জিনোম এডিটিং নিয়ে সম্প্রতি একটা সেমিনার শুনতে শুনতে খেয়াল হল খোদার ওপর খোদকারিতে কতটা এগিয়ে গেছি আমরা। জিনোম এডিটিং নিয়ে গবেষণা নতুন নয়, কিন্তু CRISPR নামক টেকনোলজির উদ্ভাবনের পর তা হয়ে গেছে অত্যন্ত সহজ এবং সস্তা। সত্যি কথা বলতে CRISPR আসার পরও হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন, তার চেয়েও উন্নত টেকনোলজিও শিগগিরই আসছে বলে শোনা যাচ্ছে।

ওপর ওপর বললে এর অর্থ আমাদের কারো জিনে কোনো গোলযোগ দেখা দিলে সেটাকে এডিট করে ঠিক করে দেওয়া যাবে হয়তো ভবিষ্যতে। অদূর ভবিষ্যতেই মানবভ্রূণের জেনেটিক গোলমাল ঠিক করা সম্ভব হবে। বংশ পরম্পরায় চলে আসা জেনেটিক অসুখ ভ্রূণ অবস্থাতেই মুছে দেওয়া যাবে এডিট করে। শুধু গোলমালই বা কেন? ধরা যাক আমরা জানতে পারলাম অমুক অমুক জিনগুলি লম্বা হবার জন্য দায়ী, তখন কোনো বাবা মা লম্বা ছেলে হোক চাইলে চট করে ভ্রূণের সেই জিনগুলো পছন্দ মত এডিট করে নিতে পারবেন, এমন দিনও আসতে পারে! ভ্রূণ অবধিও যাবার দরকার হবেনা, এমনকি শুক্রাণু বা ডিম্বাণুকেও পছন্দ মত এডিট করে নেওয়া যেতে পারে।

এই প্রযুক্তি নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের অন্যতম জেনিফার ডুডনা এসেছিলেন ওই সেমিনারে টক দিতে। অত্যন্ত অমায়িক ভদ্রমহিলা। তাঁর সঙ্গে সেমিনার রুমের বাইরে কথা বলেও ভালো লাগল, জানতে পারলাম অনেক কিছু। জানতে পারলাম চিকিৎসা শাস্ত্রের ভবিষ্যত সম্ভাবনার কথা, আবার সেই সঙ্গে বিজ্ঞানীদের কিছু আশঙ্কার কথাও!

এই ধরনের টেকনোলজি জেনেটিক অসুখের, বিশেষ করে জন্মগত অসুখের, চিকিৎসায় নতুন দিশা দেখাতে পারে। আবার অন্য প্রাণীর দেহ থেকে অঙ্গ ট্রান্সপ্লান্ট করাও সম্ভব হতে পারে এর দৌলতে। জীববিজ্ঞানী এবং ডাক্তাররা আগেই ভেবেছেন যে অন্য প্রাণীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মানবদেহে ট্রান্সপ্লান্ট করা যায় কিনা। এখনও অবধি উত্তর হল – না, যায়না। অনেক আশঙ্কা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় যেটা, তা হল অন্যান্য প্রাণীর জিনগত গঠন সম্পূর্ণ আলাদা, তাই সেটা আমাদের দেহের সঙ্গে খাপ খাবেনা। জিনোম এডিটিং টেকনোলজি সফল হবার পর কিন্তু কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করছেন যে ট্রান্সপ্লান্ট এর আগে এই ধরনের এডিটিং এবং আরো কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে এই ট্রান্সপ্লান্ট করা সম্ভব হলেও হতে পারে! অন্য প্রাণীর থেকে করা সম্ভব না হলেও অন্য মানুষের থেকে ট্রান্সপ্লান্ট এর সময়ও এই টেকনোলজির ব্যবহার করা যেতে পারে।

কিন্তু খারাপ দিক কি কিছু নেই? আজেবাজে লোকের হাতে পড়লে এর ভয়ঙ্কর ফল হতে পারে। যুদ্ধ করার কৌশলই বদলে যেতে পারে এই ধরনের টেকনোলজির হাত ধরে। ইতিমধ্যেই ব্যবসায়ীরা উঠে পড়ে লেগেছেন এই গবেষণার দখল নিতে। নিয়ন্ত্রিত আকারে বাজারে এসে গেছে জিনোম এডিটিং টুল এডিটাস। গবেষণা ভালো করে শেষ হবার আগেই যত্রতত্র বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ হতে থাকলে কিন্তু তার ফল বিপজ্জনক হতে পারে। ধরুন মানবভ্রূণের জিনোম এডিট করতে গিয়ে কিছু ক্ষতিকর দিক জানা গেল পরবর্তীকালে, সেই ক্ষতি কিন্তু শুধু সেই ব্যক্তিটিরই হবেনা, হবে সমস্ত ভবিষ্যত প্রজন্মের। সেই ক্ষতি যদি রিভার্সিবল না হয়? তখন?

তাই জিনোম এডিটিং এর এথিকাল দিক নিয়ে এখনও প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। কতটুকু গবেষণা করা যাবে, কতটুকু না, সেই নিয়ে নানান দেশের নানা আইন।  চীনে ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা অনেক এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছেন বলে দাবি। চীন এই ধরনের এথিক্সকে একটু কমই গুরুত্ব দেয় সাধারণত, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব এখনও একমত না কতটুকুর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। গতকালই ব্রিটেন অনুমতি দিয়েছে মানবভ্রূণের ওপর গবেষণা চালানোর।

যা দিয়ে শুরু করেছিলাম। খোদার ওপর খোদকারি! জেনিফার মজা করে বলছিলেন এ যেন এমন যে জিনোম এর সিকুয়েন্স লিখতে গিয়ে ঈশ্বর কিছু টাইপো করে ফেলেছেন, আমরা তার প্রুফ দেখে সেই টাইপো ঠিক করছি। ঈশ্বরের বানানো এই দুনিয়ায় (অবিশ্বাসীরা পছন্দ মত পালটে নিয়ে পড়ুন) অনেক ইমপারফেকশন আছে, এ কথা প্রায় সবাই স্বীকার করবেন। এই প্রসঙ্গে জর্জ কার্লিনের একটা শো থেকে কোট করার লোভ সামলাতে পারছিনা –

“Something is wrong here. War, disease, death, destruction, hunger, filth, poverty, torture, crime, corruption, and the Ice Capades. Something is definitely wrong. This is not good work. If this is the best God can do, I am not impressed. Results like these do not belong on the résumé of a Supreme Being. This is the kind of shit you'd expect from an office temp with a bad attitude. And just between you and me, in any decently-run universe, this guy would've been out on his all-powerful ass a long time ago.”

কেউ বলেন ওই খুঁতগুলো জরুরি, ওগুলো ইচ্ছে করেই করা। আবার একদল সেই খুঁতগুলো মেরামত করতেই সারা জীবন কাটিয়ে দেন। এই বিতর্কের মধ্যে ঢুকবনা। তবে ওই দ্বিতীয় দলের প্রাণপাত করে বানানো জিনিসগুলো যখন আমরা হরদম ব্যবহার করে চলেছি সুখে থাকার জন্য, আরো ভাল করে, আরো বেশি বাঁচার জন্য, তখন খোদার ওপর খোদকারিকে নিন্দা করি কোন মুখে!

তা খোদার ওপর খোদকারি তো মানুষ করে আসছে সেই কবে থেকেই। ঘরবাড়ি বানানো থেকে শুরু করে রোগের চিকিৎসা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, পেসমেকার, অনেক দূরই এগিয়েছি আমরা। তবে প্রাণের মূলে যা আছে, সেই জায়গায় গিয়ে এডিট করতে পারা এই খোদকারির লিস্টিতে নিঃসন্দেহে একটা বড়সড় সংযোজন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন আমাদের প্রতিটা অ্যাকশনই নাকি ঈশ্বরের ইচ্ছা। আমাদের নিজের ইচ্ছা বলে আসলে কিছুই নেই। সেই তত্ত্ব মানলে এসবই “তাঁর” ইচ্ছা। তাই আর বেশি ভেবে লাভ নেই। তবে কিনা ভাবব কি ভাববনা সেটাও তো তিনিই ঠিক করে দেন… তাহলে?

সত্যজিত রায় ফেলুদার গপ্প লিখতে গিয়ে ফেলুদা তোপসের কিরকম তুতো দাদা সেই নিয়ে অল্প ছড়িয়ে ফেলেন। একেক গল্পে একেক রকম লিখেছিলেন তিনি। পরে এই গোলমাল ধরতে পেরে আরেকটা গল্পে ফেলুদাকে দিয়েই বলিয়ে নেন ভুলটার কথা, নিজের তৈরি করা চরিত্রকে দিয়েই শুধরে নেন নিজের ভুল। আমাদের এই খোদার ওপর খোদকারিও কি তেমনটাই? 

 

খোদার ওপর খোদকারি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments