শোকে পাথর

দেবেশ বাবু হঠাৎই মারা গেলেন। বয়স বেশি হয়নি, পঞ্চাশের কমই হবে। দিব্যি সুস্থ সবল ছিলেন, হঠাৎ কাল ভোররাত্রে ম্যাসিভ হার্ট স্ট্রোক।

সকাল থেকে গেটের সামনে জড়ো হয়েছে অনেক মানুষ। বলতে গেলে গোটা পাড়া ভেঙে পড়েছে ওনার বাড়ির সামনে। হবারই কথা। দেবেশবাবু এই অঞ্চলের স্বনামধন্য এবং প্রভাবশালী মানুষ। পার্টি পলিটিক্স করতেন, অথচ এমন দুর্নীতিবিহীন ভাবে সেটা করতেন যে এলাকার লোকে ওনাকে দেবতার মত ভক্তি করত। 
এর র‍্যাশন কার্ড হচ্ছে না, ওর বাড়িতে জলের সমস্যা, তাকে গুন্ডারা হুমকি দিচ্ছে, যে কোনো সমস্যায় লোকে এসে পড়ত দেবেশবাবুর পায়ে। এলাকার যেকোনো সমস্যায় মুশকিল-আসান তিনিই। তাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে তারা যে শোকাহত হবে তাতে আশ্চর্য কি? অনেকেরই চোখে জল। তারা এসেছে দেবেশবাবুকে শেষ বিদায় জানাতে।
 
অথচ দেবেশবাবুর সদ্য বিধবা সুরঞ্জনার চোখে জল নেই। কোনো অনুভূতিরই প্রকাশ নেই তার মুখে। দরজার খুঁটিটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। কেউ বললে "অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর", আবার কেউ বলাবলি করল "ওই মহিলার অন্য কারো সাথে বাজে সম্পর্ক ছিল মনে হয়, বর মরাতে তাই দুঃখ নেই"…
সুরঞ্জনার সঙ্গে দেবেশবাবুর বিয়ে হয়েছে মাসতিনেক হল। একটু বেশি বয়সেই বিয়ে করেছিলেন তিনি। জোয়ান বয়সে দেশ সেবার নেশায় সংসারী হয়ে ওঠা হয়নি। কিছুদিন আগে বংশরক্ষার তাগিদেই হোক, বা যৌবন চলে যাবার আগের শেষ কামড়ের তাগিদেই হোক, হঠাৎ বিয়ে করে বসলেন। সেদিনও পাড়ার সবাই জড়ো হয়েছিল। আশীর্বাদ, শুভেচ্ছা জানিয়েছিল নববধূকে। আজ সেই সুরঞ্জনাকে নিয়েই নানারকম কথা বলছে তাদেরই একাংশ।
 
সারাদিনের ধকলের পর সন্ধ্যাবেলা শোয়ার ঘরের বিছানাটায় এসে বসার সুযোগ পেল সুরঞ্জনা। শ্মশানে যাওয়া থেকে শুরু করে আরও নানারকম কাজ… খুব ক্লান্ত লাগছে। তার মধ্যে মাথায় ঘুরছিল পাশের বাড়ির রমলা দির ওই কথাটা – "…অধিক শোকে পাথর"। নিজের মনেই ম্লান হাসল সুরঞ্জনা। শোকই বটে, সেঞ্চুরি মিস করলে কে না দুঃখ পায়। আজ রাত্রে এই বিছানাতেই একশোতম বার ধর্ষিত হবার কথা ছিল ওর…
 

 

ক্যাপচার কপচানি

ক্যাপচা কাকে বলে জানেন তো? ইন্টারনেটে কোনো সাইটে রেজিস্টার করতে গেলে বা কিছু ডাউনলোড করতে গেলে দেখবেন অনেকসময় ব্যাঁকাচোরা হরফে কিছু লেখা আসে। সেইটা আপনাকে ফের লিখে প্রমাণ করতে হয় যে আপনি মানুষ। দেখেছেন নিশ্চয়ই। আর আপনার মনুষ্যত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্যে হয়তো মনে মনে ক্ষুব্ধও হয়েছেন। আসলে ইন্টারনেটে "বট" (অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় কোনো ব্যবস্থা) কে থামানোর জন্যে এই প্রযুক্তির ব্যবহার। বদ লোকে যাতে একটা লুপ-ওয়ালা কোড লিখে হাজারে হাজারে অ্যাকাউন্ট খুলে না ফেলতে পারে, বা এক-ধাক্কায় একটা সিস্টেমের সব ডাউনলোড করে ফেলতে না পারে বা এই জাতীয় অন্যান্য কুকর্ম করতে না পারে সেটাকে ঠেকানোই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ "বদমায়েসী করতে হয় তো ম্যানুয়ালি একটা একটা করে কর! প্রোগ্রাম লিখে লট কে লট বদমায়েসী করা চলবেনি!"

সে যাই হোক, কিছু একটা করতে গিয়ে এই ক্যাপচার কপচানি দেখলে মাথাটা গরম হয়ে যায়। কি বিদিকিচ্ছিরি লেখা, আদ্ধেক সময় পড়াই যায়না। সেইটা আবার পড়ে উদ্ধার করে কীবোর্ডে লিখতে হবে! বেশ হয়তো একখানা মুভি ডাউনলোড করতে যাচ্ছিলাম, তার মাঝে বাগড়া। কার না বিরক্ত লাগে! তবে আমার বোধহয় এই ক্যাপচার ওপর রাগটা একটু বেশিই। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘুঁষি মেরে ভেঙেই দিই ল্যাপটপের স্ক্রীনটা!

মার্কিন দেশে আসার পর থেকে অবশ্য এইসব বে-আইনী ডাউনলোড করতে ভয় ভয় লাগে। ধরা পড়লে শ্রীঘরেও যেতে হতে পারে। প্রতিবারই ভাবি আর করবনা। কিন্তু ঐ যে, তৃতীয় রিপু! বারবার প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হয়ে যায়। যা হোক, অনেক ভেবে ঠিক করলাম আর নয়, চাকরি বাকরি পাবার পর পয়সা খরচ করে যা কেনার কিনব। বে-আইনী ডাউনলোড আর নয়। কোনও রকম বিবেকের কারণে নয়, স্রেফ জেলে যাবার ভয় থেকেই নিলাম এই সিদ্ধান্ত। আর তাছাড়া প্রতিবার ওই ক্যাপচা নামক আপদের সামনেও পড়তে হবে না!

এই ভেবে শেষবারের মত একখানা মুভি ডাউনলোড করে ক্ষান্ত দেবার রেজলিউশন নিয়ে বসলুম কম্প্যুটারের সামনে। এবার আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, এই শেষ! গুগল সার্চ করে মুভিটার ডিভিডিরিপ খুঁজে বার করে ডাউনলোড বাটনে ক্লিক করলাম। উফফ! আবার সেই কালান্তক ক্যাপচা! বিরক্তি সামলে কীবোর্ড বাগিয়ে টাইপ করতে গিয়ে চমকে উঠলাম!

ক্যাপচার বাঁকাচোরা ভৌতিক অক্ষরে লেখা আছে "Time to go to jail"…

 

 

ছোট্ট গল্প
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments