ভাল-মন্দ খাবার দেখে ম্যালার্ড হাঁসের জিভে জল

 

পাখি বলে কি জিভে জল আসতে নেই? আপনার সামনে ভাল মন্দ খাবার দিলে আপনার জিভ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে, আর পাখিদের বেলায় যত দোষ? দেখুন না এক খানা জব্বর মাছের সন্ধান পেয়ে মিস্টার গ্রেট ব্লু হেরন কিরকম জিভ দিয়ে চেটে নিচ্চেন নিজের ঠোঁট।

জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে ব্যস্ত গ্রেট ব্লু হেরন

 

উপরের দুটো ছবিই স্রেফ মজা করে পোস্ট করা। কিন্তু তাবলে ভাববেন না পাখিদের জিভ হেলাফেলা করার মত বস্তু। হিতোপদেশের সেই শেয়াল আর সারসের গল্প মনে আছে? সারসকে থালায় করে ঝোল খেতে দিয়ে প্র্যাকটিকাল জোক করেছিল শেয়াল। সারসের পক্ষে থালা থেকে ঝোল খাওয়া এট্টু কঠিন হলেও অন্য কিছু পাখির ক্ষেত্রে কিন্তু তা খাটেনা। তারা থাকলে শেয়ালকেই বোকা বনতে হত সেদিন।
পাখিদের ঠোঁটের আড়ালে জিভের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেকেই অবগত না। যাঁরা পাখি সম্পর্কে সামান্য খোঁজ-খবর রাখেন তাঁরা সকলেই জানেন, কিন্তু আমার অনেক বন্ধুকেই দেখেছি এই ব্যাপারটা ঠিক হজম করতে পারেনি। আসলে পাখিরা সকলের সামনে জিভ বার করেনা সেরকম বেশি। তাই একটা কুকুর জিভ বার করে হাঁপাচ্ছে এই দৃশ্যটা যেমন বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, একটা পাখি জিভ বার করে থালা থেকে তরল চেটেপুটে খাচ্চে বললে সে তুলনায় অনেকটা অ্যাবসার্ড লাগে।

 

               সারস (ফোটো – কাজল দাশগুপ্ত) বনাম রেনবো লোরিকিট (ছবি সূত্র – উইকিপিডিয়া)

 

তা বলে এমন নয় যে পাখিদের জিভের ব্যবহার কম। বিভিন্ন পাখির জিভ বিভিন্ন রকমের হয়, আর সেই জিভ ব্যবহার করে তারা নানারকম কাজ করে থাকে। প্রধান ব্যবহার স্বভাবতই খাওয়া দাওয়া সংক্রান্ত। পোকামাকড় খুঁটে খাবার সুবিধের জন্য, জলের মধ্যে থেকে শিকার ছেঁকে নেবার জন্য, খাবার গ্রিপ করার জন্য অথবা জোগাড় করা খাবার বাচ্চাকে এগিয়ে দেবার জন্য… এরকম বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা ব্যবহার করে তাদের জিভ।

হামিং বার্ডদের কথা বা মৌটুসি জাতীয় পাখিদের কথাই ধরা যাক। এদের জিভ তৈরি হয় সরু সুতোর মত একটা ক্যাপিলারি নালী দিয়ে। তার সাহায্যে খুব সহজেই এরা ফুলের থেকে মধু সংগ্রহ করতে পারে। অনেকটা স্ট্র দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে সরবত পান করার মত।

 

রুবি থ্রোটেড হামিংবার্ড এর ক্যাপিলারী জিভ
(ফোটো – হেইজ কামিনস)

 

যেসব পাখিরা ছোট পোকামাকড় ধরে খায় তাদের অনেকের জিভের ডগায় ধারালো ফলা লাগানো থাকে। সেই ধারালো ফলায় বিঁধিয়ে নেয় নিজের শিকার। গাছের গায়ের ফাঁকফোকর থেকে পোকা সংগ্রহ করার জন্যেও এইরকম জিভ খুব কাজের। নাটহ্যাচ জাতীয় পাখিদের জিভের ডগাটা তাই হয় কাঁটাচামচের মত। সেই কাঁটা দিয়ে ওরা দিব্যি তুলে নেয় পছন্দের খাবার। 
কাঠঠোকরার জিভ এক চরম জিনিস। এদের সুদীর্ঘ জিভ এমনিতে মুখের ভিতরে লুকিয়ে থাকে, কিন্তু একবার ধারালো ঠোঁট দিয়ে গাছের গায়ে গর্ত বানিয়ে ফেলার পর সেই লম্বা জিভ বার করে কোটরের ভিতর থেকে পোকামাকড় ধরে এরা। এদেরও জিভের ডগায় থাকে কাঁটা বা রোঁয়া। সেগুলোকে রেক (Rake) এর মত ব্যবহার করে টেনে আনে পোকাদের। নিচের কাঠঠোকরার ছবিদুটোয় দেখতে পাবেন এদের লম্বা জিভের অংশবিশেষ।

 

কাঠঠোকরার জিভের কেরামতি
(ছবি – ডেনিস তাকাহাশি)

 

  

                  পাইলিয়েটেড উডপেকার (ফোটো – মার্ক অ্যাভেরিট)         ফাল্ভাস-ব্রেস্টেড উডপেকার (ফোটো – সোমনাথ ঘোষ)

 

সাধারণত বেশিরভাগ পাখির জিভ হয় একটা মাংসল সরু ডগা ওয়ালা ফলার মত। উদাহরণ হিসেবে শালিখের একটা ছবি দেওয়া গেল। চারপাশে যেসব পাখি দেখা যায় তাদের বেশিরভাগেরই জিভ এই ধরনের। যারা বাদামজাতীয় শক্ত খাবার খায়, তাদের জিভ হয় অপেক্ষাকৃত শক্ত। আবার শিকারী পাখিদের জিভ হয় বড়, শক্ত আর খসখসে। ফুলের রেণু আর নরম ফল খাবার সুবিধের জন্য টিয়া জাতীয় পাখি লোরিকিটদের জিভের ডগাটা হয় ব্রাশের মত। জিভ দিয়ে চেটে চেটে খাওয়া বলতে যা বোঝায় সেটা পাখিদের মধ্যে এদেরকেই করতে দেখা যায়।
কিন্তু এত রকম বিচিত্র গড়নের জিভ নিয়ে এরা কি স্বাদ বুঝতে পারে? দেখা গেছে স্বাদগ্রন্থি থাকলেও তার সংখ্যা বেশিরভাগ পাখির ক্ষেত্রেই খুব কম। ফলে স্বাদের অনুভুতি খুব জোরালো নয়। কারো ক্ষেত্রে একেবারেই কম, আবার কারো ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি। নানা গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে পাখিরা মিষ্টি, নোনতা, টক এবং তেতো স্বাদ বুঝতে কমবেশি সক্ষম।

 

  

               শালিখ (ফোটো – সুচেতনা সেন)                                  শঙ্খচিল (ফোটো – অভিলাশ পিল্লাই)

 

জলের পাখিদের জিভেও দেখা যায় নানারকম বৈচিত্র। কিছু কিছু হাঁসের জিভ জল থেকে ছোট ছোট শিকার ছেঁকে নেবার কাজ করে। খাবার শুদ্ধু বেশ কিছুটা জল মুখে পুরে নিয়ে এরা জিভটাকে টাকরার দিকে তুলে দেয়। ফলে জিভের পাশের দিকের সরু সরু রোঁয়ার ফাঁক দিয়ে জলটা বেরিয়ে যায়, কিন্তু খাবার রয়ে যায় বন্দী হয়ে। একেবারে প্রথম ছবিটা এরকম সময়েই তোলা।  (খাদ্যপ্রেমীদের জন্য তথ্য – হাঁসের জিভ কিন্তু একটা ডেলিকেসি। কখনও খেয়ে দেখেছেন নাকি?)
বিভিন্ন মাছ খেকো জলের পাখিদের জিভের দুপাশে কাঁটা কাঁটা থাকে। এই কাঁটার সাহায্যে তারা মাছের পিচ্ছিল দেহকে সহজে গ্রিপ করতে পারে। আবার গুজ জাতীয় পাখিরা এই কাঁটাওয়ালা জিভকে জলজ লতাপাতা ছেঁড়ার কাজেও ব্যবহার করে। কারো কারো জিভের ধারের কেবল বিশেষ কিছু অংশে এই কাঁটা থাকে। আবার তেমনি পেঙ্গুইনের জিভের উপরিভাগ পুরোটাই এরকম কাঁটা দিয়ে ঢাকা।

 

কানাডা গুজের কাঁটাওয়ালা জিভ (ফোটো – চাক হোমার)

 

এ তো গেল খাবার সংগ্রহের কথা। আরেকটা ব্যাপার না বললে জিভের কথা সম্পূর্ণ হয় না। আমরা কথা বলার সময় জিভ ব্যবহার করে নানা ধরনের শব্দ তৈরি করতে পারি। এই কাজটা পাখিরা বিশেষ করে না। আমাদের মতই ওদেরও শব্দটা বের হয় গলার মধ্যে থেকে। তারপরে সেই শব্দকে নানারকম রূপ দেবার জন্য ঠোঁটকে ব্যবহার করে থাকে তারা, অনেকটা শিস দেবার মত কায়দায়। কিন্তু এই কাজে জিভের ব্যবহার নেই বললেই চলে। ব্যতিক্রমও আছে। টিয়া জাতীয় পাখি, যারা বোল পাড়তে পারে, তারা মানুষের মত শব্দ করতে পারে কারণ তারা ডাকার সময় জিভকেও ব্যবহার করে। গবেষণায় দেখা গেছে টিয়ার ডাকে জিভের বড় ভূমিকা আছে (বোল না পাড়ার সময়ও)।

একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা দিয়ে শেষ করব। পাখিদের এই যে নানারকম গান গাওয়া, শিস দেবার অভ্যেস, এর কারণ জানেন কি? ঠিকই ধরেছেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য হল বিপরীত লিঙ্গের প্রাণীটিকে আকৃষ্ট করা। অনেকটা সেই হবু বৌ দেখতে গিয়ে "একটা গান শোনাও তো মা" টাইপের। মেয়ে পাখি এসে বলে "গান শোনাও দেখি, কেমন পারো"। আর পুরুষ পাখি নানারকম সুরেলা গান গেয়ে আকৃষ্ট করে তাকে। শুধু ভোকাল মিউজিক না, বাদ্যযন্ত্রও আছে। কাঠঠোকরাদের গাছের গায়ে ড্রাম বাজানো কখনও না শুনে থাকলে গুগল করে নিন। অথবা তার চেয়েও ভাল, এক রোদ ঝলমলে বিকেলে বেরিয়ে পড়ুন জংলি রাস্তায়। কাঠ ঠোকরার ড্রামের সঙ্গে বিভিন্ন পাখির সঙ্গীতের জলসা শুনতে পাবেন কান খোলা রাখলেই।

 

** প্রথম দুটি ছবি (ক্যামেরা – ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস) বাদে কোনোটিই আমার তোলা নয়। ফোটগ্রাফারের নাম প্রতিটি ছবির নিচে দেওয়া হল।

 

জিভের কেরামতি
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments