১৯৭৩ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর। স্থান: আমেরিকার হিউস্টন শহরের অ্যাস্ট্রোডোম স্টেডিয়াম। ৩০০০০ মানুষ জড়ো হয়েছেন সেখানে একটা খেলা দেখতে। টেলিভিশনের সামনে উপস্থিত আরো কয়েক কোটি মানুষ। তাঁদের মধ্যেই একজন ক্যাথেরিন সুইটজার… দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে বসে আছে টিভি-এর সামনে। কে এই ক্যাথেরিন? ওর কথায় পরে আসছি। তার আগে দেখে নিই ওই লিজা জনসন কে। সে-ও আজ খুব উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন।বরের সাথে বাজি ধরেছে সে, ওই খেলার ফলাফল নিয়ে। ডাক্তারীর ছাত্রী হলেও লিজা খেলাধুলার দারুন ভক্ত। তার স্বামী ফ্রেডের আবার এসব ঢং একদম পছন্দ না। কোথায় ভাল করে সংসারে মন দেবে মেয়েরা, তা নয় হাজারটা অন্য কাজে আগ্রহ। ওর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াকেও সে ভালো চোখে দেখে না। লিজা চেয়েছিল এই ডিগ্রি টা হয়ে গেলে surgery তে আরো specialize করবে। সোজা না করে দিয়েছে ফ্রেড। আজকালকার মেয়েগুলো বড্ড পাকামো করে।

ক্রিস্তিন ব্রেনান নামের মেয়েটার কথাই ভাবুন না। শখ হয়েছিল খেলোয়াড় হবে। চারপাশ থেকে সব্বাই মিলে চোখ রাঙ্গিয়েছিল, বলেছিল "মেয়েদের পেশাদার খেলোয়াড় হওয়া সাজে না।" তাই রণে ভঙ্গ দিতে হয়েছে ক্রিস্তিনকে। এখন আবার সে নতুন বায়না ধরেছে সাংবাদিক হবে। ১৫ বছর মোটে বয়স, এদিকে শখের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই! এ হেন ক্রিস্তিনও আজ অধীর আগ্রহে টেলিভিশনের সামনে বসেছে খেলা দেখতে।
কিংবা ভাবুন বিলির কথা। মেয়েটা ছোট থেকেই ডানপিটে, খেলাধুলো করে বেড়াত ওর বয়সী ছেলেদের সাথে। যখন বাচ্চা ছিল বাবা মা পাত্তা দেন নি, একটু বড় হতেই তাঁরা একদিন বললেন - “পাড়ার ছেলেগুলোর সাথে তোর আর এভাবে খেলা উচিত না বিলি, বয়স হচ্ছে, এবার মেয়েদের মত আচরণ কর।" কিন্তু ডানপিটে মেয়েটা কিছুতেই রাজি না "মেয়েদের মত" আচরণ করতে। খেলোয়াড় সে হবেই! শেষে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই বাবা বললেন ঠিক আছে, ও এমন কিছু খেলুক যা মেয়েরা অল্প স্বল্প খেলে থাকে। বাবার পরামর্শেই বিলি হাতে তুলে নিল টেনিস র‍্যাকেট।
আজকের দিনে সেই মেয়েটা কি করছে? সে-ও কি বসে পড়েছে টিভি-র সামনে?নাহ, টিভি-র সামনে বসে শুধু দেখার পাত্রী নয় সে, ওই বিশাল অ্যাস্ট্রোডোমে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু আজ সে-ই…বিলি জীন কিং…খেলা থেকে অবসর নিয়ে র‍্যাকেট তুলে রাখার দিন যার পকেটে থাকবে ২০টা উইম্বলডন সহ ৩৯টা গ্র্যান্ডস্লাম খেতাব।

 

    …………………………………………………………

 

আসুন ফিরে আসা যাক সেদিনের সন্ধ্যায় ওই অ্যাস্ট্রোডোমে। বিলি জীন মাঠে ঢুকছেন ক্লিওপেট্রার ঢং-এ সোনার সিংহাসনে চেপে, সেটা বয়ে আনছে ৫টি সুপুরুষ যুবক। বিলির প্রতিপক্ষ ববি রিগ্‌স-কে নাটকীয় ভাবে একটা রথে চাপিয়ে টেনে আনছে সুসজ্জিত কয়েকজন নারী। ২৯ বছরের বিলির থেকে প্রৌঢ় ববি ২৬ বছরের বড়! ওরা মুখোমুখি হবেন এই বহুচর্চিত টেনিস ম্যাচে, যা ইতিমধ্যেই বিখ্যাত হয়ে গেছে "Battle of the sexes” নামে…কারো কারো মতে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়েoverhyped ম্যাচ।

            সত্যিই কি overhyped? ৫৫ বছর বয়সী প্রায়-বৃদ্ধ একজন পুরুষ খেলোয়াড় এবং ২৯ বছর বয়সী সদ্য উইম্বিলডন চ্যাম্পিয়ন মেয়ের মধ্যে এ হেন ম্যাচের মানেই বা কি? সবদিক থেকে অসম এরকম এক দ্বৈরথ পৃথিবীর খেলার ইতিহাসে স্থান পাওয়ার দাবি আদৌ রাখবেই বা কেন? প্রশ্ন গুলোর উত্তর পেতে হলে আগে বুঝে নিতে হবে সেই সময়টাকে। ৭০-এর দশকের গোড়ার দিক অর্থনৈতিক ভাঙ্গনে বিদ্ধস্ত আমেরিকা। তার মধ্যেও স্বমহিমায় বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূরা। তাই বিবাহিত জীবনে চরম অখুশি হওয়া সত্বেও সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে ডিভোর্সের কথা ভাবতেও পারেনা লিসা জনসন রা। খেলাধুলার জগতেও তার প্রভাব বিস্তর। একবিংশ শতকের প্রথম দশক পার হয়ে এসে আজ যখন মেয়েরাও ছেলেদের মত সব খেলায় প্রবলভাবে অংশগ্রহণ করছে, এই জায়গা থেকে আমরা ভাবতেও পারবনা কি ভীষণ লড়াই করে এই জায়গায় এসেছে তারা, কি ভীষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে ৪০-৫০ বছর আগেও। ৬০-এর দশক থেকেই লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে নারী আন্দোলন, যা পূর্ণতা পায় ৭০-এর দশকে গিয়ে। Women's liberation movement নামে খ্যাত এই আন্দোলনের প্রভাব পড়ে খেলাধুলার রাজ্যেও। যে দিনটির কথা আমরা বলছি, তার আগের বছরই (১৯৭২) লিট্‌ল লীগ বেসবল মেয়েদের গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। সে বছরই পাশ হয়েছে নারী-পুরুষ বৈষম্যবিরোধী আইন Title IX, তবে খেলাধুলো তখনও তার আওতায় আসেনি। আর ওই ১৯৭২ সালেই আমেরিকার ঐতিহ্যশালী বস্টন ম্যারাথন অফিশিয়ালি মেয়েদের অনুমতি দিয়েছে ম্যারাথনে দৌড়োবার। এই প্রসঙ্গে বলি ক্যাথেরিনের কথা। মনে আছে তো ক্যাথেরিন সুইটজার কে? ১৯৭৩ এর ২০শে সেপ্টেম্বর যে মেয়েটা চিন্তিতভাবে বসে ছিল টিভি-র সামনে? এই ক্যাথেরিনই ১৯৬৭ সালে বস্টন ম্যারাথনে নাম দেয় প্রথম কোন মেয়ে হিসেবে। ২৬ মাইলের দৌড়টা শেষ করেছিল সে, যদিও বস্টন অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন তাকে সে স্বীকৃতি দেয়নি, বরং নিয়ম করে বন্ধ করে দিয়েছিল মেয়েদের অংশগ্রহণ। দৌড় চলাকালীন ক্যাথেরিনকে ধাক্কা দিয়ে দৌড় থেকে বার করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন অফিশিয়াল-রা। আন্দাজ করতে পারেন কোন অপরাধে?…ক্যাথেরিন ছিল একজন মেয়ে, শুধুমাত্র এই কারণই যথেষ্ট ছিল তাকে ধাক্কা মেরে বার করে দেওয়ার জন্য।

খেলার জগতে মেয়েদের এই বঞ্চনা নিয়ে গোড়া থেকেই সরব ছিল বিলি জীন। সে সময় মেয়ে খেলোয়াড়রা প্র্যাকটিস করতে চাইলে তাদের সময় দেওয়া হত ভোর ৫টা বা রাত ১০টায়, কারণ অন্য সময় ছেলেদের জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। একই খেলায় ছেলেরা যা উপার্জন করত মেয়েরা তার সিকিভাগও পেত না। কারণ মেয়েদের কাছেও খেলাটা জীবিকা হতে পারে এটা ভাবতেই পারতনা কেউ। বিলি জীন বলল, মেয়েদেরও সমান অধিকার আছে উপার্জন করার। প্যাসিফিক সাউথওয়েস্ট ওপেন সে বছর পুরুষ বিভাগের চ্যাম্পিয়নকে দিচ্ছিল ১২৫০০ ডলার, আর মেয়েদের চ্যাম্পিয়নকে মাত্র ১৫০০ ডলার।বিলি ও আরো কিছু মেয়ে বিদ্রোহ করল, বলল এরকম খেতাবের জন্য লড়ার দরকার নেই আমাদের, ওরা হিউস্টনে Virginia Slims Tennis Tour নামে নিজেদের একটা টুর্নামেন্ট চালু করল। এখান থেকেই পরে WTA (Women's Tennis Association)এর উদ্ভব হয়। বলাই বাহুল্য বিলির এইরকম বাড়াবাড়ি ভাল চোখে দেখেনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ,তারা সুযোগ খুজতে লাগল ওকে হেনস্থা করার।

এমতাবস্থায় মঞ্চে আবির্ভূত হলেন ববি রিগ্‌স। ৪০-এর দশকের বিশ্বসেরা খেলোয়াড়। কিন্তু তাঁর আরো বড় পরিচয় ছিল তিনি একজন Hustler. অল্প বয়সেই জুয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে ববি বিভিন্ন জায়গায় বাজি ধরে exhibition ম্যাচ খেলে বেড়াতেন। কখনও হাতে ছাতা,কখনও সুটকেস, কখনও বা কুকুরের লেস ধরে অন্য হাতে টেনিস খেলে হারিয়েছেন বিপক্ষকে, বাজি ধরে। এভাবে বাজি জেতা আর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেশার মত হয়ে গিয়েছিল ববির। চরম নারীবিরোধী না হলেও তৎকালীন সমাজের বেশিরভাগ পুরুষের মত তিনিও মনে করতেন খেলাধুলা মেয়েদের জন্য নয়। বিলির বাড়াবাড়ি দেখে তিনি পরিকল্পনা ফাঁদলেন বিলির সাথে বাজি ধরে ম্যাচ খেলবেন। চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বললেন "যা টাকা পায় তার অর্ধেকও পাওয়ার যোগ্য ও নয় যদি এই বুড়োটাকে হারাতে না পারে"।বুদ্ধিমতী বিলি বুঝতে পারল এই খেলা থেকে তার পাওয়ার কিছু নেই,ও জিতলে লোকে বলবে একটা বুড়োর সাথে জেতায় কোন কৃতিত্ব নেই, অথচ হারলে ছিছিকার পড়ে যাবে, প্রশ্ন উঠে যাবে মেয়েদের টেনিস আর ওদের সমানাধিকার দাবি করা নিয়েও। খেলতে রাজি হল না বিলি। তখন ববি লোভ দেখালেন তৎকালীন বিশ্বের এক নম্বর মেয়ে খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ার মার্গারেট কোর্ট-কে। যে জিতবে সে পাবে ১০০০০ ডলার পুরস্কার। মার্গারেট টোপ টা গিলল, শুনলনা বিলির বারণ। তার কাছে এটা স্রেফ আরেকটা exhibition ম্যাচ। বিনা প্রস্তুতিতেই সে নেমে পড়ল খেলতে। অপরপক্ষে ববি নিজের বাজি জেতার ব্যাপারে খুব serious। তিনি ব্যায়াম করে মেদ ঝরালেন, নেশা ছেড়ে দিলেন, নিয়মিত ভিটামিন পিল নিলেন এবং প্রস্তুত হলেন ম্যাচের জন্য।
Mother's day এর দিন ম্যাচের আয়োজন করা হল। প্রচুর দর্শকের সামনে ঘাবড়ে গেল মার্গারেট, এমনিতেই সে ছিল অপ্রস্তুত, তার ওপর চতুর ববি তার দুর্বলতা ধরে ফেলে বেকায়দায় ফেললেন তাকে। রিগ্‌স ম্যাচটা জিতলেন ৬-২ ৬-১। খেলার জগতের পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠী তক্কে তক্কেই ছিল, তারা এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। বলল দেখো, বিশ্বের এক নম্বর মেয়েও গোহারান হয় ৫৫ বছরের বুড়োর কাছে। এরপর কোন লজ্জায় তোমরা সমান টাকা চাও? Sports Illustrated পত্রিকা ম্যাচটা সম্পর্কে লিখল "Mother's day massacre”।
আরও জ্বলে উঠলেন ববি রিগ্‌স। বললেন "এবার আমার উইমেন্স লিবের প্রতিভূ কিং কে চাই। আমি ওকে ক্লে, ঘাস, কাঠ, সিমেন্ট, যেকোন সারফেসে হারাব, চাই কি মার্বেলের ওপর রোলার স্কেটস পরেও। আমি এখন একজন নারী-বিশারদ!” বিলি বুঝল এবার চ্যালেঞ্জ প্রত্যাখ্যান করলে সেটা ভীরুতার পরিচয় হবে। মেয়েদের সাথে ছেলেদের ম্যাচ খেলে তুলনা করার কোন যৌক্তকতা নেই বটে, কিন্তু ওই "Mother's day massacre” সেই অন্যায্য তুলনাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এখন তাকে খেলতেই হবে। এবার আয়োজন হল আরো বড় করে। বিশাল অ্যাস্ট্রোডোম ভাড়া করা হল। ৭৫০০০০ ডলারে টিভি সম্প্রচারের স্বত্ব কিনে নিল ABC (যেখানে গোটা উইম্বলডন রেডিও সম্প্রচারের স্বত্ব তারা কিনেছিল ৫০০০০ ডলারে)।
বিলি জানত ম্যাচটার গুরুত্ব কতখানি, পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করল সে। ওদিকে ম্যাচের একমাস আগে থেকেই চলতে লাগল নানারকম জল্পনা কল্পনা। মিডিয়ার হাইপ,ববির সাজানো নানারকম নাটক, সবেতেই অংশগ্রহণ করল সে, কিন্তু প্রস্তুতিতে ঢিলে দিল না। অন্যদিকে মার্গারেটকে বিধ্বস্ত করে ববি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তিনি আর প্রস্তুতির ধার ধারলেন না। প্রচার নিয়েই ব্যাস্ত থাকলেন, আর ক্ষণে ক্ষণে কটাক্ষ করতে লাগলেন মেয়েদেরকে। বললেন “মেয়েদের উচিত প্রথমত শোবার ঘর আর দ্বিতীয়ত রান্নাঘর…এই দুটো জায়গাতেই আবদ্ধ থাকা, টেনিস খেলা ওদের জন্য নয়"।

    …………………………………………………………

 

 

সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ২০শে সেপ্টেম্বরের সন্ধে। দুই খেলোয়াড় মাঠে ঢুকলেন নাটকীয় ভাবে। ৩০০০০ দর্শকে স্টেডিয়াম পুরো ভর্তি। টিভি-র সামনে আরো চার কোটি দর্শক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ম্যাচটার। " Mother's day massacre” এর পর বেশিরভাগ লোকই বাজি ধরেছে ববির পক্ষে। সবাই অবাক হয়ে দেখল বিলি শুরু থেকেই কিভাবে নিজের স্বভাবসিদ্ধ নেট প্লে ছেড়ে বিভিন্ন কায়দায় লম্বা র‍্যালি চালিয়ে ক্লান্ত করে দিচ্ছে ববি কে। সবাই বুঝল মার্গারেটের মত অপ্রস্তুত হয়ে নামেনি বিলি। শুধু প্রথম সেটেই সে ৩৪টা winner মারল। দু ঘন্টা পর যখন ববির একটা ব্যাকহ্যান্ড আছড়ে পড়ল নেটে, তখন খেলার ফলাফল : গেম, সেট, ম্যাচ বিলি জীন কিং…৬-৪ ৬-৩ ৬-৩…ও হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি, বিলি ম্যাচটা খেলেছিল ছেলেদের ম্যাচের মত best of five sets, মেয়েদের খেলার মত best of three নয়, মেয়ে হওয়ার জন্য কোন বাড়তি সুবিধে নিতে চায়নি সে।

 

 

পরে যতবার বিলি জীন কিং কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে "Battle of the sexes” তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ম্যাচ কিনা, প্রতিবারই তিনি বলেছেন "খেলা হিসেবে একেবারেই না, কিন্তু সামাজিক দিক থেকে দেখলে অবশ্যই হ্যাঁ"। এই ম্যাচের পর মেয়েদের খেলা নিয়ে কটাক্ষ কমে যায় অনেকটাই। শুধু খেলা নয়, এর প্রভাব পড়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। এমন হয়ত নয় যে বিলি সেদিন না জিতলেwomen's lib movement ভেঙ্গে পড়ত, কিন্তু যেসব মেয়েগুলো সেদিন বিলির মুখ চেয়ে বসেছিল তাদের আত্মবিশ্বাসে একটা বিরাট আঘাত লাগত। বিলির নিজের ভাষায় "আমার মনে হয়েছিল আমি যদি জিততে না পারি তাহলে আমাদের লড়াইটা পিছিয়ে যাবে আরো পঞ্চাশ বছর। শুধু মেয়ে খেলোয়াড়দেরই নয়, সমস্ত মেয়ের আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে যাবে। তাই তাদের সবার জন্য জিততেই হত আমায়।"
সেদিন বিলি দেখিয়ে দিলেন মেয়েদের খেলাকে যে অপমান করা হয় তা কতটা মিথ্যে। কোটি কোটি দর্শকের সামনে সমস্ত চাপ সহ্য করে খেলার ক্ষমতা যে মেয়েদের আছে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন তিনি। এককথায় সেদিন বিলি জীন কিং ঝামা ঘষে দিলেন ক্রীড়াজগতের পুরুষতান্ত্রিকদের মুখে, ক্যাথেরিন সুইটজার ৬ বছর আগে যে লড়াই শুরু করেছিলেন তা পূর্নতা পেল বিলির জয়ে। ম্যাচটা দেখার পর আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন ক্যাথেরিন।আর সেই ভীতু মেয়ে লিসা? সে বুঝল সে সত্যিই বৃথাই ভয় পাচ্ছিল এদ্দিন। তার মুখে ডিভোর্সের সিদ্ধান্তটা শোনার পর স্বামী ফ্রেডের মুখটা দেখার মত হয়েছিল। আরো বছর দশেক পর লিসা জনসন হয়েছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার একজন নামকরা ব্রেইন সার্জন। ১৫ বছরের সেই ক্রিস্তিন ব্রেনান সেদিনটা সম্পর্কে বলেছিল "আমরা জিতেছি!আমরা মেয়েরা…পেরেছি!” ক্রিস্তিন ব্রেনান এ জুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক। তাঁর লেখা বেস্ট সেলার বই "Best seat in the house” যে কোন ক্রীড়াপ্রেমীর অবশ্যপাঠ্য।

শুধু লিসা বা ক্রিস্তিনই না, আরো কতজন যে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল বিলির এই জয়ে তার শেষ নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমস পরে লিখেছিল "শুধু একটা টেনিস ম্যাচে বিলি জীন কিং যা করেছেন, বহু নারীবাদী সারাজীবনেও তা করে উঠতে পারেন না।" ১৯৭৫ সালে অনেকগুলি পত্রিকা একসাথে পোল করেছিল তাদের পাঠকেরা বিশ্বের কোন মহিলার প্রতি সবচেয়ে শ্রদ্ধাশীল। বিপুল ভোটে প্রথম স্থান পেয়েছিলেন বিলি জীন কিং। পরবর্তীকালে মেয়েদের খেলার জন্য আরো অনেক কাজ করেন বিলি।Women's Sports Foundation এবং Women's Sports Magazine এর প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালে USTA National Tennis Centre যখন বিলির নামে নামাঙ্কিত হয় তখন তার উদ্বোধন করতে এসে জন ম্যাকেনরো বলেন "মেয়েদের খেলার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নাম বিলি জীন কিং"। ৬৯ বছর বয়সে এখনও এইরকম কাজ করে যাচ্ছেন বিলি…তাঁর লড়াই আজও অব্যাহত।

এ সমস্তই কেবল আমেরিকার ক্রীড়াজগত ও সেখানের সমাজের সাথেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তবু বিলির এই যুদ্ধজয়ের গল্প কি আমাদের দেশেও প্রাসঙ্গিক নয়? আজও? আজও বহু জায়গায় মেয়েরা সমান অধিকার তো দূরের কথা, বেঁচে থাকার প্রাথমিক অধিকারগুলোও পায়না। এই গল্পের মর‍্যাল এই যে সবাইকে পথে নেমে মিছিল-আন্দোলন করতে হবে এমন কোন কথা নেই। যে যেখানে কাজ করেন, নিজের কাজের মাধ্যম ব্যাবহার করেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সম্ভব। যতই সামান্য হোক সে প্রতিবাদ, কে বলত পারে, সেটাই হয়ত আরো পাঁচজনকে প্রতিবাদের ভাষা জোগাবে!

 

 

[ স্বীকারোক্তি: কিছুদিন আগে “When Billie beat Bobby” একটা ফিল্ম দেখে এই নিয়ে আগ্রহী হয়েছিলাম। লেখার কোন পরিকল্পনা ছিলনা, অনেকগুলো বই লাইব্রেরি থেকে নিয়ে পড়তে পড়তে আরও ডুবে গেলাম খেলার ইতিহাসের মধ্যে। এই বিখ্যাত ম্যাচ নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে,কিন্তু বাংলায় কোনও লেখা দেখিনি, কতজন জানেন সেই নিয়েও সংশয় আছে। সেই থেকেই লেখার প্রেরণা পাই।আপনাদের ভাল লাগলে পরের পর্বে আরো এই ধরনের লেখার চেষ্টা করব।
লিসা জনসন চরিত্রটির নামধাম আমার কল্পনাপ্রসূত, তবে চরিত্রটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়, বিলি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এরকম একটি মেয়ের কথা, যে পরে বিলি কে তার কাহিনী বলে ধন্যবাদ দিয়ে গেছিল। এছাড়া উদ্ধৃতিগুলো দেওয়ার সময় আক্ষরিক অনুবাদ না করে ভাবানুবাদ করেছি,সত্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে।]

 

তথ্যসূত্র :

1. The Autobiography of Billie Jean King
2. We have come a long way: The story of women's tennisB.J.King and Cynthia Starr
3. Game,set, match: Billie Jean King and the revolution in women's sports Susan Ware
4. Girls rule! The glory and spirit of women in sportsRappoport Ken

5. Sports Illustrated, May 21, 1973

6. The battle of the sexes Gail Collins

7. Battle of the sexes Anthony Holden
8. Wikipedia

 

***ছবিগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

খেলা যাঁদের লড়াই করা(প্রথম পর্ব)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments