উত্তর কলকাতার এক বহু প্রাচীন ও বনেদী রেঁস্তরাতে খেতে গেছিলাম বন্ধুদের সাথে। সেকেলে কাঠের চেয়ার, মার্বেল টপ টেবিল ,ঢং ঢং ঘড়ি, ঝুলে ভরা সিলিং ,খটাং খটাং ডিসি পাখা , টিম টিম করা ডুম আলো – সব মিলিয়ে একটা সাবেকিয়ানার প্রতিচ্ছবি। ম্যানেজার কাঠের ক্যাশ বাক্স আগলে বোধহয় ঝিমুচ্ছিল , আমরা দুমদাম ঢুকে পরায়ে কিছুটা হতভম্ব ও কিঞ্চিত বিরক্তই হয়েছিল হয়তো। বুঝলাম আজকাল আর এখানে সেরকম একটা খদ্দের হয় না। ম্যানেজারের মাথার ওপর একটা ব্ল্যাক বোর্ড তেরছা ভাবে ঝুলছে ও তাতে চক দিয়ে লেখা-আজকের স্পেশাল মেনু “আকবরী পরোটা ও কষা মাংস “!! একটু উত্সাহ নিয়েই বোর্ডটা দেখিয়ে জিগ্যেস করলাম , “এটার কি speciality দাদা?” পরাণ বন্দপাধ্যায়ের মতন গলায়ে উত্তর এলো,”বললে কি আর বুঝবেন, আমাদের যিনি শেফ, তার পূর্বপুরুষরা সাত পুরুষ ধরে নবাব বাদশাদের হেঁশেলে বাবুর্চিগিরি করে আসছে। না খেলে তা বুঝবেন কি করে?” বেশ তবে আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি, অর্ডার দেওয়া হলো সেই মোগলাই খানার। আধ ঘন্টা খানেক অপেক্ষার পরে একটা ছোকরা ঝপ ঝপ করে কয়েকটা প্লেট নামিয়ে দিল টেবিলে আর আমরাও কালাহান্ডি বা সোমালিয়ার থেকে আসা বুভুক্ষুর মত তাতে হামলে পরলাম। বেজায়ে ঝাল মশলা দেওয়া একটা মাংশ ও বাসি তেলে ভাজা শক্ত ময়দার পাতি মোগলাই পরোটার সাথে খামোকা মোগল বাদশার নাম জড়িয়ে ম্যানেজার যে আমাদের সাথে একেবারে “মোগলাই ফ্রড” করেছে তা বলাই বাহুল্য। গল্পটা এখানে শেষ হলেই ভালো ছিল, সবাইকে ওই দোকানের ঠিকানা বাতলে দিতাম ও একটিবার গিয়ে চেখে আসতে বলতাম সেখানকার স্পেশাল মেনুটা । গন্ডগোলটা হলো বাড়িতে এসে কোনো এন্টাসিড না খেয়ে শুয়ে পরার পর। পেটে আকবরী পরোটা ও সিরাজী খাসির মধ্যে কায়েমী অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধের জেরে যে দুঃস্বপ্ন দেখলাম সেটাই হচ্ছে আসল গল্প।
সেই রেঁস্তরাতে আবার খেতে গেছি, তবে এবার একা। সেই ম্যানেজার আবার সেই বোর্ড দেখিয়ে পরাণ বন্দপাধ্যায়ের মতন গলায়ে বলছে ,”আজকের স্পেশাল মেনু হচ্ছে জাহাঙ্গিরি পোলাও ও নার্গিসী কোর্মা ..হেঃ হেঃ ..বাবুর্চির হাতের মুনশিয়ানা বুঝতে গেলে খেতে হবে। ” এমন সময় , ইয়া বড় জোব্বা ও রংচঙ্গে পাতলুন পড়ে এক পেল্লায়ে গোঁফওলা তার বিশাল বপু নিয়ে আমার উল্টো দিকের চেয়ারে এসে বসলো। দু হাতে আট খানা নানা রঙের আংটি আর গলায় ডজন খানেক হার। খাপের ভেতর তলোয়ার যেটা কোমরে ঝুলছে সেটার ওজন আধ মণ তো হবেই আর মাথায়ে টুপিতে যে পালক লাগানো সেটা নিশ্চই রাশিয়ান সার্কাস থেকে জোগার করেছে ব্যাটা । ভাবলাম চিত্পুরে যাত্রা করে বোধহয়,মহলার পরে খেতে এসেছে। ও বাবা সে মক্কেল ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে কমল মিত্রের তিন গুন বাঁজখাই গলায় চিল্লে উঠলো, “অস সালাম ওয়ালাই কুম…হালে শমা চেতোরে (ফার্সিতে কি খবর) ?”
কমল মিত্র চেঁচালে পরাণ বন্দপাধ্যায়ের যতটা মিউ মিউ সুরে উত্তর দিত, তার চেয়েও তিনগুন মিনমিনিয়ে ম্যানেজার বলল ,”কেয়া বোলতা হায় , কুছ সমঝ নেহি সেকতা। ”
সে চিত্পুরের পার্টি এদিক ওদিক তাকিয়ে ,এবার একটু আপেক্ষিক আস্তে গলায় জিগ্যেস করলো, “হিন্দুস্থানী সমঝ মে আতি হায়, খানে মে কেয়া মিলেগা?”
ম্যানেজার এর হার্ট রেট বাড়ছে,শান্ত অপরাহ্নে এ কোন আপদ এসে জুটল, “ইয়ে মানে, খানে মে মোগলাই পরোটা মিলেগা…” কথা শেষ করার আগেই সেই খাজাখান আবার চিল্লে উঠলো , “আলহামদুলিল্লাহ..বহুত খুব…..সাথ মে মুর্ঘ ইয়া গোস্ত মিলেগা? ” ম্যানেজার আড় চোখে তলোয়ারটার দিকে দেখেই আরো ঘাবড়ে গিয়ে বলল , “গোস্ত মানে পাঁঠা মতলব বকরী মিলেগা, দুসরা জানোয়ার নেহি মিলতা , হিন্দু জায়েগা হায় তো …. ” এবার খাজাখান পৃথ্বীরাজ কাপুরের মুগলে আজমের কেতায়ে বলল , “হিন্দু কাঁহা যায়েগা? ইয়েঃ মুল্ক উনকা হি তো হায়। ….জালালুদ্দিন আকবর কে রেহতে হুয়ে হিন্দুস্তান সে কোই হিন্দু নেহি যায়েগা।” বোঝো, এ দেখি সকাল সকাল নেশা ভাং করে নিজেকে আকবর ঠাউরেছে আর চিত্পুর থেকে ড্রেস ভাড়া করে এখানে যাত্রার পাঠ ঝাড়ছে। আমার মনের কথা বুঝতে পারল কিনা কে জানে ব্যাটা এবার আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো , “আপ ইয়াহা নাহার(মধ্যাহ্ন ভোজন) কে লিয়ে তশরিফ লায়ে হায় ?” আমি কোনো রকমে মাথা নেড়ে হ্যা বোঝালাম। ওমা তাতে বাদশাহ কি বুঝলো কে জানে , ম্যানেজার কে উদ্দেশ্য করে বলল, “ইয়েহ জনাব মেরা খাস মেহমান হায় …ইনকে আউর মেরে লিয়ে উমদা পরাঠা আউর দো তস্তরী বকর কে গোস্ত লাইয়ে। ” আরে এতো মহা জ্বালা, আমি এই গুলিখোর পাঠানটার সাথে খেতে যাব কেন? ওদিকে ম্যানেজারও উঠে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল, ফিরে আসবে তো নাকি থানা টানায়ে খবর দিতে গেল । আমি এবার সাহস করে জিগ্যেস করলাম , “আপ আকবর হায় ….বাদশাহ আকবর ?” সে একটু ভ্রু কুঁচকে তলোয়ারের হাতলে হাত রেখে বলল , “কোই শক ?” ঘাড় নেড়ে জানালাম “নাঃ।”,মনে মনে বললাম, বালাই ষাট এরকম মাগনায়ে ৩৭ টাকার পরোটা মাংস খাওয়ালে আকবর কেন আলাউদ্দিন খিলজি থেকে সিরাজুদ্দৌলাহ, কাউকে নিয়ে আমার কোনো অসুবিধে নেই !! সে আবার বলে উঠলো , “বহুত ঢুন্ডনে কে বাদ ইয়েঃ জগহ মিলা ,যাহান মেরে খাস বাবুর্চি কা বনা হুয়া লজীজ খানা অভি ভি মিলতা হায় , আকবরী পারাঠে ..ওয়াঃ ওয়াঃ….নার্গিসী কোর্মা …কেয়া বাত।” ভাবলাম একবার বুঝিয়ে বলি যে সে যা ভাবছে সেরকম নয় ,আমি সদ্য মুরগি হয়েছি। তারপর ভাবলাম কি দরকার, বেশি জ্ঞান দিতে গেলে যদি রানা প্রতাপ মনে করে তলোয়ার চালিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে ম্যানেজার আরও দু জনকে সাথে নিয়ে এক গাদা খাবার দাবার নিয়ে এলো। শাহেনশা যে খুশি হয়েছে তা তার চোখ দেখেই বোঝা গেল। আর শুধু শাহেনশা কেন, গন্ধ নাকে যেতে আমার জিভেও লিটার খানেক জল চলে এলো। ম্যানেজার এবার একটু সাহস পেয়ে জানালো , “খাস আপ কে লিয়ে ডবল মতলব ইয়ে দুঠো আন্ডা দেকে পরোটা বানায়া..হেঃ হেঃ। ” এরপর জাহাপনা ফার্সি না আরবি তে বিড়বিড় করে কি সব বলতে বলতে মাংস দিয়ে একের পর এক পরোটা যে ভাবে খেলো সেটা দেখলে গুপি গাইন বাঘা বাইনের নৃপতিও লজ্জা পেত। এক একটা পরোটা শেষ হয় আর সম্রাট গলা থেকে এক একটা হার খুলে ম্যানেজারের দিকে ছোড়ে আর বলে , “ইয়েঃ বাবুর্চি কে লিয়ে…ইয়েঃ খানসামে কে লিয়ে …ইয়েঃ আপকে লিয়ে….ওয়াঃ কেয়া খুশবু …ওয়াঃ কেয়া অন্দাজ ..” আমিও ফাঁকতালে গোটা তিনেক পরোটা সাঁটিয়ে দিলাম ,আহা কি সাইজ আর কি স্বাদ, তারওপর খাঁটি ঘিতে ভাজা!! খাওয়া দাওয়া শেষে জাহাপনা জানালেন, “বহুত দিনো বাদ রুহ কো সুকূন মিলা…..অশরাফিয়া তো হায় নেহি, বস দিন-এ-ইলাহী সে দুয়া মাং সকতা হুঁ আপ সব কে লিয়ে …” ম্যানেজার এর এদিকে হার্ট এটাক হয়ে যাবার যোগার, খেয়ে দেয়ে ব্যাটা বলে পয়সা নেই!! কিন্তু তলোয়ারটার দিকে আবার চোখ পড়তেই ম্যানেজার কিরকম আমতা আমতা হয়ে বলল , “না না সব আপকা হি হায় ….ফির সে আকে হুকুম করেগা তো ফির সে স্পেশাল খানা খিলায়েগা …. হেঃ হেঃ। ” এ কথা শুনে আকবর ম্যানেজারকে জড়িয়ে ধরে কি একটা ফার্সি কবিতা বলছিল…কয়েকটা শব্দ…দোস্ত…ওয়াক্ত…..জমীন এসব চেনা চেনাও ঠেকলো ,এমন সময় শব্দ গুলো বাংলা হয়ে গেল আর আশৈশব চেনা গলায় মাকে বলতে শুনলাম,”উঃ, জাহাপনার ডাল ভাতে আর মুখ রুচছে না, রাতভর হিন্দি উর্দু তে উনি ভুল বকছেন আর কালিয়া কোর্মার স্বপ্ন দেখছেন !!”
কি আর করা, যাই হোক কাশি মুখুজ্যে লেনের দিকে কেউ গেলে ব্যক্তিগত ভাবে রেঁস্তরার ঠিকানা দিতে পারি , প্রয়োজনে জানাবেন।

জাহাপনা খুশ হুয়া
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments