জোড়া গল্প ( পুরনো আর নতুন)

পতনবাবুর পতন
সুব্রত চৌধুরী

বনেদী কবিরাজকুলে জন্ম পতনবাবুর। গুপ্ত কবরেজের বাড়ী বললে এখনো আশেপাসের পাড়ার লোকে তাঁদের বাড়ী দেখিয়ে দেয়। পতনবাবুর ছোটবেলায় লোকে খেপাতো গুপ্তরোগের গুপ্ত কবরেজ বলে। পতনবাবুর বাবা সুষেন গুপ্ত বংশের ঐতিহ্য বজায় রেখে পুত্রের নাম রেখেছিলেন পতঞ্জলি আর কন্যার নাম বিশল্যকরণী। লোকের কাছে পতঞ্জলি হল পতন আর ক্ষীনবপু বোনটিকে পাড়ার লোকে বলত থানকুনি। পতনবাবু যখন নামের জ্বালা বুঝলেন, তখন আর করার কিছু ছিল না, কোর্টে গিয়ে এপিঠওপিঠ করতে পারতেন, কিন্তু বুদ্ধিমান পতনবাবু তাতে লাভের চেয়ে বিপত্তির আশংকাই বেশি করেছিলেন, তাই ওপথে পা বাড়ান নি।

বংশগত কবিরাজি পেশা পতনবাবুর পছন্দের ছিল না। তাই রাইটার্সের কেরানিকূলে নাম লেখান। ওই পেশা থেকে রোজগারও কমে আসছিল, আজকাল সবাই স্টেথো ঝোলানো ডাক্তার খোঁজে। তাই বাবা সুষেন গুপ্তও আপত্তি করেন নি। রাইটার্সে ঢুকে পতনবাবু ইউনিয়নে নাম লেখালেন, ফলে তাঁকে তাঁর টেবিলে পাওয়া যেত কখনোসখনো। ক্যান্টিনেই কাটাতেন, মাঝেমধ্যে কার্জন পার্কে তাসের আসরেও বসতেন।

বাবা পতনবাবুর বিয়ের জন্য মেয়ে এনেছিলেন পাল্টি ঘর থেকেই, আরেক বনেদী কবিরাজ বংশ। বিয়ের আসরে নববধু বা হবু বধু দর্শনে তাঁর মনে রংমশালের আলো প্রজ্বলিত হলেও তার ছটা কিছুটা কমে এলো যখন তার নাকি গলার আওয়াজ কানে এলো, বন্ধুমহলে সেদিন থেকেই পতনপত্নী পতনপেতনি নামে পরিচিত হলেন। পতনবাবুর শাশুড়ীমাতা মেয়ের বিয়ের আগেই ধরাধাম ত্যাগ করেছিলেন। তাই পতনবাবুর জীবনে জামাইষষ্ঠীর আপ্যায়ন জোটে নি। এই নিয়ে তাঁর ছিল মহা আক্ষেপ। একমাত্র সন্তান জন্মের পর বংশের নিয়মের বাইরে গিয়ে মেয়ের নাম রাখলেন লিলি। মেয়েকে যেন বাবা পিসিদের মত আয়ুর্বেদিক বোঝা না বইতে হয়। তখন থেকেই তাঁর মনে শখ ছিল কন্যার বিয়ের পর ধুমধাম করে জামাইষষ্ঠী করবেন।

পতনবাবুর মেয়েটি সুশ্রী, কথাবার্তা ভীষন মিষ্টি, জন্মসুত্রে মায়ের রূপ পেলেও নাকি আওয়াজ সে পায় নি। ছোট থেকেই পাশের বাড়ীর দত্তবাবুর মেয়ে বাবলির খুব ন্যাওটা। বাবলি তার চেয়ে তিন চার বছরের বড় হলেও দুজনে হরিহর আত্মা। দত্তবাবুরা কয়েক বছর আগে পাড়া ছেড়ে চলে গেলেও বাবলির সাথে লিলির যোগাযোগ আছে বলে শুনেছেন। মেয়েকে নিয়ে কোনও অভিযোগ কি কানাঘুষো কথাবার্তা পতনবাবুকে শুনতে হয় নি কোনদিন। সুন্দরীর পিছনে ছেলেপিলের লম্বা লাইন থাকলেও সে কোনদিন কোন ছেলের দিকে ঘুরেও তাকায় নি। পতনবাবুর দিনকাল সুখেই কাটছিল, দু’তিন বছর পর মেয়ের জন্য ভাল একটা পাত্র খোঁজার কথাও ভেবে রেখেছেন, তবে পাল্টি ঘরের চক্করে তিনি যাবেন না।

হঠাৎ একদিন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত লিলি উধাও বাড়ী থেকে। মায়ের মোবাইলে মেসেজ এল, আমি বিয়ে করেছি। তোমরা মানবে না, তাই বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি। পতনবাবু ব্যাঘ্রগর্জনে ঘোষনা করলেন, যে মেয়ে এভাবে পালিয়ে বিয়ে করে তার সাথে সম্পর্ক নেই। বাড়ীর দরজা বন্ধ ওই মেয়ের জন্য। পতনপত্নী দিনরাত কান্নাকাটি করে গেলেন, আর মেয়ের মোবাইলে ফোনের চেষ্টা করে গেলেন। সপ্তাহদুয়েক পর মেয়ের মোবাইলে আওয়াজ পাওয়া গেল; মা মেয়ের লুকিয়ে চুরিয়ে কথাবার্তা চালু হল। মাসদুয়েক পর পতনবাবুও নরম হলেন, নববর্ষে মেয়ের প্রনামও নিলেন। তারপরও তাঁর মাথায় সেই পুরনো আকাঙখা জেগে উঠলো। মেয়েকে বললেন জামাইকে নিয়ে জামাইষষ্ঠীতে আসার জন্য।

জামাইষষ্ঠীর আগে ঘরদোর নতুন করে সাজানো হল, বাইরের ঘরের পর্দা পালটানো হল। পতনবাবু বাড়ী রঙ করার কথাও ভাবছিলেন, সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে ভেবে আর এগোলেন না। আগের বিকেলেই ফল, মিস্টি এনে রাখলেন। সকালবেলায় ইলিশ, চিংড়ি, মাংস সবই এল। পতনপত্নী সকাল থেকেই রান্নায় ব্যাস্ত, খুশীর হাওয়া বইছে। দশটা নাগাদ বাড়ীর সামনে ট্যাক্সি থামার আওয়াজে দুজনেই বেড়িয়ে এলেন। মেয়ে এসে পা ছুঁয়ে প্রনাম করলে তাকে আশীর্বাদ করার বদলে পতনবাবু নিজেই মাটিতে বসে পড়লেন। দত্তবাবুর মেয়ে বাবলি যে জামাই বাবলু সেটা কে ভেবেছিল!

অদলবদল

পতনপত্নী তো জামাই আদরের সব ব্যাবস্থা করে রেখেছিলেন। বাবলিকে জামাই হিসেবে মেনে নিতে মন না চাইলেও কিছু করার ছিল না। আর নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল নীতি মেনে জামাই আদরেই আপ্যায়ন করছিলেন। জিনস সার্ট পরা বাবলিকে চেয়ারে বসিয়ে ষষ্টির ফোঁটা দিলেন, তারপর পাঁচরকমের ফল আর সাতরকমের মিষ্টিভরা বড় রেকাবিটা তার সামনে দিলেন। এই রুপোর রেকাবি এই বংশের কয়েক পুরুষের সম্পত্তি, বংশের বনেদিয়ানার প্রতীক। তার উপর সাজানো খাবার দেখে বাবলি তো আঁতকে উঠে বলল, ও কাকিমা করেছ কি? এতসব কে খাবে! আর মিষ্টি খাওয়া তো লিলির ভয়ে ছেড়েই দিয়েছি। মিষ্টি খেলেই ও বকাবকি করে।

-মা, ওর কথা শুনো না। গাদাগাদা মিষ্টি খায় আর যা মোটা হচ্ছে! ঠিক আছে, আজকের মতো ছাড় দিলাম মায়ের অনারে। খেয়ে নাও। আর শোনো, আমার মা-বাবা তোমারও মা-বাবা, ছোটবেলার মত কাকিমা বলবে না। লিলি বলে উঠল পাশ থেকে।

সবই তো হল, কিন্তু প্রথম জামাইষষ্টিতে জামাইয়ের জন্য কেনা ধুতি তো আর এই জামাইকে দেওয়া যায় না, তাই মেয়ের জন্য কেনা শাড়িটাই জামাইকে দিলেন। তার সাথে কয়েকহাজার টাকা বাবলির হাতে দিয়ে বললেন, বাবা নিজের পছন্দমত জামাকাপড় কিনে নিও। পতনবাবু মেয়েকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে তার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে একই কথা বললেন। তবে রাত্রে দু’চার আত্মীয়কে ডেকে মেয়ে জামাই দেখাবেন ভেবেছিলেন, সে পরিকল্পনা বাতিল করলেন। তবে তার উপায়ও ছিল না, দুপুরে খেতে বসেই মেয়ে ঘোষনা করল যে বিকেলে বাবলিদের বাড়ি যেতে হবে, তার মা বাবাও জামাইষষ্টিতে ওদের ডেকেছেন। খাওয়াদাওয়ার পরই লিলি বাবলিকে নিয়ে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করল। কৌতুহল হলেও মা হয়ে মেয়ের দরজায় কান পাততে পতনপত্নীর লজ্জা হল।

বিকেলে দরজা খুলল ওরা নিজেদের সাজগোজ সেরেই। পতনদম্পতি দেখে খুশি হলেন যে এবার বাবলি তাঁদের দেওয়া নতুন শাড়ি পড়েছে। কিন্তু লিলির পড়নে ট্রাউজার আর শার্ট। খেয়াল হল লিলি এখন বাবলির মায়ের জামাই ।

জামাইষষ্ঠী
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments