প্রবল উতসাহিত হয়ে গত পোষ্ট দেওয়ার সময়েই লিখেছিলাম, যে চেষ্টা করব অন্তত দু সপ্তাহে একটা পোষ্ট দিতে, কিন্তু কাজে-অকাজে থাকতে থাকতে সে কথা বেমালুম ভুলে বসে আছি। আজ যখন মনেই পড়লো কথাটা, ভাবলাম, শুভস্য শীঘ্রম! (কোন এক গল্পে শুভস্য সিঙ্ঘম কথাটাও শুনেছিলাম, জার অর্থ হল, শুভ কাজে সিংহের মত ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। সিংহের মায়েদের ছানাদের সুস্থ রাখা, ঠিকমত খাবার খাওানো, জল খাওয়ানো ইত্যাদি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতে হয় না, কিন্তু মানুষ মায়েদের তো হয়, তাই এই পোষ্টএর অবতারণা। এপ্রিল-এর শুরুতেই সারা দেশ জুড়ে তাপপ্রবাহ চলছে, ঘটছে হিট-স্ট্রকের মত ঘটনা, এই অবস্থায় বেশিরভাগ ছানাপোনার মায়েদের একটা বিশেষ চিন্তা ছানাদের জল খাওয়া! কারণ প্রাকৃতিক ভাবে যদিও আমাদের তৃষ্ণা অনুযায়ী জল পান করা উচিত, শিশুদের ক্ষেত্রে কথাটা পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়, কারণ বেশিরভাগ শিশুই নিজেরা জল খেতে চায় না এবং অনেক সময়েই তা ডিহাইড্রেসনের মত মারাত্মক সমস্যা ডেকে আনতে পারে।
ঠিক কতটা জল প্রয়োজন?
জলের প্রয়জনীয়তা নির্ভর করে ব্যাক্তি বিশেষের শারীরিক অবস্থা, শারীরিক পরিশ্রম, বয়স, ওজন, উচ্চতা, এবং সবার ওপরে আবহাওয়ার ওপর; মানে গ্রীষ্মকালে জলের চাহিদা, শীতকালের চাহিদার থেকে বেশি। তবুও মোটামুটি ভাবে বলা যায়, ৭মাস থেকে এক বছর অবধি বাচ্চাদের জন্য ৭০০ মিলি, ১ থেকে ৩ বছর অবধি বাচ্চাদের জন্যে ১লিটার থেকে ১লিটার ৩০০ মিলি তরলের প্রয়োজন হয়। ৭ মাসের কম বয়সী শিশুদের আলাদা করে জল খাওাতে হয় না, নিজের চাহিদা মত মাতৃদুগ্ধ থেকেই প্রয়োজনীয় তরল শরীর সংগ্রহ করে নিতে পারে, খালি লক্ষ্য রাখতে হবে যেন দিনে ১০ বার মত হিসি করে, এবং হিসির রঙ হলুদাভ না হয়। এই যে তরলের পরিমাণ লিখলাম, এই তরল হতে পারে জল, ফলের রস, দুধ এবং অন্যান্য খাবার থেকে। মানে ১ বচরের শিশু সাধারনত ৪৫০ মিলি দুধ পান করে সারা দিনে, তাহলে জলের প্রয়োজন হবে ১লিটার ৩০০ মিলি-৪৫০মিলি=৮৫০ মিলি মত। এছাড়াও যদি শিশু অসুস্থ হয়, সরদি-কাশি, পেট খারাপ ইত্যাদি—তাহলে অবশ্যই এর থেকে বেশি জল খাওাতে হবে, কারণ জল শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বা টক্সিন বের করে দেয়।
তাহলে সারাদিন কি জল মেপে খাইয়ে যেতে হবে??
না, তার প্রয়োজন নেই, যদি যথেষ্ট হিসি করে, এবং হিসির রঙ হলুদাভ না হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যায়, যে যথেষ্ট জল খাচ্ছে। তবে চেষ্টা করা উচিত, তেষ্টা পাওয়ার আগেই, জল খাওয়ানোর কারণ শিশু নিজে তেস্টার কথা বলছে মানে অল্পও হলেও ডিহাইড্রেশন শুরু হয়ে গেছে, কারণ ক্লান্ত বোধ না করলে সাধারনত বাচ্ছারা জল খেতে চায় না!
কতটা ফলের রস??
ফলের রস যদিও তরল হিসেবে গণ্য করা হয়, তা হলেও যেটা জানা দরকার, ফলের রস জলের বিকল্প নয়,জল যত তাড়াতাড়ি তক্সিন দূর করতে পারে, ফলের রস পারে না। এক বছরের কম বয়সীদের ১০০% ফলের রস দেওয়া উচিত নয়, এক-ভাগ রসের সাথে দু ভাগ জল মিশিয়ে তবেই দেওয়া উচিত। প্যাকড জুস বা কোন এয়ারেটেড পানীয় দেওয়া উচিত নয় কারণ তাতে অতিরিক্ত শর্করা/ ক্যালোরি শরীরে যায়। আর ফলের রস পেট ভার করে, জার ফলে ডায়েট-ে কঠিন তরলের ভারসাম্য রক্ষা অসুবিধা হয়। আর যেকোনো সুস্থ মানুষের জন্যে ফলের রস অপেক্ষা ফল খাওয়া বেশি জরুরি। কারণ গোটা ফলে ফাইবার থাকে, যা কোষ্ঠকাঠিন্যর জন্যে বিশেষ উপকারী।
অন্য কোন তরল?
১ বছর অবধি শিশুদের জন্যে মাতৃদুগ্ধ অথবা ফরমূলা দেওয়া উচিত। ১ বচরের পড়ে গরুর দুধ/ মোষের দুধ শুরু করা যেতে পারে। (আমি অবশ্য নিউট্রনকে প্যাকেটের দুধ-ই দি) ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ফুল-ক্রীম দুধ দেওয়া উচিত যদি না ওজন মাত্রাতিরিক্ত হয়, কারণ ফুল্ল-ক্রীম দুধ না হলে পর্যাপ্ত ভিটামিন-এ পাওয়া যায় না। দুধ ছাড়া অন্য তরলের মধ্যে ভীষণ উপকারী ডাবের জল, শরীরের পটাসিয়াম ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে। ঘোল, লস্যি, লেবুর জল ইত্যাদিও বিশেষ উপকারী।
গ্লুকোস- যুক্ত তরল?
অবস্থা বিশেস-এ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু নিয়মিত ভাবে না দেওয়াই ভালো, সুস্থ শরীর খবার থেকে গ্লুকোস সংগ্রহ করে নেবে, সরাসরি গ্লুকোস দেওয়ার দরকার হয় না।
কিন্ত আমার বাচ্চা যে সত্যি জল খেতে চায় না… রইল কিছু পরামর্শ
১। আপনি আচরি ধর্ম… ওর সামনে আপনি জল খান, বাড়ির অন্যদেরও খেতে বলুন, এবং সাথে সাথে পিচ্ছিটাকেও খেতে দিন, না হয় এক ধোক-ই খেল, আস্তে আস্তে অভ্যাস হবেই।
২। জলের বদলে… ঘোল, লেবুর জল, মিছরির জল ইত্যাদি দিয়ে দেখতে পারেন
৩। জলের রং/গন্ধ/স্বাদ… জলে কর্পূর/ এলাচ গুঁড়ো /পুদিনা পাতা/ তুলসী পাতা/আদা কুঁচি ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে রাখলে, জলের স্বাদ/গন্ধ/বরণে পরিবর্তন হবে, অনেক সময়েই শিশুদের কাছে তা বেশ আকর্ষণীয় লাগে
৪। কোন গ্লাসে জল খাবি, লালটাতে না নীলটাতে… সুন্দর রঙ্গিন গ্লাসে জল দিলে, অনেক শিশুর কাছেই তা আকর্ষণীয় হয়। আমার মনে আছে, একবার ভুতু (আমার ভাইপো)কে ছোট্ট ষ্টীলের গ্লাসে জল দেয়া হয়েছিল, আর অন্যদের কাঁচের গ্লাসে, ভুতু সেই জল মুখে তোলেনি, এক্তাই দাবী ছিলো তার “চকচকে গ্লাসে জল খাবি” । শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই আসল খাবারের থেকে তার পরিবেশন তা বেশি মানে রাখে
৫। বুঁদ বুঁদ মে… না হয় একবারে গোটা গ্লাস নাই শেষ করল, প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর চেস্টা করুন জল খাওয়ানোর। অল্পও অল্পও করে হলেও খাবে হয়ত
৬। হাতের কাছে রাখুন… এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, জলের বোতল পিচ্চিটার হাতের কাছে রাখা। শুধু হাতের কাছে বোতল-ই রাখবেন তাই নয়, রেখে দিতে পারেন কিছু সুন্দার সুন্দার স্ত্র, যাতে জল খেতে ওর নিজের ভালো লাগে।
৭। পহলে দর্শনধারী… এটা শিশুদের ক্ষেত্রে ভীষণ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওর পছন্দ মত বোতল, সিপার, গ্লাস ওর হাতের কাছে রাখুন। একটু হলেও হয়ত জল খাওয়া বাড়বে।
৮। জলের তাপমাত্রা… অনেক শিশুদের ক্ষেত্রেই এটা বিশেষ গুরুত্বপূরন। আপনার শিশুর কিরকম তাপমাত্রার জল পছন্দ লক্ষ্য রাখুন, সেই অনুযায়ী অল্পও ঠাণ্ডা বা ঘরের তাপমাত্রায় রাখা জল দিন
৯। নাকের বদলে নরুন… এতসব করেও জল খাওয়া বাড়াতে না পারলে, জলীয় ফল যেমন তরমুজ, শশা, আঙ্গুর ইত্যাদি বেশি করে খাওয়ানোর চেস্টা করুন, যাতে খাবার থেকেই শরীর প্রায়জনীয় জল সংগ্রহ করে নিতে পারে।
১০। শেষ কথা… গ্রীষ্মকালে শুধু জল খাওানো নয়, যাতে শরীর থেকে জল কম বের হয়, সেটাও লক্ষ্য রাখা উচিত। রোদ্দুরে কম বের করা, বাইরে খেললে ২০ মিনিট অন্তর জল খাওয়ানো ইত্যাদি মেনে চলা উচিত।
জল খান, জল খাওয়ান। আর উপভোগ করুন গ্রীষ্মকাল।

জল-ই জীবন— আপনার শিশু পর্যাপ্ত জল খাচ্ছে তো??
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments