কৃশানু দে চকিতে শট নিলেন। গো………। না, কৃশানুর শট ইস্টবেঙ্গল গোলরক্ষক ভাস্কর গাঙ্গুলিকে পরাস্ত করে ক্রসবারে লেগে প্রতিহত হয়েছে। এই গোলটি হলে কিন্তু মোহনবাগান এক-শূণ্য গোলে এগিয়ে যেত। অসাধারন শট নিয়েছিলেন কৃশানু।

উফ, হৃদপিণ্ড গলার কাছে এসে আবার জায়গায় ফেরত চলে গেল। ১৯৮৪ সাল। আই এফ এ শিল্ডের ফাইনাল খেলা। তৎকালীন বিশ্ব ফুটবল তখনও দ্বারে এসে কড়া নাড়ে না। দূরদর্শনের একটিমাত্র চ্যানেলে মাঝে মাঝে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের কিছু কিছু খেলা দেখানো হয় মাত্র। মারাদোনা, জিকো, ফালকাও, রুমেনিগে, পাওলো রোসি কোন ক্লাবে খেলেন আমাদের জ্ঞানের অনেক বাইরে। এখনকার বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের মত ম্যান ইউ, ম্যান সিটি, রিয়াল, বার্সা মুখে মুখে ঘুরত না। কিন্তু ময়দানের বিখ্যাত গাছের তলায় কোন কর্তার সাথে কোন স্থানীয় ফুটবলার কথা বলছেন আর সন্তোষ ট্রফি এই দুই নিয়ে রকের আলোচনায় একেবারে বৃহস্পতির দশা। আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্বাদ নিতে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলির প্রায় দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া জওহরলাল নেহরু গোল্ড কাপ একমাত্র ভরসা। তবুও বেশ কিছু ভাল ভাল ফুটবলার সেই টুর্নামেন্টে আসতেন। মনে আছে একবার আর্জেন্টিনা দলের সাথে এসেছিলেন গোলরক্ষক পম্পিদু, স্ট্রাইকার বুরুচাগা। কোচ ছিলেন ডঃ বিলার্দো। এই তিনজনেই পরবর্তি সময়ে ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে আর কত সময় কাটে? কয়েকটা দিন মাত্র। কাজে কাজেই শিবাজী-ভাস্কর, প্রসূন-প্রশান্ত, সুব্রত-মনোরঞ্জন এরাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় আগ্রহ। যদিও তাদের কোয়ালিটি আগ্রহ জাগানিয়াই ছিল।

তো যাই হোক, সেই ১৯৮৪ সালে যখন কৃশানু-বিকাশ জুটি সবে জমছে, দুজনের কেউই ইস্টবেঙ্গলের ঘরের ছেলে হয়ে ওঠেনি, ফাইনালের আগেই সেমিফাইনালে মহমেডানের স্পোর্টিংয়ের সাথে আরেকটা বড় ম্যাচ জিতে মোহনবাগান ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের মুখোমুখি হল, খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তেজনা তুঙ্গে। তখন হোস্টেলে। ভয়ংকর আড়াআড়ির মধ্যে, যেন আমরাই মাঠে খেলছি, রেডিওর ধারভাষ্য শুরু হল। কৃশানু দে-র এই ঘটনার পর ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা বেশ একটু কোণঠাসাই হয়ে পড়ল। মোহনবাগান সমর্থকেরাও ‘আজকে আর তোদের রক্ষা নেই’ এই রকম একটা ভঙ্গিতে লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিল। খেলা শেষ হল অবিশ্যি ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মুখে হাসি ফুটিয়ে।

এখনকার দিনে যেমন বাংলায় খেলা সংক্রান্ত কোনও প্রায় কোনও পত্রিকা নেই, বা থাকলেও সিংহভাগ জুড়ে ক্রিকেটের খবর, সেই সময় এই আকাল ছিল না। একাধিক পত্রিকা আমরা পড়ার সুযোগ পেয়েছি, যাতে ভারতীয় ফুটবলই প্রাধান্য পেত। এদের মধ্যে সবচেয়ে নামী ছিল অধুনালুপ্ত ‘খেলার আসর’। কলকাতা ফুটবলের হাঁড়ির খবর দিতে এর জুড়ি মেলা ভার ছিল। ইস্টবেঙ্গল আই এফ এ শিল্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, অতএব ছুটিতে বাড়ি এসে বাবার কাছে আবদার করে নির্দিষ্ট ‘খেলার আসর’ জোগাড় করলাম। আজকের দিনেও ইস্টবেঙ্গল যদি কলকাতা ফুটবল লিগের একটা অকিঞ্চিৎকর ম্যাচও জেতে, তার খবর আমি একাধিক বার পড়ি, আর সেই সময়ের অবস্থা তো সহজেই অনুমেয়। পড়তে পড়তে আমার প্রায় মুখস্থ হয়ে গেল, তবু ওটাকে আমার কাছছাড়া করি না। মা রীতিমত বিরক্ত হয়ে উঠলেন। সময় বেঁধে দিলেন পড়ার। কিন্তু সময় বেঁধে দিয়ে কি আর এই সব আকর্ষণ কমানো যায়। আমাকেও বুদ্ধি খাটাতে হল। আমি রোজ সকালে বাথরুমে যাওয়ার সময় বইটা নিয়ে ঢুকতে লাগলাম। মা-র বারণ আমার কানে গেল না। অবশেষে একদিন, আমি বাথরুম থেকে বের হয়েই দেখলাম দরজার সামনে মা দাঁড়িয়ে। আমার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে আপদ বিদায় করলেন। আর আমি অসহায় দেখে গেলাম। ওই একবার, ওই একবারই ইস্টবেঙ্গল আমার প্রায় সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছিল।

ছেঁড়া খেলার আসর
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments