কালবৈশাখী… নটরাজের দামামা। আধশোয়া হয়ে আছে একটা বুড়ো বটগাছ। যেন পড়ে যেতে যেতে কেউ উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। হাঁ করে থাকা অন্ধকার গহ্বর থেকে জীবনে এই প্রথমবার সূর্যের আলোর মুখোমুখি শেকড়গুলো। মাটি আঁকড়ে থাকার দম্ভ আর নেই। একটু শুকিয়ে উঠলেই করাতের দাঁত আর তার ধাতব বিষচুম্বন। বৃষ্টির জল সরু সুতোর মত বয়ে এসে সেখানে ভোজবাজির মত হারিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকেই কাঁধে ছোট ছোট দানা নিয়ে পিলপিল করে পিঁপড়ের অসীম মার্চ চলেছে। ইতিউতি ঘুরঘুর কাঠবেড়ালির ছানারা। চেনা খোঁদলে জমানো খুচরো খাবারের শেষ সঞ্চয়টুকু বেহাত হওয়ার মুখে। ভীষণ ব্যস্ততা তাই। ঢিমেতালে বহু কষ্টে দূরের অশ্বত্থটার দিকে চলেছে প্রাচীন দাঁড়াশ। জন্মানো অবধি এতদিনের ঠাই আশ্রয় ছেড়ে যেতে হয়ত মন চাইছে না। নরম রোদের কম্বল মুড়ে ঝিরঝির বৃষ্টি মাখছে শুকনো পাতার দল। সবুজ মাঠে এক রাতেই তামাটে গালিচা। একটা গন্ধ ভেসে আসছে… ইতিহাস উপড়ে যাওয়ার গন্ধ।
এই সকালেও ঈষৎ নেশাতুর “রাজেন বিস্ত”, শ্যাওলা ধরা স্যাঁতস্যাঁতে চ্যাপ্টা পাথরটার ওপর বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে দিকে। সেই ছোট্টবেলায় এখানেই তার বাবার সঙ্গে বসে ওই বটগাছটার দিকে তাকিয়ে কত ভোর হতে দেখেছে। রাত ঘনালে কাছে-দূরের সব ঘরের আলো যখন অল্প অল্প করে নিভে যেত, গেটের বাইরের রাস্তার স্ট্রিটল্যাম্পের আলোগুলো কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে যেত, রাতের নেপালি খবর শেষ হতেই ব্যাটারি বাঁচাতে বাবা রেডিওটা অফ করে দিত… ঘুম আর মশার আক্রমন থেকে বাঁচতে দুজনে লাঠি হাতে ঘুরে বেড়াত। এতক্ষন চিৎকার করা মাদি কুকুরটাও ততক্ষনে দুধের ছানাগুলোকে নিয়ে বাগানের ডাই করা পুরনো পিপেগুলোর ভুলভুলাইয়াতে নিরাপদ আশ্রয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে…। এই শ্বাপদ পরিবারটির ইতিহাসের আগেও একটা ইতিহাস আছে। এরা আগে এই বটগাছের পাশের কাঠের বেঞ্চের নিচেই রাত কাটাত। রাজেনের কেন যেন অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল রাতে টর্চ জ্বেলে একবার অন্তত মায়ের পেটের উষ্ণতায় চারখানা ছানাকে ঘুমোতে দেখা। অদ্ভুত একটা শান্তি পেত সে। একদিন সকালে হঠাৎ বাচ্চাগুলোর সংখ্যা একটা কমে গেল। সকলে বলল যে এই বটগাছের ভেতরে কয়েকটা বিশাল সাপ আছে। তারাই কেউ রাতে খেয়ে গেছে একটা। ছোট্ট রাজেনের সেটা বিশ্বাস হয় নি। বড় সাপ থাকলে কি এতদিন তার চোখে পড়ত না ! তবে রাতের গভীরে সরসরিয়ে কোন বুকে হাঁটার অস্তিত্বের হদিশ পেয়ে সেই বারবার আচমকা শিউরে ওঠাটা এখনও যেন অনুভব করতে পারে। ভেতরে কোথাও এই অস্বীকারের জায়গাটা হারিয়ে যায়। মা কুকুরটা সারাদিন একজায়গায় থাবায় মুখ গুঁজে বসে রইল। তারপর কিন্তু নীরবে সেখান থেকে সরে গিয়ে বাগানে আর একটা বাসা খুঁজে নিয়েছিল।
মাঝরাতে প্রায় মাটি ছুঁয়ে থাকা ঝুরিগুলো অন্ধকারের আবেশে পাঁচ ব্যাটারির আলোর সাথে একটা অপার্থিব খেলা খেলে বেড়াত গাছটার শরীরে। থমথমে অন্ধকারে একটা প্রহেলিকার মত বহু হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল অবয়বটা প্রথম সকালের ছায়াপথে স্পষ্ট হলে দেখা যেত রোদ্দুর কিভাবে পরম আদরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে বিশাল গুঁড়িটা। ঘুম ভাঙা পাখীদের একযোগে ডানা ঝাপটানোর অনুনাদে আর দূর চা বাগানের সকালের ভোঁ শুনে আড়মোড়া ভাঙত সে। টিফিন কৌটো থেকে বাপ-ছেলের রাত্তিরের খাওয়ার শেষ রুটির গুঁড়োগুলো গাছটার নিচে ছড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টারের দিকে হাঁটা দিত দুজনে। পাখীর দল এক্ষুনি ব্রেকফাস্টের জন্য নিচে নেমে আসবে।
বাবা আর নেই। এখন রাজেন নিজেই এখানকার পাহারাদার। রাত দশটা থেকে সকাল ছটা অব্দি ডিউটি। কাজ ছাড়া কাউকে কিছু কৈফিয়ত দেওয়ার নেই, কিছু নেওয়ারও নেই। তবে আজকে সকালে হঠাৎ সময়টা তার দুকাঁধ ধরে পেছনের দিকে টানছে কেন! গতকাল ঝড়ের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে ছুটে নিজের ঘরে চলে যেতে হয়েছিল। শেষরাতে ঝড় থামতেই কোন এক অজানা আশংকায় ফিরে এসেছিল সে। তারপর থেকে স্থানুর মত ওই পাথরটার ওপরেই বসে আছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির কনা শিশিরের মত কাঁচা পাকা চুলের ওপর ঝিকমিক করছে।
বটগাছটাকে সে ভালবাসত নাকি ঘৃণা করত জানে না। পড়াশোনা জানা বাবুদের মত কোনদিন ভাবেও নি। আকাশছোঁয়া দেহটাকে ভয় পেত, শ্রদ্ধাও হয়ত করত। কারন, মাঝে মাঝে গাছটাকে অনেকে পুজোও দিত। প্রসাদ পেত তারা। মজা হত বন্ধুদের সঙ্গে ঝুরি ধরে দোল খেতে, রাগ হত নিশ্চিত বাউনডারিটা গাছে ধাক্কা খেয়ে আটকে গেলে; কিন্তু অনেক রাতে নেশায় প্রায় বেহুঁশ বাবার কম্বলের আড়াল থেকে পায়ে পায়ে হেঁটে গিয়ে যখন গাছটার কালচে বাদামি খরখরে শরীরে কান রাখত, তার সামনে একটা অন্য পৃথিবীর দরজা খুলে যেত। অনেক নতুন শব্দ, অনেক নতুন গন্ধ, তাদের অনুবাদে অনেক অনেক নতুন ছবি… সেগুলো যেন এই পৃথিবীর কিছু নয়।
পশ্চিমের রোদ্দুরটা সোজা এসে রাজেনের চোখের ওপর পড়ছে। সূর্যকে সামনে থেকে আটকে দেওয়ার মত আর কিছু নেই যে। কিন্তু সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওই যে গেট খুলে দিল চন্দন। রাজেনের বড় ছেলে। ঘরঘর করে গাড়িটা এসে দাঁড়ালো অদূরে। করাত আর কাঠ কাটার দা নিয়ে লাফিয়ে নামলো কয়েকটা লাল নীল জ্যাকেট বর্ষাতি। শীর্ণ হাতে মদের বোতলটা তুলে এক ঢোকে শেষ করে পেছন ফিরেই টলমল পায়ে চা বাগানের দিকে দৌড়তে লাগল রাজেন। কোথায় থামার ছিল আর মনে আসছে না। কিন্তু, একটা মৃতদেহকে আরও খুঁড়ে খুঁড়ে মেরে ফেলা দেখতে পারবে না সে। অনেকের জীবনে পিতৃবিয়োগ একাধিকবার হয়।

গভীর রাতের ডায়রি- ১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments