স্যুইং ডোরটা ঠেলে গড়িয়া থানার সাব ইনস্পেক্টর, পাঁচ ফুট এগার ইঞ্চি লম্বা দোহারা চেহারার মলয় দাশ ঘরে ঢুকে ইনস্পেক্টর অম্লান রায়ের টেবিলের সামনে এসে একটা স্যালুট ঠুকে বললেন, “মলয় দাশ রিপোর্টিং, স্যার।”

 অম্লান রায় সবে মিনিট পনের হল এসেছিলেন। একটা স্মার্টফোনে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলছিলেন। ডাক শুনে মলয়ের দিকে মুখ তুলে চাইলেন। টেবিলের উল্টোদিকে একটা চেয়ার টেনে বসে মলয় হাতে ধরা কাগজটা অম্লানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আজকের ক্রাইম রিপোর্টটা, স্যার। আপনার একটা সাইন লাগবে।”

গম্ভীরভাবে মলয়ের কাছ থেকে কাগজটা নিয়ে কি লেখা আছে না পড়েই সামনের পেন-স্ট্যান্ডটা থেকে একটা পেন তুলে নিয়ে পাতাটার নিচের দিকে গোটা গোটা করে নিজের নামটা লিখে দিলেন অম্লান।

মলয়ের পেছন পেছন ঘরে ঢুকেছিলেন হেড কনস্টেবল বছর পঞ্চান্নর বিশ্বজিৎ সামন্ত। সই করা শেষ হলে অম্লানের সামনে এসে বললেন, “স্যার, আপনাকে একবার একটু কষ্ট করে পাশের ঘরে আসতে হবে। একটু দরকার ছিল।”

ঢলঢলে ইউনিফর্মটা একটু টেনেটুনে ঠিক করে নিয়ে মলয় আর বিশ্বজিতের সাথে পাশের ঘরে এসে অম্লান দেখলেন ঘরটা লাল সাদা বেলুন দিয়ে সাজানো। টেবিলের ওপর একটা ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক রাখা, তাতে লেখা ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু অম্লান রায়।’ পাশে একটা প্লাস্টিকের ছুরি আর বয়স নির্দেশ করা একটা জ্বলন্ত মোমবাতি। থানার ছোট বড় র‍্যাঙ্কের সব পুলিশরা এসে ঘরটায় জমায়েত হয়েছে।

মলয়ের সাথে অম্লান এসে দাঁড়ালেন কেকটার সামনে। বিশ্বজিতের ইশারায় ভিড়ের মধ্য থেকে কনস্টেবল নিরঞ্জন আর তার স্ত্রী কল্পনা এগিয়ে গিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়ালেন অম্লানের দুই পাশে।

মলয় ছুরিটা অম্লানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “কেকটা কাটুন, স্যার।” সবার সমবেত ‘হ্যাপি বার্থ ডে’ গানের মধ্যে এক ফুঁয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে কেকটা কাটলেন অম্লান। ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে হাততালি দিল। কেউ কেউ আবার মোবাইলে ফটো বা ভিডিও তুলল পুরো ঘটনাটার। সবাই আনন্দ করলেও নিরঞ্জনের চোখের কোনায় জল চিকচিক করছিল, কল্পনার চোখ আঁচল দিয়ে ঢাকা।

আর গত কয়েকমাস ধরে ক্রমাগত কেমোথেরাপি নিতে নিতে রুগ্ন, ক্লান্ত অম্লানের মুখে তখন এক অপার্থিব আনন্দ। চোখদুটোয় ইচ্ছাপূরণের এক অপূর্ব দ্যুতি, মুখে বিজয়ীর হাসি।

সাত বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তার খুব ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে বাবা নিরঞ্জনের মত পুলিশ হবার। দুরারোগ্য ক্যান্সার তাকে সেই সুযোগ না দিলেও, যাতে সে জীবনের বাকি হাতে গোনা কয়েকটা দিন মনে আনন্দ নিয়ে কাটাতে পারে, সেই জন্যে তার বাবার সহকর্মী পুলিশ কাকুরা সম্ভবতঃ তার জীবনের শেষ জন্মদিনটায় তাকে একদিনের পুলিশ ইনস্পেক্টর বানিয়ে তার সেই ইচ্ছা আজ পূর্ণ করে দিয়েছে।


সমাপ্ত

জন্মদিন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments