সাউথ আফ্রিকায় সিরিজ খেলতে গেছেন। টেস্ট চলছে। পেশায় উকিল বাবা একটা ফ্যাক্স পাঠালেন। একজন টিমমেট খবর দিল। তিনি চিন্তিত হলেন, ব্যাপারটা কি? তবে কি বাড়িতে কারুর কিছু হল? তা হলে তো বাবা ফোন করতেন। যাই হোক। ফ্যাক্সের কাগজটা আনানো গেল। দেখলেন, ক্রিকেট-বিষয়ক একটা বইয়ের একপাতা। তাতে ব্র্যাডম্যানের কিছু কোটের নিচে দাগ মেরে তলায় বাবা লিখেছেন, পরের ইনিংসে ব্যাট করার সময় এইভাবে ভুলটা শুধরে নিও।

বাবাকে সারাজীবন এইভাবেই পেয়েছেন কুমার সঙ্গাকারা। প্রশ্রয়, আবার সমালোচক। উইকেটকিপার হয়েছিলেন নেহাত টিমে ঢোকার তাগিদেই। সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব গ্রাউন্ডে সিলেকশনের সময় গেছেন, জাতীয় কোচ সেখানে উপস্থিত। সবাই ব্যাটসম্যান আর বোলার বলে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন। কোচ তখন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিপার কেউ নেই? সঙ্গার তখনও চান্স হবে কিনা জানা নেই। বুদ্ধিমান ছেলেটি এই সুযোগে হাত তুলে দিল। এইভাবেই শুরু। আর শেষ হবে ওয়ান ডে’তে এখনও অবধি সবচেয়ে বেশি আউট করতে পারা কিপার হিসেবে।

২০১১ সাল, ৪ জুলাই। লর্ডসে এমসিসি স্পিরিট অফ ক্রিকেট-এর কাউড্রি লেকচার দিতে উঠলেন সঙ্গাকারা। সদ্য ক্যাপ্টেন্সি ছেড়েছেন, কিন্তু তখনও শ্রীলঙ্কা টিমের ফুলটাইম সদস্য, কাউড্রি লেকচারের ইতিহাসে তরুনতম এবং একমাত্র বক্তা যিনি প্রাক্তন নন। দেড় ঘন্টার বক্তব্যের শুরুতে প্রাজ্ঞ ও প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরলেন দেশের ক্রিকেট ইতিহাস, তারপর উঠে এল শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়। “দাঙ্গার ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়ায় আমাকে। কতই বা বয়স আমার তখন, ছয় বছরও হয়নি। প্রায় ৩৫ জন বন্ধুর পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল আমাদের বাড়িতে। ইস্কুল নেই, সবাই বাড়িতে আর আমার কাছে সেসব ছিল আনন্দের, কারণ একটি ছয় বছরের শিশুর কাছে বন্ধুদের কাছে পাওয়ার থেকে বড় কিছু আর হয় না। বাড়ির পিছনে মাঠে খেলতাম, কিন্তু মাঝেমধ্যেই খেলা ছেড়ে লুকিয়ে পড়তে হত, যখন গুণ্ডাবাহিনী তল্লাশি চালাতে আসত বাড়ি বাড়ি”, বলে চলেন তিনি।

তারপর আসে জীবনের দুই কঠিনতম মুহুর্তের কথা। বক্সিং ডে, ২০০৪। “আমরা তখন নিউজিল্যান্ডের মাঠে ওয়ান ডে খেলছি। ড্রেসিংরুমে সনতের (জয়সুরিয়া) ফোন বাজল, মেসেজ এসেছে, সামুদ্রিক ঢেউতে নাকি শ্রীলঙ্কার কিছু অংশে বন্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমে পাত্তা দিই নি, ভেবেছি এমন তো হয়েই থাকে। কিন্তু খেলা শেষে হোটেলের ঘরে ফিরে টিভি চালিয়ে যেন মাথায় বাজ পড়ল! ৩১ ডিসেম্বর রাত্রে কলম্বোতে নামলাম, সাধারণত যে রাত আলোয় ঝলমল করে, সেই রাতে গোটা কলম্বো শহর অন্ধকার। ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করব। মুরলীধরণ আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাথার ছেলে। সে দেখি মোবাইলে নম্বর ধরে ধরে ফোন করা আরম্ভ করল। সবাই যে যার পরিবারের খবর পেলাম। তারপর একটু গুছিয়ে নিয়ে শুরু হল আমাদের ডিউটি। মুরলী দেশবিদেশে ফোন করতে লাগল ত্রাণের সাহায্য চেয়ে, ওর উদ্যোগে আমরা শুরু করলাম ত্রাণ সংগ্রহের কাজ। সমস্ত উপকূল অঞ্চলে ঘুরতে লাগলাম, চোখের সামনে দেখলাম দুর্যোগ কিভাবে এলটিটিই আর আর্মির মত যুযুধান দুপক্ষকেও হাতে হাত মিলিয়ে দিতে পারে”। যে মাঠে সঙ্গা জীবনের প্রথম টেস্ট ও ওয়ান ডে খেলেছেন, এমনকি জীবনের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি যে মাঠে, সেই গল স্টেডিয়ামটাই ধ্বংস করে দিয়েছিল সুনামি।

এতদিন ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশে থেকেও সেভাবে সরাসরি বোমাগুলির মধ্যে কখনও পড়েননি সঙ্গা। কলম্বোর মানুষ সেসবের মধ্যেই জীবনের অন্য রঙ খুঁজে নিত। কিন্তু কঠিনতম চ্যালেঞ্জ আসে ২০০৯ সালের মার্চে। “লাহোরের গদ্দাফি স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় টেস্ট, তৃতীয় দিন। সেদিন আমাদের বাস হোটেল থেকে একটু আগেই ছেড়েছিল। ভেতরে তুমুল হট্টগোল, ফাস্ট বোলাররা নিজেদের সমস্যার কথা আউড়াচ্ছে। হঠাত চারদিক থেকে একটা পটকা ফাটার আওয়াজ এল। সামনে থেকে কেউ একজন চিৎকার করল, ‘গুলি চলছে, সবাই মেঝেতে শুয়ে পড়ো’। দুদ্দাড় করে যে যার ঘাড়ের ওপর পারল শুয়ে পড়ল। বাসটা থেমে গেছে। তারপরেই কানে এল, প্রবল শব্দে গুলিবৃষ্টির আওয়াজ। মাহেলা পিছনে ছিল, ওর চিৎকার শুনলাম, ‘আমার পায়ে গুলি লেগেছে!’ আমি ছিলাম থিলানের পাশে। ওর থাইতে গুলি লেগেছে, আমি ওর চিৎকারে মাথাটা সামান্য তুলে যে ওর পায়ের দিকে উঁকি মেরেছি, আমার কানের পাশ দিয়ে কিছু একটা বেরিয়ে পাশের সিটের গায়ে লাগল। ধাতব শব্দে বুঝলাম, সেকেন্ডের ভগাংশ আগে আমার মাথাটা ঠিক ওইখানেই ছিল। দিলশান চেঁচাচ্ছে, আরে ড্রাইভার করছেটা কি?” শেষপর্যন্ত ড্রাইভার বাসের স্পিড বাড়িয়ে কোনও মতে স্টেডিয়ামে ঢুকিয়ে দেয়। সঙ্গাকারার উপলব্ধি, “সেদিন কিছুক্ষণের জন্য হলেও বুঝেছিলাম, তিরিশ বছর ধরে আমার দেশের লোক ঠিক কেমন জীবন কাটিয়েছে”।

লেকচারের শেষটা ছিল শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে বিশ্বকাপ পরবর্তী সময় ধরে চলা দূর্নীতির কথা। আমাদের কাছে এক তামিল ও তাঁর শিষ্যের কল্যাণে সেসব জলভাত, তাই সেদিকে আর না গেলেও চলে। তবে সঙ্গার এই লেকচার ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কিছু বক্তৃতার মধ্যে পড়ে। এতটাই যে, পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে অবধি এটাকে রাখা হয়েছে।

ভারতের খেলা দেখার সময় বা ইচ্ছে, কোনওটাই আমার খুব একটা হয় না এখন। তবে যখন দেখতাম, বেশ মনে আছে, শ্রীলঙ্কা ব্যাট করলে জয়সুরিয়া, জয়বর্ধনে আর সঙ্গাকারার ব্যাটিং দেখার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। অরবিন্দ ডি’সিলভার খেলা লাইভ দেখিনি, দেখেছি জয়সুরিয়ার। ঝোড়ো ব্যাটিং যাকে বলে। ফর্মে থাকলে গ্যালারিকে রীতিমত সাবধানে থাকতে হয়! আর সঙ্গাকার উল্টোদিকে ঠাণ্ডা মাথায় ধরে খেলার মানুষ। ক্রিজের ওপারে জয়বর্ধনে থাকলে তো কথাই নেই। আপাদমস্তক ভদ্র। স্টার স্পোর্টসের এক অনুষ্ঠানে এক খুদের প্রশ্ন এল, “আপনি কিপার হিসেবে কতটা ইরিটেট করতেন ব্যাটসম্যানকে?” সঙ্গাকারার সরল উত্তর, “যখন নতুন ঢুকেছি, তখন কিপারের এদিকটা নিয়ে বেশ আগ্রহ ছিল। কিন্তু পরে বুঝেছি, স্লেজিং জিনিসটা অর্থহীন। তাই কিছুদিন পর থেকেই আমি ঠিক করি, নিজের কাজেই শুধু মন দেব, ব্যাটসম্যানের কাজ সে করুক। থ্যাঙ্কস দ্যাট আই হ্যাভ গ্রোন আপ!”

ক্রিকেটের সম্ভবত সর্বকালের সেরা এক বিজ্ঞাপন। শ্রীলঙ্কার মত ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রে জন্মালেও যিনি আজীবন বিশাল জায়গা জুড়ে থেকেছেন। ম্যাচেই হোক বা ভক্তদের হৃদয়ে। স্বচ্ছতার ভাবমূর্তি। রিটায়ার করার মাসপাঁচেক আগে অবধি বিশ্বরেকর্ড করেছেন, বিশ্বকাপে পর পর চার ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকানোর রেকর্ড। ঝরঝরে ইংরেজি, ডিকশনে অসম্ভব ভাল। শেষ বেলায় মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানানো ছাড়া বোধ হয় আর কিছুই পড়ে থাকে না।

ক্রিকেটের কুমারঃ ব্যাট-বলের বাইরের বাইশ গজে…
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments