বর্ষার মাইয়ু পাহাড়ে বেশ ঠাণ্ডা তার ওপরে মাঝে মাঝেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। রফিকের পরনে একটা চেক লোঙ্গাই আর গায়ে বছর তিনেক আগের ঈদে মাউংডোউ জেলা সদরের বাজার থেকে কেনা একটা রংচটা গেঞ্জি। অন্য একটা লোঙ্গাই দিয়ে পিঠে বাঁধা দু’বছরের আব্দুল। কাঁধে ঝুলছে গামছায় বাঁধা একটা পোঁটলা। পাশেপাশে হাঁটছে হামিদাবিবি। হামিদার হাতেও একটা বড় পুঁটলি। পিঠে বাঁধা ন’মাসের নাসরিন। ওদের দু’জনের হাতেই একটা করে কাঠের বাঁটওলা ছাতা। এই ছাতার আড়ালই গত পাঁচদিন ধরে ওদের মাথার একমাত্র আচ্ছাদন।

রাতের জমাট অন্ধকারে ভেসে আসছে একটানা ঝিঁঝিঁর আওয়াজ। মাঝেমাঝেই নিস্তব্ধ চরাচর বিদীর্ণ করে দিচ্ছে শেয়ালের লোভী অথবা হায়নার ভয়াল ডাক। পাহাড়ের জংলি ঝোপ কেটে বানানো অস্থায়ী আস্তানায় দিনভর পথ চলায় ক্লান্ত চোখ দুটো বুজে আসছে রফিকের। কিন্তু অনিশ্চয়তার ভয় ওকে ঘুমতে দিচ্ছে না। হামিদার পোঁটলায় বাঁধা শেষ চিঁড়েটুকুও আজ গুড় দিয়ে আব্দুলকে খাইয়ে দিয়েছে হামিদা। নাসরিনের জন্যে মায়ের বুকের দুধ থাকলেও খালিপেটে হামিদাই বা তা কতদিন জোগান দেবে। ওদের ‘খাইন থা মা’ গ্রামের মাটির বড়িতে আর্মির লোকের আগুন লাগানোর দিনটা মনে পড়তেই যেন সারা শরীর কেঁপে উঠল রফিকের। গত কয়েক মাস ধরেই একটা চাপা উত্তেজনা টের পাচ্ছিল গ্রামের প্রত্যেকেই। আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির জিহাদিরা মাউংডোউ সেনা ছাউনিতে হামলা করে প্রচুর সেনা মেরে ছাউনি উড়িয়ে দেওয়ার খবর আসতেই বুকে কাঁপুনি ধরেছিল রফিকের। বুঝতে পারছিল ওদের জন্মস্থানের মাটির মায়া ত্যাগ করে বিবি-বাচ্চাসমেত অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। হয়তো কালই অথবা আজ রাতেই।
জুম্মার ভোরের নমাজের তকবীরের আগেই ঘর ছাড়ল রফিক, হামিদা আব্দুল আর নাসরিনকে সঙ্গে নিয়ে। অসময়ে ঘুম থেকে উঠে নাসরিনটা একটানা ঘ্যানঘ্যান করতে থাকলেও বছর দুয়েকের আব্দুলটা নিশ্চুপ। আব্দুল কী বুঝতে পারছে সামনের অনিশ্চিত দিনগুলোর ভয়াবহতা? দু’বছরের বাচ্চার তো বোঝার কথা নয়। তবুও বাচ্চাটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ। হয়তো আব্বা-আম্মুর ভয়ার্ত চোখমুখ দেখে ভয় পেয়েছে বাচ্চাটাও। গ্রাম ছাড়িয়ে জঙ্গলের পথ ধরতেই রফিক ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ বোলাল চিরদিনের মত পেছনে ফেলে আসা গ্রামের দিকে। সদ্য ভোরের আলো মাখতে থাকা রফিকের গ্রামের আকাশে ততক্ষণে ঘর জ্বলতে থাকা আগুনের লেলিহান শিখা ছুঁয়েছে। সেই রক্তাক্ত আগুনরঙা আকাশে নিজের অতীতকে পুড়তে দেখতে দেখতেই পাহাড়ি জঙ্গলের পথে পা বাড়াল রফিক। জঙ্গলের পথ ধরেই চলতে হবে যতটা সম্ভব। সড়ক পথে টহল দিচ্ছে মিলিটারির সাঁজোয়া গাড়ি। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় কতদিন ধরে কতটা পথ চললে খুঁজে পাবে ভয়হীন নতুন জীবনের অস্পষ্ট রেখা জানেনা ওদের দু’জনের কেউই। অনিশ্চিত অজানা পথে অবিরাম চলার নামই যে জীবন তা বুঝতে বুঝতেই রফিক পেরিয়ে যায় মাউংডোউ শহর ঘেঁষা জনমানুষ শূন্য পিয়াউং পিয়েট গ্রাম। মাত্র কিছুদিন আগেও প্রাণচঞ্চল এক জনপদের কঙ্কাল পেরতে পেরতেই রফিকের মনে পড়ল ওর চাষের জমির কথা, ওর কুঁড়ের চালের ওপর লতানো লাউগাছের সদ্যফোটা ফুল অথবা কানে বেজে উঠল নিকনো উঠোনে টলোমলো পায়ে দৌড়ানো দাদা আব্দুলের পেছনে পেছনে হামাগুড়ি দিতে দিতে ছোট্ট নাসরিনের খিলখিল হাসির শব্দ। বেশ কিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বাড়ির কঙ্কালের পাশেই আধপোড়া মানুষের লাশকে পেছনে ফেলে একটু এগোতেই মুখোমুখি দুই সাক্ষাত যমদূতের। অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে ওদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে দুই আর্মি জোয়ান। ওরা বাংলাদেশ চলে যাচ্ছে জানানোর পর ওদের পথ ছাড়লেও ছিনিয়ে নিলো হামিদার হাতের দু’গাছা চুড়ি আর কানের দুল। ওই সোনাটুকুই ওদের শেষ সম্বল ছিল। রফিকের কষ্ট হলেও মনেমনে আল্লাকে সুক্রিয়া না জানিয়ে পারল না। শুধু চুড়িতে আর কানের দুলেই, হামিদার শরীরে নজর পড়েনি দুই আর্মি জওয়ানের।

ছিন্নমূল – ১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments