মাইরি লোকটার হাতে! আমাদের সময় নিয়ম ছিলো প্রেয়ারের সময় দেরি করে পৌঁছলে হয় রেকর্ডবুকে উঠে যাবে বা গার্জেন কল হবে, তো একদিন দেরি হচ্ছে দেখে যেই না উল্টোদিকে ফিরেছি, দেখি হোস্টেলের দিক থেকে কট্মট করে এগিয়ে আসছেন সত্যদা … আমার স্থির বিশ্বাস সেইদিন ডানগালে ওই বিরাশি সিক্কার চড়টা খেয়ে যে মাথাটা কিঞ্চিৎ লেফট লিবেরাল হয়ে গেছিলো, আজ-ও সেটা পুরোপুরি সারেনি …

 

সত্যদার সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড ছিলেন গবা মহারাজ, নরেন্দ্রপুরের গল্প হবে, গবা আসবেন না, এ যেন ইন্ডিয়া টিম ব্যাট করতে নামছে আর শচীন বললেন আজ গা-টা ম্যাজম্যাজ করছে, বা পুজোবার্ষিকী আনন্দমেলা বেরুলো, কিন্তু শীর্ষেন্দু মাইটোসিস আর মিয়োসিসের তফাৎ নিয়ে রচনা ফেঁদে বসলেন। আমাদের এক সিনিয়র গুরুচন্ডালির ব্লগে লিখেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দের পরে সবথেকে বিখ্যাত সন্নিসী গবা, খুব একটা অত্যুক্তি নয় সেটা !

 

গবার নাম কেন গবা তা কেউ জানেনা, ওনার বয়েসও যে কি করে ওই এক জায়গায় গিয়ে আটকে গেছে, তা-ও না, ওই ইস্টার আইল্যান্ড বা বারমুডা ট্র্যায়াঙ্গলের মতোন রহস্যজনক ব্যাপার। অনেকে বলে, ভগবানে র 'ভ' আর 'ন' কেটে গবার আবির্ভাব, তবে এর সত্যাসত্য যাচাই করা আমার সাহসের বাইরে … তবে হ্যাঁ তিনি ফোক লিজেন্ডের মাথায় বাড়ি, তাঁর সব গল্প করতে গেলে অবশ্য এ লেখা আর শেষ হবে না, তবে দু-এক পিস না বললে বেম্মপাপ হবে, যদিও সবকটাই এদিক-ওদিক থেকে হাওয়ায় ভেসে আসা বা কুড়িয়ে পাওয়া, নিজের চোখে দেখা নয় !

 

নরেন্দ্রপুর একটু ঝড়বাদলা হলেই সব আলো নিভিয়ে এক্কেরে নিঝুমপুরী হয়ে যেতো, আর যেই আলো নিভতো হোস্টেলের ব্যালকনি থেকে শয়ে শয়ে পোলাপান কোরাসে চিল্লাতো, "গবা আলো দে, গবা আলো দে" … সে এক অতিপ্রাকৃত দৃশ্য ! এক সিনিয়রের গল্প শুনেছি, একবার নাকি আম্রিগার এক সিনেমা হলে আলো নিভে যাওয়ায় পুরোনো অভ্যেসে ভুল করে চিল্লে ফ্যালেন, 'গবা আলো দে' বলে, অমনি পিছন থেকে স্পষ্ট বাংলা গলায় ভেসে আসে, 'আমি নাইন্টি টু-এর ব্যাচ, আপনি?'

 

এমনও গপ্পো শুনেছি যে, গবার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নাকি একবার এইরকম-ই এক লোডশেডিং-এর রাতে মাথায় বালতি চাপা দিয়ে কয়েকজন দুষ্কৃতী ছাত্র দুই-ঘা কষায়, নিজের মুণ্ড বালতির তলায় তাই ছাত্রদের মুখ দেখতে না পেয়ে মহারাজ হুমকি দেন, যার বালতি তার কপালে টিসি নাচছে! বিধাতার কি পরিহাস, আলো এলে দেখা গেলো বালতিটাও গবার-ই …

 

আর একবার নাকি এক জাপানী ভিজিটর নরেন্দ্রপুরে এসেছেন, তাঁকে লাঞ্চে আপ্যায়ণ করে খাওয়াতে নিয়ে গেলেন সত্যদা আর গবা, এটাসেটা খাওয়ার পর দই এলো। জাপানী অতিথি যাতে এই সুবর্ণ সুযোগ হাতাছাড়া না করেন তাই গবা মহারাজ দই নিয়ে যারপরনাই পীড়াপীড়ি শুরু করলেন – তাতে অতিথি খানিক উৎসাহ বোধ করে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন জিনিষটি কি? গবা মুখ উজ্জ্বল করে বললেন, This is spoiled milk, বলেই বোধহয় অতিথির মুখের দিকে চেয়ে খেয়াল হলো হেব্বি ছড়িয়েছেন, তাই তড়িঘড়ি নিজেকে সামলে বললেন, 'না রে বাবা এটা Intentionally spoiled milk ..'

 

(যতই  মশকরা করি, এ ব্যাপারে আমার সত্যিই একটা গর্বের জায়গা আছে, গবা মহারাজ সন্নিসী হওয়ার আগে যে স্কুলে তরুণকান্তি দে হয়ে  দশ-দশটা বছর কাটিয়েছেন, আমিও সেই বরানগর মিশনের বাই-প্রোডাক্ট !)

 

আমাদের সময় ইলেভেন-টুয়েল্ভ ছিলো কলেজে, আর ক্লাস নিতেন হরেক রকমের মজার লোক, আর তাদের ডাকনামগুলোও দারুণ, HKC হয়ে গেলেন হিরণ্যকশিপু, আর BKS, বকাসুর … আর কিছু ছিলেন বহুমুখী প্রতিভা, কেমিস্ট্রি ক্লাসে প্রথম দিন-ই এসে বেঞ্জিন রিং দেখিয়ে যিনি আমার বাপের নাম খগেন করে ছেড়ে দিলেন, একদিন লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখি সেই সন্তোষ মাজীর একটা আস্ত কবিতার বই – বাংলা পড়াতেন দুইজনায়, গোবিন্দ-স্যার আর প্রণব-স্যার, অর্থাৎ পেনো … পেনোস্যারেরও একটা গল্পের বই ছিলো, তাতে আবার দুষ্টু ছেলেরা হাল্কা উত্তেজক জায়গাগুলো আণ্ডারলাইন করে রাখতো, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য … বইটার নাম মনে পড়ে না, তবে তার একটা গল্পে অমর একটা স্লোগান ছিলো, সেইটে গেঁথে আছে ভিতরেঃ "নেশার খেয়ালে, মুতেছে দেওয়ালে' …

 

অঙ্ক করাতেন বিজয় বেরা, পি এস এম আর ননী-দা, দারুণ লোকজন সব, শেষের জনের উপর সত্যি বলতে দশ নম্বরের নামকরণের সার্থকতা লিখে ফেলা যায় চাইলেই। বিজয়বাবু অসম্ভব ভালোমানুষ, আমরা ভুল করলে উনি-ই লজ্জা পেয়ে যেতেন, আর পিএসএম একেবারে যাকে বলে tour de force, শক্ত শক্ত অঙ্ক ওনাকে দেখলে চুপচাপ নিজেরাই QED লিখে বসে থাকতো … আর ছিলেন ইংরেজী স্যার সতীপ্রসাদ মাইতি, নিশ্চিন্তে লাস্ট বেঞ্চে বসে ঢুলছি – হঠাৎ তুলে বললেন বানান করো তো ম্যানুএভর … আমি তো ইদিকে বাংলা মিডিয়াম, প্যান্টে হেগে একশেষ …

 

পাশ থেকে ছোট্ট চিরকুটে কোনো কোনোদিন চলে আসতো শক্ত বানানগুলো, কখনো পরীক্ষার হলে অরগ্যানিক কেমিস্ট্রির ফরমুলা, একবার অঙ্ক পরীক্ষায় একটা বন্ধুকে একটা গোটা ইন্টিগ্রেশান দায়িত্ব নিয়ে টোকালাম, সে বেরিয়ে বললো, সব-ই বুঝলুম, খালি ওই পাশে চাউমিনের মতন কি একটা একেঁ গেলি সারা পাতা জুড়ে ওইটা বুঝিনি, বাকিটা দাঁড়ি-কমা শুদ্ধু টুকে দিয়েছি …

 

কোনো-কোনোদিন পড়াশুনো মুলতুবি থাকতো, সে বিকেলগুলো বড়ো মায়াময় হতো, এক একদিন অনি বা সৌম্যর সাথে বসে কবিতা পড়তে পড়তে ভাবতাম প্রেম বোধহয় শঙ্খ ঘোষের কবিতা, হয়তো বিপ্লবও তাই – একদিন সন্দীপ এসে বলতো চল রাজপুরের কালিবাড়ি নিয়ে যাবো, সন্ধ্যে ছটায় আরতি হবে – একটা এইটুকুনি ছেলে ঢাক বাজায় আর তার আওয়াজ এক মাইল দূর থেকে স্পষ্ট শোনা যায় …

 

একটা দারুণ বন্ধু ছিলো, শুভ্রকান্তি – অনেক অনেকদিন পরেও তার চিঠি আসতো আমার ঠিকানায়, সে লিখতো গরমকালে কেমনি দামোদর নদের জল শুকিয়ে গেলে হেঁটে হেঁটে পেরিয়ে যাওয়া যায়, আর আমিও লিখতাম তাকে, ঘোর বর্ষায় আমার বাড়ির পাড়াই কেমন দামোদর হয়ে যায়, আর বাবা কেমন সকালে উঠে ইঁট পেতে দেন যাতে ইস্কুলের জুতোটা না ভিজে যায় গলিটা পেরোতে গিয়ে …

 

আমাদের ইস্ট উইং-এর একদম শুরুর ঘরটায় থাকতো অরিজিৎ আর দেবাঞ্জন, মাঝে মাঝে বসতো আড্ডা আর অন্তাক্ষরী – বানিয়ে টানিয়ে ভুজুং-ভাজুং দিয়ে গান মিলিয়ে দারুণ হতো ব্যাপারটা … সেই একবার তো আমি, রবিরঞ্জন আর সুদীপ্ত একটা গান-কুইজ প্রায় জিতেই গেছিলাম, লাস্ট রাউন্ডে জিজ্ঞেস করলো বাংলাদেশের একটা আধুনিক গান গাও (নাঃ, আমার সোনার বাংলা গাইলে হবে না), তখন কোথায় আয়ুব বাচ্চু, কোথায় এল আর বি আর জেমস, আমরা তো হতাশ হয়ে পাস করে দিলাম – ওমা, পাশের টিম দেখি লজ্জাঘেন্নার মাথা খেয়ে শুরু করে দিলো আজগুবি একটা গান, "সাতদিন এক হপ্তা, বারোদিনে মাস, তিনমাস পর এগজামেতে, টিচার দিলো বাঁশ "… তুমুল আপত্তি সত্ত্বেও জাজদের সেইদিন মানতে হয়েছিলো, যে কোনো জিনিষের Existence disprove করা ভয়ানক কঠিন, সে নিরাকার ঈশ্বর -ই হোন বা বাংলাদেশী র‍্যাপ …

 

ভয়ানক দুষ্টূ ছেলে ছিলো জ-বাবু (আসল নামটা চেপে গেলাম, সে এখন একটা সফল স্টার্ট-আপের সি-ই-ও), পেনো-গোবিন্দো তো এসেই তাকে বের করে দিতো, তাও জ-বাবু ঠিক টাইমে পৌঁছে যেতো ক্লাসে, এক একদিন আবার একগাছা জংলা ফুল থান ইঁট দিয়ে চাপা দিয়ে রাখতো স্যারের টেবিলে, "ভিতর থেকে" সরি বলবে বলে … একদিন গোবিন্দো-স্যার ক্লাসে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়াচ্ছেন, হঠাৎ জ-বাবু সামনের বেঞ্চ থেকে বলে উঠলো, "স্যার জয়েন্টের সাজেশান দিন" … গোবিন্দ-দা হেব্বি খচে গিয়ে বল্লেন, "হয় তুমি ক্লাসে থাকবে, নয় আমি", জ-বাবু সাজা শুনলো, আস্তে আস্তে উঠে ক্লাসের দিকে ফিরে বললো, 'তোরা তো শুনলি, স্যার বলেছেন, হয় স্যার থাকবেন, নয় আমি থাকবো, এবার তোরা বল, তোরা কি চাস?'

 

আরো কত্ত-কত্ত মজার গল্প, রাত কাত হয়ে যাবে লিখতে লিখতে, এই এতোদিন পরে লিখতে বসে নিজেই একচোট হেসে নিলাম সেসব ভেবে ভেবে, আর মনটাও বেশ ফুরফুরে হয়ে গেলো, মনে হলো যেনো শীতের ছুটি পড়েছে, সেই এক-বিড়ি পথটায় হাঁটছি পুরোনো বন্ধুদের সাথে, হাতে একটা ব্যাট আর ক্যাম্বিস বল, আর কদিন পরেই টেস্ট পরীক্ষা, তারপর জয়েন্ট, সব্বাই কে কোথায় ছিটকে যাবে কেউ জানে না, কিন্তু কিছুই যায় আসে না, আজকে জমিয়ে খেলা হবে, আর সন্ধ্যেবেলায় মহামায়াতলার দোকানটায় শেয়ার করে এগরোল, বা গড়িয়া মোড়ের রাঁদেভুতে গিয়ে তড়কা-রুটি।

 

একজন দুজন তবু পাশে থেকে যাবে, বড় ক্লান্ত হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালেই জানি অরিজিতের একটা ফোন আসবে এক্ষুনি, বা ইনবক্সে অনির একটা সদ্য হাতে লেখা কবিতার ছবি এসে বলবে, 'আমার চিঠিটা কবে আসবে, হাবু?'

 

আমিও এসব ভাবতে ভাবতে, সেই স্মৃতিগুলোর সাথে আড্ডা মারতে মারতে ফিরে যাই সেই শীতের দুপুরগুলোয়, পা ছড়িয়ে বসি একটা পুরোনো পুকুরের পাড়ে, আর এই  রংলাগা রোদ্দুরটায় আমাদের কি যেন একটা হয়ে যায়!

 

কলকাতা – ১০৩
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments