মনের মধ্যে আসা কিছু প্রশ্ন… আর প্রতিনিয়ত চোখের সামনে ভণ্ডামি দেখতে দেখতে জেগে ওঠা বিরক্তি… এই দুই থেকেই লিখে ফেললাম এইখানা। বিষয় গুলো অতি সাধারণ এবং নীরস, তাই যদি বোর হন তার জন্য আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে রাখছি। আশা করি এই লেখা পড়ে কেউ আহত হবেননা। কোনো ব্যক্তিকে আক্ক্রমণ করার উদ্দেশ্য আমার নেই, আমার আক্রমণ কেবল কিছু ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে…

 

বাংলা আর্ট ফিল্ম কি এবং কেন?

বাংলা ফিল্ম জগতে ভাই দুরকম ফিল্ম হয়। কমার্শিয়াল ফিল্ম আর আর্ট ফিল্ম। কমার্শিয়াল ফিল্ম আমি দেখি না। ও আবার মানুষে দেখে? ওসব তো দেখবে সলমন খানের ভক্তরা। ওসব সাধারণ ধী-সম্পন্ন লোকের জন্য। আমার মত আঁতেল লোকেদের জন্য আসল ফিলিম হল আর্ট ফিলিম। কি বললেন, আর্ট ফিলিম কাকে বলে? আসুন তাহলে এর কিছু বৈশিষ্ট্য বলা যাক।

(১) প্রথমত ডিরেক্টরের মধ্যে একটা আঁতেল ভাব থাকতে হবে। তাঁর কথাবার্তা, জামাকাপড় সব কিছু থেকেই ফুটে বেরোতে হবে আঁতলামি। অর্থাৎ "কি দারুণ ভাবলাম ফিল্ম টা!" এরকম মনোভাব থাকতে হবে। সেই ভাবনার উৎস কোনো বিদেশী ছবি হতে পারে… কোন বাধ্যবাধকতা নেই যে মৌলিক হতেই হবে। আগে অন্য লোকে ভেবেছে তো কি হয়েছে? বাঙ্গালিদের মধ্যে তো উনিই প্রথম ভাবলেন। তাহলে তো ঠিকই আছে।

(২) ফিল্মটার গতি বেশ ধীর হলে ভাল হয়। নায়ক নায়িকারা যেন মুখ তুলে কথা বলতে গেলেও সেটা স্লো মোশনে করেন। ওটাই কায়দা। আপনার জীবনের গতিকে থামিয়ে দেওয়া হবে সিনেমার পর্দায়। সবই যদি আপনার জীবনের মত হয় তাহলে আর আর্টটা কোথায় হল?

(৩) অন্তত একজন চরিত্রকে বেশ ভাবুক এবং কবি কবি হতে হবে। তাঁর মুখে সর্বক্ষণই কাব্যি ফুটে বেরুবে, নিদেনপক্ষে গভীর জীবনদর্শনের বুলি থাকবেই। যদিচ তাঁর বাংলা উচ্চারণ অত্যন্ত খারাপ হলেও তাতে সমস্যা কিছু নেই। এ কথা বললাম কারণ ছবিকে একটা স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য মুম্বাই থেকে (বা দক্ষিণভারত থেকে) অভিনেতা ধরে আনার প্রয়োজন হয় অনেকসময়ই। যদিও তার থেকে ভাল অভিনেতা হয়তো এ পোড়া বাংলাতেই পাওয়া যাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, তবু এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন আমরা তুলবনা। এই ধরনের অভিনেতার গলা ডাব করা হয় অনেকসময়ই, আবার অনেকসময় তাঁরা বিকৃত উচ্চারণে বাংলা বলে থাকেন। যাই হোক উচ্চারণ শিখতে তো আপনি হলে যাননি, গেছেন আর্ট দেখতে। কাজেই ঠিকই আছে।

(৪) আজকাল নতুন একটা আর্ট বাজারে খাচ্ছে ভাল। সেটা হল যৌনতা। যৌনতা জিনিসটা খোলামেলা দেখানো তো যায়না, তাহলে সেন্সারে আটকাবে। যদি নাও আটকায় লোকে ছি ছি করবে। তাই অল্প সুড়সুড়ির ব্যবস্থা করলেই চলবে। তাইতে নন্দন চত্বর ভরবে ভাল। কি বললেন? বাজারে বিকোনোর তাগিদে ফিল্ম বানালে সেটা কমার্শিয়াল ফিল্মই হয়ে গেল? চুপ থাকুন দাদা, এসব কথা তো নিন্দুকে বলে। আপনি কি নিন্দুক?

(৫) কিছু বিশেষ ধরনের দৃশ্য বারবার ব্যবহার করতে হবে আঁতলামোর তাগিদে। যেমন ধরুন ঘুমের ওষুধের বড়ি কাচের গ্লাসে রাখা জলে গুলে গেল, কিংবা কাচের জানালার ওপর জলের বিন্দু জমল, অথবা অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে খেলা করে বেড়াচ্ছে কিছু সোনালি মাছ। এরকম অনেক আছে, লিস্টি দিতে বসলে দিন কাবার হয়ে যাবে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন কি ধরনের দৃশ্যের কথা বলছি। এগুলো থাকতেই হবে, তা সে যতই ক্লিশে লাগুকনা কেন। আর এখন তো টেকনোলজির গুণে ঝাঁ চকচকে ভিডিও চলেই এসেছে। সব মিলে জমে একদম ক্ষীর।

(৬) সৌভাগ্যবশত এই মুহূর্তে বাংলা গানের জগতে খুব ভাল কয়েকজন লিরিসিস্ট আছেন। তাঁদের একজনকে পাকড়াও করতে পারলেই কেল্লা ফতে। ভাল কাব্যি-ওয়ালা গান এক্কেবারে রেডি। তারপর ডিরেক্টর সেটাকে ফিল্মে অতি বেখাপ্পাভাবে ব্যবহার করবেন, এটুকু আপনাকে ক্ষমাঘেন্না করে মেনে নিতে হবে। আঁতেল গান শুনতে তো পেলেন বাপু, আবার অত দাবি কিসের?

(৭) আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট মিস করে যাচ্ছিলাম। এইটে মিস করলে ফুল মার্ক্স পাওয়ার আশা নেই। মিডিয়াকে পাকড়াও করতে হবে ভাল করে। এট্টু পয়সা খসালেই এটা করা যায়। তাহলেই মিডিয়া ফিল্মটাকে ধন্য ধন্য করবে, ডিরেক্টরকে সত্যজিত রায়ের সাথে এক আসনে বসাবে আর সেই টিভি চ্যানেলে ঘটা করে ইন্টারভিউ নেওয়া হবে ডিরেক্টরের, সেখানে তিনি ফিল্মটার বিভিন্ন "লেয়ার" গুলোকে ব্যখ্যা করবেন।তাঁর এই ফিল্ম যে কি গভীর চিন্তার ফসল সে কথা ব্যখ্যা করবেন। আর সেই ব্যখ্যা মানুষকে ভাবাবে। বেশি না, অল্প একটু। বেশি ভাবালে বিপদ। আমরা বেশি ভাবনাচিন্তা করতে ভালবাসিনা। একটু একটু ভাবব, ভেবে বুঝতে পারব, তবে না মজা! ছবিটার অন্তর্নিহিত অর্থটা আপনি কিরকম উপলব্ধি করলেন, হল থেকে বেরোনোর সময় সেকথা বলতে বলতে বেরোবেন। সেখানেই তো আর্ট ফিল্ম দেখার তৃপ্তি। আরে মশাই এটাও জানেননা? তাহলে একটা এক্সপেরিমেন্ট বলছি, করে দেখুন। ফেসবুকে কখনও এমন কিছু পোস্ট করে দেখবেন যেটা বুঝতে অল্প, সামান্য একটু মাথা খাটাতে হয়। বেশি নয় কিন্তু, তাহলে চলবেনা। এইরকম অল্প মাথা খাটানো ওয়ালা স্ট্যাটাস দিয়ে এক ঘন্টা ঘুরে আসুন। ফিরে দেখবেন লাইকে লাইকে ছয়লাপ! আপনার ওই স্ট্যাটাসের মানে যারা সামান্য মাথা খাটিয়ে উদ্ধার করতে পেরেছে, তারাই আপনার জন্য রেখে গেছে ওই লাইক-গুচ্ছ। "আমি মানে বুঝেছি"… এই জিনিসটা ভাবতে এবং দেখাতে লোকে ভালবাসে। বাংলা আর্ট ফিল্মের বেলাতেও তাই। একথা মাথায় রেখেই কিন্তু পরিচালকরা ছবি বানান।

কি বুঝছেন? বড্ড বেশি মধ্যবিত্ত মানসিকতার গন্ধ পাচ্ছেন? কি বললেন, আমরা তো মধ্যবিত্তই, তা মানসিকতাই বা অন্যরকম হবে কেন? মন্দ বলেননি, তবে ওই দিয়ে আর যাই হোক, ভাল শিল্প হয়না। সপ্তাহান্তের পার্টি করার মত সঙ্গীসাথী নিয়ে হুজুগে দেখতে যাওয়ার জন্য হয়তো এই ফিল্মগুলো ঠিকই আছে (তাও অনেক বাছাই করতে হবে), কিন্তু তাহলে "আর্ট ফিল্ম" নাম দিয়ে ভন্ডামি কেন? বিশাল কিছু একটা করলাম, এরকম দেখনদারিই বা কেন? আর যে মানুষগুলো ফিল্ম নিয়ে সত্যিকারের চর্চা করেছেন, ভাবনাচিন্তা, পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের সাথে তুলনা করে তাঁদের অপমান করাই বা কেন? আর্ট? আর্ট মাই ফুট!

 

মাতৃভাষা বাংলার প্রতি বাঙ্গালিদের ভালবাসা এবং অভ্র কীবোর্ড

এখন নাকি বিশ্বায়নের যুগ। তাই একটা আঞ্চলিক ভাষা ভাল করে শেখা, বলা এবং লেখার চেয়ে বিশ্বভাষা ইংরেজী নিয়ে চর্চা বেশি জরুরী। ইংরেজী শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বামফ্রন্ট সরকারের প্রাইমারী স্কুলে ইংরেজী শিক্ষা তুলে দেওয়ার নীতি সঠিক বলে আমার কখনও মনে হয়নি (যদিও যাঁরা মনে করেন এর জন্য নাকি বাঙ্গালি জাতি এক ধাক্কায় এক দশক পিছিয়ে গেছে তাঁদের কথারও কোনো যুক্তি দেখিনা) । কিন্তু তার সঙ্গে বাংলা না শেখার কি সম্পর্ক সেটা বুঝতেই আমায় বেগ পেতে হয়। ভাল করে ইংরেজী শিখতে গেলে বাংলায় অশিক্ষিত হতে হবে এটা কোথাকার নিয়ম? নাকি একটার বেশি ভাষা (যার মধ্যে একটা কিনা মাতৃভাষা) ভাল করে শেখা মানুষের অসাধ্য?

আসল কথা সেটা নয়। আসলে বাংলা কম জেনে ইংরেজী বেশি জানাটা একটা ফ্যাশন। সে ফ্যাশনের মধ্যে গৌরব আছে কিনা সেই প্রশ্নে যাবনা, কিন্তু বুদ্ধিমত্তার পরিচয় যে নেই সে কথা অন্তত বুঝি।
বিরুদ্ধবাদীরা বলেন মাতৃভাষাকে ভালবাসা একটা ন্যাকা সেন্টিমেন্ট। এই সেন্টিমেন্টের নাকি কোনো যৌক্তিকতা নেই। যেমন মাতৃভূমিকে ভালবাসাটাও একপ্রকার সংকীর্ণতা। এই দ্বিতীয় কথাটা আমি তবু কিছুটা মেনে নিতে পারি। সত্যি কথা বলতে আমি ভারতে জন্মেছি বা বড় হয়েছি বলে "মেরা ভারত মহান" বা "সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি" বলতে হবে এটা আমারও খুব একটা পছন্দ না। কোনো ভারতবাসীর মনে হতেই পারে ভারত অতি বাজে দেশ, এর চেয়ে পাপুয়া নিউ গিনি ঢের ভাল। এটার মধ্যে আপত্তিজনক কিছু আমি দেখিনা। আর এইসব দেশ টেশ তো মানুষের বানানো গন্ডি দিয়ে সীমাবদ্ধ। ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত হওয়ার কোনো কারণ আমার নেই, কারণ আমার এই ভারতবাসী স্ট্যাটাসটা আমি পেয়েছি নেহাতই ভাগ্যগুণে (বা দোষে)। এর মধ্যে আমার কোনো হাতই নেই, তাই গর্বিত হওয়ারও প্রশ্ন নেই। কিন্তু মাতৃভাষাকে আপন করে নেওয়ার বিজ্ঞানসম্মত কারণ আছে। জন্মে থেকে চারপাশে যে ভাষা শুনে মানুষ বড় হয় সে ভাষার প্রতি তার আপনা থেকেই একটা ঝোঁক চলে আসে। সেটা শেখার জন্য তাকে আলাদা করে এফর্ট দিতে হয়না যদি না সেটা না শেখার জন্য সে ইচ্ছাকৃত এফর্ট দিতে শুরু করে।

তা দাদা রা, এই যে আপনারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে আজ বাংলাকে হ্যাটা করে সারাক্ষণই ইংরেজী আওড়ান, ইংরেজী শেখার পিছনে (বা কত ভাল শিখেছেন সেটা দেখানোর পিছনে) আপনাদের এই যে এত এফর্ট, আপনাদের ইংরেজী ব্যকরণগতভাবে বিশুদ্ধ হয় তো? আপনাদের ইংরেজী উচ্চারণ শুনে ইংরেজরা (বা মার্কিনিরা, যারা নাকি নিজেদের মত করে ইংরেজী ভাষা কে গড়ে তুলতে চায়) আড়ালে হাসবে না তো? আসলে এই বাংলাবর্জনকারীদের মধ্যে এত কমজনকে সত্যিকারের ভাল ইংরেজী বলতে বা লিখতে দেখেছি যে বড্ড ভণ্ডামি মনে হয় পুরো ব্যাপারটা। আর খুব বোকা বোকা লাগে তাদের এই মাতৃভাষা শেখার সহজ কাজটা না করে কঠিন বিদেশী ভাষাটাকে বেশি আপন করার এই চেষ্টা দেখে। বাংলার মত এত রিচ একটা ভাষাকে ত্যাগ করে তাঁরা যে কত কি হারাচ্ছেন এটা ভেবে তাঁদের ওপর করুণাও হয়। বাংলা সাহিত্যের বিপুল সম্ভার তাঁদের কাছে রয়ে যাচ্ছে অধরা।

সত্যি কথা বলতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালির মত আর কেউ বোধহয় নিজের মাতৃভাষাকে এত বেশি তাচ্ছিল্য করেনা। অন্তত ওপার বাংলার মানুষের বাংলাভাষার প্রতি ভালবাসা দেখে কিছুটা ভাল লাগে। এরকমই এক মানুষ ডঃ মেহেদি হাসান খান। অভ্র কীবোর্ডের আবিষ্কর্তা। কম্পুটারে বাংলা ফন্ট এসেছে অনেকদিন, ফোনেটিক বাংলা টাইপিং-ও এসেছে, কিন্তু সেটাকে এত সুন্দর করে গড়তে পারেননি আগে কেউ। অথচ খুব কঠিনও নয় কাজটা। এই কাজটাই করে দেখালেন তিনি অভ্র কীবোর্ডের মাধ্যমে, যা আজ সারা বিশ্বের বাঙ্গালিদের ডিজিটাল লেখালিখির সম্বল। কিন্তু তবু অনেকে ব্যবহার করে চলেন দৃষ্টিকটু বাংরেজী ভাষা (অর্থাৎ ইংরেজী ফন্টে বাংলা লেখা)। এই ব্লগেও এরকম আছেন অনেকে। তাঁদের অনেকের হয়তো অনেক বাধা থাকতে পারে (অনেক সময় অফিসের কম্পুটার থেকে কাজ করতে হয় ইত্যাদি), কিন্তু আসল কারণ বাংলা টাইপিং-টা ভাল করে শিখে নেওয়ার অলসতা। এমন কিছু কঠিন বা সময়সাপেক্ষ কাজ নয় এবং একবার শিখে নিলে বাংরেজী টাইপিং এর মতই দ্রুত টাইপ করা সম্ভব। আমরা যারা এই বাংলা ব্লগে যোগ দিয়েছি তারা সবাই নিশ্চয়ই বাংলা ভাষাকে ভালবাসি। সেই ভালবাসার জিনিসটার জন্য এটুকুও কি করা যায়না?

 

“আমি সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল"… এই অযৌক্তিক বক্তব্যকে ছুঁড়ে ফেলা যায়না?

আপনি কি যুক্তি দিয়ে কথা বলতে বা ভাবতে ভালবাসেন? নাকি মনে করেন যুক্তি দিয়ে অনেক কিছু ব্যখ্যা করা যায়না, সুতরাং যুক্তি দিয়ে ভাবনাচিন্তা না করাই ভাল? যদি আপনি দ্বিতীয় দলের হন তাহলে এই লেখার বাকিটা আর পড়ে কাজ নেই। এটা স্রেফ যুক্তিবাদী মানুষদের জন্য… এই ডিসক্লেমার শুরুতেই দিয়ে রাখলাম।

সব ধর্মের মানুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল আমিও। কিন্তু সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। যাঁরা দাবি করেন তাঁরা সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাঁরা হয় সেই "সব" ধর্মের কিস্যু জানেননা, অথবা তাঁদের যুক্তিবোধ নেই। কারণটা খুব সাধারণ। এই বিভিন্ন ধর্মগুলি যেভাবে ঈশ্বরকে ব্যখ্যা করে সেগুলি একে অপরের সাথে কনট্রাডিকটরি। অর্থাৎ হিন্দু ধর্মের ঈশ্বর সম্পর্কে যা ব্যখ্যা সেগুলো যদি সব সত্যি হতে হয় তো মুসলিম ধর্মের ঈশ্বর সম্পর্কে ব্যখ্যার অনেক কিছু মিথ্যা হতে বাধ্য, ইত্যাদি ইত্যাদি… সেক্ষেত্রে আপনি হয় কোনো ধর্মকেই সম্পূর্ণভাবে মানেননা, অথবা বড়জোর একটা ধর্মকে মানেন। যদি দ্বিতীয়টা সত্যি হয় তাহলে একটা বড় প্রশ্ন চলে আসে – “কেন বলুন তো আপনার মনে হল ওই ধর্মের ব্যখ্যাটাই সত্যি, অন্য ধর্মগুলোর ব্যখ্যা সত্যি নয়?” আপনি মানুন বা না মানুন, উত্তরটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাই – “কারণ আমার বাবা মা ওইরকম বিশ্বাস করতেন, এবং ছোটো থেকে আমায় ওইরকম শিখিয়েছেন"… কারো কারো ক্ষেত্রে এই শেখানোটা বাবা মা না করে অন্য কেউ করেছেন, যাকে বলে প্রীচ করা… আর খুব খুব সামান্য সম্ভাবনা যে আপনি নিজে বিভিন্ন ধর্মের মূলগ্রন্থগুলি পাঠ করে নিজে পছন্দের থিওরীটা বেছে নিয়েছেন। তাই সত্যিকারের যুক্তি দিয়ে আপনার একটি বিশেষ ধর্ম বেছে নেওয়ার কারণ ব্যখ্যা করতে আপনাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে। এই প্রসঙ্গে একটা বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ না করে পারছি না – “I just believe in one fewer god than you do. When you understand why you dismiss all the other possible gods, you will understand why I dismiss yours.”

এবার আসা যাক অন্য সম্ভাবনাটায়। অর্থাৎ আসলে আপনি কোনো ধর্মকেই সম্পূর্ণভাবে মানেননা, কেবল নিজের মনগড়া একজন ঈশ্বর কল্পনা করেছেন এবং তাঁর আরাধনা করেন। আপাতদৃষ্টিতে এর মধ্যে সমস্যা কিছু নেই। সমস্যা বাধে তখন যখন দেখা যায় আপনার মনগড়া ধর্মটা আসলে হয়তো হিন্দুধর্মের অর্ধেক নিয়ে গড়া, অথচ হিন্দুধর্মের বাকি অর্ধেক মেনে না নিলেও আপনি কখনো মুখ ফুটে বলেননা যে হিন্দুধর্মের এই এই জায়গা গুলো বোগাস, এবং কিমাশ্চর্যম! নিজেকে পরিচয় ও দেন হিন্দু হিসেবে! কোন যুক্তিতে? কারণ আপনার বাবা হিন্দু। আহা…বোকা-বোকাত্বের কি অপরিসীম উচ্চতায় নিয়ে গেলেন নিজেকে! ধর্ম, যা কিনা একটা বিশ্বাস, সেটা নাকি বংশানুক্রমিকভাবে ইনহেরিটেড হবে!!

দেখুন দাদা, আমার সোজা সরল কথা। ভগবান থাকতেই পারেন। কিন্তু যতক্ষণ না সেটা প্রমাণ হচ্ছে ততক্ষণ সেটা মেনে নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। আপনি মনে মনে বিশ্বাস করতেই পারেন হ্যাঁ, তিনি আছেন, আপনার পাশেই আছেন, সর্বভূতে আছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মুস্কিলটা হল অজানাকে ঘিরে এরকম একটা হাইপোথিসিস খাড়া করতে গেলে একটু সাবধানে করতে হয়। নইলে আপনার থিওরীর মধ্যেই চলে আসে সেলফ কন্ট্রাডিকশন। আমার জানা প্রতিটি ধর্মের মধ্যেই আছে এরকম অসঙ্খ্য সেলফ কন্ট্রাডিকশন। সেজন্য একজন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে আমার জানা কোন ধর্মে বিশ্বাস করা আমার পক্ষে সম্ভব না। এই ধর্মগুলো স্রেফ মানুষকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে এবং তারপর সেই দলাদলিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের ক্ষতি করে।

অনেকেই মনে করেন কেউ যদি নিজের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে থাকেন তাতে অন্যদের কি বলার আছে? কার কি ক্ষতি হচ্ছে এতে? ক্ষতি আছে। ধর্ম জিনিসটার গোড়ার কথা হল বিশ্বাস বা ফেইথ। অর্থাৎ যীশু বলেছেন তাই তোমায় বিশ্বাস করতে হবে। কেন ওরকম সে কথা জিজ্ঞেস করার কোনো অধিকার নেই। আদৌ কথাগুলো যীশু বলেছেন না পরে তাঁর শিষ্যরা সেগুলো বিকৃতভাবে প্রচার করেছেন তাই জানা নেই, কথাগুলো কতটা ঠিক সে তো অনেক পরের কথা।এই যে গায়ের জোরে মানুষকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা, এটাই যুক্তিবাদী চিন্তা করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়, অগ্রগতি বন্ধ করে দেয় মানবসভ্যতার। ভেবে দেখুন, আজ আপনি বিজ্ঞানের যেসব দান নিত্য ব্যবহার করছেন, সেগুলোর আবিষ্কার হয়েছে কিন্তু মানুষ প্রশ্ন করতে চেয়েছে বলেই। মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে "কেন এমন হয়?” “কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়?”… যখনই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, সে তার উত্তর খোঁজার জন্য চর্চা করে, তার জ্ঞান বাড়ে, সে এগিয়ে চলে… আর যখনই ধর্ম এসে তার মুখ চেপে ধরে বলে "চোপরাও! আমি বলছি এটাই ঠিক, ব্যাস! মেনে নাও! এত পোস্নো কিসের?”… তখনই তার গতি থমকে যায়। তাই আপনার পায়ে পড়ি, নিজের ছেলে মেয়েকে প্রশ্ন করতে শেখান… তার মনে যখন জিজ্ঞাসা আসে, সেটার টুঁটি টিপে না ধরে সেই জিজ্ঞাসার উত্তর দিন। কোনটা কেন হয় কারণসহ বুঝিয়ে দিন… “এটা এরকমই… আমি বলছি মেনে নাও" বলে ধমক না দিয়ে…

এবার আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো। ধর্মবিশ্বাসের খারাপ দিকটা তো আমি বললাম, ভাল দিক কি আছে? আদৌ কিছু আছে কি? অনেক ভেবে আমি একটাই পেলাম… মানুষের যখন একা লাগে, আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়, তখন "আমার পাশে ঈশ্বর আছেন" এই ভেবে সে অনেকসময় মানসিক শান্তি পায়। যেহেতু এর সত্যতা সম্পর্কে কেউ জানেনা, তাই এটাকে অনেকটা White Lies এর মত বলা যেতে পারে। সেটা খুব কাম্য কিছু নয়। অনেকে মনে করেন ধর্ম মনুষের বিবেকবোধ কে জাগ্রত করে। বিশাল ভুল ধারণা। তাহলে ধার্মিকরা কখনও পাপকাজ করতনা, শুধু নাস্তিকরাই করত। বিবেকবোধ আসে মানুষের ভিতর থেকে, অন্য মানুষের প্রতি সহানুভূতি আর ভালবাসা থেকে। ধর্ম লোককে নরকবাসের ভয় দেখিয়ে পাপকাজ থেকে বিরত করার চেষ্টা করে। আবার নানারকম প্রায়শ্চিত্ত করে পাপস্খালন করার সুযোগও দেয়। ভয়ই যদি দেখাতে হয় তবে আদালতের শাস্তির ভয়টা সঠিকভাবে দেখানো বেশি কাজের।

অন্যদিকে ধর্মের খারাপ দিক এতই বেশি যে তার পাশে এই সুবিধেটা নিতান্তই নগন্য। প্রচুরতম মানুষের প্রভূততম ক্ষতিসাধনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল ধর্ম। প্রতি বছর ধর্মের নামে হাজার হাজার মানুষ খুন হন, নির্যাতিত হন। আপনি বলবেন যারা এরকম করে তারা সাচ্চা ধার্মিক নয়। এটা ধর্মের দোষ নয়, দোষ তাদের যারা ধর্মকে ভুল পথে ব্যবহার করছে। তো? যতদিন মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করবে, পারবেন এই ভুল পথে ব্যবহার আটকাতে? পারবেন না, কারণ ধর্মবিশ্বাস মানেই অন্ধবিশ্বাস। বিশ্বাস যুক্তি দিয়ে হয়না, বিশ্বাসের গোড়ার কথাই হল বললে মেনে নিতে হবে। তাই সুবিধাবাদী লোকেরা যখন ভুলভাবে ধর্মকে ব্যখ্যা করে, মানুষ সেটাও মেনেই নেয়। প্রশ্ন করার ক্ষমতাটাই তো তাদের লোপ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে এই ধর্ম নামক ব্রহ্মাস্ত্রে! সুতরাং আপনি এমন একটা জিনিস বদ লোকেদের হাতে তুলে দিচ্ছেন যার সামান্য মিস-ইন্টারপ্রিটেশন করে তারা আরেকদল মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে খুন করাচ্ছে বা ভুল বুঝিয়ে অত্যাচার করছে। বন্দুক তো খুন করেনা, করে বন্দুকধারী। তাবলে কি সবাই বন্দুক হাতে ঘুরুক এটাই কাম্য?

তাই দাদারা, আপনারা যদি এখনও সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার নীতিতে বিশ্বাস করেন, এ ভুল আর করবেন না। যদি আপনি প্রবল ধর্মবিশ্বাসী হন তাহলে এই লেখা পড়ে কিস্যু পাল্টাবেন না, সে আমার ভালই জানা আছে। কারণ ধর্মবিশ্বাসীদের যতই যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, তারা মানবেনা। তাদের যে যুক্তি দিয়ে ভাবার ক্ষমতাই লোপ পেয়েছে। একটা জায়গার পর যখন তাদের ধর্মবিশ্বাসে সেলফ কন্ট্রাডিকশন গুলো সামনে চলে আসতে থাকে তখন তারা তাদের অমোঘ অস্ত্র প্রয়োগ করে – “সব কিছু যুক্তি দিয়ে বোঝা যায়না" অথবা "আমাদের সীমিত যুক্তিবোধ দিয়ে ঈশ্বরকে বোঝা যাবেনা, সে বোঝার জন্য সাধনা দরকার"… ইত্যাদি… অর্থাৎ সেক্ষেত্রে আপনি যুক্তি মেনে চলবেন না। তাই যদি হয় তাহলে তো দাদা বলতে হয় আমার লেখার এই অংশটার প্রথম লাইনটাই আপনি ভাল করে পড়েননি…

আমরা নাস্তিকরা কেন আস্তিকতার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগি এটা ভেবে অনেকেই বিস্মিত হন। কেন তা করি সেটা বোঝানোর চেষ্টা করলাম কিছুটা। এই প্রসঙ্গে বলি বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্সের একটা উক্তি – We will stop caring what you believe in as soon as what you believe in stops influencing the decisions of those in power, thereby affecting our lives. Negatively, I might add…

শেষ করি রিচার্ড ডকিন্সেরই একটি বক্তৃতার ভিডিও দিয়ে। আপনি যে মতেই বিশ্বাস করুন না কেন, যদি যুক্তি দিয়ে ভাবতে ভালবাসেন তাহলে এই ভিডিওটা দেখলে উপভোগ করবেন।

 

আমার শেষ কথাও এটাই… Let's all stop being so damned respectful!

 

পুনশ্চ – দ্বিতীয় অংশটি প্রসঙ্গে একটি স্বীকারোক্তি করার আছে। আমি নিজেও লেখায় বা কথায় প্রচুর ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করে থাকি যেগুলো হয়তো সহজেই বাংলায় বলা যায়। একদিক থেকে হয়তো আমি জ্ঞানপাপী। কিন্তু আবার এটাও সত্যি যে ওই শব্দগুলো আমার স্বতস্ফূর্তভাবেই এসেছে ইংরেজীতে, বাংলা ভাষাকে তাচ্ছিল্য করে ফ্যাশন দেখাতে নয় বা আমি কত ভাল ইংরেজী জানি সেটা দেখানোর প্রচেষ্টায় নয়।

 

***ছবিগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

কেন???
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments