আমাদের আশেপাশেই আছে অনেক অনেকগুলো খুদে জগত। তাদের বাসিন্দারাও খুদে, আপনি আপিস যাওয়ার সময় যতটা দূর যান, এদের অনেকে সারা জীবনেও অদ্দুর গিয়ে উঠতে পারেনা। এতই ক্ষুদ্র এদের জগত, যে আমরা এদের পাত্তাও দিই না নিতান্ত বেগতিকে না পড়লে। কিন্তু যদি কোনোভাবে জুম করে এদের জীবনটা চোখের সামনে এনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে দেখবেন এরাও আমাদেরই মত, সুখ দুঃখের মধ্যে দিয়ে অবিরাম গেয়ে চলেছে বেঁচে থাকার গান। 

মাস কয়েক আগে ক্যামেরায় ম্যাক্রো ছবি তোলা শেখার আগ্রহে কিছু পোকামাকড়ের ছবি তুলতে শুরু করেছিলাম। ওয়াইল্ড লাইফ ফোটো তুলতে গেলে স্কিল থাকুক বা না থাকুক, অধ্যবসায় আর ধৈর্য না থাকলে চলে না। এটা যাঁরা এই ধরনের ছবি তুলে থাকেন তাঁরা হাড়ে হাড়ে জানেন। সেই চক্করেই এদের ছবি তুলতে গিয়ে এদের অনেক কাছ থেকে দেখলাম বলতে পারেন, চিনলাম অনেক। দেখলাম কি অসাধারণ সব স্বভাব এদের, নানারকমের আশ্চর্য জীবনযাত্রা, টিকে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় অদ্ভুত সব ক্ষমতা।  যা শিখেছি, জেনেছি, কিছুটা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, কিছুটা পড়াশুনা করে। তবু এই বিষয়ে আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই, এদের বেশিরভাগের নামই জানি না, তাই বেশি জ্ঞান ফলাবনা। তার বদলে স্রেফ কিছু ছবি দেখাব। ফাঁকে ফাঁকে এক আধটা গপ্প বলা যাবে খন।

ছবিগুলি সবই আমার বর্তমান নিবাসের কাছে, অর্থাৎ নর্থ ক্যারোলিনার বিভিন্ন অঞ্চলে তোলা। তার কারণ আর কিছুই না, এই ক্যামেরাটি আমার হস্তগত হবার পর আমি দেশে আসিনি বললেই চলে। ছোটবেলায় গোপাল ভটচাজের কিছু বই পড়ে এবং পিঁপড়ে দের নানারকম মজার আচরণ দেখে পোকামাকড়দের প্রতি বেশ আকৃষ্ট হয়েছিলাম মনে পড়ে। ওদের খুঁটিয়ে লক্ষও করতাম সু্যোগ পেলেই। তবে ছবি তোলার অভ্যাস তখন ছিল না, এবং ছবি তোলার অভ্যেস হবার পরও ভাল ক্যামেরার অভাবে এ চেষ্টা করিনি। এই প্রথম প্রয়াস আপনাদের ভাল লাগলে পরের বার আরও গপ্প সহ ফিরে আসব নাহয়। স্থানসঙ্কুলানের জন্য কিছু ছবি ছোট আকারে দিতে হল। ছবিগুলি ভাল করে দেখতে গেলে ওর ওপর ক্লিক করে বড় করে দেখতে পারেন।

আশেপাশে অনেককেই দেখি কুকুরছানা দেখে "ও মা কি কিউট" বলেন, নিজেদের পশুপ্রেমী বলে দাবি করেন, অথচ তাঁরাই আবার পোকামাকড়, পিঁপড়েদের বিনা কারণে পিষে মারেন। এই বৈষম্য কেন? এঁরা কি আদতেই পশুপ্রেমী, নাকি সুন্দর দেখতে কুকুরছানার চেহারার কিউটনেসটাই কেবল পছন্দ এঁদের? এঁরাই যে ভাল দেখতে মানুষদের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্ব করবেন তাতে আর আশ্চর্য কি?  নারায়ণ সান্যালের না মানুষের পাঁচালীতে পড়েছিলাম সেই মানুষটির কথা যখন কুমিরে পাখির ছানা খেয়ে ফেললে তিনি রেগে গিয়ে কুমিরটাকে গুলি করতে যান, আর তারপরই তাঁর মনে হয় এটা অযৌক্তিক। খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক তো জীবজগতেরই নিয়ম। একটু আগে যখন ওই পাখিগুলোই পোকামাকড় খুঁটে খাচ্ছিল তখন তো তিনি পাখিগুলোকে মারতে ছোটেননি, সেই পোকার মায়েদের কান্না শোনা যায়না বলেই কি? অত্যন্ত সত্যি কথা। ফড়িং এর পিছনে কাঠি গুঁজে দিলে তার কিরকম লাগে সেটা আমরা শুনতে পাইনা বলেই কি করি সেটা? নাকি জেনেশুনেই করি এই স্যাডিস্টিক কাজ? অনেককে নস্টালজিকভাবে এও বলতে শুনেছি "আহা কি সুন্দর ছিল সেই ফড়িং এর পিছনে কাঠি দেবার দিনগুলি…"

এঁদের পশ্চাদ্দেশে জাপানি বাঁশের অনুপ্রবেশ ঘটুক এই কামনা করি।

যাহোক, প্রথমে দেখাই কিছু সুন্দর দেখতে পোকামাকড়। বীটল জাতীয় পোকা এবং আরও কিছু পোকার গায়ে দেখা যায় শক্ত পিঠের বর্ম এবং তার ওপর নানারকম রঙের কারুকার্য। ছোটোবেলায় কাচ পোকাদের দেখে মুগ্ধ হতাম। অনেকে সেই কাচ পোকাদের খোলস সংগ্রহও করত। এই ধরনের পোকারা সাধারণত অত্যন্ত নিরীহ হয়। তবে বাগানের গাছপালা খেয়ে নষ্ট করে ফেলে বলে অনেক সময় এদেরকে পেস্ট আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। গ্রীন জুন বাগ এবং জাপানীজ বীটল এই ধরনের ক্ষতি করে থাকে।

বালির পোকা, সমুদ্রসৈকতে তোলা

 

       

 

গ্রীন জুন বাগ

 

জাপানীজ বীটল

 

   

উপরের দুটি ছবির মধ্যে বাঁদিকেরটির কথা বিশেষ ভাবে বলব। ছবিতে কতটা বোঝা যাচ্ছে জানিনা, সূর্যের আলো পড়লে এদের চকচকে পিঠটা দেখে মনে হয় সোনার ঢাল! অথচ আলো না পড়লে এরা এমনভাবে শুকনো পাতার সঙ্গে মিশে থাকে যে চোখেই পড়েনা। ডানদিকের পোকাটির নাম আমার অজানা, কিন্তু খুব দেখা যায় এদিক ওদিক।

 

ফোটিনাস

 

উপরের এই পোকাটা চেনা চেনা ঠেকছে কি?
অন্ধকারে এদের জ্বলা নেভার ছন্দ দেখতে ভালবাসি আমরা সবাই। ভারতবর্ষের জোনাকিরা অবশ্য একটু অন্য প্রজাতির, তবে গড়নটা একই রকম। তবু বেশিরভাগ লোকই হয়ত ছবিটা দেখে একনজরে চিনতে পারবে না।
নর্থ ক্যারোলিনায় এই ফোটিনাস প্রজাতির জোনাকিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। জোনাকিরা যে নিজেদের মধ্যে আলো জ্বলা-নেভার ভাষায় কথা বলে এটা সকলেই জানেন। এর প্রধান কাজ হল মেটিং সীজনে বিপরীত লিঙ্গের প্রাণীটিকে আকৃষ্ট করা। অনেকটা এই ফোটিনাস এর মতই দেখতে আরেক প্রজাতি ফোটুরিস কিন্তু আরেক রকম উদ্দেশ্যে ব্যাবহার করে এই সিগন্যাল। এদের মধ্যে একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ফোটিনাস প্রজাতির জোনাকির আলো জ্বলা-নেভার ছন্দ হুবহু নকল করার। এইভাবে মেয়ে ফোটিনাস দের আলোর ছন্দ নকল ক’রে ফোটুরিস প্রজাতির মেয়ে জোনাকিরা ছেলে ফোটিনাস জোনাকিদের আকৃষ্ট করে, এবং তারপরে তাদের স্রেফ মেরে খেয়ে ফেলে। (মেয়েরা চিরকালই ছলনাময়ী…)
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আরেক কাঠি উপরে উঠে মেয়ে ফোটুরিস দের এই অভ্যাসকে ব্যাবহার করে ওই প্রজাতিরই ছেলে জোনাকিরা। যখন ছেলে ফোটুরিস-রা তাদের যৌনসঙ্গী জোটাতে পারেনা, তখন তারা ছেলে ফোটিনাস দের আলোর ছন্দ নকল করতে থাকে। তাই দেখে পেটুক কোনও মেয়ে ফোটুরিস ছুটে এলে তখন ছেলে ফোটুরিস-টি তার সঙ্গে যৌনমিলনে আবদ্ধ হয়।
কি ভাবছেন? ফোটুরিস-রা খুব চালাক আর ফোটিনাস-রাই মাথা মোটা? তাহলে শুনুন আরেক আজব ঘটনা। বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন কখনও কখনও ছেলে ফোটিনাস-রাও হুবহু নকল করতে পারে মেয়ে ফোটুরিস-দের আলোর ভাষা। তাতে লাভ? নিজে মেয়ে ফোটুরিস সেজে তারা নিজের প্রজাতিরই ছেলেদের ভয় পাইয়ে ভাগিয়ে দেয়। ফলে যৌনসঙ্গী খোঁজার কম্পিটিশনে তার কম্পিটিটর এর সংখ্যা যায় কমে, অনেক সহজে সে খুঁজে পেতে পারে তার মনের মানুষ, থুড়ি… মনের জোনাকিকে…

 

ভয়ংকর সুন্দর

 

গ্যালাক্সি নয়, মাকড়শা এবং তার জালে আটকে যাওয়া অগুন্তি পোকামাকড়

  

সেই পোকামাকড়ের দল থেকে বেশ ফ্রেশ দেখে একটি বেছে নিয়ে ভক্ষণ

 

লাল মাকড়শা

 

নীচের ছবিগুলি যে পতঙ্গের সেটা বোধহয় সবারই প্রিয়। রংবেরঙের এই প্রজাপতিরা যেকোনো বাগানের শোভা। বেশি কিছু বলার দরকার নেই এদের সম্পর্কে।

 

 

 

 

 

  


  

  

  

  

 

 

এবার দেখাই কিছু পোকামাকড় যারা বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিচারে উপরের দলের ধারেকাছে আসতে পারবেনা। কিন্তু সত্যিই কি এরা অসুন্দর?

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির

 

  

  

শেষ ছবিটি প্রসঙ্গে – এটি একটি হলদে ঝিঁঝিপোকা। ঝিঁঝিপোকার ডাক প্রচুর শুনেছি। দেখেওছি ওদের তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে। কিন্তু চোখের সামনে ওদের ডানা কাঁপিয়ে আওয়াজ বার করতে আগে দেখিনি। এই মক্কেল আমায় ডিটেইলস এ ডেমো দিয়ে দেখিয়েছিল। সাধারণত এরা নিচু ঝোপেঝাড়েই থাকে বেশি। আমায় দেখানোর সুবিধের জন্যেই বোধহয় গাছের ফাঁকা ডালে চড়ে বসে দেখিয়েছিল ওর কেদ্দানি।

প্রজাপতি ছাড়া আরেকটি পতঙ্গের রূপ দেখে বারবার মুগ্ধ হয়েছি। ফড়িং। তাদের গায়ে, পাখায় যে কতরকমের কারুকার্য হতে পারে, খুঁটিয়ে না দেখলে সবসময় চোখে পড়েনা। তাদের কয়েকজনের ছবি এখানে দেওয়া গেল। পাঁচ নম্বর ছবির ফড়িং-এর শিকার ধরার দৃশ্য তুলতে পেরে বেশ খুশি হয়েছিলাম।

এ স্টাডি ইন স্কারলেট

 

 

 

 

শিকারী ফড়িং

 

রিপ্লেসমেন্ট

(উপরের ফড়িংটি ধেয়ে আসছে নিচেরটিকে স্থানচ্যুত করে নিজের পছন্দের কাঠির ডগাটি দখল করতে)

 

হেলমেটের কারুকার্য


ডানা ছাড়াও দেখুন এর পিঠের ডিসাইন

 

বিশালকায় ফড়িং

 

 

   

 

ফড়িং দের ডেটিং

উপরের এই ছবিটি পুকুরপাড়ের একটি কমন ছবি। ফড়িং এবং ড্যামসেলফ্লাইরা উড়তে উড়তেও মেটিং করতে পারে। মেটিং এর সময় এরা একে অপরের সঙ্গে ইন্টারলকড হয়ে একটা রিং এর মত গঠন তৈরি করে। এই ছবিটি সেই মেটিং এর আগে বা পরের দৃশ্য। তাই একে আমি বলেছি "ডেটিং"। একে অপরের হাত ধরে বেড়াতে বেরিয়েছে যেন। নিচের ছবিটিতে দেখুন ইন্টারলকড অবস্থায় থাকা দুটি ড্যামসেলফ্লাই কে। এদের দেহটা কাঠির মত হলে কি হবে, রঙের বাহারের দিক থেকে এরাও কিছু কম যায়না।

 

ড্যামসেলফ্লাই দের ডেটিং

 

লাল ড্যামসেলফ্লাই

 

নীল ড্যামসেলফ্লাই

নিচের সিলুয়েট দুটি দেখে সাদাকালো মনে হলেও এগুলি কিন্তু ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট মোডে তোলা নয়। আলো আঁধারির খেলায় রঙগুলো সব হারিয়ে গেছে। কিন্তু সৌন্দর্যটা বোধহয় হারায়নি। কি বলেন?

ড্যামসেলফ্লাই

 

শুঁয়োপোকা

 

নিচের পোকাটিকে দেখে একনজরে ভয় ভয় লাগলেও আসলে এরা খুব মজাদার একটি প্রাণী। গ্রীষ্মকালে ঝিঁঝির ডাকের সঙ্গে সঙ্গে এদের যে ডাক শোনা যায় তা কিন্তু ঝিঁঝির মত ডানা ঘষে ঘষে তৈরি হয়না। এদের পেটের তলায় একপ্রকার প্রত্যঙ্গ থাকে যার সাহায্যে এরা তলপেটের মেমব্রেনকে ভাইব্রেট করে এই আওয়াজ সৃষ্টি করে। অনেক সিকাডা একসঙ্গে এই গান ধরলে কার সাধ্যি সেই আওয়াজকে ইগনোর করে! পুরুষ সিকাডারা এই ডাক ডাকে যথারীতি মেটিং কল হিসেবেই। কিন্তু মেটিং এর পর কি হয় সেখানেই অপেক্ষা করে আছে আসল আশ্চর্য। সদ্যজাত সিকাডার ছানারা চলে যায় মাটির নিচে। সেখানে নিম্ফ অবস্থায় কাটায় বছরের পর বছর। নর্থ ক্যারোলিনা অঞ্চলে যে সিকাডাদের দেখা যায়, তারা মাটির নিচে কাটায় জীবনের প্রথম ১৭ বছর! তারপর দল বেঁধে বেরিয়ে আসে একসঙ্গে। ১৯৯৬ এর পর এই ২০১৩ সাল ছিল কোটি কোটি সিকাডাদের দল বেঁধে বেরিয়ে আসার বছর। গ্রীষ্মকালে রাতের দিকে যেকোনো গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ালে এদের শব্দে কান পাতা দায় হত। এমনকি ভর দুপুরেও এদের অনেকে চালিয়ে যেত তাদের সঙ্গীতসাধনা!

সিকাডা

ভ্রমর

 

ফুলবনে ভ্রমরদের দেখা যায় সারাক্ষণই। সাইজে বেশ বড়, এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে বেড়ায়, আর সেইসঙ্গে শোনা যায় গুনগুন আওয়াজ। এদের উড়ন্ত অবস্থার ছবি ক্যাপচার করার চেষ্টা করতে গিয়ে নিচের দুখানি ছবি তুলেছিলাম।

 

 

শেষ করার আগে দুটি খুব কমন পোকার ছবি দিই। এই মাছি বা লালপিঁপড়ে আমাদের অতি পরিচিত। অনেক সময় বিরক্তির উদ্রেকও করে থাকে। কিন্তু একটু খেয়াল করে যদি দেখেন পিঁপড়েদের জীবনযাত্রা, তাহলে দেখবেন ওদের থেকে আমাদের কত কি শেখার আছে। পিঁপড়েদের কর্মসংস্কৃতি মানুষের চেয়ে (অন্তত বাঙ্গালীর চেয়ে তো বটেই) অনেক উচ্চদরের। তাদের থেকে শিক্ষা নিলে আখেরে আমাদের উপকারই হবে।

এই মাছি এবং পিঁপড়ে দুজনেই জঙ্গুলে। সাইজেও বেশ হৃষ্টপুষ্ট!

পাতে পড়ল মাছি

লাল পিঁপড়ে

সূর্যাস্তের আলো গায়ে মেখে পোকার দল

 

 

** এই লেখার কিছু কিছু অংশ পূর্বে অন্যত্র প্রকাশিত।

*** সমস্ত ছবি আমার ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস ক্যামেরায় তোলা।

 

 

 

খুদে জগতের বাসিন্দারা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments