প্রথম অধ্যায়

পাঁচ পুত্রসন্তানের পরে হেমনলিনীর কোল আলো করে এলো গৃহলক্ষ্মী গৌরি। জমিদারীটা ইংরেজদের হাতে খোয়া গেলেও, জমিদারী মেজাজটা গৌরচন্দ্র ঠাকুরের থেকেই গেছে। অনেক কিছুই হাতছাড়া হয়ে গেলেও জমি জিরেতের পরিমাণ তখনও নয় নয় করে শ'পাঁচেক বিঘে তো হবেই। তিন-মহলা বিশাল বসতবাড়ি, নাট মন্দির আর কাছারি বাড়ি দেখলেই গৌরচন্দ্রের বৈভব প্রতিপত্তির কথা বুঝতে আর বাকি থাকে না কারও। এহেন জমিদারবাড়িতে গৃহলক্ষ্মীর আগমনে অনেকদিন পরে উৎসবের মেজাজ। হেমনলিনী তার সুবর্ণ-বর্ণা কন্যার নাম সুবর্ণলতা রাখতে চাইলেও গৃহকর্তা গৌরচন্দ্রের মনোবাসনার সঙ্গে আপস করে কর্তার নামের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে কন্যার নাম গোরোচনা রাখতে সম্মত হলেন আর ডাকনাম গৌরি। পাঁচ বড় দাদার কোলেপিঠে বড় হতে লাগল দাদাদের আদরের একমাত্র বোন গৌরি। বড়দার কাঁধে বসে পেয়ারা গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়া ছিল গৌরির বড় প্রিয়। দাদাদের সহচর্যে এবং বাবা গৌরচন্দ্রর বাধাহীন আশকারায় দিনদিন ছেলেদের মতই ডানপিটে হয়ে উঠছে গৌরি। বয়েস পাঁচ পেরল কিন্তু মেয়ের মধ্যে মেয়েসুলভ নম্রতা অথবা সুশীলতার লেশমাত্র না দেখে হেমনলিনীর চিন্তা দিনদিন বাড়ছে। গৌরির বয়সী গ্রামের অন্য মেয়েরা যেখানে দিব্যি ডুরে তাঁতের শাড়িতে শরীর ঢেকে মায়ের হেঁসেলে হাত বাটছে সেখানে গৌরির ধিঙ্গিপনা হেমনলিনীর এক্কেবারে চক্ষুশূল। শাড়ি জড়িয়ে মায়ের পিছু পিছু হেঁসেলে ঘুরঘুর করা তো দুর অস্ত, ধিঙ্গি মেয়ে গ্রাম চষে বেড়িয়ে দিনভর ধিঙ্গিপনা করে বেড়াচ্ছে। আকার ইঙ্গিতে বিষয়টাতে কর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলেও, কর্তা বিশেষ আমল দিতে চান বলে মনে হয় না। গৌরিও যে বড় হচ্ছে কর্তা যেন তা মানতেই চান না। গিন্নির ধৈর্যের বাঁধ অবশেষে ভেঙেই পরল সেদিন। আম গাছে চড়তে গিয়ে পড়ে গিয়ে দু'হাঁটু ছড়ে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরতেই গৌরির কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে হেমনলিনী একেবারে উপস্থিত হলেন কর্তার বৈঠকখানার মজলিশে। মজলিশে তখন কর্তা গ্রামের হেডমাস্টার বসন্ত সেনগুপ্তের মুখ থেকে বৈষ্ণব পদাবলীর ব্যাখ্যা শুনতে ব্যস্ত। মাস্টারমশাই পণ্ডিত মানুষ। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে অংক, ইংরেজি আর সংস্কৃততে ট্রিপল এম.এ করে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন হিন্দু কলেজে। গৌরচন্দ্রের অর্থানুকূল্যে যখন গ্রামের প্রথম স্কুল গড়ে উঠলো অবধারিত ভাবেই পত্র গেল গৌরচন্দ্রের বাল্যবন্ধু বসন্ত সেনগুপ্তের কলেজের ঠিকানায় এবং হিন্দু কলেজের বসন্তস্যারের পত্রপাঠ তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাকাপাকিভাবে গ্রামে প্রত্যাবর্তন। সেই থেকেই বসন্ত সেনগুপ্ত গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার।

হেমনলিনী বৈঠকখানায় ঢুকেই হেডমাস্টার মশাইকে দেখে সচকিত হয়ে হাতে ধরে থাকা গৌরির কান ছেড়ে দিয়ে মাথার ঘোমটাটা আরও টেনে দিয়ে দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে পরলেন। বাড়ির বৌয়ের আচমকা বৈঠকখানা আগমনে দুই বন্ধুর বৈষ্ণব পদাবলীর আলোচনায় আপাতত যবনিপাত। মায়ের বজ্রমুষ্টিতে আবদ্ধ রক্তাভ কান হঠাত মুক্তি পাওয়া মাত্র অহ্লাদি গৌরি একছুটে বাবার কোলে। গৌরির মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে গৌরচন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন-

- "ওমাঃ কানছিস ক্যানে? কি হয়েছে কি তোর মা ?"

বাবার কথার উত্তর না দিয়ে আরও জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ইশারায় ছড়ে যাওয়া হাঁটু দেখাতেই চোখ মুখ কুঁচকে যন্ত্রনাক্লিষ্ঠ স্বরে গৌরচন্দ্র গিন্নির উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন-

- " ওহোঃ বড়বৌ! তুমি দুধের বাচ্চাটাকে ফের মেরেচ? শাসন কচ্চ? এমন তরো?"

ঘোমটার আড়াল থেকেই যেন ঝাঁঝিয়ে উঠলেন হেমনলিনী-

- "আজ্ঞে আপনে তো বলেই খালাস আর ইদিকে যে আপনের খুকির ধিঙ্গিপনা বাচ্চে দিনকে দিন। খুকি যে সেয়ানা হচ্চে, বলি সে খেয়াল আচে?"

- " ক্যানে, কি করেচে কি ও? আর সেয়ানাটাই বা কে? গৌরিমা?"

বলেই অট্টহাসিতে বড়ি কাঁপিয়ে, তাচ্ছিল্যের সুরে গৌরচন্দ্র বলে উঠলেন-

- "তুমি পারোও বটে বড়বৌ। যাও দিকিনি খুকিকে নিয়ে ভেতর পানে….."

গৌরির হাত ধরে হেমনলিনী অন্দরমহলে গমন করতেই একটু ধাতস্থ হলেন হেডমাস্টার মশাই। একটা অদ্ভুত দ্বিধা মিশ্রিত কণ্ঠে বন্ধুর উদ্দেশ্যে বললেন-

- "বুঝলে হে ভায়া গৌর! তোমার ওই নয়নের মণিখান ছেনতাই করতি মনে সাধ জাগতিছে ভারি.."

- " ওহে মাষ্টার! তুমি হেঁয়ালি কোরনাকো আর। বলি কি, এট্টু ঝেরে কাশো দিকিনি…"

গৌরচন্দ্রের মস্করা শুনে স্মিত হেসে নিবেদনটা জানিয়েই ফেললেন বসন্ত সেনগুপ্ত-

- "তোমার গৌরিকে আমার বড় ব্যাটা গোরাশশী, মানে গোরার সাথে কিন্তু ভারি মানাবে। গোরার ফিফ্থ কেলাস থেকে ফোর্থ কেলাস হল এবার। মা মরা ছেলেদুটো আমার ওই ঝি চাকরের হাতেই মানুষ। বাড়িটা লক্ষ্মীছাড়া হয়ে আছে অনেকদিনই, তাই আমি বলতেছিলাম আর কি….."

বন্ধুর মুখের কথা ফেলতে না দিয়েই হেডমাস্টারকে বুকে জড়িয়ে ধরে অসম্ভব খুশির স্বরে গৌরচন্দ্র বলে উঠলেন-

- "তোমার মতন পণ্ডিতের ঘরে, একই গেরামে আমার চোখ্খের মণি শ্বশুরঘর করবে। একজন মেয়ের বাবা ইর থিক্যা বেশি আর কিই বা চাইতি পারে…."

অবশেষে একশো বিঘে জমি আর দেড়শ ভরি গহনা যৌতুকের বিনিময়ে জমিদার মহাশয়ের আদরের একমাত্র কন্যা গোরোচনা ওরফে গৌরি চির বন্ধনের প্রতিশ্রুতিতে বাঁধা পরল হেডমাস্টারের জ্যেষ্ঠপুত্র গোরাশশী ওরফে গোরার সঙ্গে।

বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল। ন'মাস পরে মাঘ মাসের তিন তারিখে গোরা আর গৌরির চারহাতের মিলন। বিয়ের দিন ঠিক হতেই গৌরির অবাধ স্বাধীন জীবনে নেমে এলো অসংখ্য বিধি নিষেধ। ফ্রক পরে বাড়ির বাইরে বেরনও নিষিদ্ধ হল। এবছর পুজোতে যে আর একটাও ফ্রক হবে না তা মেয়েকে স্পষ্টই বুঝিয়ে দিলেন হেমনলিনী। যে মাষ্টার জ্যেঠুর কোলে চেপেছে বছর দুয়েক আগেও, সেই মাষ্টার জ্যেঠুকে দেখলেই এখন থেকে নাকি মাথায় ঘোমটা দিতে হবে। মায়ের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেও গৌরির কপালে অঘটনটা ঘটেই গেল। যদিও ঘটনাটাতে ওর কোনও দোষই ছিল না, মায়ের পইপই করে শিখিয়ে দেওয়া উপদেশ মানতে গিয়েই তো ঘটে গেল ঘটনাটা। গৌরি কি ভাবেই বা জানবে যে নাটমন্দিরে বুদ্ধপূর্ণিমার কীর্তনের আসরে আচমকাই উদয় হবেন গৌরির হবু শ্বশুর মাষ্টার জ্যেঠু। বাড়ির লাগোয়াই নাটমন্দির, তাই গিয়েছিল ফ্রক পরেই। বিনামেঘে বজ্রপাতের মতই হবু শ্বশুরের আচমকা আবির্ভাব আর সাথে সাথে গত কয়েক দিন ধরে মায়ের পইপই করে শেখানো শিক্ষাগুলো, সব মিলেমিশে গৌরির শিশু মস্তিষ্কের বিপুল ঝাঁকুনিই গোলমাল করে দিল সবকিছু। হবু শ্বশুরের যোগ্য সম্মান রক্ষার্থেই তো গৌরি ফ্রকের তলাটা তুলে মাথায় দিয়ে ঘোমটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এতে যে কেন লজ্জায় বাবা-মায়ের মাথা কাটা গিয়েছিল তা গৌরি বুঝেছিল অনেক পরে, যেদিন মাষ্টার জ্যেঠুর ছেলেকে সামনা সামনি দেখে ওর নিজেরও সত্যি সত্যি লজ্জা লেগেছিল।

ক্রমশ….

গৌরি (পর্ব ১)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments