প্রচার, শুভানুধ্যায়ীদের বারন, কোনও কিছুই ত্যাগ করাতে পারেনি আমার অভ্যাস। না, ধূমপান বা মদ্যপানের কথা বলছি না। বলছি ইয়ারপ্লাগ কানে গুঁজে গান শোনার কথা। বাড়িতে বিশেষ একটা হয়ে ওঠে না। কারন আমার গান শোনার ইচ্ছে হলেই আমার পুত্রেরও একই ইচ্ছে হয় এবং তার ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দেওয়া সময় সময় জরুরি হয়ে ওঠে। এটা যদি একটি কারন হয়, তবে অন্য কারনটি হল বাড়ি-অফিস-বাড়ি এই পথে আমার অনেকটা সময় ব্যয় হয়। ট্রেনে যাতায়াত করি, তাস খেলতে পারি না, নিত্যযাত্রী কোনও বন্ধু নেই, কাজেই ধর্মের কাহিনিতে কান দিতে পারিনি।

সেদিনও ট্রেনে উঠেছি লেক গার্ডেন্স থেকে। গান শুনছি। বাধা পড়ল বালিগঞ্জ পার হতেই। এক দম্পতি উঠেছে ভিক্ষা করতে। কামরার একেবারে অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল গলায় ঝোলানো লাউডস্পিকার থেকে তাদের গানের শব্দ। আমার গান শোনা বাধ্য হয়েই থামাতে হল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল সেই কান ফাটানো আওয়াজ। কি করব, চুপচাপ বসে আছি আর গান বন্ধ হওয়ার অপেক্ষা করছি। গান থামল। উল্টোদিকের প্রায় খালি ট্রেন, খুব বেশি লোকজন নেই। যেটুকু মাধুকরী সম্ভব সেটা শেষ হতেই থামল। গাড়ি পার্ক সার্কাস ছেড়ে শিয়ালদহমুখী। আমার কানে আবার বেজে উঠল আমার প্রিয় গানগুলির কোনও একটি। মগ্ন হয়েই শুনছিলাম। মগ্নতা ভাঙল কানে আকস্মিক টান অনুভব করে। খুব জোরে নয়। সামান্য একটু টান। তাকালাম। দেখলাম একটি শিশুকন্যা ইয়ারপ্লাগের তার ধরে টানছে। অসদুদ্দেশ্য যে নেই সেটা টানের প্রকৃতিতেই স্পষ্ট। কার বাচ্চা? কান থেকে ইয়ারপ্লাগ নামিয়ে প্রশ্ন করে এদিক ওদিক তাকালাম। প্রশ্নটাতে কে সাড়া দেয় দেখাটাই উদ্দেশ্য। সাড়া এল সেই ভিক্ষুক মায়ের কাছ থেকে। এবার ভাল করে লক্ষ্য করলাম। দম্পতির একজন অন্ধ। সঙ্গে বয়সে আরেকটু বড় একটি ছেলে। এই শিশুকন্যাটি তারই বোন। কন্যাটি তার মায়ের “চলে আয়” ডাকটিকে আমল দিল না। আমিও দেখতে চাইছিলাম সে কি করে। জিজ্ঞাসা করলাম – “শুনবি?” অকৃপণ সম্মতি এল। এক কানে প্লাগ গুঁজে দিলাম। অন্য একটা গান চালালাম। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল উপভোগ করছে। কাছে ডেকে নিল দাদাকে। আরেকটা প্লাগ দিলাম দাদার কানে। তার খুব একটা ভাল লাগল না বোধ হয়, কারন সে কানে রাখতে চাইল না। খুলে দিয়ে চলে গেল মায়ের কাছে। কন্যা গান শুনতে শুনতে আমার মোবাইলটিকে হাতে নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করতেই আমার মস্তিষ্ক বিদ্রোহ ঘোষণা করল। মোবাইলটি হাতেই রেখে দিলাম। একটু বাদে আবার জানতে চাইলাম – “শোনা হয়েছে?” আবার সম্মতিসূচক ঘাড় হেলানো। প্লাগটি কান থেকে খুলে নিলাম। কোথাও এতটুকু আপত্তি নেই। শিয়ালদহের বাইরে ট্রেন দাঁড়িয়েছিল। আবার গড়াতে শুরু করল। আমি যন্ত্রপাতি গুটিয়ে ব্যাগে ঢোকাচ্ছি এমন সময় আবার মাথায় একটা টান সেই সঙ্গে প্রথমবার কানে এল কন্যার কণ্ঠস্বর। ‘কাকু’। আগেই বলেছি আমার মস্তিষ্ক হৃদয়ের ওপর দখল নিচ্ছিল। সেই দখলদারিটা এবার বেশ বেড়ে গেল। মনে হল – একটা ভিখিরির মেয়ে, এতবড় সাহস, আমার মাথা ধরে টানছে। যে কোনো কারনেই হোক মুখোশটা খুলে পড়তে গিয়েও খুলল না। একটা হাসি আমার মুখে ঝুলিয়ে রাখলাম। মাথা নেমে এল কন্যার ছোট্ট দুটো হাতের টানে। আমার গালে ঠেকাল তার গাল। সর্বাঙ্গ গড়িয়ে খেলে গেল এক বিদ্যুৎতরঙ্গ। মনে হল সবকিছু মিথ্যা। মুহুর্তের মধ্যে আমাকে আমার জন্মদিনের পোশাকে দাঁড় করিয়ে দিল ওই গালের স্পর্শ! এভাবেই বোধহয় ভেঙে পড়ে সব অহংকার!! আমার অভিনয় বোঝার ক্ষমতা নেই এই প্রান্তবাসী শিশুর। আমি ভেবেছিলাম সে একটা পুতুল। আমার যখন খুশি যেরকম খুশি দড়ি খুলব, গোটাব। কিন্তু ও তো ছোট্ট হলেও আসলে মানুষ। জানে ভালবাসার চাইতে বড় কিছুর দাতা সে হতে পারে না। তা-ই সে উজার করে দিয়েছে আমার ওপর। কি করতে পারতাম আমি? কিছুই না। করিওনি। শুধু একটু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলাম – ‘ভাল থেকো। আবার পরে দেখা হবে’। ট্রেন ঢুকে পড়েছে শিয়ালদহতে। নামলাম। ভয় পাচ্ছিলাম। তবু একবার পেছন ফিরে দেখলাম এটা জেনেই যে আবার যদি সত্যি সত্যি কোনদিন দেখা হয়েও যায়, আমি কিন্তু চিনতে পারব না কাউকেই। দেখলাম সেই পরিবার রওনা হয়েছে অন্য কোনও ট্রেনের উদ্দেশ্যে, অন্য কোনও প্লাটফর্মের দিকে।

ছোট্ট ভালোবাসা (পুরনো একটা লেখা নতুন করে)
  • 3.50 / 5 5
2 votes, 3.50 avg. rating (74% score)

Comments

comments