বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ যে কতখানি জায়গা জুড়ে আছেন তা আমার কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কের RNT ফোল্ডারটার মাপ দেখলেই বোঝা যায়। অন্যরাও অনেকেই আছেন তবে ওনার তুলনায় তাদের স্মৃতিকোষের (মেমারির) ভাগ যথেষ্টই কম। মানে উনি যদি টেরাবাইটার হন বাকিরা তাহলে হলো গিয়ে গিগা কিম্বা মেগাবাইটার। কিন্তু আমার মনে হয় সাহিত্যে কারো অবদান বাইটে মাপাটা অনেকটা কোন ক্রিকেটার কতদিন ধরে কত বল বা ব্যাট করেছেন, সেরকম একটা দিকশুন্য পরিসংখ্যানের মত হয়ে দাঁড়ায়। উনি রান কত করেছেন বা উইকেট কটা নিয়েছেন সেটার হিসেব না করলে তার প্রতি একটা অওফুল অন্যায় ও অবভিয়াস অবিচার করা হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজের জীবনকালে ব্যক্তিগত ভাবে অনেক কাছের মানুষদের অকালে হারিয়েছেন , নিদারুন কষ্ট পেয়েছেন ও সেগুলোই বোধহয় অনেক সময় তার লেখায় জীবনবোধের রসদ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। কাকতালীয় হলেও অনেক সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রে এইরূপ ট্রাজেডি হয়ে থাকত এবং এখনও হয়ত হয়ে থাকে । নজরুল কে তো সেই শোক ‘বিদ্রোহী’ থেকে একটানে ‘উন্মাদ’ বানিয়ে ছেড়েছিল। বাইটে না মাপলেও এরকম ট্রাজেডির শিকার আরও যেই দুই ডাকসাইটে মহারথী আমার হৃদয়ের অনেকাংশই জুড়ে বসে আছেন তারা হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী ওরফে সিঁতু মিঞা ও অন্যজন রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরাম। এরাও নিজেদের এইরকম ব্যক্তিগত ধারাবাহিক দুঃখগুলোকে দিনের পর দিন উপেক্ষা করে তাদের ক্ষুরধার ব্যাঙ্গাত্মক লেখার মাধ্যমে আমাদের হাসিয়েছেন, ভাবিয়েছেন এবং এক ঝটকায় অনেকখানি বড় হয়ে উঠতে বাধ্য করেছেন। রাজশেখর বাবুদের পারিবারিক স্বর্ণকারের নাম ছিল তারাচাঁদ পরশুরাম ও উনি সেই উপাধি ধার করেন নিজের ছদ্মনাম হিসেবে, কুঠারহস্ত ক্ষত্রিয়হন্তা পুরাণের পরশুরামের এর সাথে কোনো যোগাযোগ নেই । দারভাঙ্গায় বড় হওয়ার দরুন গোড়ার দিকে উনি হিন্দিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন ও অনেক পরে বাংলা শেখেন ও সেই ভাষায় লেখা শুরু করেন। আজ সীতা, কাল লক্ষণ তো পরশু রাম ! তা এই পরশুরামের গল্পের বইয়ের ভূমিকাতে স্বয়ং গুরুদেব লিখেছিলেন , ” পিতৃদত্ত নামের ওপর তর্ক চলে না কিন্ত স্বকৃত নামের যোগ্যতা সমালোচকের আছে। পরন্ত অস্ত্রটা রূপধ্বংসকারীর , তাহা রূপসৃষ্টিকারীর নহে। পরশুরাম নামটি শুনিয়া পাঠকের সন্দেহ হইতে পারে যে লেখক বুঝি জখম করিবার কাজে প্রবৃত্ত। কথাটা একেবারেই সত্যি নহে। বইখানি চরিত্র চিত্রশালা। মুর্তিকারের ঘরে ঢুকিলে পাথর ভাঙ্গার আওয়াজ শুনিয়া যদি মনে করি ভাঙ্গা চোরাই তার কাজ তবে সে ধারণাটা ছেলেমানুষের মত হয়, ঠিকভাবে দেখলে বুঝা যায় গড়িয়া তোলাই তাহার ব্যবসা। ” এই পরশুরাম কিম্বা আলী সাহেব যে অজস্র চরিত্রদের নিয়ে নিপুণভাবে চিত্রশালা তৈরী করেছিলেন তারা আজ কোথাও না কোথাও ঘুরে বেড়ায়। এরা কখনো ঘুম ভাঙ্গায় আবার কখনো বা ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এরা স্বপ্নে ও জাগরণে ফিরে ফিরে এসে সেই বইয়ের পাতার অক্ষরগুলোকে চোখ কিম্বা কানের ভেতর দিয়ে মগজে পৌছে দেয়, বলছিলাম না এক ধাক্কায় অনেকখানি বড় করে দেয়।

এবার আসি আমার বড় হয়ে ওঠার পথে যে চরিত্ররা আজও প্রায়শই উঁকি দেয় তাদের গল্প নিয়ে। না উঁকি দেয় বলাটা ঠিক নয়, কেননা রোজ না হলেও মাঝে মধ্যেই এদেরকে এদিক সেদিক যেতে আসতে দেখা যায়। সময়ের সাথে সাথে এই চরিত্রগুলো হয়তো অনেকখানি বদলে গেছে অথবা একটুকুও বদলায়নি, এক্কেবারেই সেরকমটি রয়েছে। পরিবর্তনগুলি কখনও বাহ্যিক , কখনও অভ্যন্তরীণ আবার কখনো দুক্ষেত্রেই সমান। আজকে ওই সেইরকম এক চরিত্র নিয়ে লিখব যে এক্কেবারেই পাল্টায়নি । চরিত্রটি আমাদের পাড়ার প্রাচীন প্রবাদ পুলুদা (আসল নামটা লিখলে আমার টাকে গাট্টাবৃষ্টি হতে পারে তাই বদলে দিলুম)। প্রাচীন প্রবাদগুলোর মধ্যে একটা হলো যে কোনো এক মন্বন্তরের সময় পুলুদার বয়সের মানপত্র হারিয়ে যায় ও তখন থেকে তার বয়সটাও যেন থম মেরে গেছে। তাকে তখনও যেরকমটি দেখতে ছিল আজও নাকি তাকে ঠিক সেরকমটি দেখতে রয়েছে। তামাটে রং ,কোঁকড়ানো কালো চুল ,ছিপছিপে চেহারা সুধু খুঁত বলতে ওপরের পাটির দাঁতটা এই ইঞ্চি দেড়েক কোদালের মতন বাইরের দিকে বার করা। শোনা যায় যাত্রা পালায় এক কালে দ্রৌপদির অভিনয় করতে গিয়ে সুধু ওই উঁচু দাঁতের জন্য বেজায় প্যাঁক খেয়েছিল। সেই যে অপমানিত হয়েছিল আর কোনদিন সে স্টেজে ওঠেনি। আরেকবার ১৫ই অগাস্ট পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলার সময় পুলুদা ডজ করে ভাঁজ মেরে যেই নেটে বল ঢোকালো অমনি লাইন্সম্যানের বাঁশি বেজে উঠলো – অফসাইড ! পুলুদা খেপে ফায়ার , “কিসের অফসাইড? দেখলেন না , অপনেন্টের দু দুটো প্লেয়ার আমায় পাশ থেকে গোতাচ্ছে ! কানা নাকি? ” লাইন্সম্যানের যুক্তি পুলুদার বডি ঠিক জায়গায় থাকলেও দাঁতটা সামান্য রংসাইডে পড়ে গেছিল, ব্যাস এটা বলতেই মাঠে একেবারে ফ্রিস্টাইল বাওয়াল শুরু হয়ে গেল। সেই থেকে পুলুদা আর জার্সি পরে কখনও মাঠেও নামেনি। সুধু দাতের জন্যে এতগুলো ত্যাগস্বীকার করে শেষমেষ পুলুদা ঠিক করলো সে জেনারেল অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু করবে। বলে রাখি পুলুদারা অনেক ভাইবোন ও আক্ষরিক অর্থে ভোজনং যত্র তত্র ও সযনং গৃহস্বামী ও পরিবার বেড়াতে যাওয়ার ফলে পাহাড়া দেওয়ার জন্য ফাঁকা বাড়িতে। ভোজনটা যদিও মাঝেই মাঝেই ভোজ হয়ে যেত কেননা রাতে মরা পোড়ানো কিম্বা বিয়েবাড়িতে গাড়ি কিম্বা ফুলের সাপ্লাই দেওয়াটা পুলুদা অহরহ করে থাকত। ফিরে আসি অর্ডার সাপ্লাইতে, পাড়ার এক উঠতি ডেপো ছোকড়া একদিন পুলুদা কে জিগ্গেস করে বসলো , ” জেনারেল অর্ডার সাপ্লাই মানে তুমি কি যা বলব তা সাপ্লাই দিতে পারবে?”পুলুদা বেশ উত্সাহ নিয়ে বলল , “হ্যাঁ’ , হ্যাঁ বলনা কি লাগবে ?”
“এই অল্প ব্যাড়া লাগত। .”
“কিসের ব্যাড়া , বেতের ?”
“হ্যাঁ বেতের হলেও হয় , মজবুত হলেই হলো। ”
” আলবত মজবুত হবে, কতখানি লাগবে?”
“বেশি না, ধর এই ইঞ্চি চারেক হলেই হবে ”
এবার একটু ভ্রু কুঁচকালো পুলুদা ” ঐটুকুনি, কোথায় লাগাবি?”
“আরে বাবা মাপটা বড় কথা নয়, একটা দামী রাষ্টীয় সম্পদ রক্ষা করতে হবে ”
“বাব্বা , তা কি সেই সম্পদ শুনি, কোহিনুর হিরে ফিরে নাকি?”
” না, তোমার ওপরের পাটির দাঁতগুলো , কোহিনূরের চেয়েও ঢের দামী।.” বলেই সে ছেলে চপ্পল মাথায় এক দৌড়ে পগার পার । এর পর পুলুদা সেই জেনারেল অর্ডার সাপ্লাই করাও বন্ধ করে দেয়।

পুলুদা এমনি সময় যখন রকে বসে ছেলে ছোকরার দের সাথে আড্ডা দেয় তখন হরেক বয়সের জনগণ সেখানে জমায়েত হয় ও বাবা কাকাদের সমবয়সীরা ছাড়া আমি দেখেছি পঞ্চাশর্ধ থেকে উনিশ কুড়ি বছরের যুবকেরা তাকে পুলুদা বলেই ডাকে। দুপুর হলে সে রাস্তার কলে স্নান সেরেই চাড্ডি গিলে আবার রকে ফিরে দেদার রকমের এন্টারটেইনমেন্ট মূলক একটিভিটি দিতে থাকে। এই যেরকম কেউ জোরে বাইক বা সাইকেল চালিয়ে গেলে অমনি শোনা যাবে , ” বাবা কি গতি, ছায়াটাও ঠিক করে পাল্লা দিতে পারছে না!” আবার মাঞ্জা মেরে কোনো মহিলা কে দেখে হয়ত সে বলে উঠলো , “আমি তো ভাবলাম বসাক বস্ত্রালয়ের সেই মানেকুইনটা ট্রলি চেপে এদিকে এগিয়ে আসছে !”
আবার পুলুদার হিন্দি সিনেমা নিয়ে প্রচুর উত্সাহ থাকলেও হিন্দি ভাষা নিয়ে সেরকম একটা কনফিডেন্স ছিলনা। আমাকে একদিন ধরে জিগ্গেস করলো , ” আচ্ছা এই ‘দিল ধক ধক করনে লাগা ‘ মানে টা ঠিক কি?” আমি বললাম ” মানে হৃদপিন্ড ধরাস ধরাস করছে… ”
“ওই দেখো, আমি ভাবতাম এর মানেটা হচ্ছে , বুকে ধক থাকলে একবারটি আমায় লাগা..দেখেছ কান্ড ! আচ্ছা ‘ হাম কিসিসে কম নাহি ‘….এটার মানে?”
আমি আবার বললাম , ” এটা তো সহজ, আমি কারো থেকে কম নই…”
পুলুদা আবার জিভ কাটল, ” বোঝো ঠেলা, আমি ভাবতাম এর মানে হচ্ছে, আমি কোনো কম্মের নই….ইসস, ছ্যা ছ্যা !”
ব্যাঙ্গাত্মক ধারাবিবরণী ছাড়াও পুলুদার আরেকটা প্রিয় কাজ হলো লোকজনকে আগ বাড়িয়ে ঠিকানা ও রাস্তা বাতলে দেওয়া। পুলুদার চরিত্র কাহিনী শেষ করব সেরকম এক এপিক ঘটনা বলে। একবার এই বিকেল নাগাদ যখন পুলুদা কার ঘাড় ভেঙ্গে চা কিম্বা কাকে পটিয়ে ফিল্টার উইলস খাওয়া যায় এইসবের হিসেব করছে , একজন চশমা পরিহিত কাঁধে সাইডব্যাগ ঝোলানো মাঝবয়সী লোক সরাসরি পুলুদাকেই জিগ্গেস করলো , ” আচ্ছা জাগৃতি সংঘের ক্লাব কি ভাবে যাব, বলতে পারেন? ” পুলুদা একটু মেপে টেপে উত্তর দিল , ” সোজা যাবেন ৬০০ মিটার মতন, তার পর বা দিকে আরো ২০০ মিটার। এবারে সোজা ৪০০ মিটার হাঁটবেন তারপর দেখবেন ডান দিকে নিচের দিকে একটা কাঁচা রাস্তা নেমে গেছে। সেটা যেরকম তেরে বেঁকে চলে গেছে আপনিও সেরকম এঁকে বেঁকে চলতে থাকবেন, যেখানে ধাক্কা খাবেন সেটাই জাগৃতি সংঘের ক্লাব.. ” ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়েই জিগ্গেস করলেন , ” এঁকে বেঁকে চলে যাব, এটা কোথাকার ভাষা ?”
পুলুদাও ছাড়ার পত্র নন , “আপনাকে কি তাহলে দ্রাঘিমাংশ ধরে বলতে হবে নাকি, আপনি কি ভূগোলের প্রফেসর ?”
“হ্যাঁ, আমি সিটি কলেজে ভূগোলের অধ্যাপনা করি। ”
পুলুদা এবার একটু নড়ে চরে বসলো, ” সরি স্যার , আপনি অধ্যাপক সেটা ঠিক বুঝতে পারিনি। তা স্যার আমার একটা মৌলিক প্রশ্ন ছিল যদি বলেন তো জিগ্গেস করি। ”
ভদ্রলোকের মুখ থেকে বিরক্তির আলগা ভাবটা এখনো যায়নি তবুও সে বলল, ” কর..”
” আচ্ছা স্যার ছোটবেলা থেকে পৃথিবীর জল ও স্থল-এর অনুপাত সম্বন্ধে ভুগোলে আমাদের কি সেখান হয় ?”
” কি সেখান হয় জানোনা ? ফাজলাম হচ্ছে?”
” আহা আপনার মুখ থেকেই শুনি না স্যার। ”
“পৃথিবীর তিন ভাগ জল ও এক ভাগ স্থল ..”
পুলুদা লাফিয়ে উঠলো , ” ব্যাস এটাই আমার সমস্যা..”
ভদ্রলোক আবার বিরক্তিভরে চেচিয়ে উঠলেন, ” এতে সমস্যা কোথায়?”
পুলুদা এবার মিচকে হাসি দিয়ে জিগ্গেস করলো, ” তা স্যার আপনার ওই তিন ভাগ জল দাড়িয়ে আছে কার ওপর?”
ভদ্রলোক খানিকটা চমকে গেলেও বুঝতে দিলেন না , ” তুমি যেরকম ভাবছ সেরকম নয়, তিন ভাগ জল স্থলভূমির ওপরে থাকেলেও সেই স্তরের নিজে আবার জলস্তর আছে…”
পুলুদার চট মন্তব্য, ” সেই জলস্তরের নিচে কি….”
ভদ্রলোক এবার ধৈর্য্য হারিয়ে বললেন, ” কি বলতে চাইছ কি তুমি..”
পুলুদা এবার গাল ভরা গর্বের হাসি নিয়ে বলল, ” বলছি কিছুই না, আপনারা পন্ডিত মানুষ। মান্ধাতা আমলের সিলেবাস, বই এগুলো সব এবার একটু বদলান। আমাদের না হয় তিনকাল এসে এক কালে ঠেকেছে কিন্তু ভবিষ্যত প্রজন্মর জানা উচিত যে পৃথিবীটা পুরোটাই স্থল সুধু নিচু গত্তগুলয় অল্প জল জমে আছে মানে কাল যদি কেউ সেই জল গুলো পাম্প দিয়ে বার করে নিয়ে মঙ্গল গ্রহে চালান দেয় তাহলে এখানে পুরোটাই স্থল পরে থাকবে…”
আসে পাশের সবাই হো হো করে হেসে উঠলো ও ভদ্রলোক কিরকম একটা সদ্য হ্যাঠিত মুখ করে পুলুদার বাতলে দেওয়া সোজা রাস্তায় হন্টন লাগলেন।

চরিতনামা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments