লেখাগুলি ঠিক ওইরকম ভাবে ছিল না। তিনটে দাগের মধ্যে ইংরিজি, দুটো দাগের মধ্যে বাংলা এত সব নিয়ম যা শিখেছিলাম স্কুলে বা বাড়িতে মায়ের কাছে, তার থেকে অনেক দূরে লেখাগুলি। আর সেই জন্যেই বোধহয় এত চমৎকার দেখতে লাগত। চওড়া হয়ে শুরু, মাঝে সরু, তারপর আবার চওড়া হয়ে শেষ। বা শুরুটা একটু বড়, তারপর ছোট। আরও নানারকম। সঙ্গে ছবি। আহা! অনেকগুলো মুখ, একটার সঙ্গে আরেকটার ভাবগত কোনও সাদৃশ্য নেই, একটা রাগী তো অন্যটা হাসিমুখে। শিল্পাচার্যের আঁকা সহজ পাঠ-এর ছবি ধারে কাছে আসে না এই সব ছবির। তবে পুরো ব্যাপারটার মধ্যে যে একটা নিষিদ্ধ জিনিস আছে, সেটা আমি খুব অল্প বয়সেই বুঝে যাই। আর সবাই জানেন যে কোনও নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ একটু বেশিই থাকে, আমারও ছিল। বয়স বাড়ে, নিষিদ্ধ বস্তুর তালিকাও ক্রমাগত ছোট হতে থাকে, এইভাবেই এখন এইটাও একদিন ধীরে ধীরে তালিকার বাইরে চলে এসেছে।

জিনিসটা এখনও চোখে পড়ে, কিন্তু আমার মতে তার সৌন্দর্য অনেকাংশে কমে গেছে। সিনেমার পোস্টার। ছেলেবেলাতে আমার অত্যন্ত প্রিয় কিছু। যখনকার কথা, তখন পোস্টার আঁকা হত। কখনও সাদা কালো চোখে পড়েনি, যা দেখেছি সবই রঙিন। এমনকি সিনেমা হলের বাইরের দেওয়ালেও হাতেই আঁকা হত। একদিকে থাকত যেটি সগৌরবে চলিতেছে, অন্যদিকে পরবর্তী আকর্ষণ।

কালেভদ্রে যখন সিনেমা দেখতে যাওয়ার ঘটনা ঘটত, সেটা সেলিব্রেট করার মতই হত আমার কাছে। যতই ‘বাদশা’, ‘চারমূর্তি’ এইসব আমার দর্শনযোগ্য বলে গণ্য করা হোক না কেন, ওই পরবর্তী আকর্ষণের লবিস্টিল কিংবা বাইরের দেওয়ালে আঁকা ছবি আমার চোখ এড়াত না। তার ওপরে ছেলেবেলা থেকেই এমন জায়গায় থাকি, যাকে প্রায় একটা মাকড়সার জালের ঠিক মাঝখানে বসে থাকে মাকড়সার সাথে তুলনা করা যায়। পশ্চিমদিকে গঙ্গা, অতএব উপায় নেই, কিন্তু বাকি তিন দিকেই সামান্য কিছু দূরত্বেই সিনেমা হল। সুতরাং পোস্টারের ছড়াছড়ি। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে অথবা কোনও কারণে বাড়ির বাইরে বেরোলেই স্যাট করে চেনা জায়গায় অচেনা ছবির জন্য একবার চোখ ঘুরিয়ে নেওয়া আমার কাছে জলভাত ছিল। যদিও এখন তার অধিকাংশই চিরতরে দেহ রেখেছে, কোনওটা বা গঙ্গার ধারে অপেক্ষা করছে। একটা অবিশ্যি মাল্টিপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। যাই হোক, সিঙ্গল স্ক্রিন হোক বা মাল্টিপ্লেক্স, সেই পোস্টারের দিন গিয়েছে, লবিস্টিল তো অদৃশ্য।

কথায় কথায় অন্য দিকে চলে যাচ্ছি, ফিরে আসি। তো আমি যখন যেভাবে পারতাম পোস্টার দেখতাম। রোজকার কাগজ দেখে আমার অত মন ভরত না, বড় ক্ষুদ্রাকৃতি ছিল, কাজেই আমার বড় জ্যাঠামণির জন্য বাড়িতে নিয়মিত আসত ‘স্ক্রীন’ বলে একটা কাগজ, সচরাচর আমাদের হাতের নাগালের বাইরেই রাখা হত, তবু মাঝে মধ্যে সুযোগ পেয়েই যেতাম। এটার মূল আকর্ষণ ছিল অন্য জায়গায়। রাস্তার দেওয়ালে বেশ অনেকটা দূরত্ব থেকে যা দেখতে হয়, সেটাই একেবারে হাতে নিয়ে সামনাসামনি দেখা। এক্ষেত্রে সাবধনতা অনেক বেশি অবলম্বন করতে হত, কারণ বাঘের ঘরে ঘোগ হতে গেলে অন্য কোনও উপায় থাকে না।

বহুদিন ধরেই মনের মধ্যে একটা ইচ্ছা ছিল, আঁকতে তো পারি না, যদি অন্তত লেখাটা নিজে লিখতে পারি। এই ভাবটা মনের মধ্যে মধ্যে জমতে জমতে একদিন ফেটে বেরিয়ে এল, প্রাথমিক ভাবে ধরা না পড়ে আমার আত্মবিশ্বাসটাও উর্দ্ধমুখী হয়ে উঠেছিল, সেই কাহিনি আজ।

আমার মনোবাসনা পূর্ণ করার পথে প্রথমেই যে ছবিটাকে বেছে নিয়েছিলাম তার নাম হল ‘জানী দুশমন’।  নিঃসন্দেহে হিট এবং মাল্টিস্টারার ছবি, যদিও হিট এবং মাল্টিস্টারার, এই দুটোই বোঝার বয়স তখন আমার হয়নি, কিন্তু যত্রতত্র অনেকদিন ধরেই দৃষ্টিগোচর হয়েছিল, ফলত এইটিই আমার হাতেখড়ির জন্য নির্বাচিত হল। (ফুল লেংথ পোস্টারটা অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক ছিল, কিন্তু পেলাম না। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য একটা ছবি দিলাম। তবে এখানে পুরো পোস্টার জরুরি নয়, মুল টাইটেলটা লক্ষ্য করলেই গল্পের বাকি অংশের জন্য যথেষ্ট হবে)

                                                               

বাংলা খাতায় লিখতে লিখতে একসময় হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পাতার নিচের দিকে চার-পাঁচটা লাইন ফাঁকা পড়ে থাকছে। পুরো ঘটনাটাই কাকতালীয়, কিন্তু এটাই আমার কাছে আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিল। বুঝতে পারার পরেই দরকার না থাকলেও আমি নিজেই নিচের লাইনগুলো ফাঁকা রাখতে শুরু করলাম। একদিন এটাও বুঝতে পারলাম মা বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যে আনছেন না। আমি একেবারে প্রথম পাতার ফাঁকা অংশে লিখলাম ‘জানি দুশমন’। প্রথম লাইনের মিডল অ্যালাইনমেন্টে ‘জানি’, তারপরের লাইন ফাঁকা, তারপরের লাইনে আবার ‘জানি’-র ঠিক নিচে ‘দুশমন’। ‘দ’ শুরু হল ওপরের লাইনের ‘জানি’-র ‘জ’-এর পাশ থেকে আর ‘দুশমন’-এর ‘ন’ শেষ হল ‘জানি’-র ‘ন’-এর ঠিক পাশে। ইটালিক্স যথাসম্ভব বজায় রেখে লেখাটা শেষ হল।  

পুরো বিষয়টা বড়দের নজরের বাইরেই রয়ে গেল। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। এক পাতা করে লেখা এগোয়, আর নিরাপদ দূরত্ব রেখে পেছনের পাতার ফাঁক বোজায় ‘জানি দুশমন’। এভাবেই চার-পাঁচ পাতা দুশমনের অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার পর একদিন আকস্মিকভাবে মায়ের প্রশ্ন – নিচের লাইন গুলি ছেড়ে রেখেছিস কেন?

তারপর যা ঘটল তা মোটামুটি এই রকম

আমি – কি হয়েছে? লিখি না পরের পাতায়

মা – দেখি খাতা

খাতা হাতে পেছনের পাতা ওলটাতে ওলটাতে মা – এ কি? লিখিসনি কেন এখানে?

এভাবেই ঘটে গেল অবশ্যম্ভাবী এবং অবশ্যই সবচেয়ে অনভিপ্রেত ঘটনা। মা বুঝতে পারলেন মূল কারণ। ‘এগুলি কি?’ আমতিয়ে আমার উত্তর – ‘জানি দুশমন’

-মানে?

-সিনেমা

-কি হয়েছে? – রঙ্গমঞ্চে আমার পিতৃদেব প্রবেশ করলেন, আমার আন্তরিক অনিচ্ছে সত্বেও। ‘এই যে, জানি দুশমন’ খাতা দেখিয়ে মায়ের উত্তর। ‘জানি দুশমন? সেটা আবার কি’ বাবার অবাক হওয়ার পালা। ‘কেন? সিনেমা’ মায়ের আলোকে বাবা আলোকিত। ‘অ্যাঁ, পড়াশোনার খাতায় এই সব?’ বলে বাবার প্রস্থান এবং শুরু হয়ে গেল মায়ের চোটপাট।

 

বহুকাল বাদে আমার পুত্র এই সেদিন যখন আমার কাছে ‘লুঙ্গিডান্স’-এর ব্যাপারে উত্তেজনা প্রকাশ করে ধমক খেল তখন অনুভব করলাম ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে’। আজকের দিনে আমার বিশ্বাস করার যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আছে ‘জানী দুশমন’-টা কি, খায় না মাথায় দেয়, সে ব্যাপারে আমার মা-র ধারণা যদি বা না থেকেও থাকে বাবার কাছে দিনের আলোর মতই পরিষ্কার ছিল, সে যতই বাবা সেদিন বিস্মিত হয়ে পড়ুন না কেন

 

জানী দুশমন-এর পোস্টার – ইন্টার্নেট থেকে সংগৃহীত

জানী দুশমন
  • 3.00 / 5 5
1 vote, 3.00 avg. rating (71% score)

Comments

comments