প্রবল ঠাণ্ডায় আর দূরে হেঁটে গিয়ে রাতের খাবার খেতে ইচ্ছে করে না । বাড়ি থেকে বেরোলেই ভীষণ ভাবে জ্যাক লন্ডনের কথা মনে পড়ে । মনে হয় এই মনুষ্য জীবনে এক লড়াকু ধূসর নেকড়ের ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছি । সমগতির একটা দৌড় চলছে যেন অনন্তকাল ধরে। কোনও গতিবৃদ্ধি নেই, গতিহ্রাস ও নেই । অচেনা তুন্দ্রা মাড়িয়ে অশেষ যাত্রা ।
অথচ আমি নামের অভিনেতাটির জিন সিকোয়েন্স বলছে যে এখনো সে ক্যারেক্টারে পুরোপুরি ঢোকেনি । এখনো সে মানুষই , সাব আরবান । মানিয়ে উঠতে সময় লাগছে ।কয়েক রাত হোল , লাস্ট ট্রেনের আগমনের কথা ঘোষণা করে ঘোষক নারীকণ্ঠ সযত্নে মনে করিয়ে দিচ্ছে একটি শান্তির আশ্রয়ে শুয়ে শান্তির নিবিড় ঘু্মই হল মনুষ্যত্ব । ঘুম পেলে মনে হয় পেট খালি হয়ে গেলে নিজে থেকেই পাকস্থলী ভরে যাবার কোনও পদ্ধতি যদি থাকতো , তবে মানুষও শীতঘুমে যেত নির্ঘাত । শীতঘুমেই থেকে যেত শীত- গ্রীষ্ম -বর্ষা । মানুষ ঘুমোতে যে বড় ভালোবাসে । আমি যে নেকড়ের ভূমিকায় ব্যস্ত এখন , সেও তো ঘুমোতেই চায় । হয়তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ছুটছে বলে দৌড়ের ওপরে আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই তার, কোনও পরিবর্তন আর তার হাতে নেই । সতত সমগতি । ক্রিয়াশীল অথচ যেন অদ্ভুতভাবে সমাহিত।
আমি যে ঘরে ঘুমোতে যাই সে ঘরে কোনও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই । দরকার পড়ে না । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত । শুয়ে শুধু পাখার আওয়াজের কথা মনে পড়ে । নিঃশব্দ নিরন্তর পিছু নিলে তখন একঘেয়ে যেকোনো আওয়াজই আঁকড়ে ধরা যায় । কিন্তু শুধুমাত্র ব্রহ্মের আকাক্ষাতেই কি ব্রহ্ম মেলে ? শব্দই ব্রহ্ম । পবিত্রনাদের পূত সাধন মন্ত্র শ্বাপদের আয়ত্বের বাইরে । তার ভোক্যাল কর্ডে আদিম ধ্বনি আছে কিছু অদৈবিক , জৈবিক প্রয়োজনে । বাকি সব শব্দ থেকে নিদ্রা দ্বারা ইন্সুলেটেড । শুধু একটাই ফাঁক এই নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থায় । ঘড়ি । মহাকালের থেকেও শক্তিশালী এই সময়ের দাঁড়িপাল্লা । জোড়া ব্যাটারিতে ভর দিয়েই ডেডলাইন গুলো বেঁচে আছে। দেয়ালে , টেবিলে , বালিশের তলায় শুয়ে থাকে; সবসময়েই মুচকি হাসে এমন , যে মনে হয় ডেটোনেটর – এই ফাটলো বলে । বিগ ব্যাং দেখিনি । হতেও তো পারে এটা তারই কোনও তুতোভাই ! সব ওলটপালট হয়ে যাবে তাই কথা শোনা ভাল , উঠে পড়া ভাল । ডান কাতে উঠলে বোধয় হার্ট অ্যাটাকের ভয়টা কম । ডান – বাম সবেতেই এখন অরুচি । ঘোর অনিচ্ছা ।
ঘুম ভেঙে গেলেই চোখ চলে যায় জানালার দিকে । আমাদের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ডাকনাম দুটো বলা হয়নি । একটা হল ঢপের অহংকার আর আরেকটা হল গিয়ে মিথ্যে আশ্বাস । এদের ব্যাকবোন নেই , হাতও না । এরা কিছু করে না । আগে যা শুনেছি বা শুনেছ , তার সবটাই বাতেল্লা ।
আলোর তীব্রতাই আমাদের ঘড়ি ঠিক করে দেয় । ইদানীং ধুলো পড়ে পর্দাটা এমন হয়েছে যে খবর যা আসে তার বেশিরভাগটাই বেঠিক। সব সময়েই মনে হয় বাইরে হয় বৃষ্টি পড়ছে , নয় বরফ। এহেন সময়ে নেকড়েটাকে বাইরে যদি বেরোতেই হয় তবে আরও চর্বি চাই , লোমও। অন্তত ইঞ্চি তিনেক করে । নেকড়ের খাবার চাই আরও অনেক , অনেক। নেকড়েটা নেকড়ে বলে তার খাবার চাই , নেকড়েটা অভিনেতা বলেও খাবার চাই, নেকড়েটা মানুষ বলেও তো চাই খানিক ! আরও অনেক দূরে ছুটে চলার পরেও নেকড়ের থেকে খাবার এখনো অনেক দূরে । খাবারও কি তবে ঘুমিয়ে আর সেও কি ছুটছে সমগতি নিয়েই ?
কালান্তক নিউমোনিয়ার বা সেপটিসেমিয়ার কথা ভাবলেও এখন বীরেদের চোখে ভয় নয় , অনিবার্য কারণে শুধু ঘুম দেখা যায় ।

কালঘুমসমগ্র (শুরুর কথা)
  • 4.00 / 5 5
2 votes, 4.00 avg. rating (80% score)

Comments

comments