মহাভারতের সময় দিল্লির নাম নাকি ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ। অবশ্য এটা একপ্রকার অনুমান মাত্র ও এই নামকরণের কোনো ঐতিহাসিক সাক্ষ্য নেই বললেই চলে।এও শোনা যায় যে যমুনার ধারে খাণ্ডবপ্রস্থ নামে এক বিশালকায় জঙ্গল ছিল ও সেই বন্যভূমিতে ছিল নাগা নামক এক উপজাতির বাস যারা আসে পাশের গ্রামের লোকেদের ওপর অহরহ অত্যাচার করতো।মতান্তরে সেখানে আদপে সাপের ভারী উপদ্রব ছিল ও তাদের রাজা ছিল তক্ষক। জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে জনৈক বাসিন্দাদের অনেকেই প্রাণ হারান ও তারা এই সমস্যার সুরাহা করতে পাণ্ডবদের কাছে দরবার করেন। পাণ্ডবেরা এসে তক্ষক কে মেরে সেই বন জ্বালিয়ে দেয় ও দেবরাজ ইন্দ্রের নামে যে নতুন বসতির প্রতিষ্ঠা হয় -তারই নাম ইন্দ্রপ্রস্থ। পুরাণে যদিও এই খাণ্ডবদহনের পেছনে অন্য যুক্তি দেওয়া আছে কিন্ত আমি সেই তক্ষকের বন্ধু ইন্দ্র ও ইন্দ্রের মানসপুত্র অর্জুনের মধ্যে জটিল ঝাড়পিটের কাহিনীতে আর গেলাম না।মোটামুটি এই ইন্দ্রপ্রস্থই পরবর্তীকালে পাণ্ডবদের রাজধানী হিসেবে পরিচিত হয় ও সেখানেই ময়দানব নিজের কারিগরি মুন্সিয়ানা দেখিয়ে পাণ্ডবদের জন্য এক তাক লাগানো মায়ামহল তৈরী করে। আর্যাবর্তের ইতিহাসে এর পর সহস্র বছর ধরে নানান সাম্রাজ্য এই ভৌগোলিক এলাকার আসে পাশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। দিল্লি নামটা বোধহয় তাদেরই কারো একজনের দেওয়া। অথবা কেউ কেউ বলে দিল্লি কথাটা অপভ্রংশ হিসেবে এসেছে দেহলীজ বা দেহলী শব্দ থেকে ,হিন্দুস্থানী ভাষায় যার অর্থ চৌকাঠ বা দরজা। তখন সাম্রাজ্যগুলি বহিরাগতদের আক্রমণ ঠেকাতে, পাণ্ডবদের মায়াপ্রাসাদ না হলেও, একটা ছোটখাটো দুর্গ বা কেল্লা শুরুতেই বানিয়ে ফেলতো।তাই দিল্লিকে মূলত আমরা একটা কেল্লা শহর বা ফর্টিফায়েড সিটি হিসেবেই জানি । ১২০০ শতাব্দীতে মুহাম্মদ ঘোরীর কাছে পৃথ্বিরাজ চৌহানের হার ও তার পরে পরেই তুরস্ক সুলতানদের দিল্লি দখলের গল্প সকলেরই জানা। এর পর ক্রমে শিখ,জাট,মারাঠা,মোঘল, ইংরেজ, কংগ্রেস, মোদী,কেজরিওয়াল সবাই এই শহরে কম বেশি রাজত্ব করে গেছে বা এখনও করে চলেছে। ঐতিহাসিকেরা বলে দিল্লি বেজায় স্বাধীনচেতা শহর ও চাইলে পরেও তাকে কেউ বাগে এনে চিরকালের জন্য নিজের করে তুলতে পারেনি।মানে সে বরাবরই ঘরের বৌ কিংবা হারেমের জেনানা হওয়ার চেয়ে কোঠার বাঈজী হওয়াটাই বেছে নিয়েছে। আবার আম জনতা বলে ‘দিল্লি দিলওয়ালো কে শহর’, অবশ্যি দিল্লিওয়ালাদের দিল যে বেশ বড় তা তাদের গাড়ির সাইজ,কুতুব মিনারের হাইট ও নেহেরু প্লেসে খাবারের দাম দেখেই বোঝা যায়। আরও বোঝা যায় গালিবের বাড়িতে ঢুকলে দেওয়ালে লটকানো তার পসনদীদা খাবারের লিস্ট দেখলে। আঃ কি জীবন ছিল ওই উর্দু শায়রটির‼ দুপুরের দিকে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা , উঠেই নাহারী পরোটা সাঁটিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো কিংবা শায়রী লেখা , বিকেলে গোসল করে জোব্বা পরে আতর লাগিয়ে আড্ডা মারতে মহল্লায় এদিক ওদিক যাওয়া ,সন্ধেবেলায় সেই আড্ডা গড়াতো কারো বাড়িতে মুশায়েরা কাম ফোকটে খানাপিনার ঠেকে , ভোর রাতে টলতে টলতে বাড়ি ফিরে জোব্বা ছেড়ে পায়জামা পরে শুয়ে পড়া ও এ সব করার জন্য নবাব বাদশাদের থেকে মাসে মাসে মাইনে নেওয়া। গালিব যেই অঞ্চলে থাকতেন সেটা লাল কেল্লার অদূরে পুরাতন দিল্লির চাঁদনী চৌক এলাকায় অবস্থিত। অঞ্চলটি বা বলা ভালো গলিটি আজও বল্লিমারান নামে পরিচিত। সেই গলিতে ঢুকলে পরেই দেখা যায় চারশো পাঁচশো বছরের পুরোনো বাড়িরা ভেঙে যেতে যেতেও একে অন্যকে জাপ্টে জড়িয়ে কোনোরকমে টিকে আছে।বাড়ির উঠোনে বেঁধে রাখা নধর দুম্বাগুলো হয়তো জিন্স জামা পড়া মানুষদের দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছে ‘তওবা তওবা, ইয়ে ক্যায়সি লিবাস পেহেন রক্খা হ্যায় ?’। পলেস্তরা বিহীন ইঁটের দেওয়ালগুলো যা কিনা প্রত্যেকবছর ঈদের সময় চুনকাম করা হয় তার এক কোণের কাঠের দরজার আড়াল থেকে কেউ হয়তো বলে উঠছে,” আম্মিজান, আজ শাম চুড়ি খরিদনে জানা হ্যায় সলমা কে সাথ, বস অব না মত্ করনা।” কিংবা বাজারে দর্জির দোকানের গায়ে লাগা ইউনানী ওষুধের দোকানে দাড়িওয়ালা কোনো বুড়ো অর্শের ওষুধ চেয়ে বলছে ,” হাকিম মিঞা মুআমলা ইসবার নেহায়েৎই সখ্ত হ্যায়, জুলাব সে জরা মুলায়ম কার দিজিয়ে ।” তা আমি একবার এই অলিগলির মধ্যে গিয়ে পড়েছিলাম ছোট্ট একটা কাজ ও বিটকেল এক শখের দায়।ছোট্ট কাজটা সারতে আমার দশ মিনিটের বেশি সময় লাগলো না আর ওই দশ মিনিট ব্যাতিত শখ মেটানোর চক্করে বাকি সারাদিনটা যেভাবে কাটলো সেই আজব কিস্সাটা বলার জন্যেই এই লেখা । আমার সাথে কাজ করতো ইয়াসিন নামক ছেলেটির আদি বাড়ি চাঁদনী চৌকে। ওই আমাকে কথায় কথায় একদিন জানায় যে ওর বাড়ির কাছেই একটা চেনাশোনা দোকান আছে যেখানে সস্তায় ভালো চোরাই ইলেকট্রনিক গুডস পাওয়া যায়। আমার একটা সস্তার ডিক্টাফোন কেনার দরকার জেনে ও সেই দোকানের নাম ঠিকানা আমায় দিয়ে বললো,” যা রহে হ্যায় তো একবার মেরে বড়ে আব্বা সে ভি মিল লিজিয়েগা ,বহুতহি দিলচসপ শখস হ্যায়। ” শুনলাম ইয়াসিনের সেই জেঠু নাকি চাঁদনী চৌকের চলতা ফিরতা ক্রনিকলার বা ঐতিহাসিক কাহিনীকার। আমার তাতে আরো উৎসাহ বাড়লো ও আরেকটু জিজ্ঞেস টিগ্গেশ করে জানতে পারলাম যে ওর জেঠিমার কাছে নাকি এক মহামূল্যবান বস্তু রয়েছে আর সেটা হলো রিজিয়া সুলতানার ব্যবহার করা একটা রত্নখচিত রুপোর গয়নার বাক্স। ডিক্টাফোন কেনার কাজের সাথে এবার আমার শখ চাপলো সেই বাক্সটা একবার চাক্ষুস দেখার।

কথায় বলে দিল্লি দূর হ্যায়, দূর পাস্ জানি না পুরানি দিল্লি বহুত ঘিঞ্জি হ্যায় ‼ ডিক্টাফোন কিনে দোকানে জিজ্ঞেস করতেই ইয়াসিনদের পৈতৃক বাড়ির রাস্তা বাতলে দিলো দোকানদার। বাড়ির আসে পাশের আবর্জনা এড়িয়ে কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখলাম একটা লুঙ্গি,সাদা স্যান্ডোগেঞ্জি ও মাথায় সাদা তাকিয়াহ পড়া এক বৃদ্ধ দাওয়ায় বসে উর্দু খবর কাগজ পড়ছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ,”নিসার সাহাব কে মকান ইয়েহি হ্যায় ?” খবর কাগজের থেকে মুখ তুলে ভ্রূ কুঁচকে আমাকে মেপে নিয়ে সে বললো, ” নিসার নেহি নাসির, মূহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন মেরা হি নাম হ্যায় অউর পুরা মকান নেহি ,অব বস দো কমরে রহ গয়ে মেরে হিস্সে মে ।” পা ছুঁয়ে ‘সালাম বড়ে অব্বা’ বলে আমি নিজের পরিচয় ও আসার উদ্দেশ্য জানাতেই বুড়ো বেশ টগবগিয়ে উঠলো ,” অরে ইয়াসিন ভি বড়ি কমবখ্ত হ্যায়, মুঝে বিন বতায় আপকো দাওয়াত দে দিয়া ‼” জানালাম দাওয়াত টাওয়াত কিছুর দরকার নেই শুধু একটিবার রিজিয়া সুলতানার ওই গয়নার বাক্সটা দেখেই চলে যাবো আমি। সেটা শুনে বোধকরি ভদ্রলোক একটু স্বস্তিই পেলেন আর বাড়ির ভেতর ঢুকতেই স্বস্তির কারণটা বেশ বুঝতে পারলাম। এরকম বিন বুলায়া মেহমানের খাতিরদারি করার মতো সামর্থ্য কিংবা সাচ্ছন্দ কোনোটাই তাদের আর এখন নেই। খোলা উঠোনে একটা ভাঙা বালতি, একটা তক্তপোষ ও কয়েকটা ভাঙা টব রাখা আছে। তক্তপোষটায় বসে চারদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখে মনে হলো একাধিক শরিকের বাস এই বাড়িটিতে। নাসির সাহাব ঘরের ভেতরে বেগমের সাথে কি একটা ছোট গুফতগু করে এসে জানালেন যে বাক্সটি আসলে ওর শালীর বাড়ির সিন্দুকে রাখা আছে ও সেটা খুব দূরে নয়।ততক্ষনাৎ বললাম তাহলে চলুন ওখানে যাই। কিন্ত বুড়ো নাছোড়বান্দা দুপুরের খাওয়া খেয়ে যেতে হবে। আমি অনেক জোরাজুরি করতে শেষ মেশ সে রাজি হলো আমাকে শুকনো মুখেই তার শালীর বাড়িতে নিয়ে যেতে। রাস্তায় যেতে যেতে আমি ডিক্টাফোনটা চালু করে বুক পকেটে রাখলাম। বুড়ো নিজের থেকেই শুরু করলো ওর মহল্লার ইতিহাস বা তার ঐতিহাসিক মহল্লার কাহিনী,” জনাব ইয়ে পুরানি দিল্লি পুরা ঘুমনে মে এক হফ্তা লগ্ জাতা হ্যায়। হর এক নুক্কড় ,হর এক গলি কি অলগ অলগ দাস্তান হ্যায় ‼” বেশি ডিটেল্সে ঢোকার আগে আমি সংক্ষেপে তার কাছ থেকে ওই গয়নার বাক্সের ইতিহাসটা জানতে চাইলাম। নাসির সাহাব জানালেন যে বাক্সটার সাথে একাধিক কাহিনী জড়িয়ে আছে। ১১৯৩ সালে মুহাম্মদ ঘোরী ভারত আক্রমণের পরে দিল্লির রাজপাটের ভার তার মুখ্য সেবক কুতুবুদ্দিন আইবকের হাতে তুলে দিয়ে খোরাসান ফিরে যান। দিল্লিতে শুরু হয় মামলুক সাম্রাজ্য। ওদিকে মধ্যে এশিয়ার বুখারার বাজার থেকে ঘোরীর কেনা ক্রীতদাস ইলতুৎমিস খুব তাড়াতাড়ি তার একনিষ্ঠ সেবক হয়ে উঠেছিল। কুতুবুদ্দিন তার প্রাক্তন মালিকের কাছ থেকে ইলতুৎমিসকে কিনতে চায় কিন্ত ঘোরী তাতে রাজি হয় নি। মধ্যস্থতা হিসেবে ঠিক করা হয় যে ইলতুৎমিসকে কুতুব নিজের জায়গা অর্থাৎ দিল্লিতে কিনতে পারে কিন্ত ঘোরীর এক্তিয়ারে পড়া লাহোরে নয়। দিল্লিতে আসার পর ইলতুৎমিস কুতুবের খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠে ও আইবক খুশি হয়ে তাকে উত্তরাধিকারি বানাতে তার কন্যা কুতুব বেগমের সাথে বিবাহ দেন। তাদের একমাত্র পুত্র মারা যাবার দরুন তাদের কন্যাই হন ভবিষ্যতে হিন্দুস্থানের প্রথম মহিলা সুলতান রিজিয়া সুলতানা। রিজিয়া বাবা ও দাদু দুজনেরই খুব পেয়ারের পাত্রী ছিলেন। অবাধ বিচরণ ছিল তার দরবার থেকে অন্দরমহলে। ইলতুৎমিস যখন গৌড় আক্রমণ করেন তখন গৌড়ের সুলতান নিজের রাজ্য ও প্রাণ বাঁচাতে প্রচুর অর্থ ও সোনাদানা দেন ইলতুৎমিসকে। শুধু তাই নয় ভবিষ্যতে যাতে দিল্লির মসনদ গৌড়ের প্রতি সুনজর কায়েম রাখে তার জন্য সে হবু সুলতানাকে গৌড়ের বিখ্যাত স্বর্ণকারেদের তৈরী মনি-মানিক্য খচিত রুপোর সেই বাক্স ভেট করেন। শোনা যায় রিজিয়া সেটা পেয়ে এতটাই আহ্লাদিত হন যে সে সেটা ঘুমোনোর সময়ও সে কাছ ছাড়া করতেন না । ইলতুৎমিসের মৃত্যুর পর তার ইচ্ছে অনুযায়ী রিজিয়ার হাতে দিল্লির ক্ষমতা আসে। কিন্ত তার সৎ ভাই বাহরাম ষড়যন্ত্র করে তখ্ত থেকে সরিয়ে তাকে মারার পরিকল্পনা করে। প্রাণ বাঁচাতে সুলতানা তার স্বামীর সাথে দিল্লি ছেড়ে পালিয়ে যাবার আগে ঘুষ হিসেবে ওই বাক্সটি দেন এক জনৈক কোতোয়ালকে। ও সেই কোতোয়ালের পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে ওই বাক্স এখন নাসির সাহাবের কাছে। তবে হালে চুরি চামারি বেড়ে যাওয়ায় ওটা ওর শালীর বাড়ির সিন্দুকে মেহফুজ রাখা আছে।

গল্প শেষ হওয়ার আগেই দেখলাম ডিক্টাফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে , বোধহয় ব্যাটারীটা পুরোনো দিয়েছিলো। নাসির সাহাব এবার একটু হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলো, ” বহুত দূর সে আ রাহে হ্যায় , ভুখ তো লগি হোগি ‼” আমি হ্যাঁ না কিছু বলার আগেই সে আমার হাত ধরে টেনে একটা ছোট ঘুপচি দোকানে ঢুকিয়ে একটা ছেলেকে হেঁকে বলল, ” অরে অব্দুল , বেটা, দো প্লেট নাহারী , চার কুলচে অউর দো হাফ প্লেট বিরিয়ানি যে আও ,মেহমান আয়া হ্যায়। ” আমাকে বললো, ” বড়ি লাজিজ হ্যায় ইয়াহাঁকা খানা, আপ বস্ ইতমিনান সে ইনকা লুৎফ উঠাইয়ে।” আব্দুল একে একে সব খাবার নিয়ে এসে দিয়ে গেলো। খানিক্ষন পর সে আবার এসে জলের গ্লাস রিফিল করে আমাকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে নাসির সাহাবকে বলল, ” অব্বু বোলে হ্যায় পেহলে কে এক্সো বারাহ রুপয়া বকায়া হ্যায়…” সে মনোযোগ দিয়ে নাহারীর হাড্ডি চুসছিলেন, হাবভাব এমন যেন কিছু শুনতেই পাননি। আমি ভাবলাম সত্যি তো লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়া লোকটার কাছে কোনো রেস্ত আছে বলে তো মনে হয় না। যাই হোক খাবার শেষে জলের গ্লাসে লেবু কচ্লে নুন দিয়ে বুড়োর হাত ধোয়া শেষ হতেই আব্দুল আবার মনে করলো, ” আজকা মিলাকে পুরা দোসও হো গয়া। ” মুখটা লুঙ্গির খুটে মুছে নিয়ে এবার নাসির সাহেব চিল্লে উঠলো, ” আব্বে গান্ডু,ম্যায় চাঁদনী চৌক ছোড়কে ভাগ যা রাহা হুঁ কেয়া? তেরা দোসও রুপয়া মারকে তাজ মহল খরিদুঙ্গা কেয়া?” ঝামেলা বাড়ার আগেই আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সব পাওনা মিটিয়ে দিলাম। গজগজ করতে করতে বুড়ো বেরিয়ে এবার পানের দোকানে গিয়ে আমার ও নিজের জন্য স্পেশাল পানের অর্ডার দিলো, বলা বাহুল্য আবার ষোলো টাকা গচ্চা গেলো। পান চিবুতে চিবুতে খানিকটা মেজাজ ঠান্ডা হলে সে আবার তার ছেলেবেলার কথা শুরু করলো, সে কোনোদিন ইস্কুলে যায়নি মাদ্রাসাতেও গেছিলো দু কি তিন বার কেননা তাদের ওয়ালিদ মানে বাবা বিশ্বাস করতেন শিশুদের জীবন হেসে খেলেই কাটা উচিত। রাস্তায় বাচ্ছারা গিল্লি ডান্ডা খেলছিল ও সেটা দেখে কিছুক্ষনের জন্য স্মৃতিবিলাসকাতর হয়ে পড়লেন ইয়াসিনের বড়ে অব্বু। যাক শেষে পৌঁছলাম তার শালীর বাড়িতে, স্যাঁতস্যাঁতে একটা পৌনে তিনতলা বাড়ি। মানে করি বর্গার দোতলার ওপরে পিলার দিয়ে আরো পৌনে এক তলা পরে তৈরী করা হয়েছে ও এই ঘরকানাঘাটকা গোছের স্ট্রাকচার বড়োই বেমানান লাগছে। হাঁক ডাক পারতেই একটা দশ বারো বছরের মেয়ে বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে ও আমাদের দেখেই সে দৌড়ে আবার ভেতরে চলে গেলো। মিনিট খানেক পর এবার ভেতর থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে এসে বিরক্ত মুখে জিজ্ঞেস করলো, ” কহিয়ে, ক্যায়সে আনা হুয়া ?” নাসির সাহাব আমাকে দেখিয়ে বললো, ” ওহ বক্সা দেখনে কে লিয়ে আয়া হ্যায় , ইয়াসিন কে দোস্ত। ” ভাবলাম এবার মহিলা ভেতরে আসতে বলবে। ও বাবাঃ মহিলা হটাৎ আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, “ইয়ে তো ইস মুহল্লে কে মস্হুর পাগল হ্যায়, আপ কহাঁ সে ভাগ কর আ রহে হ্যায়?” আমি আমতা আমতা করছি দেখে বুড়ো আবার বললো, ” অরে হামিদা,ওহ সুলতানা ওয়ালা বক্সা যে তুম্হারী সন্দুক মে রক্খি হ্যায় ‼” মহিলা এবার চিৎকার করে উঠলো, ” অরে ইয়াকুব কে অব্বা, জরা বাহার আইয়ে , দেখিয়ে ফিরে সে নাসির পগলা অপনা বক্সা ঢুন্ডনে আয়া হ্যায়। ” একটা ষণ্ডা মার্কা লোক তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এসে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে বুড়োকে চপ্পল হাতে তাড়া করতেই বুড়োও লুঙ্গি তুলে সটান দৌড় লাগালো। ওদিকে মহিলা বলেই চলেছে, ” কভি সুলতানা কি বক্সা তো কভি আকবর কে পাৎলুন, ইস পগলে কো সারা হিন্দুস্তান কা দৌলত মেরে সন্দুক মে হি দিখাই দেতা হ্যায় ‼” আসে পাশের সবাই এবারে উঁকি মেরে আমাকেই দেখছে বুঝতে পারলাম , এও বুঝলাম নাসির পাগলার ভায়রাভাই ফিরে এলে আমার সমূহ বিপদ। অগত্যা আমি আস্তে করে সাইডের গলিতে ঢুকেই সামনের এক রিকশাওয়ালাকে বললাম ,”সিধা মেট্রো স্টেশন, জলদি…”

কিস্সা-এ-বক্সা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments