বছর বারোর দেওর রামু আর পেটের ছ’মাসের বাচ্চাটাকে সম্বল করেই ওর ননদ লক্ষ্মী বুড়ো শ্বশুর আর স্বামী জগন্নাথ নস্কর সমেত দাউদাউ আগুনে জ্বলতে থাকা ঘরকে পেছনে ফেলেই গ্রাম ছেড়েছিল রাখী নস্কর। মাউংডোউ শহরের অনতিদূরে খা মাউক সেইক গ্রামের সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের গৃহবধূ হয়ে রাখী সিত্তাওয়ে থেকে এসেছে পুরো এক বছরও হয়নি। গঞ্জে পারিবারিক সোনার দোকান। শাশুড়ি গত হয়েছেন বেশ কিছু বছর আগেই। বুড়ো শ্বশুর নাবালক দেওর যুবতী অবিবাহিত ননদ লক্ষ্মী আর স্বামী নিয়ে সুখের সংসার। সংসারটা নিজের মত করে গুছিয়ে নিতে নিতেই বাড়তে শুরু করল অশান্তির আগুন। জগন্নাথ অনেকদিন ধরেই ইন্ডিয়ায় পালানোর প্ল্যান ছকছিল। কিন্তু বাবার আপত্তিতে হয়ে উঠছিল না। বাপ-দাদার ভিটে জমি আর তিলতিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা, সব কিছুকে পেছনে ফেলে উদ্বাস্তু হয়ে ইন্ডিয়ায় পালানোতে একেবারেই মত ছিল না বৃদ্ধ রামপ্রসাদ নস্করের। জগন্নাথ বাবাকে বোঝাতেই পারেনি জীবন আর বৌ-বোনের ইজ্জতের দাম জমি-বাড়ি-সম্পত্তির থেকে অনেক বেশি। অবশ্য জেহাদি গোষ্ঠীকে নিয়মিত অর্থ যুগিয়েও ওদের তরফ থেকে দেশ না ছাড়ার হুমকি অথবা চাপ দুটোই ছিল। তবুও জগন্নাথ মরীয়া হয়েই ঠিক করেছিল বাড়িতে লুকনো সোনা পোঁটলায় বেঁধে দেশ ছাড়বে।
মাউংডোউ সেনা ছাউনিতে জেহাদি আক্রমণের পরেই জীবনটা হয়ে উঠল শাঁখের করাত। একদিকে দেশ ছাড়ার জন্যে প্রতিনিয়ত আর্মির চাপ আবার অন্যদিকে জন্মভূমি না ছাড়ার জন্যে জেহাদিদের হুমকি। দুই বিপরীতমুখী চাপের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতেই জগন্নাথ অনেক কষ্টে বাবাকে রাজি করাল।
যেদিন ভর সন্ধেয় মুখে কালো কাপড় বাঁধা দশজনের দলের চার পাঁচজনে জোর করে তুলে নিয়ে গেল লক্ষ্মীকে সেই দিনই গভীর রাতে গ্রাম ছাড়ার জন্যে তৈরি ছিল সকলে। ওরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে আসাতেই সন্দেহ হয়েছিল। ওরা যে আর্মি জওয়ান নয়, ওরা আসলে যে স্থানীয় জেহাদি দলেরই লোক সেটা ওদের নিজেদের মধ্যে স্থানীয় উচ্চারণে বলা কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছিল। লক্ষ্মীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরেই জগন্নাথ বুঝেছিল এবার ওরা হাত বাড়াবে ছ’মাসের পোয়াতি রাখির দিকেও। তাই বাবাকে নিয়ে ওদের পেছন পেছন একটু পরে আসবে বলে রামুকে বৌদির হাতে সঁপে বিদায় জানিয়েছিল জগন্নাথ। স্বামীকে বিপদে ফেলে কিছুতেই যেতে চায়নি রাখী । কিন্তু জগন্নাথের প্রবল জোরাজুরিতে বাড়ির কিছুটা দুরে গাছের আড়াল থেকে নাবালক দেওরের হাত ধরে যারা লক্ষ্মীকে তুলে নিয়ে গেছিল তাদের ফিরে আসতেও দেখল রাখী। অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখল লক্ষ্মীর তছনছ করে দেওয়া উলঙ্গ নিথর দেহটা বাড়ির দাওয়ায় ফেলে জগন্নাথের সঙ্গে বচসার মাঝেই চাকু চালিয়ে দিল ওর গলায়। বোন লক্ষ্মীর নিথর দেহের পাশেই ছটফট করতে করতেই লাশ হয়ে গেল কিছুক্ষণ আগের জলজ্যান্ত মানুষটাও। রামপ্রসাদ তখনো ঘরে। টানতে টানতে দাদা-বোনের লাশ দুটো ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে ওরা আগুন ধরাল। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা বৃদ্ধ রামপ্রসাদের তীব্র আর্তনাদকে ছাপিয়েও মুখোশধারী দুপেয়ে জন্তুগুলোর “আল্লা হু আকবর ” বলে জান্তব উল্লাসে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে রামুর হাত ধরে রাখী নস্কর সেই যে দৌড় শুরু করেছিল একেবারে এসে থামল গ্রামের শেষ প্রান্তের জঙ্গলে।

ছিন্নমূল – ২
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments