ছোটবেলায় একবার তার নামিদামি ইংরেজি মিডিয়াম ইস্কুলে শেক্সপীয়ারের নাটকে পার্ট না পেয়ে আমার প্রিয় বন্ধু অর্থাৎ সোমেশ্বর কুন্ডুর (বক্রেশ্বর কুন্ডুর নাতি ও বিশ্বেস্বর কুন্ডুর সুপুত্র ) হেব্বি দুঃখ হয়েছিল। শুধু ফটফট করে বিলিতি কায়দায় ইংরেজি বলা ছেলে মেয়েরা চান্স পেলো আর উচ্চারণে মাতৃভাষার প্রভাব থাকার দরুন তার আবেগমথিত অভিনয়ের কেউ কদর করলে না ! ছেলেটা ভীষণ মনমরা হয়ে পড়লো – পড়াশুনায় এমনিতেই সেরকম মন ছিল না কিন্তু খাওয়াদাওয়া ও খেলাধুলার প্রতি তার উৎসাহ হারিয়ে ফেলাটা আমাদেরও বেজায় কষ্ট দিলো। আসলে সে শুধু পেটুক কিংবা তুখোড় খেলোয়াড়ই ছিল না অভিনয় ব্যাপারটাও তার যারপরনাই ভালো লাগার জায়গা ছিলো। শুক্কুরবার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো যে কিনা কোনোদিন ছাড়তোনা আজ তিন হপ্তা হোলো ভবানী সিনেমা হলের চত্বরের ছায়াটুকুও সে মাড়ায়নি। অবস্থা বেগতিক দেখে পাড়ার ক্লাবের নাট্য সম্পাদক শিবুদা তাদের পরবর্তী প্রযোজনার স্ক্রিপ্টে এক কিশোর চরিত্রের আলটপকা অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সে যাত্রায় সোমেশ্বরের মানভঞ্জন ঘটায়। পার্শ্ব চরিত্র হলেও সে যখন এক সীনে ,’ ওরা কি আমাদের ক্ষমা করবে? দেখো, করবে নিশ্চই, হ্যাঁ নিশ্চই করবে..’ মার্কা ডায়ালগ দেবার সময় ঘাড় ঘুরিয়ে আলোর দিকে মুখ করে চোখের কোণ চিকচিকিয়ে গলা কাঁপাতো তখন দর্শকরা তাদের আহাহা, ইসস আটকে রাখতে পারতেন না ! তা শেক্সপীয়ারের ম্যাকবেথ না হোক শিবুদার ‘প্রথম আলো’ দিয়েই সোমেশ্বর নিজের অভিনয়ের কিছু মুনশিয়ানা দেখিয়েছিলো বটে।
আজ আমাদের মাননীয় প্রধামন্ত্রীর অবস্থাটাও খানিকটা সোমেশ্বরের মতন। বিদেশী কালো ধন এনে প্রত্যেকের একাউন্টে ১৫ লক্ষ্য ফ্যালার কথা ছিলো কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি তাই এবার দেশি কালাধন আটক করতে ১০০০ আর ৫০০ টাকার নোট গোটাচ্ছেন। মালটা ফুল অবসেস্ড এই কালো টাকা নিয়ে, সে যেখানকারই হোক -মাঝরাতে উঠলো বাই এটিএম ব্যাঙ্ক বন্ধ তাই ! তা বেশ , ভালো কথা যে ট্যাক্স দেবেনা তার সঞ্চিত মুদ্রা কেড়ে নেওয়াটা রাষ্ট্রের ন্যায্য অধিকার , কিন্তু এতো কাঁড়ছে না ! এতো প্রায় কয়েক সহস্র কোটি টাকা উবে যাচ্ছে। আচ্ছা তার পুরোটাই কি কালো নাকি ট্যাক্স ও লেট ফাইন বাদ দিলে বাকিটা সাদা? তার মানে কয়েক সহস্র কোটির সাদা টাকাও জাস্ট ঝুসস হয়ে যাবে। এবার দ্যাখা যাক কারা কারা এই কালো টাকা ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাড়িতে বা বিভিন্ন অফিস কাছারিতে লুকিয়ে রাখে? ডাক্তার, মাষ্টার , উকিল, মেজো ও সেজো ব্যবসায়ী ও পুলিশ কিংবা সরকারি কর্মচারী যারা ঘুষ নেন । তার মানে কাল থেকে ছোটোখাটো নার্সিং হোম ও লিগাল ফার্মের অনেক জুনিয়র কর্মী ছাঁটাই হওয়ার সম্ভাবনা থাকলো। আচ্ছা ঘুষ যে নিয়েছে তার নয় পুরোটাই কালো কিন্তু এই ঘুষটাকেই যদি রেলের টিকেটের মতন ডায়নামিক চার্জ বা স্পেশাল সার্ভিস চার্জ বলে রশিদ দিয়ে নেওয়া হতো। মানে মেসোমশাই আপনার বয়স হয়েছে, আপনি ৫০০ টাকা সুইফট চার্জ দিন আমি রাত জেগে কাজ করে আপনার ফাইল তাড়াতাড়ি বের করে দেব আর রশিদও পাবেন যেটার থেকে কিনা আপনি কর ছাড়ের সুবিধাও পাচ্ছেন ! মানে মাওবাদী অঞ্চলে বা উত্তর পূর্ব ভারতে যেরকম অনেক ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। একরকম সোশিওফিনান্সিয়াল সিন্ডিকেট আর কি।
অনেক কিছুই ভাবা যেতে পারতো কিন্ত এরকম গাম্বাটের মতন দুম করে কারেন্সী নোটের ওপর হুট্ ইমার্জেন্সিতা নিছকই তুঘলকি কারবার । এই মুহূর্তে প্রচুর মানুষ কাজের দায় বা ফুর্তির জন্য বাড়ির বাইরে আছে। ফিরতে চাইছে কিন্তু ট্রেনে টিকিট পাচ্ছে না এদিকে বিদেশ বিভূঁইয়ে চেনাশোনাও কেউ নেই, কি করবে সে ? সবাই তো আর ১০ বার এটিএম ব্যবহার করে পার্সে কাঁড়ি কাঁড়ি ১০০ টাকার নোট ভোরে রাখেনি। আমারই এক পরিচিতের আজ বাইরে যাবার কথা ছিল খুবই জরুরি একটা কাজে তা শুধু মাত্র ১০০ টাকার নোট নেই বলে যাওয়া হলোনা ও টিকিট ক্যানসেল করিয়ে প্রচুর গচ্চা গেলো। তবু মন্দের ভালো একবার গন্তব্যে পৌঁছে গেলে তো এক্কেবারে ফেঁসে যেত ব্যাচারা ! হাসপাতাল ও শ্বশান এমনিতেই দালালদের আখড়া আর তারা এই সুযোগে তো আরো ফোর পাইস কামিয়ে নেবে মানে ১১০০ টাকার টেস্ট তা অনায়াসেই ১৫০০ টাকা হয়ে যাবে। ওষুধের দোকান ঝামেলা এড়াতে স্রেফ দামি ওষুধ এই দু দিন বেচবে না, বলে দেবে নেই, রুগীর বাড়ির লোক তখন কি করবে? শুধু তাই নয় এর পর ব্যাঙ্ক খুললে যদি ব্যাঙ্ক বলে ১০০ টাকার নোট আর নেই তখন? যতদিন না নতুন মাল ছেপে আসছে ততদিন চেপে বসে থাকুন! অনেক মাথা খাটিয়ে একটা কিছু বার করলাম আর সেটার জন্য ১০০ কোটি জনতার এ’কদিনের দুর্ভোগের হিসেবটা কে করবে? মোদীজির প্রচারের জন্য যে টাকা খরচ হয়েছিল তার মূল অংশটাই তো ছিলো কালো টাকা তাহলে কি তলে তলে সেই ব্ল্যাকফান্ডারদের কাছে এই ব্ল্যাকথান্ডারের সতর্কবার্তা আগে থেকেই পৌঁছে গেছিলো ও সেকারণেই কি এটিএমে ১০০০/৫০০ ছাড়া অন্য নোট প্রায় পাওয়াই যাচ্ছিলোনা বিশেষ করে যবে থেকে এই নতুন সরকার কেন্দ্রে এসেছে ! মানে নিজের পেটুয়াদের দিওয়ালি অব্দি সময় দিয়ে তারপর হটাৎ কোপ বসাও ! একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন দেখবেন অনেকটাই পাটিগণিতের হিসেবে মিলে যাচ্ছে ! অনেকে আম্বানি, আদানি ইত্যাদির নাম নিচ্ছেন এখন।আরে আম্বানি, আদানিরা কালো টাকা নিজের একাউন্টে রাখে না বরঞ্চ এরা যে অজস্র ব্যাঙ্ক থেকে লোন বা সরকারি সুবিধা গুলো বেআইনি ভাবে নিয়ে থাকে সেগুলোই এদের কালোধন বা ব্ল্যাক রিসোর্স। বিজয় মাল্য বা রামালিঙ্গারাজুরা এটা হালেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়েছে। যদি কারো বাড়িতে আইটি রেইড করে ২০ লক্ষ্য টাকা ক্যাশ পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে সেটা শৈলচূড়ার শুধু ওপরের ভাগটুকু আসল মাল বেনামে শেয়ার, সোনা, হিরে, ভুঁয়ো কোম্পানি ও রিয়েল এস্টেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে সে ব্যক্তি। অর্থনীতি তে গ্রে-এরিয়া বলে একটি ব্যাপার আছে ও সেটা শুধু ক্যাশ টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায়না এর মধ্যে আরো অজানা সম্পদ লুক্কায়িত আছে। সারদা কেলেঙ্কারির সময় যে টাকা বারুইপুর ও বর্ধমান থেকে বস্তাভরে ওদের হেড অফিসে আসতো তার মধ্যে ১০০০/৫০০ নয় বরঞ্চ ১০/২০ টাকার নোটই থাকতো বেশি। এবার বোধকরি হিসেবটা আরেকটু সরল হলো?
যাক এই ক্যাঁচালের মধ্যে কয়েকটা ভালো খবর – কাল থেকে কয়েকদিনের জন্য বড় রেস্তোরাঁয় ও মদের দোকানে কাঁচা পয়সাওয়ালা ছোটোলোকগুলোর ভিড় কমবে।বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো প্রচুর ডিসকাউন্ট দিলেও অনেকেই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে না পেরে হাত কামড়াবেন । ফ্লিপকার্ট বা ডোমিনোস-এর ক্যাশ ওন ডেলিভারি কাজ করবে না। ব্যাঙ্ক ডাকাতদের চেয়ে পকেটমারদের অবস্থার উন্নতি হবে যেরকম বাড়বে ট্যাক্সির থেকে অটোওয়ালাদের ব্যবসা। ভিকিরি বা সুলভ যারা চালায় তাদের সৌ কা একশোতিস বলতে বলতে এখানে সেখানে ঘোরাফেরা করতে দ্যাখা যাবে। ঝাড় হয়ে যাওয়ার ভয়ে শনি মন্দিরের থালাগুলো ঝটপট দানপেটিতে রূপান্তরিত হবে ও পুলিশরা ট্রাক ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে সাইকেলের ও ভ্যানরিক্সার লাইসেন্স চেক করতে গিয়ে প্রচুর দু টাকা চার টাকা ঘুষ নেবে। আর জনগণ হিলারি না ট্রাম্প ছেড়ে ফেসবুক হোয়াটস্যাপে মোদীজির পোস্টদিওয়ালি চমক নিয়ে চর্চায় মাতবে।

কালা কন্সপিরেসি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments