আমাদের প্রত্যকের জীবনেই একটা নির্দিষ্ট ছন্দ আছে, প্রকৃতির মতো অমোঘ না হলেও মোটামুটি একটা প্রাত্যহিকী আমরা সবাই অনুসরন করি। এই চলার পথে কখনো একটু ভালো লাগা, কখনও একটু মন্দ লাগা একটু বেশি-ই মন ছুঁয়ে যায়। সেসব কথা হয়ত বা কাউকে বলি অথবা বলি না। যেহেতু এখন কদিন একটু ব্লগিং-এর মন হয়েছে,তাই ভাবলাম এই ঘটনাটি একটু ভাগ করে নি। বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে এটি হয়ত খুব সাধারন, পাঠকের হয়ত মনে হতে পারে এরকম তো আগেও ঘটেছে, ফলাও করে বলার কি হল। আসলে বলার কিছু হয়নি, বলতে ইচ্ছে হল, তাই বললাম। আর ঘটনাটা সত্যি তেমন বড় কিছু নয়, তবু সেই মুহূর্তে আমার বেশ ভালো লেগেছিল, তাই লিখছি।
কলকাতার রাস্তায় চলাফেরা করার হাজারো সমস্যা। বাস পাওয়া যায় তো সে বাস এমন ঢিকঢিকিয়ে চলে, গন্তব্যে পৌঁছোতে দেরি হয়ে যায়। ট্যাক্সি যদিও তাড়াতাড়ি যাবে তবে সে পাওয়া যায় না; ট্যাক্সি পাওয়া যায় তো সে ট্যাক্সি আমার গন্তব্যে যাবে না। আমার গন্তব্যে যাবে, তাড়াতাড়িও যাবে অটো পাওয়া যায়, তবে বড় লাইন পড়ে; লাইন দিয়ে এসে যাও বা ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল, ‘দিদি খুচরো দেবেন কিন্তু’। খুচরো না থাকলে? বলা যায় না, হয়ত মারধোরও খেয়ে যেতে পারেন। ভাগ্য অতোটা খারাপ না হলেও চালকের চোখরাঙ্গানিতেই ছাড় পাবেন। এর থেকে ভালো কিছু কেউঈ আশা করেন না।
আমি অবশ্য এ কদিন বাসেঈ চড়ছি, কিন্তু আদতে কলকাতা আর আমার রোজকার শহর নয়; বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছি, সুতরাং নিজের পার্স খোলার দরকার পড়ছে না তেমন; কাজেই বাসে উঠে প্রায় দিনই একশ/পঞ্চাশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিচ্ছি। বেশিরভাগ সময়েই পরিচালক-দাদার বিরক্ত মুখ দেখতে হয়। সাধারনত বিকেলের দিকেই চেষ্টা করি, কাচুমাচু মুখ করে ‘দাদা, সারাদিন তো খুচরো পেয়েছেন, একটু যদি দয়া করে…”। সেদিন যেমন দেখলাম পরিচালক দাদা পকেট থেকে বের করে গোছা গোছা খুচরো নোট গোনা শেষ করে ভাড়া চাইতে এসে অম্লানবদনে বললেন “খুচরো নেই”। কথা বাড়াইনি। মনটা ভার হল একটু। পকেটে থাকতেও মিছে কথা! জানি অবিস্যি খুচরো পয়সার একটা সমান্তরাল বাজার আছে, যাদবপুর থানার সামনে দেখেছি গাদা গাদা রেজগি সাজিয়ে বসে থাকতে, দর শুনেছি। ৮৫ টাকার কয়েন/১০০ টাকা। যাকগে মন খারাপ হলেও কিছু করার নেই, বাস্তব সমস্যা হল আর ৩/৪ তেই দশটাকার নোট থাকল, কালকে সকালে আবার ভাঙ্গানোর চেষ্টা করতে হবে।
পরের দিন সকালে প্রথম বাস টাতেই চেষ্টা করে যথারীতি বিফল হলাম, আরও একটা দশ টাকার নোট ফুরল তার মানে। দ্বিতীয় বাসের ভাড়া চোদ্দ টাকা। ১০০ টাকাটা বাড়িয়ে দিতেই পরিচালক দাদা নোটটা নিয়ে নিলেন, আনন্দে মনটা ভরে গেল, অনুভব করলাম ডাক শুনে যখন মা কালী বেড়া বান্ধতে এয়েছিলো রামপ্রসাদের মনের অবস্থাটা কি হয়েছিল। বুদ্ধি করে একটা সেলফি তুলে রাখলে আপনাদের দেখাতে পারতাম ভগবান নিজে হাতে প্রসাদ খেয়ে গেলে ভক্তের কি অবস্থা হয়। তখন অবিশ্যি সেলফি তোলার থেকে জরুরি কাজটা মনে পড়ে গেল; বললাম “দাঁড়ান দাদা, ৪ টাকা খুচরো দিচ্ছি।” জবাব পেলাম “লাগবে না, আমার কাছে আছে তো, দিচ্ছি!!!” … স্বপ্ন দেখছি নাকি, এও হয়!! কলকাতা শহরে বাস কন্ডাক্টর খুচরো দিতে বিরক্ত বোধ করছেন না, ঝাঁঝিয়ে কথা বলছেন না। এই দুনিয়ায় ভাই সবি সম্ভব। আর সম্ভব বলেই না আমরা বেঁচে আছি, ভালো আছি। কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও কখনো না কখনো একটু ভালো হয়ে ওঠে। তাই তো এ কলকাতা, বা শুধু কলকাতাই বা কেন, এ বিশ্ব আজও বাসযোগ্য। পাঠক কি বলেন।

খুচরো ভালো লাগা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments