আলো ফোটার সময় হয়ে এলো। অন্ধকার আকাশের গায়ে ঝাপসা দাগ। প্রতিবেশীর অ্যালার্ম ঘড়িটা প্রস্তুত হচ্ছে বেজে ওঠার জন্য। খুব ভোরে তাদের দিন শুরু হয়। যেমন শুরু হয়েছে কোকিলটার। গত দশ মিনিট ধরে তারস্বরে ডেকে চলেছে শিমূল গাছের ডালে বসে। আমার জীবনে কোকিলের ডাকের মত বিষণ্ণতা আর কিছু নেই। কোকিলের ডাক মানেই অ্যানুয়াল পরীক্ষার ঘণ্টা… সেই স্মৃতির ভূত তাড়া করে আজও গ্রীষ্মের শুনশান দুপুরগুলোতে! বাচ্ছাবাচ্ছা ছেলেমেয়েরা ভেজা চুল টেরি কেটে কপালে দই এর ফোঁটা মেখে প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে দেখলে সেডিস্টিক আনন্দ হয়! মনটা হালকা হয়ে আসে তখন। আনন্দে বিড়ি ধরাতে ইচ্ছে করে। তারপর গায়ে লাগে বসন্তের দখিণা পবন। অহো! ললিত বসন্ত বিলাসে কে আসে এই মধুর পিয়াসে… বড় হয়ে ওঠার মত আনন্দ আর কিছুতে নেই। যারা ছোটবেলাটাই ভালো ছিল ইত্যাদি নেকুপুশু আদিখ্যেতা করে করে ফেসবুকের দেওয়াল ভরিয়ে ফেলে তারা আসলে জোচ্চোর এবং অসৎ।

আমার জীবনে ছোটবেলার মত বোরিং পিরিয়ড আর নেই। বিশেষ করে ইস্কুল জীবন। ওহ কি অসহ্য সেই ১১ টা থেকে ৪ পর্যন্ত ইস্কুল নামক নরকের কড়াই তে ভাজা ভাজা হওয়া। আমাদের স্কুল টা ছিল একটা বহু প্রাচীন সরকারী স্কুল। ফলে দু’ একজন বাদে অধিকাংশ মাষ্টারমশাইরা মানুষ হিসাবে ছিলেন আদ্যান্ত বোরিং এবং ক্লান্ত। সরকারী চাকরীর কর্মহীন সংস্কৃতি আর নিজেদের জীবনের নানাবিধ ফ্রাস্ট্রেশান তাদের চাল চলনে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গে প্রতি মুহূর্তে প্রতীয়মান হয়ে উঠত। তাদের মুখমণ্ডলের কুঞ্চিত বলি রেখায় ফুটে উঠতো জীবনের প্রতি এক তীব্র বিতৃষ্ণা। ছাত্রদের কে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং স্কুলপাঠ্য বইয়ের জগতের বাইরেও যে একটা অন্য জগত রয়েছে তার সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য নিজেদের যে পরিমাণ অধ্যাবসায় ও এন্থুসিয়াসম প্রয়োজন হয় তার কোনটাই বেশীরভাগ মাষ্টারদের মধ্যে ছিলোনা। ফলত তাঁরা যখন ব্ল্যাকবোর্ডে খড়ি দিয়ে থোড় বড়ি খাড়া অঙ্ক বা বিজ্ঞান ঘষতেন বা ইতিহাসের কোনও একটা বিবর্ণ অধ্যায় রিডিং পড়তে বলে বসে বসে ঢুলতেন তখন আমার চোখ চলে যেত জানলার বাইরে দিয়ে রাস্তার ওপারের বাড়ির কার্নিশে বসে থাকা বেড়াল টার দিকে। বেড়াল টার চোখের মধ্যে দুটো কাঁচের গুলি ছিল, যা থেকে নানা রঙের আবছা ও নরম আলো প্রতিফলিত হয়ে এসে পড়তো আমার অঙ্ক খাতার সাদা ক্যানভাসে। আর আমি এক অদ্ভুত অচেনা বিস্ময়ে ক্যাবলার মত সেই সব নাম না জানা আলোদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক সময় স্যার এসে কান মুলে বা মাথায় চাঁটি মেরে আমার নেশা কাটাতেন। ক্লাস ভর্তি ছাত্ররা হেসে উঠতো হো হো করে। বেড়াল টাও হাসতো। আমি বলতাম, “দেখুন স্যার বেড়াল টা কেমন হাসছে”। স্যার দেখতে পেতেন না। ঘন হলদেটে সবুজ থকথকে পিচুটি তে ঢাকা চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকাতেন। “বেড়াল টা হাসছে, তাই না? জানোয়ার ছেলে…” বলতে বলতে শুরু হত কিল চড় ঘুষি বর্ষণ। বখাটে ছাত্রের ফচকেমি তে এমব্যারাসড মাষ্টারমশাই এর তখন গোটা ক্লাসের সামনে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান বাঁচানোর লড়াই! সময় মত ডিএ না পাওয়ার যন্ত্রনা, কলিগ এর কোচিং ক্লাসের পসারের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি, স্ত্রী কে বিছানায় সুখী করতে না পারার হতাশা, পুরনো স্টাফ কোয়ার্টারের ফুটো ছাত থেকে জল পড়ার বিরক্তি, এই সমস্ত বঞ্চনার জমে থাকা ক্ষোভ যেন এই বখাটে স্কুল ছাত্রের ফচকেমি তে আগুনে ঘি দেওয়ার মত অব্যর্থ ভাবে আউটবার্স্ট করতো। ছোটবেলায় প্রচুর খেলাধুলো করার ফলে আমার সহনশক্তি কিঞ্চিৎ বেশী ছিল, ফলে আমি প্রায় নির্বিকার মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে মার খেয়ে যেতে পারতাম। আর এর ফলে স্যারের ফ্রাস্ট্রেশান আরো বৃদ্ধি পেত, মারের টেম্পার ক্রমশ বাড়তে থাকতো। কিন্তু এই মারের চোটে আমার যত না কষ্ট হত তার চেয়েও বেশী খারাপ লাগতো স্যারের জন্য। মনে হত প্রেমিকার মত কোলের উষ্ণ উদ্দীপনায় শুইয়ে বিলি কেটে দিই ওই অর্ধেক পেকে যাওয়া চুলের গোড়ায়। শীতল পাটির স্নেহ-সজ্জায় শুইয়ে হোমো সোহাগে ভরিয়ে দিই ওই বুভুক্ষু শরীরের প্রতি টি ব্যর্থ গ্রন্থি কে। কতদিন মানুষের ভালোবাসা পায়নি ওই হৃদয়, আহা! কতদিন পৃথিবীর সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত ওই প্রাণ, হায়! একটা অদ্ভুত মায়া হত। এখনও হয়।

***

এপ্রিলের শুরুতেই এ বছর ভয়ানক দাবদাহের চোটে সকলের অবস্থা ঢিলে। যদিও আমার গরম খুব একটা খারাপ লাগেনা। বস্তুত আমি গরম ভালোবাসি বললেও খুব একটা ভুল বলা হয়না। গরমের দুপুর গুলো আমার চিরকাল বেশ হ্যালুসিনেটিং মনে হয়। চারিদিক গরমে থমথম করছে, রাস্তায় জনপ্রাণী নেই, পশু পাখি সব ছায়ার আশ্রয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে, এরকম সময় গুলো আমার বিশেষ প্রিয়। বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় যেন কোনও পরিত্যক্ত ডেসার্টেড শহর কে দেখছি। মরুভূমিতে বেড়াতে যাওয়া আমার হয়নি, কিন্তু এই সময় গুলো মার্কেজ এর গল্পের অদ্ভুত রুক্ষ মরু শহর গুলোর কথা মনে পড়ে। যেন একটা কঠিন রোগের প্রকোপে গোটা শহরের সব লোক মারা গেছে, আর তাদের ক্ষুদ্র অকিঞ্চিৎকর জীবনের আজন্ম লালিত ছেঁড়া খোঁড়া স্বপ্ন গুলোর মধ্যে আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের বারান্দার দড়িতে দুটো সায়া আর একটা গেঞ্জি কেচে ঝুলিয়ে দেওয়া আছে। হয়ত বাথরুমের এক কোণে জড়ো করা সার্ফের প্যাকেট টাও এখনও রাখা আছে, কাচার পরে যেমন রাখা হয়েছিল। সায়ার দড়িতে ভুলবশত একটা গিঁট পড়ে রয়েছে, যেটা হয়ত এক সময় কেউ খোলবার চেষ্টা করেছিল ও ব্যর্থ হয়েছিল। মাঝে মধ্যে ছুটে আসা গরমের হল্কা হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে কাগজের টুকরো, ঠোঙা। ঠোঙার গায়ে ছাপার অক্ষরে প্রতি টা শব্দ যেন নৈর্ব্যক্তিক, মুক্ত প্রাণ। মানুষের প্রয়োজনে অর্থ ভারে অন্তঃসত্বা হয়ে ওঠার দায় নেই আর তাদের। দেওয়ালে পশ্চিম বঙ্গের বিধানসভা ভোটের দেওয়াল-লিখনের রঙ চঙে আঁকাজোকা গুলো যেন মানবেতিহাসের সুদীর্ঘ চিত্রনাট্যে এক ঝলক কমিক রিলিফ! হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা ভোগের ইতিহাসে আরও কিছু  মৃত নাম, মৃত শহরের দেওয়ালে লেগে রয়েছে স্বাদগন্ধহীন পরিত্যক্ত চুইংগামের মত! ফ্ল্যাটের সারি সারি ঘরগুলোর প্রতি টা জানলা কালো কাচে ঢাকা। কেননা মৃত্যুর পরেও আমাদের সম্পত্তি আমাদেরই থেকে যায়। তাই মৃত্যুর আগে মানুষ বন্ধ করে রেখে যায় তার সমস্ত জানালা। জীবন্ত মানুষ চায় সেই মৃত জানলায় উঁকি দিয়ে দেখে নিতে। কিন্তু তারা আসলে ভয় পায় সেই জানালা খুলতে। অথচ তারা জানেনা যে জানালা বন্ধ করে রেখে মৃত্যু কে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। আমাদের ঠাকুর ঘরের বেদীতে আমার মৃত ঠাকুরদা’র এক জোড়া চটি রাখা আছে এখনও। যদিও ঠাকুরদা মৃত, কিন্তু চটি গুলো আজও ঠাকুরদা’র-ই। এভাবেই বন্ধ জানালার এপারেও মৃত্যু আমাদের সঙ্গেই রয়ে যায় ছায়ার মত। প্রতিদিন সকলের অলক্ষ্যে আদায় করে নেয় বাতাসা ও জল।

***

বেসিক্যালি আমার জীবন টা একটা শূন্য থেকে শুরু করে আরো একটা বিশাল শূন্যের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু তার জন্য কোনো ক্ষোভ বা হতাশা যে আছে তা বলা যায় না। আলস্য আমার অঙ্গের ছাল, অপদার্থতা আমার মস্তকের তাজ, ব্যর্থতা আমার হস্তের আয়ুধ। এখন বসে আছি আমার অন্ধকার ঘর টাতে, পিছন থেকে একটা টেবিল ফ্যান ঘরঘর শব্দ করে আমার ভার্জিন নিতম্বে ঠাণ্ডা হাওয়া যুগিয়ে চলেছে, আর আমি এই প্রায় বারো বছরের বুড়ো কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে যা মনে হচ্ছে টাইপ করছি। আজ আটাশে চৈত্র, শুক্লা চতুর্থী, রাত তিনটে কুড়ি। সন্ধ্যের দিকে আমার বাড়ির পশ্চিমে দুটো সুপুরি গাছের পিছন থেকে একটা কাস্তের মত চাঁদ উঠেছিল, এখন সেটার মধ্য গগনে থাকার কথা।

চারিদিকের পরিবেশ পরিস্থিতি বেশ গোলমেলে। সে সব নিয়ে তাই আজকাল আর ভাবিনা। যা হচ্ছে হোক, মরুজ্ঞে যাক! কোনও এক প্রকারে নিজের বরাদ্দ সময় টা কে কাটিয়ে যাওয়াটাই একমাত্র উদ্দেশ্য। কে যেন বলেছিল বেঁচে থাকতে গেলে নাকি একটা ছাপ রেখে যেতে হয়। কিন্তু আমার ছাপ রেখে যাওয়ার কোনও দায় নেই। কাফকা নাকি মরবার সময় নিজের সব লেখাপত্র পুড়িয়ে দিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ম্যাক্স ব্রড কাফকার কথা রাখেনি। সে সব কিছু পাবলিশ করে দিলো। অনেকে বলে ম্যাক্স ব্রড পৃথিবীর সাহিত্য কে বাঁচিয়ে দিয়ে গেসলো। আমার তো মনে হয় পুড়িয়ে দিলেই ভালো হত। কারণ মৃত্যুর পরেও কাফকার লেখা কাফকারই সম্পত্তি। একজন মানুষ মৃত বলেই তার সঙ্গে এভাবে কথার খেলাপ করা টা মোটেই ভালো কাজ নয়। কাফকা চায়নি কোনও ছাপ রেখে যেতে। পৃথিবীর মানুষের প্রতি কোনও দায় তার ছিলোনা, না থাকাই স্বাভাবিক। যেমন একজন মুক্তকচ্ছ সন্ন্যাসী একদিন সংসারের পাট চুকিয়ে দিয়ে হিমালয়ের পথে চলে যায়। আর কেউ খোঁজ পায় না তার। অথচ তথাগত কে ফিরে আসতে হয়েছিল। কিসের টানে? ধর্মসংস্থাপনার্থায়? নাকি ছাপ রেখে যাওয়ার তীব্র বাসনা? কাফকা পেরেছিলেন নৈর্ব্যক্তিক শূন্যতায় পৌছতে, বুদ্ধ পারেননি।

আসলে গরম পড়লেই আমার মাথার ভিতরে এইসব নানাবিধ ভুলভাল চিন্তা ভাবনা ঘুরতে শুরু করে। কোনটার সঙ্গে কোনটার কোনো যোগাযোগ নেইও, আবার আছেও, আবার আছেও এবং নেইও, আবার এ দুটোর কোনটাই নয়! আমি জোর করে চেষ্টা করি সবাই কে এক সূত্রে গেঁথে নিজস্ব প্রকৃতি রচনা করার। কিছুই হয় না বুঝতে পারি, কারণ কিছুই আসলে হওয়ার নেই। শূন্য থেকে শূন্য গেলে শূন্যই পড়ে থাকে। তাই সব ছেড়ে জানলার দিকে তাকিয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল চিন্তা করি। জানালার বাইরে অন্ধকার রাত দেখতে পাই। দেখতে পাই গ্রীষ্মের দাবদাহে হিমায়িত মৃত শহর টা কে। আর দেখতে পাই জানলার বাইরে শূন্যে লটকে থাকা সেই বেড়ালের হাসিটা!     

গ্রীষ্মের প্রলাপ ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments