তৃতীয় অধ্যায়

নাটমন্দির লাগোয়া পাঁচিলঘেরা বাগানের অসংখ্য গাছের মধ্যে দক্ষিণ কোনের পাঁচিল ঘেঁষা পেয়ারা গাছটাই এতদিন একমাত্র বন্ধু ছিল গৌরির। বছরভর পেয়ারায় ভরে থাকে গাছটা। অবিশ্যি টোপাকুলের গাছটার সঙ্গেও ওর একটু আধটু ভাব ছিল বৈকি। গত বছর পর্যন্ত বড়দার কাঁধে চরে পেয়ারা পেরে খাওয়াতে কোনও নিষেধ না থাকলেও ইদানীং গৌরির প্রতি হেমনলিনীর কড়া নজর। এইতো গত শীতে ছাদের কার্নিশ থেকে আচারের বয়েমগুলো নামানোর সময় হেমনলিনীর নজর আটকে গেল বাগানের দিকে। অবাক বিস্ময়ে হেমনলিনী লক্ষ্য করলেন তার বড়ছেলে গোবিন্দচন্দ্রের দুই কাঁধের দুই দিকে পা ছড়িয়ে বসে ধিঙ্গি মেয়ে গৌরি এক হাতে দাদার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে অন্য হাতে গাছ থেকে পেয়ারা পাড়তে ব্যস্ত। গৌরির এই লাগামছাড়া ধিঙ্গিপনায় হেমনলিনীর সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। রাগে গজগজ করতে করতে হেমনলিনীর স্বগতোক্তি-

- ” কাচায় না নোয়ালে বাঁশ
পাকলে করে ট্যাঁস ট্যাঁস”

অতএব হেমনলিনীর অনতিদূরে দাঁড়ানো রাঁধুনি মাসির ভার পড়ল পত্রপাঠ গৌরিকে বাগান থেকে ডেকে আনার। গৌরি সামনে আসতেই ওর আদুরে কচি মুখটা দেখে ভারি মায়া হল হেমনলিনীর। মায়ের স্নেহশীল সত্ত্বায় চাপা পড়ে গেল ইচ্ছে আরোপিত রুক্ষতার মুখোশ। এই পুতুল খেলার বয়েসে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর কথা মনে পড়লেই বুকটা যেন হঠাত খালি হয়ে যায় হেমনলিনীর। বুঝতে পারে না নিজের কোন সত্ত্বাটা আসল। একদিকে এক অসহায় মা, যার হৃদয়ের টুকরোকে অদ্ভুত সামাজিক নিয়মের জালে আটকে যাওয়া পতঙ্গের মত মনে হয় অপর দিকে সামাজিকতার ফাঁসে নিজেই বন্দি হয়ে যাওয়া এক মহিলা, যার মধ্যে আবহমান কাল থেকে প্রচলিত নিয়ম ভাঙ্গার মত সাহস বা মানসিক জোর কোনটাই নেই। নিজের সঙ্গে নিজেরই এই অসহনীয় মানসিক লড়াই লড়তে লড়তেই স্নেহশীলা মা সত্ত্বার পরাজয় ঘটে, সেই ছোট থেকেই সামাজিক যত অসঙ্গতির সঙ্গে আপোষ করতে শিখে নেওয়া নারী সত্ত্বার কাছে। গৌরির কান ধরে হালকা মুলে দিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে হেমনলিনী বলে উঠলেন-

- “আবার যদি দেখি দাদাদের সাথে বাগানে যেছিস তো আমার একদিন কি তোর একদিন….”

মায়ের বকুনি খেয়ে এক ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে পালঙ্কে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে গৌরি বুঝতে চেষ্টা করতে লাগলো মায়ের আজকের এই হঠাত গোসা করার কারণ। বাগানে গিয়ে বড়দার কাঁধে চেপে পেয়ারা পারার জন্যে মায়ের গোসা করার কারণ বুঝতে না পারলেও গৌরি মনে মনে শ্রীগৌরাঙ্গের নামে দিব্যি খেয়ে প্রতিজ্ঞা করল যে সে আর বাগানে যাবে না কোন দিনও। বাড়ির বুড়ো চাকর, যাকে বাবা-মার মতই সে নিজেও হারুদা বলেই ডাকে। সেই হারুদাকে বললেই তো বাগানের গাছ থেকে ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারা পেড়ে এনে হাতে দেবে। কিন্তু সেই পেয়ারাতেও গৌরির নিজের হাতে পেড়ে খাওয়া পেয়ারার মতই স্বাদ থাকবে কি? গৌরির আবারও খুব কান্না পাচ্ছে। দু’হাঁটুতে মুখ গুঁজে পালঙ্কে বসে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতেই গৌরি ওর মাথায় অনুভব করে সেই পরিচিত কোমল হাতের ছোঁয়া। গৌরির চুলে বিলি কাটতে কাটতে হেমনলিনী কোমল স্বরে বলেন-

- “কি রে পাগলী! মায়ের ওপর গোসা হয়েচে?”

নরম দু’হাতে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অস্ফুটে গৌরি যেন স্বগতোক্তি করল-

- “তোমার সঙ্গে আড়ি, যাও!”

গৌরির থুতনিটা ধরে ওর মুখটা ওপর দিকে তুলে মিষ্টি হেসে হেমনলিনী জিজ্ঞাসু স্বরে “তারপর” বলতেই গৌরি অভ্যেস মতই আওড়ে গেল-

- “আড়ি আড়ি আড়ি! কল যাব বাড়ি, পরশু যাব ঘর! হনুমানের ন্যাজ ধরে টানাটানি কর!”

বলেই মায়ের শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে ফিক ফিক করে হেসে আদুরে গলায় গৌরি বলে-

- “তেঁতুলের আচার দিলে ভাব ভাব ভাব! নইলে আড়ি, কথাও কইব নাকো…..”

- “লাজ সরম নেইকো দেখি এক্কেরে। মেয়ে মানুষের এত নোলা? চল…….”

বলেই হনহন করে ছাদে উঠে গেলেন হেমনলিনী আর পিছুপিছু গৌরি। ছাদের কার্নিশে রাখা কাঁচের বয়েম খুলে তেঁতুলের আচার গৌরির হাতে দিয়ে হেমনলিনী মেয়েকে কাছে টেনে এনে মিষ্টি করে জানতে চাইলেন,

- “এবার তো ভাব, নাকি?”

তেঁতুলের আচার মুখে দিতেই গৌরির সব রাগ গলে জল। পেয়ারার দুঃখ তেঁতুলে ভুলে গৌরি ছাদের কার্নিশে থুতনি ঠেকিয়ে দেখতে লাগলো ওর বড় প্রিয় বাগানটা। বড়দা পাঁচিলে উঠে পেয়ারা পেরে খাচ্ছে আর নিচে দাঁড়ানো মেজদা, সেজদা, ফুলদা, ছোড়দাসহ ওদের বন্ধুর দলকে মাঝে মাঝে ছুড়ে দিচ্ছে। বড়দার ছোড়া পেয়ারা দু’হাতে ধরতে না পেরে ফুলদার মাথায় পড়তেই খিলখিল করে হেসে ওঠে গৌরি। একটু আগেই যার দুচোখ জলে ভরে ছিল সেই তাকেই খিলখিল করে হাসতে দেখে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে হেমনলিনীর। নিজের শৈশবের মতই মেয়ের শৈশবেরও অকাল মৃত্যু কিছুতেই চান না হেমনলিনী। উনি নিজেও যখন বৌ হয়ে এবাড়িতে এসেছিলেন তখন ওর বয়েস সাতও পেরোয় নি। শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামী, দেওর, ননদ, নন্দাই এবং বেশ কিছু আশ্রিত আত্মীয়-স্বজন, বাচ্চাকাচ্চা সহ সে এক প্রকাণ্ড পরিবার। প্রতি বেলায় গোটা পঞ্চাশ পাত পরে। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে যেত রাতের আয়োজন। সেদিনের সেই সাত বছরের হেম নিজের বয়েস তিরিশ না পেরতেই আজকের জমিদারী হারানো কিন্তু মেজাজটা রয়ে যাওয়া গৌরচন্দ্র ঠাকুরের জাঁদরেল গিন্নি। হেমের বয়েস বারো পেরতে না পেরতেই গোবিন্দর জন্ম তারপর একে একে চন্দন, মুকুন্দ, জগদীশ, জয়ন্ত আর শেষে গৌরি। জগদীশের জন্মের আগেই শাশুড়ি মাতার প্রয়াণ আর সাথে সাথেই সংসারের অর্থাৎ দেরাজ থেকে শুরু করে হেঁসেল পর্যন্ত সমস্ত চাবির গোছার স্থান বদল। চাবির গোছা শাড়ির আঁচলে বাঁধা পরলে বধূ থেকে দায়িত্বশীল নারীত্বে উপনীত হওয়া যায় মাত্র কিন্তু পরিণতি আসে সন্তান নয়, সন্ততির হাত ধরে। তাইতো সেদিনের সেই সাত বছরের হেম আজকের হেমনলিনী হয়ে উঠেও অপেক্ষা করে নারীত্বের পূর্ণ পরিণতির, প্রথমে গৌরির বিয়ে তারপর একে একে গোবিন্দ এবং বাকি ছেলেদের বিয়ে। নাতি নাতনিকে ছাদের কার্নিশে রাখা বয়েম থেকে আচার চুরি করতে দেখেও না দেখার ভান করা অথবা কর্তার নজর এড়িয়ে দেরাজ থেকে পয়সা বের করে নাতি নাতনিদের সঙ্গে চুপিচুপি ফেরিওয়ালার কাছ থেকে রঙিন শরবৎ মেশানো বরফ-কুচি কিনে খাওয়া। আসলে হেমনলিনীর কাছে নারীত্বের পূর্ণ পরিণতির অর্থ বোধহয় নবীন প্রজন্মের হাত ধরে পৌঁছে যাওয়া নিজেরই শৈশবে।

গৌরি (পর্ব ৩)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments