সন্ন্যাসীদের পরিব্রাজন

“তোমরা দুজনে জোড়ায় জোড়ায় যাও, কিন্তু যে যার মত কাজ কোর। এবার যাও,মানুষকে উদ্ধার কর, গ্রহণ কর।
“মানুষকে সদ্ধর্ম চিনতে সাহায্য কর; যে মানুষ আকাঙ্খার ধুলোয় নিমজ্জিত হয়ে অন্ধ হয়ে আছে, তাকে পুণ্য জীবনের আলো দেখাও।
“তারা জ্ঞানের অভাবে মরতে বসেছে।
“তাদেরকে ধর্ম শেখাও
এইভাবে শিশুসুলভ একাকীত্বে, অমিত প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে তারা ধর্মোপ্রচারে বেরিয়ে পড়ল। ফুলে ফুলে রক্তরাগে রঞ্জিত শাখাপ্রশাখা, আশায় আশায় প্রহর হল দীর্ঘ। যে পরম সত্যকে চীরকাল ভেবে এসেছে, আজ তাকে মুখ ফুটে বলতে পারছে; এতদিন বুদ্ধের মতন কেউ ছিলেন না যিনি এমন নিশ্চিত করে বুঝিয়ে দিতেন। তারা যা এতদিন ধরে ভেবেছে, তা যে সত্যি, সেই উপলব্ধি এবার হয়েছে, যেন কতদিনের স্বপ্ন পূরণ হল। সংঘের পুষ্প প্রস্ফুটিত হল, ভারত থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল, “সৎ সুগন্ধ দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল” ।

এই সময় বুদ্ধের কাছে একজন এসে জানতে চাইলেন, গৃহস্থ অবস্থায় বাড়িতে থেকে ধর্ম পালন সম্ভব কিনা। বুদ্ধ বললেন, “সাধুও যা, গৃহস্থও তাই, যে অবস্থায় উভয়েই “আত্ম” বোধ বিসর্জন দিয়ে সমস্ত প্রাণীর প্রতি সমদৃষ্টি প্রদান করেন, তাঁরা সমান।” কয়েকদিনের মধ্যেই বুদ্ধের প্রায় সহস্র নুতন শিষ্যলাভ হল। তিন কাশ্যপ ভ্রাতৃত্রয় আর তাঁদের সমস্ত শিষ্যগণ বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। এঁরা অগ্নি-উপাসক। গয়ার কাছে হস্তিশিলা (elephant rock), সেই পাহাড় থেকে দেখা যায় সুমুখে রাজগৃহের বিস্তীর্ণ ছড়ানো উপত্যকা । দিগন্তে হঠাৎ করে দাবানল জ্বলে উঠেছে। তা দেখে বুদ্ধদেব সেই সহস্র অগ্নি-উপাসকদের কাছে তাঁর আদিত্য পরিযায় সূত্র ব্যাখ্যা করলেন।
“হে সাধুগণ, সবকিছুতে আগুন লেগেছে, দেখুন। কিন্তু আগুন কোথায় লেগেছে?
“চক্ষু, হে সাধুগণ, চক্ষুতে অগ্নিসংযোগ হয়েছে; অবয়বে অগ্নিসংযোগ হয়েছে, নয়ন-চেতনায় আগুন লেগেছে, চোখ যা দেখে তার সবকিছুতে আগুন লেগেছে, তাবৎ বোধ, সংবেদনা, সে সুখের কি দুঃখের, কি সুখদুঃখ রহিত, আগুন হতে সঞ্জাত, তাতেও আগুন লেগেছে।
এ আগুন কিসের আগুন?
এ আগুন লালসার আগুন, ঘৃণার আগুন, রিরংসার আগুন, জন্ম, জরার, মৃত্যুর, দুঃখের, শোকের, হতাশার আগুন।
কর্ণে অগ্নি সংযোগ হয়েছে, শব্দেরা সব অগ্নিদগ্ধ, নাসিকায় অগ্নি, অগ্নিদগ্ধ ঘ্রাণ, জিহ্বায় আগুন, স্বাদ পুড়ে যাচ্ছে, শরীরে আগুন, যা কিছু স্পর্শ করা যায় তার সবেতে আগুন, মস্তিষক্কে আগুন, ধারণায় আগুন, মনসিজ-চেতনায় আগুন, তাবৎ বোধ, সংবেদনা, সে সুখের কি দুঃখের, কি সুখদুঃখ রহিত, আগুন হতে সঞ্জাত, তাতেও আগুন লেগেছে।
“ হে সাধুগণ, এই দেখে যাঁরা প্রাজ্ঞ, তাঁদের চোখ সম্বন্ধে বীতরাগ জন্মায়, অবয়ব সম্বন্ধে বীতরাগ জন্মায়, নয়ন চেতনা সম্বন্ধে তাঁরা উদাসীন হন, তাবৎ বোধ, সংবেদনা, সে সুখের কি দুঃখের, কি সুখদুঃখ রহিত, আগুন হতে সঞ্জাত সমস্ত কিছতেই তাঁরা উদাসীন। শ্রবণেন্দ্রিয় সম্বন্ধে তাঁরা উদাসীন, শব্দবোধ নিয়ে উদাসীন, নাসিকা, ঘ্রাণ, জিহ্বা, স্বাদ, শরীর, স্পর্শজাত তাবৎ বিষয়ে উদাসীন, মস্তিষ্ক, ধারণা, মন-চেতনা, যা কিছু বোধ, চেতনা, সমস্ত বিষয়ে তাঁরা উদাসীন, বীতরাগ।
“এই ঔদাসীন্য যখন উপলব্ধি হয়, তখন তাঁরা আসক্তি রহিত হন, তখন তাঁরা মুক্ত ।
“যখন মুক্তি আসে, তখন উপলব্ধি করেন যে মুক্ত হয়েছেন।
“তখন বোধ জন্মে যে পুনর্জন্মের অন্ত হয়েছে, বোঝেন যে পুণ্য জীবন প্রাপ্ত হয়েছেন, যা করা উচিৎ তাই করেছেন, ইহজগতের তিনি কেউ নন। “
এই-ই পরম সত্য!
অজস্র শিষ্যসমেত পরম শ্রদ্ধেয় জন এবার মগধের রাজধানী রাজগৃহে অবতীর্ণ হলেন।

রাজগৃহে বুদ্ধদেব একটি শান্ত কাননে বিরাজ করছেন, তখন সেখানে মহারাজ বিম্বিসার তাঁর পাত্র, মিত্র,, অমাত্য, সৈন্যাধ্যক্ষ, ব্রাহ্মণ পুরোহিত সহ দেখা করতে এলেন। ইনি সেই মহারাজ বিম্বিসার, যিনি এককালে শাক্য রাজপুত্রের প্রাসাদ ত্যাগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তারপরে সিদ্ধার্থকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন যে কোনদিন যদি তিনি সর্বোচ্চ বোধি প্রাপ্ত হন, তাহলে রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করবেন। পরম শ্রদ্ধেয় জনের সঙ্গে উরুবিল্ব কাশ্যপ কে একসঙ্গে দেখে মহারাজ ও তাঁর সঙ্গীরা ভাবলেন ব্যাপারটা কি? রাজা ও রাজন্যবর্গের সামনেই উরুবিল্ব কাশ্যপ পরমজনের প্রতি সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করে বিষয়টা পরিষ্কার করে দিলেন। প্রণিপাত করে কাশ্যপ ব্যখ্যা করে বললেন যে নির্বাণের পরম শান্তি উপলব্ধি করার পর তাঁর আর যাগযজ্ঞ, বলিদান ভাল লাগে না, “ওতে নারীসঙ্গ আর ভোগবিলাসের চেয়ে উচ্চতর কিছু পারিতোষিকের আশা নেই” বৃদ্ধ মহাকবির ভাষা ধার করে বলতে হয়। এই প্রাচীন পন্থী সাধুরা যখন উপলব্ধি করলেন যে মৃত্যুর কারণ জন্ম, আবার জন্মের কারণ লোভ লালসা কৃত কর্ম, তাঁদের কাছে বুদ্ধদেব যেন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে জলে ভেসে যাওয়া মানুষদের ডেকে বলছেন, “ভো! ওঠো জাগো! জলে ভেসে যেতে যেতে তোমার স্বপ্নের নদী তোমার কাছে পরম প্রিয় মনে হতে পারে, কিন্তু এই বয়ে চলা স্রোতের তলায় রয়েছে কুমীরে ভর্তি খরস্রোতা এক সরোবর। জেনে রেখো যে এই নদী দুরভিসন্ধি, এই সরোবর কামুক লালসাপূরর্ণ ভোগবাদী জীবন, সেখানে ক্রোধের তরঙ্গ, খরস্রোত লালসা, আর কুমীর নারীসম্ভোগ।”

মানবচরিত্র দেখে আর ধর্ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বুদ্ধদেব এইটুকু বুঝেছিলেন যে, এই যে রাজা ও পাত্রমিত্র তাঁর কাছে এসেছেন, এঁরা অহঙ্কারী, বিত্তবান, প্রতিপত্তিশালী, কিন্তু এসেছেন এই আশায় যে এতে কি লাভ হবে দেখতে, কারণ এ নিয়ে এদের মনে যথেষ্ট সংশয় আছে । তিনি প্রকৃত আলোকপ্রাপ্ত । তিনি তাদের শেখালেন যে কি দারিদ্র, কি প্রাচুর্য, কি জ্ঞান, কি অজ্ঞানতা, বেঁচে থাকা, না থাকা, কোনকিছুতেই ব্যক্তিমানুষের কিছু আসে যায় না। তিনি তাদের বোঝালেন, মানুষ সত্যি বলতে কি, নানান সমষ্টির একটা পিণ্ড বই কিছু নয় ।
“একটা হাড়ের মজবুত খাঁচা তৈরী করা হল, তাকে রক্তমাংস দিয়ে ঢাকা দেওয়া হল, তারপর সেখানে জরা, মৃত্যু,বার্ধক্য, অহংকার, আর প্রবঞ্চনার আস্তানা গড়ে উঠল।
“এই সাজানো গোছানো জুড়ে দেওয়া মাংসপিণ্ডটার দিকে তাকিয়ে দেখুন, সেখানে শুধুই ক্ষতের প্রলেপ, তার নিজস্ব কোন শক্তি নেই, কোন কিছু আঁকড়ে থাকা নেই। “
‘আমিত্বের জায়গাই নেই কোন, জন্ম-মৃত্যু দুঃখ সঞ্জাত পিণ্ডটাকে, যাকে শরীরের অংশ বলে মনে করছি, এ শরীর কিন্তু আমি নই, শরীরে আমিত্বের কোন জায়গাই নেই, সব শেসে আছে শুধু পরম অনন্ত শান্তি। আর কিছু নেই।
“আমিত্বের চিন্তাই যাবতীয় দুঃখের উৎপত্তির কারণ, পৃথিবীর সঙ্গে একসূত্রে গ্রথিত, কিন্তু যখনই এই বোধ জন্মায় যে কোন “আমি” কে আর বাঁধা যাবে না, তখন যাবতীয় বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়।
কোথাও কোন বন্ধন নেই, এই উপলব্ধিমাত্রই মুক্তির বোধ হয় ।
সত্যি বলতে কি, “আমি” কোথাও নেই।
“না কর্মী, না জ্ঞানী, না প্রভু, না দেবতা, কেউ নেই কোথাও, তবু, এতৎসত্ত্বেও, জন্মও আছে, মৃত্যুও আছে, যেমন প্রতিদিন প্রভাত হয়, রাত নামে, ক্রমাগত চলতেই থাকে ।
“এবার যা বলি শুনুন। ষড়েন্দ্রিয় আর তার ছয়টি বস্তুকে সংযুক্ত করলে ছ রকমের চেতনার উদয় হয়। চোখ আর দৃশ্যের মিলনে দৃষ্টির চেতনা; কান আর শব্দের মিলনে শব্দের চেতনা,; জিহ্বা আর আস্বাদের মিলনে স্বাদের চেতনা; নাসিকা আর ঘ্রাণের মিলনে আঘ্রাণের চেতনা; শরীর আর স্পর্শের মিলনে স্পর্শের চেতনা; মস্তিষ্ক আর চিন্তার মিলনে চিন্তার চেতনা; তারপর স্মৃতি।
“আতস কাঁচ রৌদ্রজ্জ্বল দিবা দ্বিপ্রহরে শুকনো কাঠের ওপরে ধরলে সেখানে যেমন আগুনের উৎপত্তি হয়, তেমনি, বহিরিন্দ্রিয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর মিলনে চেতনার উদয় হয়, অহং, যা কিনা চেতনার জনক, তার জন্মও এইখানেই।
“বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম, তবু বীজ অঙ্কুর নয়, অথচ তার থেকে সে ভিন্ন কিছুও নয়। এই হল তাবৎ জীবের জন্মরহস্য।”

বোধ আর স্মৃতি সঞ্জাত এই যে অহং, এ যে অনিত্য, কাজেই এর লয়ও অনিবার্য, এই জ্ঞান উপলব্ধি করার পর মহারাজ বিম্বিসার ও তাঁর সমস্ত অমাত্যগণ বুদ্ধ, ধর্ম, ও সংঘ – গার্হস্থ্যে এই ত্রিরত্নে শরণ নিলেন। মহারাজ তখন পরম শ্রদ্ধেয়জন ও তাঁর সমস্ত শিষ্যদের রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানালেন, ও সংঘকে তাঁর নিজের প্রমোদকানন, যার নাম বেলুবন, উপহার দিলেন। এই বেলুবনে মহাগুরু ও তাঁর গৃহত্যাগী শিষ্যদের থাকার বন্দোবস্ত হল। বুদ্ধদের ও তাঁর শিষ্যদের শরীর পরিচর্যা ও চিকিৎসার জন্য মহারাজ বিম্বিসার বিখ্যাত চিকিৎসক জীবককে নিযুক্ত করলেন । জীবকের নির্দেশেই ভিক্ষুগণ, যাঁরা এতদিন চীর ও কাষায় পরিধান করে দিন কাটাতেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হলুদ-রঞ্জিত বস্ত্র গ্রহণ করে পরিধান শুরু করলেন।

বেলুবন নামে জায়গাটি শহরের উপকন্ঠে, সেখানে নানারকমের তোরণ, খোলামেলা হাঁটার জায়গা, বাগানঘেরা। জায়গাটি দিনের বেলা শান্ত, রাত হলেই নিগূঢ় নীরব, জনস্থান থেকে বহুদূরে, একান্তে থাকার, মনসংযোগ করার আদর্শ জায়গা। সেখানে বাগান, আশ্রম, ধ্যানগৃহ কুটীর, চারপাশ পদ্মদীঘি দিয়ে ঘেরা, সেখানে আম গাছের মিষ্টি গন্ধ ম’ম’ করে, সরু দীর্ঘ গগনচুম্বী তালগাছের সারি, তালপাতার ভিজে পাতা যেন ছাতার তলায় সন্ন্যাসীদের মনে করিয়ে দেয় তালের বীজ, যেন জাগতিক সুখ, সুখী জীবনের সমতাকে বিপর্যস্ত করে আকাশে উঁকি দিচ্ছে ।

একদিন অশ্বজিৎ নামে বুদ্ধদেবের প্রথম পাঁচ শিষ্যের একজন, রাজগৃহে মাধুকরী করছিলেন, এমন সময় সাধু সারিপুত্রের সঙ্গে দেখা। অশ্বজিতের আনন্দময় আভিজাত্য দেখে অবাক হয়ে সারিপুত্র শুধোলেন, “কে আপনার গুরুদেব? তিনি কোন সম্প্রদায়ের?” সারিপুত্রের মৌদগল্যায়ন নামে এক গুরুভাই ছিলেন । বহুদিন আগে তাঁরা দুজনে ঠিক করেছিলেন যে দুজনের মধ্যে যে প্রথম পরম সত্য ও অমৃতের সন্ধান পাবে, সে অন্যকেও জানাবে। অশ্বজিৎ যখন বললেন, “শাক্যবংশজাত গৃহত্যাগী এক মহৎ সাধু আছেন, তিনি আমার গুরুদেব, আমি তাঁরই শিষ্য”, এই বলে গেয়ে উঠলেন,

“যা কিছু কারণ হতে উথ্থিত হয়,
বুদ্ধ বলেছেন তার কারণ সমুদায়,
কিসে তার লয়,
পরম জন সে কথাও বলেছেন”

শোনার সঙ্গে সঙ্গে সারিপুত্র উপলব্ধি করলেন তিনি অমৃতের সন্ধান পেয়েছেন। মৌদগল্যায়নের কাছে গিয়ে যা শুনেছেন তা বললেন । সারিপুত্র ও মৌদগল্যায়ণ দুজনে সশিষ্য তথাগতের কাছে গেলেন।

জেগে ওঠ – পর্ব ৬
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments