আর্মির লোকজন মাঝে মাঝেই আসে বাসায়। জয়নালের বড় বেটা মইনুলের খোজ নিতে। গ্রামের সবাই জানে মইনুল জেহাদি দলে ভিড়েছে। কী সুন্দর বাঁশী বাজাত মইনুল। রাত গভীর হলেই সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিত উদাসী সুর। বড় কোমল মনের ছেলে, কিন্তু রাগলে একেবারে চণ্ডাল। যে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়াল একদিন, সেই মাটিকেই নিজের বলতে না পারার অসহনীয় জমাট বাধা যন্ত্রণা গভীর রাতে ছড়িয়ে পড়ত বাঁশীর সুরে। মাতাল সুর সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে জঙ্গলের প্রতিটি পাতায় ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে আসত। জয়নাল আঁচ পেত বড় বেটার বুকে জমে থাকা আগুনের। তারপর একদিন কাকভোরে চোখ খুলেই বুঝল মইনুল বুকের আগুন নেভাতে ঘর ছেড়েছে। বছর তিনেক হয়ে গেল, ছোট বেটা সিরাজুল তখন পাঁচ বছরের। আর বাড়িমুখো হয়নি। তবে কানাঘুষো শুনতে পায় বড় বেটা বেঁচে আছে। সে নাকি এখন লিবারেশন আর্মির কমান্ডার। আর মইনুল যে বেঁচে আছে সেটা এই আর্মির লোকের মাঝেমাঝেই বাড়ি বয়ে এসে ধমকি দিয়ে যাওয়া দেখেই বুঝতে পারে জয়নাল। আর্মির লোকজনকে আগেও বাসায় আসতে দেখেছে সিরাজুল। আগে শুধুই আব্বু আর আম্মুকে ধমক দিয়ে ভাইজানের কথা জিজ্ঞেস করতো। আর কথা বলতে বলতে আপুর পিঠে পাছায় হাত বোলাত। ভয়ে আর লজ্জায় কুচকে যেত আপু। ওদের দেখলেই দুরে সরে সরে থাকতো সিরাজুল। ভাইজানের ওপর খুব রাগ হত সিরাজুলের। মনে মনে ভাবত ওর জন্যেই ওদের এরকম অবস্থা। ওর জন্যেই আব্বুকে আম্মুকে ধমক খেতে হয়, ওর জন্যেই ওরা হাত বোলায় আপুর শরীরে। শেষবার যখন আর্মির লোক বাসায় এসেছিল তখন আপুর বুকে থাবা মেরে এক নেতা গোছের আর্মি আব্বুকে শাসিয়েছিল – “বেটি কিন্তু ডাগর হয়েছে মিঞা….. পরের বার এসে যদি খবর না পাই…..” পরের বার ওরা কী করবে না বুঝলেও সিরাজুল এটা বুঝেছিল যে খুব খারাপ কিছুই হবে।

আজ ভর দুপুরেই বাসায় আর্মির হানা। আগেও অনেকবার এসেছে ওরা। কিন্তু এবার যেন আগের থেকেও বেপরোয়া। দশ-বারোজনের দল। অন্য দিন আব্বুকে মুখে ধমকায়। আজ শুরু থেকেই মারমুখী। ওদের দেখেই সিরাজুল এক দৌড়ে পাশের ঘরের রহমত চাচার বাগানের আমগাছের ডালে। গাছের ঘন পাতার আড়াল থেকেই সিরাজুল দেখছে। আব্বুকে মাটিতে ফেলে রাইফেলের বাট দিয়ে ক্রমাগত মেরে চলেছে দুই আর্মি জওয়ান। আম্মু আব্বুকে ধরতে গেলেই অন্য একজন ভারি বুট পরা পায়ে সজোরে লাথি মারতেই উঁচু দাওয়া থেকে উঠনে ছিটকে পড়ল আম্মু। দু’জন আর্মি ততক্ষণে ফালাফালা করে ছিঁড়ে দিয়েছে আপুর গায়ের কাপড়। সিরাজুল ভয়ে চোখ খুলতে পারছে না। হঠাত গুলি চলার শব্দে চোখ খুলতেই দেখল দুজন আপুকে আর অন্য দুজন আম্মুকে তুলে ঘরে ঢুকে গেল। আর যে দুজন মিলে এতক্ষণ ধরে আব্বুকে মেরে যাচ্ছিল রাইফেলের বাঁট দিয়ে, আব্বুর রক্তে ভেসে যাওয়া নিথর শরীরটা মাড়িয়ে ঢুকে গেল সেই ঘরে যেখানে আম্মু আর আপুকে নিয়ে ঢুকেছে বাকিরা।

কতক্ষণ গাছের ডালে বসেছিল বুঝতেই পারেনি সিরাজুল। মাঝেমাঝেই আম্মু আর আপুর বীভৎস চিৎকার কানে আসছিল। এতক্ষণে সেই চিৎকারও থেমে গেছে। এতক্ষণ কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যেই ছিল ও। আচমকা ঘোর কাটতেই দেখল ওদের আর রহমত চাচার বাসা সমেত আশেপাশের আরও কয়েকটা বাড়ি জ্বলছে দাউদাউ করে। সেই ঘর জ্বলা আগুনের থেকেও বীভৎস লাগছে আর্মির লোকগুলোর জান্তব উল্লাস। ভীষণ ভয় পেয়ে চোখ বুজে গাছের ডালে বসে রইল সিরাজুল। অপেক্ষায় কখন আর্মির লোক গ্রাম ছাড়বে। কখন সন্ধে নামবে। অন্ধকার গাঢ় হলেই সিরাজুল গাছ থেকে নেমে দৌড় লাগাবে। ও আরাকান পাহাড়ে যাবে। ও আপুর কাছে শুনেছে আরাকান পাহাড়ের কোনো এক জঙ্গলেই নাকি ভাইজান থাকে। ভাইজানের হাতেও নাকি আর্মির লোকদের মতই রাইফেল আছে। ভাইজান নাকি এক সঙ্গে দু’হাতেই দুটো রাইফেল নিয়ে একাই মহড়া নিতে পারে এই রকম দশ বারো জন আর্মির।

টকটকে লাল সূর্যটা সাগরের জলকে রক্তাক্ত করে ডাঙায় সন্ধে নামে। শুরু হয় আট বছরের সিরাজুলের দৌড়। ও দৌড়তে থাকে অজানা নতুন দিনের নতুন সূর্যের লক্ষে। দৌড়তে থাকে গ্রামের এবড়োখেবড়ো মেঠো পথ ধরে। লক্ষ সবুজ জঙ্গলের কার্পেটে মোড়ানো আরাকান পাহাড়।

ছিন্নমূল – ৩
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments