চতুর্থ অধ্যায়

মহালয়ার সকালে কাটোয়ায় গঙ্গার জলে পিতৃ তর্পণ করে মাতৃপক্ষকে আহ্বান জানানোর পারিবারিক প্রথাটা গৌরচন্দ্র মেনে এসেছেন বরাবর। বাল্যকালে পিতা রমেশচন্দ্রের সঙ্গে গরুর গাড়িতে রওনা দিতেন সেই মাঝ রাতে। গরুর গাড়ির ছাউনিতে বাবা রমেশচন্দ্রের সঙ্গে গৌরচন্দ্র আর সঙ্গে নায়েব মশাই। কৃষ্ণ চতুর্দশীর ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে হ্যাজাক লাইট মাথায় জনা চারেক পাহারাদার গরুর গাড়ির সামনে সামনে আর সঙ্গে থাকত গণ্ডা কতক লেঠেল। মাঝের ঝাঁপানতলা গ্রামের নিধু ডাকাতের কুখ্যাতি তখন ছড়িয়ে পরেছে মহকুমা সদর কাটোয়া ছাড়িয়ে জেলা সদর বর্ধমান পর্যন্ত। তাই রমেশচন্দ্র উত্তর ভারত থেকে আমদানি করা লেঠেলদের ছাড়া প্রায় কোনও খানেও যেতেন না। বাড়িতেও অষ্ট প্রহর দুজন করে খোট্টা দাররক্ষী ছাড়াও বিশ জন বাছাই করা লেঠেল পাহারায় থাকতো। পাঁচ ক্রোশ দুরে কাটোয়ার গঙ্গার ঘাটে পৌঁছতে পৌঁছতে ভোরের সূর্যের লালিমায় লাল হয়ে যেত চরাচর। ঘুমঘুম চোখে রমেশচন্দ্রের হাত ধরে গরুর গাড়ি থেকে নেমে গঙ্গার বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে বসে গৌরচন্দ্র দেখতেন রমেশচন্দ্র খালি গায়ে শুধু ধূতি পরে কোমর জলে দাঁড়িয়ে গঙ্গার বুক চিঁরে ক্রমশই ওপর দিকে উঠতে থাকা সূর্যের দিকে মুখ করে চোখ বুজে দুহাত জোর করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তেন। ধীরে ধীরে আরও অনেকেই তখন রমেশচন্দ্রের মতই পিতৃতর্পণে মগ্ন হয়ে যেত আর গৌরচন্দ্র হারিয়ে যেতেন ওই দুরের ছিপ নৌকার মাঝির হাল বাওয়ার ছন্দে অথবা ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাওয়া গাংচিলের ভিড়ে। স্নান সেরে রমেশচন্দ্র গরুর গাড়ির ছাউনিতে রাখা নতুন ধুতি পাঞ্জাবী পরে কাঁধ পর্যন্ত লম্বা সৌখিন চুল পরিপাটি করে আঁচড়িয়ে কাঁধে রেশমি চাদর ঝুলিয়ে গৌরচন্দ্রের হাত ধরে রওনা দিতেন ঘাট লাগোয়া নিচুপট্টি বাজারের বিনয় শেঠের কাপড়ের দোকানে। বিধবা ঠাকুমার থান কাপড় দিয়ে শুরু পূজোর কেনাকাটা, তারপর একে একে মা, দিদি, পিসি হয়ে রাঁধুনি মাসির শাড়ি কেনা হত। গৌরচন্দ্রের জন্যেও যে ষষ্টি থেকে বিজয়া পর্যন্ত পাঁচ দিনের পাঁচজোড়া ধুতি সঙ্গে মসলিন আর আদ্দির পাঞ্জাবী কেনা হত তা বলাই বাহুল্য। শাঁসালো খদ্দের বলে দোকানি বিনয় শেঠের দোকানেই জিলিপি-সিঙ্গারা সহযোগে জলযোগের বন্দোবস্ত হয়ে যেত। কেনাকাটা শেষ হতেই নায়েব মশাই দাম মেটাতেন আর গৌরচন্দ্র বাবার হাত ধরে চড়ে বসতেন গরুর গাড়ির ছাউনিতে। মাতৃপক্ষের নরম রোদ গায়ে মেখে দুধারি ধেনো জমির আলের কাশফুলের কাঁপুনি দেখতে দেখতে অবশেষে যাত্রা বাড়ির পথে।

এবছর গৌরচন্দ্র চলেছেন পিতৃতর্পণে সঙ্গে বড়বেটা গোবিন্দ। দেখতে দেখতে কতগুলো বছর পেরিয়ে গেল। এই তো যেন সেদিনের কথা। সাত বছরের বালিকা হেমনলিনী বউ হয়ে এলো ঠাকুর বাড়িতে। অজয়নদের জল যেমন সকলের অলক্ষ্যেই গঙ্গার জলে মিশে একাকার হয়ে বহে যাচ্ছে, সেরকমই হেমের আর গৌরচন্দ্রের জীবনর স্রোত কখন যে মিলে মিশে একই খাতে বইতে শুরু করেছে বুঝতে বুঝতেই পেরিয়ে গেল এতগুলো বছর। গোবিন্দও এবছরই আঠারো পেরিয়ে উনিশে পরল। ম্যাট্রিকের পর আর কলকাতায় গিয়ে পড়াশুনা করতে চাইল না। অবিশ্যি গৌরচন্দ্রেরও বিশেষ আগ্রহ ছিল না তাতে। ওই ম্লেচ্ছ বেহ্মগুলোর খপ্পরে পরে জাত খোয়ালে সমাজে আর মুখ দেখানোর জো থাকবে না। তার ওপর স্বদেশী ছোকরা গুলোর উপদ্রব তো আছেই। এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদাররাই এত চেষ্টা করেও জমিদারী রক্ষা করতে পারল না আর ওই স্বদেশী ছোকরারা কিনা ইংরেজদের করবে দেশ ছাড়া। তার থেকে ঘরের ছেলে ঘরে থেকে বাপ ঠাকুরদার জমি জিরেত দেখাশুনা করবে। এই তো সামনের মাঘেই গৌরির বিয়ে। গৌরিটাকে পাত্রস্থ করেই গোবিন্দর বিয়ে দেবেন গৌরচন্দ্র। সম্বন্ধ নিয়ে ঘটক মশাই ঘুরঘুর করছেন অনেক দিন ধরেই, এবার একটা পাকা সিদ্ধান্ত নিয়েই নেবেন।

পিতৃ তর্পণ সেরে সেই বহুকালের অভ্যেস মতই গোবিন্দকে সঙ্গে নিয়ে গৌরচন্দ্র উপস্থিত হলেন বিনয় শেঠের দোকানে। বিনয় শেঠও গত হয়েছেন বছর চারেক হল। বিনয় শেঠের দুই পুত্র, দুজন মিলেই বাবার দোকানটা চালাচ্ছে। কেনাকাটা চলতে চলতেই সেই পুরনো নিয়ম মতই শালপাতার ঠোঙায় মুড়ে জিলিপি শিঙাড়া এলো। জলযোগ সারতে সারতেই হেমের জন্যে চারটে তাঁতের আর একটা গরদের শাড়ি আর গৌরিমার জন্যে গণ্ডা দুয়েক ডুরে তাঁতের শাড়ি কিনে ছেলেদের জন্যেও কেনাকাটা করলেন গৌরচন্দ্র। বাড়ির অন্যান্য আত্মীয় স্বজন এবং ঝি-চাকর-রাঁধুনির জন্যে ধুতি কাপড় কিনে দাম মিটিয়ে দোকান থেকে বেরনোর উদ্যোগ নিতেই দেওয়ালে ঝোলানো লাল ঝালর দেওয়া ফ্রকটা দেখেই চোখ আটকে গেল গৌরচন্দ্রের। মনে মনে ভাবলেন, ‘আহা! গৌরিমাকে ভারি মানাবে ওই ফ্রকখানায়’। কিন্তু হেম যে পই পই করে বলে দিয়েছে এবছর পূজোয় গৌরির জন্যে ফ্রক না কিনতে। ফ্রকটা দেখে মনটা হু হু করে ওঠে গৌরচন্দ্রের। জেদ চেপে যায় মাথায়। ফ্রকটা কিনেই ফেললেন গৌরচন্দ্র। বিয়ের আগে এবছরই শেষ পূজো মেয়েটার। গৌরচন্দ্র মনে মনে ঠিক করলেন হেম যদি খুব বেশি রাগারাগি করে তো গৌরিমাকে বলবে ফ্রকটা পরে বাড়ির বাইরে না যেতে, শুধু একটি বার পরে দুদণ্ড দাঁড়াক চোখের সামনে। তারপর নিজের দেরাজে তুলে রাখবেন যত্ন করে, খুব মন খারাপ করলে সকলের অলক্ষ্যে চুপিচুপি বের করে দেখবেন। গৌরিমার ফ্রকটা বুকে চেপে গরুর গাড়ির ছাউনিতে বসে বসে গৌরচন্দ্র লক্ষ্য করলেন জমির আলে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা এবছরের কাশফুলগুলো শরতের হাওয়াতেও যেন আর দুলছে না, কাশফুলের রঙটাও আর তেমন সাদা নয়, কেমন যেন ফ্যাকাসে। নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল কখন তসরের পাঞ্জাবীটাকে ভেজাতে শুরু করেছে বুঝতেও পারেন নি গৌরচন্দ্র।

গৌরি (পর্ব ৪)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments