দ্বিতীয় অধ্যায়

বিদ্যালয়ের গ্রীষ্মাবকাশ শেষ হতে চলল, বর্ষা শুরু হয়ে গেল। গ্রামের বর্ষা মানেই একদিকে বীজতলা থেকে সবে আকাশের দিকে মুখ তুলতে শেখা ধানগাছের চারা জমিতে রোপণ করা আর অন্য দিকে প্রবল বর্ষণে রাস্তার এঁটেল মাটির চটচটে কাদা পেরিয়ে পা টিপেটিপে পাঁচ মিনিটের রাস্তা কুড়ি পঁচিশ মিনিটে অতিক্রম করা। বর্ষার জলে বাড়ির পেছনের মধুপুষ্কনির জল শান বাঁধানো ঘাটের তিনটে সিঁড়িকে ডুবিয়ে শেষ সিঁড়িকেও ছুঁইছুঁই করছে। ক্রমবর্ধমান বৃষ্টির তেজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে বসন্তর নিঃসঙ্গতাও। আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে ডুবে যান মনের কবি চণ্ডিদাসের পদাবলীতে। এই নিঃসঙ্গ বর্ষারাতে মুরলীধর নয়, বসন্তর মননে শ্রীরাধার অনুভূতি। মাথার কাছে টেবিলের ওপর রাখা লন্ঠনের টিমটিমে আলোয় পুঁথির প্রতিটি অক্ষরে ওর মানস চক্ষে ফুটে ওঠে শ্রীরাধার অনাবিল বিরহের অকুতি। নিজের মরমে শ্রীরাধাকে অনুভব করতে করতে চোখ বুজে বহুপঠিত পদাবলী আওরাতে থাকেন বসন্ত-

"রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুন মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।
পরাণ পীরিতি লাগি থির নাহি বান্ধে।।
কি আর বলিব সই কি আর বলিব।
যে পণ করেছি চিতে সেই সে করিব।।"

একাকীত্বে মোড়ানো আজকের এই গতিহীন জীবনে পুরনো কত কথাই মাথায় ভিড় করে হেডমাস্টারের। কলকাতার হিন্দু কলেজের বসন্তস্যার থেকে রমেশচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার হয়ে যাওয়ার জীবনপথের প্রতিটি বাঁকে একটু একটু করে বদলে যেতে লাগলেন মানুষ বসন্ত। ধীরে ধীরে হেডমাস্টার বসন্তের বর্ণহীন জীবনেও এলো নতুন বসন্ত। সুরমা কলকাতার ধনী এবং উদার পরিবারের মেয়ে, ইশকুলে না গেলেও অধ্যাপক বাবার কাছে লেখাপড়াও শিখেছেন। শরৎ বঙ্কিম এর সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথেও ডুবে যেতে ভালোবাসেন অবসরে। সুরমাকে বিয়ে করে গ্রামে নিয়ে আসার আগে ভীষণ সংশয়গ্রস্থ ছিলেন বসন্ত। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিয়ের মাস ঘুরতে না ঘুরতেই শক্ত হাতে সংসারে হাল ধরলেন সুরমা। শ্বশুর শাশুড়িকে সকাল সন্ধে কৃত্তিবাসী রামায়ণ পাঠ করে শোনানো থেকে শুরু করে জমির ফসলের হিসেব রাখা অথবা হেঁসেল সামলানো, সবই সুরমা সামলাতে লাগলেন একার হাতে। বসন্ত নিজেও কোনও দিন ভাবতেও পারেন নি, যে হাত একদিন পরম মমতায় রবিঠাকুরের শেষের কবিতার পৃষ্ঠা উলটিয়েছে সেই হাতই আজ একান্নবর্তী পরিবারের মস্ত-বড় ভাতের হাড়ি উনুন থেকে নামাচ্ছে অনায়াসে। বসন্ত ছাত্রাবস্থায় সংস্কৃত সাহিত্যে পড়েছিলেন যে নারী যেন গলানো সোনা, তাকে যে ছাঁচেই ঢালা হোক না কেন তা অলঙ্কারের রূপ ধারণ করবে। সেদিন যে নারীর ওই উপমার সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে পারেন নি আজ তা বুঝতে পরেন বসন্ত।

আজকের প্রবল বর্ষণে হেডমাস্টার মশাইকে আচমকাই টেনে এনে ফেলে বিবাহ পরবর্তী প্রথম বর্ষার রাতে। হেঁসেল এবং বাড়ির সবার রাতের খাওয়া দাওয়া সামলে সরমা উঠোন পেরিয়ে বড়দালানে দাঁড়াতেই বসন্তর দৃষ্টি আটকে গেল বর্ষণস্নাত সরমার দেহ বিভঙ্গে। এলোকেশী সরমার ভেজা চুলের প্রান্তদেশে হঠাত রুদ্ধ হয়ে যাওয়া জলের প্রতিটা ফোঁটা যেন লন্ঠনের মৃদু আলোতেও হীরকখণ্ড। সিক্তবসনা সুরমার সেই অপরূপ মোহময়তায় মুগ্ধ হয়ে মৃদুস্বরে বসন্ত আওড়ে ছিলেন সেই চণ্ডিদাসেরই কয়েকটা লাইন-

"ঘোর রজনী, মেঘের ছটা,
কেমনে আইল বাটে।
আঙ্গিয়ার মাঝে, বঁধুয়া ভিজিছে,
দেখিয়া পরাণ ফাটে।।
সই! কি আর বলিব তোরে।
বহু পুণ্যফলে, এ হেন বঁধুয়া,
আসিয়া মিলিল মোরে।।"

লজ্জায় রাঙা হয়ে যাওয়া সুরমার শরীরী ভাষা সে রাতে ভেঙ্গে দিয়েছিল দুজনেরই সংযমের সমস্ত বাঁধ। প্রবল বর্ষণের শব্দকে ছাপিয়ে শুধু প্রেমের হিল্লোলই নয়, বিদ্যাপতির মিলনান্তক পদাবলী বসন্ত শুনিয়েছিল ওর সুরমাকে। শরীরজোড়া প্রেমের আবেশ মাখতে মাখতে গহন আধারে বসন্তের বুকে মাথা রেখে সুরমা শুনেছিল বসন্তের আবেগ মেশানো কণ্ঠে বিদ্যাপতির প্রেমগাঁথা-

"ভাগে মিলন ইহ প্রেম সঙ্ঘতি।
ভাগে মিলন ইহ সুখময় রাতি।।
আজু যদি মানিনি তেজবি কান্ত।
জনম গোয়াওবি রোই একান্ত।।
বিদ্যাপতি কহ প্রেমক রীত।
যাচিত তেজি ন হয় উচিত।।"

বছর ঘুরতেই সুরমার কোল আলো করে বসন্তের প্রথম সন্তান গোরার জন্ম। ধপধপে ফর্সা ছেলের দিকে তাকাতেই সুরমার মনে হয় যেন এক তাল পূর্ণিমার চাঁদ ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। আদর করে ছেলের নাম রাখলেন গোরাশশী। তারপর আরও কয়েকটা বর্ষার প্রবল বর্ষণে মধুপুষ্কনির দু'কূল ছাপাল বেশ কয়েকবার, মাদূর্গার বার্ষিক বোধনের মতই। বোধনের হাত ধরেই যেমন এগিয়ে আসে বিসর্জনের কালো ছায়া, তেমনই হেডমাস্টারের জীবনেও বিদ্যুতের ঝলকানির মতই ক্ষণিক সুখের ওপর নেমে এলো কালো মেঘ। সুরমা তার নিজের হাতে গড়া সংসারের মায়া কাটিয়ে পাড়ি দিল অমৃতলোকে, ঠিক ছোটপুত্র সতীশের জন্মের পরেই, তখন গোরা সবে চার পেরিয়ে পাঁচে পড়েছে। গোরাটা ছোট থেকেই ভীষণ চাপা স্বভাবের, অকালেই মায়ের চলে যাওয়াটা ওর পৃথিবীটা একেবারে শূন্য করে দিয়েছিল আর সতীশের তো মা শব্দটার পরিচয় শুধুই বইয়ের পাতায়।

আজ এই ঘোর বর্ষাকে মাথায় করেও ভর সন্ধে বেলায় বাড়ি থেকে বেরতে হল বসন্তকে। কলকাতার জীবনে এই রকম বর্ষণমুখর সন্ধেয় বসন্তকে টেনে হিঁচড়েও মেসবাড়ি থেকে বের করা যেত না। বর্ষণমুখর সন্ধেয় মুড়ি আলুরচপ আর চা সহযোগে বৈঞ্চবপদাবলীর প্রেমলীলায় ডুবে যাওয়াটা ছিল বসন্তের বড় প্রিয় অবসর বিনোদন। কিন্তু সময় বড়ই নিষ্ঠুর। বসন্তের মনে পড়ে ওর ছাত্রাবস্থায় বলা মায়ের কথাগুলো। ছয়-সাত মাস পরেই ওর ম্যাট্রিক পরীক্ষা। সেদিনও সকাল থেকেই চলছে একটানা বৃষ্টি। সন্ধে হতেই মধুপুস্কুনির পাড়ের ঝোপ থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁর একটানা সুরের সঙ্গে বর্ষার ব্যাঙের সঙ্গতের অদ্ভুত ছন্দ। মায়ের হেঁসেল থেকে ভেসে আসা গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ির মিষ্টি গন্ধের আবেশে পড়তে পড়তেই কখন যে চোখ লেগে গেছে বুঝতেই পারেনি বসন্ত। মা আদর করে ডেকে কাঁসার বগি থালায় হাতায় করে গরম গরম খিচুড়ি দিতে দিতেই, স্বস্নেহে অথচে দৃঢ়তা মেশানো গলায় বলেছিল-

- "বাবা বসন্ত! ভগমান পেত্তেক মনিষ্যির জেবনে সুখ-দুখ্খু ভোগের সীমা বেঁধে দেছেন। কম বয়সে বেশি সুখ ভোগ করলি বয়স কালে কিন্তু ভাগের সুখ শেষ, পড়ে রইবে শুধুই দুখ্খু…"

সুরমা চলে যাওয়ার পরে মায়ের সেদিনের কথাগুলো মাঝে মাঝেই মনে পরে যায় বসন্তর। বাল্যবন্ধু গৌরচন্দ্র আর বসন্তের বন্ধুত্ব আজ আত্মীয়তায় পরিণত হতে চলেছে। তাই গৌরচন্দ্রের বৈঠকখানা পেরিয়ে বসন্ত-র গতিবিধি জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের খাবার ঘর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে স্বাভাবিক নিয়মেই। তাইতো গৌরচন্দ্রের খাস চাকর জগাই যখন জানালো যে জমিদারবাড়ি থেকে হেডমাস্টার মশাইকে তলব করেছে তখন আর বর্ষার দোহাই দিয়ে ঘরে কেমন করেই বা বসে থাকবেন। ধনী কুটুমবাড়ি, তাছাড়া মা মড়া গোরাটার ভবিষ্যতের কথাটাও তো ভাবতে হবে। অগত্যা জগাইয়ের পিছু পিছু একহাতে মাথায় ছাতা আর অন্য হাতে জুতোজোড়া ধরে ধুতিটাকে কোমরের কাছে একটু গুজে হাঁটু পর্যন্ত তুলে চটচটে এঁটেল মাটির কাদার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে জমিদারবাড়ির পথ ধরলেন হেডমাস্টার মশাই আর হ্যাজাক লাইট কাঁধে সামনে সামনে জগাই। জমিদারবাড়িতে গিয়ে হেডমাস্টার বুঝতে পারলেন যে জরুরি তলবের গুরুত্বপূর্ণ কোনও কারণই ছিল না। আসলে বন্ধু গৌরচন্দ্র মেয়ের বিয়ের বাজার করে ফিরলেন সদর থেকে। গৌরির জন্যে লাল টুকটুকে বেনারসি, হবু জামাই গোরার জন্যে তসরের পাঞ্জাবি এবং আরও অনেক কিছু। শুধু বিয়ের কেনাকাটার আনন্দই নয় সে রাতের নৈশভোজেও বন্ধু গৌরচন্দ্রকে সঙ্গ দিয়ে তবে নিস্তার পেলেন হেডমাস্টার। বাড়ি ফিরে দেখলেন সর্বক্ষণের কাজের লোক মানদা ছেলে দুটোকে খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছে। বড়দালানের পাশে রাখা বলতির জলে পা ধুয়ে মানদার উদ্দেশ্য, "আমি খেয়ে এয়েছি, তুই খেয়ে শুয়ে পর।" বলেই ঘরে ঢুকে গেলেন হেডমাস্টার। পূর্বদিকের জানলার লম্বা গরাদ ধারে চোখ মেলে দিলেন মধুপুষ্কুনির অন্ধকার মেশানো ঘন কালো জলের দিকে। মুখে বৃষ্টির ছাট আর মননে চিরসঙ্গি পদাবলী। বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দের ছন্দে যেন করুন বাঁশির সুরে বেজে চলেছে-

"কাঁদিতে না পাই বঁধু কাঁদিতে না পাই,
নিশ্চয় মরিব তোমার চাঁদ-মুখ চাই……."

ক্রমশ….

গৌরি (পর্ব ২)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments