সে-ও ছিল এইরকমই এক পঁচিশে বৈশাখ। খুব অনেকদিন আগে নয়, তবে রবীন্দ্রসৃষ্টির ওপরে বিশ্বভারতীর বজ্রআঁটুনি থাকলেও তা অনেকটাই ক্ষমতাচ্যুত, কারণ স্থির হয়ে গেছে বিনিয়ন্ত্রণের দিনক্ষণ।

রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলার স্মৃতিবিজড়িত গঙ্গার ধারের একটি বাড়িতে যেখানে সচরাচর বছরের অন্য যে কোনওদিন বিনানুমতিতে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেদিন সকালে সামান্য কিছু সময়ের খুলে দেওয়া হয় মূল ফটক। নাঃ রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত কোনও অমূল্য সামগ্রী প্রদর্শিত হয় না, কিছুই তো নেই, কোত্থেকে হবে ! জীবনস্মৃতির কোনও এক পাতায় কয়েক লাইনে উল্লিখিত এই বাড়ির সে কৌলীন্য কোথায় ? তবু, খুলে দেওয়া হয়। আসলে এই বাড়িটি বর্তমানে একটি বালিকাশ্রম, আশ্রমকন্যারা এই দিনটির জন্যে প্রস্তুত হয়, তাদের সেই পারফর্মেন্স সবাইকে দেখানোর জন্যেই এই ব্যবস্থা। অনুষ্ঠান শুরু হত বেশ সকালেই, একে ছোট বাচ্চারা বেশি রোদ উঠলে অসুবিধে বোধ করতে পারে এছাড়াও আমন্ত্রিতদের অন্যান্য নানা কাজ আছে, যদিও এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণের অপেক্ষা কবে কেই বা করেছে, প্রায় সবাই রবাহূত। আংশিক ভগ্ন দোতলা বাড়িটির সামনে একটা বিশাল মাঠ। সেই মাঠের মাঝখানে গোল হয়ে বসে থাকা দর্শক, দুয়েকজন আবার গঙ্গার ঘাটে বাঁধানো সিমেন্টের চেয়ারে আসীন। ওই দর্শকবৃন্দের মাঝখানে মাঠের যে অংশ, সেখানেই শুরু হত অনুষ্ঠান, বৈশাখের সুর্যদেব নিজ মহিমা প্রকাশ করার আগেই সমাপ্তি ঘোষণা।

এক-দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠান সেরে বের হয়েই সেবার দুই রবীন্দ্রানুরাগী, যাদের প্রাথমিক গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক কালক্রমে বদলে গিয়েছে অসমবয়সী বন্ধুত্বে, তাদের একজনের মনে হল, এখনও সময় আছে, হোক আরও রবীন্দ্রচর্চা। যে রকম ভাবা সেইরকমই কাজ। স্থান নির্বাচন – সে তো খুব সহজ, চল গিয়ে বসা যাক যে বয়সে বড় তার বাড়িতেই। খুব কাছেই তো সেই বাড়ি। অংশগ্রহণকারী দু’জন – যাদের মাথা থেকে বের হয়েছে এই ভাবনা, আর শ্রোতা?! কেন? এই দুজনই তো যথেষ্ট, তবে বিষয় একটিই, রবীন্দ্রসঙ্গীত, এই ব্যাপারটাতেই তো তাদের সামান্য কিছু দক্ষতা, নিজেদের হৃদয়ের টান, এই একটি মাত্র আকর্ষণই তো কাছে এনেছিল এই দু’জনকে, তারপরে কেটেছে বেশ কিছু সময়, আগে যেমন বলা হয়েছে, আরও কাছাকাছি। তবু শ্রোতা দু’জনের চেয়ে বেড়ে গেল আরও একজনে। বাড়িতে উপস্থিত শিশুপুত্র। শুধুমাত্র একটি তানপুরা সহযোগে, বিনা সঞ্চালনায়, মেঝের ওপরে শতরঞ্চিমাত্র মঞ্চ সম্বল করে রবীন্দ্রপ্রতিকৃতির সামনে শুরু হল রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রক্রিয়া।  মোটামুটি সকাল সাড়ে ন’টা-দশটা নাগাদ শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানের যতি কি পড়ত ? অন্তত অন্দরমহল থেকে ডাক না আসলে ?

- তোমরা কি আজ গীতবিতান শেষ করেই উঠবে নাকি?

- অ্যাঁ !!

- ক’টা বাজে খেয়াল আছে ? এই তোমার আর বাড়ি গিয়ে কাজ নেই এখানেই খেয়ে নাও

সম্বিৎ ফেরে দু’জনের। শিল্পী ব্যতীত উপস্থিত একমাত্র শ্রোতা সোফার ওপরেই ততক্ষণে ঘুমের দেশে।

দরকার কি আদৌ ছিল এই লেখার? অজানা।  ক্ষমা করবেন বন্ধুরা। তবু এই একটি দিনে চারিদিকের অত্যন্ত উচ্চকিত রবীন্দ্রচর্চার মধ্যে বড্ড বেশি করেই মনে পড়ে এই রবীন্দ্রজয়ন্তীটির কথা।

ওঃ হ্যাঁ আরও একটা কথা, ওই বালিকাশ্রমে আজও রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী পালিত হয়। এখনও সকালে শুরু হলে বাচ্চাদের সুবিধে হবে, এই বিষয়টা মাথায় রেখে সবার শুরুতে একটা সমবেত নৃত্য এবং সমবেত সঙ্গীত গাইয়ে দেওয়া হয়, মাঠের মাঝে ঘাসের মঞ্চের বদলে বিশাল মণ্ডপ তৈরি হয়, এখানে গান গাইতে পারা স্থানীয়ভাবে স্টেটাস সিম্বল বলে বিবেচিত হয়, প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় হতে চলল সরকারি কোষাগারের অর্থে একসময়ের ভগ্নপ্রায় বাড়িটি সুস্থ হয়ে উঠেছে, তা যে দেবে সে তো কিছু নিয়েও নেবে, অতএব………

কোনও এক পঁচিশে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments