শ্রীখণ্ড ষ্টেশনে নেমে এবড়োখেবড়ো একটা চওড়া মেঠোপথ মাইল দুয়েক একেবেকে গিয়ে সোজা গ্রামে ঢুকে গেছে। ষ্টেশন থেকে সেই পথ ধরে মিনিট পাঁচেক এগোলেই ডানদিকে আরও একটা সরু মেঠোপথ এঁকেবেকে মুসলমান পাড়ার বুক চিরে, ঝাঁপানতলার বুড়ো তেঁতুলগাছটাকে পেছনে ফেলে, সারিসারি তালগাছে ঘেরা ঢলঢল কালোজলে ভরা ঘোষাল পুকুরকে পাশ কাটিয়ে সোজা গিয়ে মিশেছে বড়ডাঙ্গার মাঠে। ছোটবেলাতে দিদুর কাছে যখনই তেপান্তরের মাঠের গল্প শুনতুম প্রতিবারই শুনতে শুনতে কল্পনায় তেপান্তর আর বড়ডাঙ্গা মিলে মিশে এক হয়ে যেত। ষ্টেশনে নেমে বাড়ি যাওয়ার পথ ধরতেই নিজের অজান্তেই কখন যে মুসলমান পাড়ার ওই সরু রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে পরতুম তা বুঝতেও পারতুম না। চওড়া রাস্তা থেকেই দেখা যেত অনেক দুরের মইনুল-রহিমদের খড়ের চালের মাটকোঠা আর তার ঠিক পেছনেই মসজিদের গম্বুজও। রহমত চাচার খেজুর গাছে ঘেরা বেড়ার ঘরটা চোখে না পরলেও পৌষ পরতে না পরতেই অত দুর থেকেও ভেসে আসতো খেজুর রসে জ্বাল দেওয়ার নেশা ধরিয়ে দেওয়া গন্ধ।

শীতের বিকেলটা বড্ড ছোট। জোড়াতালতলার মাঠ জুড়ে সদ্য খেত থেকে কেটে আনা অসংখ্য ধানের পালার মাঝে মাঝে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অলি গলিতে লুকোচুরি খেলতে খেলতেই হঠাৎ ঝুপ করে সন্ধ্যে নামলো। বাড়ি ফিরলেই ধুলোমাখা চেহারা দেখলেই কপালে নির্ঘাত ঠাকমার টিপ্পনী,
- “ওই এলেন রাজার বেটা চাষা!”
বলেই হয়তো হিড়হিড় করে টানতে টানতে কূয়োতলায় নিয়ে গিয়ে এই হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় মাথায় ঢেলে দেবে এক বালতি জল। সুতরাং এক দৌড়ে মামার বাড়িতে দিদুর নিশ্চিন্ত প্রশ্রয়ের আড়ালে। হাতমুখ ধুয়ে সোজা দিদুর হেঁসেলে। কুলুঙ্গিতে জ্বলা টিমটিমে হারিকেনের আলোয় দিদুর রান্নাঘর জুড়ে আলো আধারিতে ঢাকা অদ্ভুত এক আবছা প্রসন্নতা। তিন চুল্লিওয়ালা মাটির উনুনের সবথেকে বড় চুল্লিতে একটা বড় হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটছে ভাত আর পাশের ছোট চুল্লিতে ফুটছে সদ্য দুইয়ে আনা গরুর দুধ। কাঠের পিঁড়িতে উবু হয়ে বসে দিদু একহাতে টিমমটিম কর জ্বলতে থাকা লম্ফ ধরে অন্য হাতে হাতা দিয়ে হাঁড়ি থেকে ভাত তুলে দেখছে সেদ্ধ হতে আর কত দেরি। টিমটিমে লম্ফর আবছা আলোয় দিদুর কুঁচকে যাওয়া মুখের চামড়ার প্রতিটি রেখায় যেন চুইয়ে পরছে অসীম ক্লান্তি, অথচ ঠোটে ঝুলছে সেই পরিচিত হালকা হাসি আর দু’চোখ জোড়া সেই ঘোষাল পুকুরের শীতল গভীরতা, যার দিকে দু’দণ্ড তাকিয়ে থাকলেও শরীরে-মনে বয়ে যায় অনাবিল শান্তি। পা টিপেটিপে গিয়ে দিদুর একেবারে পাশে একটা পিঁড়ি টেনে বসলুম। শুধু দিদুর সাহচর্যই নয়, আসলে ফুটন্ত দুধে গোবিন্দভোগ চাল আর খেজুর গুড়ের পাটালি পরবে কিনা সে ব্যাপারে অনুসন্ধানের লোভই বোধহয় এই অসময়ে দিদুর হেঁসেলে আমার আসার আসল কারণ। দিদুর পাশে পিঁড়িতে দিদুর মতই উবু হয়ে বসে লোভী গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলুম,
- “পায়েস করছ?”
মিষ্টি হেসে দিদু বলল,
- “না রে আজ নয়! রহমত কাল খেজুর গুড়ের পাটালি দিয়ে যাবে, কাল পায়েস করবো…”
অগত্যা বিফল মনোরথে দিদুর হেঁসেল থেকে বেরিয়ে ফের রাস্তায়। ধানুদার মিষ্টির দোকানের প্রকাণ্ড উনুনে কালো রঙের বিশাল লোহার কড়াইয়ে খেজুর গুড়ের রস ফুটছে। কাঠের বড় বারকোশে ছোট ছোট টেবিল টেনিস বলের মত প্রচুর ছানার গোল্লা, ফুটন্ত লালচে রসে পরলেই লালচে রঙের গুড়ের রসগোল্লা, যার গন্ধে জিভের জল আটকে রাখা মুশকিল। পকেট হাতড়ে অনেক দিনের জমিয়ে রাখা গোটা কতক কয়েন থেকে একটা এক টাকার কয়েন ধানুদার হাতে দিয়ে বললুম,
- “দুটো গুড়ের রসগোল্লা দাও! রসটা বেশি করে দিও!”
একটা শালপাতাকে মুড়িয়ে ফানেলের মত ঠোঙা বানিয়ে অনেকটা রস সমেত দু’টো রসগোল্লা দিতেই আস্ত একটা মুখে দিয়ে পা বাড়ালুম বাড়ির দিকে। বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে বাকি রসগোল্লাটা তো বটেই চুমুক দিয়ে রসটুকু এমনকি শালপাতাটা কয়েকবার চেটে ফেলেও দিয়েছি। বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে মনে হল রসগোল্লার রস হাতের চেটোতেও কয়েক ফোঁটা পড়েছে। হাতের চেটোতে বার কয়েক জিভ বোলাতেই চ্যাটচ্যাটে ভাবটা উধাও।
ঠাকমার হাতের ডাল আলুপোস্ত আর মাছভাজা দিয়ে ভাত খেয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কাঁপুনিটা যেন হঠাৎ বেড়ে গেল। চারভাই একসঙ্গে ঢুকে গেলুম গরম লেপের আদরে। আমার বড় দুভাই দুই প্রান্তে লেপের পর্যাপ্ত দখলদারির লড়াইয়ে মেতে গেল আর আমরা ছোট দুভাই চোখ বুজলুম নিশ্চিত লেপের আশ্রয়ে।

********

গত রাতে শুয়ে শুয়েই কানে কানে ফিসফিস স্বরে বরুর সঙ্গে গোপন পরিকল্পনাটা করাই ছিল। বরুই ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে তুলে দিল অনেক ভোরে। বুঝতে পারছি না এখনও রাত কিনা। গায়ে ফুলসোয়েটার আর মাথায় বাঁদর টুপি গলিয়ে দু’জনে খুব সন্তর্পণে দরজার লম্বা খিল খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলুম। আসার সময় খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে চলকে ঢুকে আসা চাঁদের আলোয় লক্ষ করলুম বড়দা আর ছোটভাই কিছুই টের পায়নি, কুঁকড়ে শুয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ঘরের দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে ফুটফুটে চাঁদের আলো মাখা কুয়াশার চাদর সরিয়ে উঠোন পেরিয়ে খিড়কীর দরজা খুলে মধুপুস্কুনির পাড় ধরে সোজা গিয়ে পরলুম চওড়া রাস্তায়। শুনশান রাস্তা, মানুষজন তো দুরের কথা প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় রাস্তার কুকুরগুলোও আশ্রয় নিয়েছে গৃহস্থের বারান্দা অথবা সিংহবাহিনীর মন্দিরের দালানের এক কোনে। একেবারে হাড় কাঁপানো কনকনে ঠাণ্ডায় দাঁতের দুই পাটিতে নিজের ইচ্ছে মত অবিরাম বেজে চলেছে দাদরা অথবা কাহারবা। চওড়া রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়েই বাঁদিকের সরু রাস্তাটা ধরে একেবারে এসে থামলুম খেজুর গাছে ঘেরা রহমত চাচার বেড়ার ঘরের সামনে। দু’হাতপায়ে আঁকড়ে ধরে বরু উঠতে লাগলো খেজুর গাছে আর আমি নিচে দাঁড়িয়ে বাঁদর টুপি পরা বরুকে দেখতে লাগলুম। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, ঠিক যেন একটা আস্ত বাঁদর খেজুর গাছে চড়ছে। মুহূর্তেই বরুর নাগালে খেজুর রসে ভর্তি ছোট্ট মাটির কলসি। অদ্ভুত দক্ষতায় গাছে বাঁধা মাটির কলসির দড়ি খুলে একহাতে কলসিতে বাঁধা দড়ি ধরে ধীরে ধীরে নেমে এলো বরু। প্রায় অর্ধেক হাঁড়ি খেজুরের রসে ভর্তি। গাছ থেকে নেমে কলসিতে মুখ লাগিয়েই চোঁচোঁ করে বেশ খানিকটা রস খেয়ে আমার হাতে কলসিটা দিতেই অমিও বরুর মতই একদমে চোঁচোঁ করে বাকি রসটুকু খেয়ে খালি কলসিটা দিতেই বরুসুলভ অপকর্মটা বরু করেই বসলো। খালি হয়ে যাওয়া ফাঁকা কলসিতে পেচ্ছাব করে আমাকে বলল,
- “এই নে ধর! তুইও কর!”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাধ্য ছোটভাইয়ের মত অগ্রজের নির্দেশ পালন করে মাটির কলসিটা বরুর হাতে দিতেই, বরু আবার গাছে উঠে মাটির কলসিটাকে যথাস্থানে ঝুলিয়ে দিল। বরু গাছ থেকে নামতেই দুই ভাইয়ে চোঁচা দৌড় লাগালুম বাড়ির দিকে। ঠাকমা ওঠার আগেই ঘরে ফিরতে হবে, নইলে পিঠের হাড় কখানা আর আস্ত থাকবে না। যে পথে গিয়েছিলুম সেই পথেই ফিরে খিড়কির দরজা লাগিয়ে উঠোন পেরোতে পেরোতেই খেয়াল করলুম পূব আকাশ ফরসা হতে হতে হালকা লালচে রঙ ধরতে শুরু করেছে। চটপট ঘরে ঢুকে অন্ধকারে হাতরে হাতরে আবার যথাস্থানে পৌঁছে গেলুম। লেপের নিশ্চিন্ত গরম আশ্রয়ে পৌঁছে শুয়ে শুয়ে দু’চোখ বুজে ভাবতে লাগলুম আজ যদি রহমত চাচা কালকের খেজুর রসে গুড় বানায় আর সেই গুড়েই দিদু পায়েস রাঁধে! না:! আর ভাবতে পারছি না। দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। ঘুম চোখেই প্রতিজ্ঞা করলুম সন্ধে বেলায় কিছুতেই মামারবাড়ি মুখো হব না। জীবনে এই প্রথমবার দিদুর হাতের খেজুর গুড়ের পায়েস খেতেও ভয় পাচ্ছি……

খেজুর গুড়ের পায়েস
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments