পূর্ব প্রকাশিতের পর

বুদ্ধদেবের প্রাত্যহিক জীবন

পরম শ্রদ্ধেয় জন তখন অনাথপিণ্ডকের জেতবনে অবস্থান করছেন । একদল সন্ন্যাসী ভোরে উঠে সাজসজ্জা-অন্তে ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে আশ্রম থেকে শ্রাবস্তীনগরে মাধুকরীতে বেরিয়েছেন। ফিরে এসে তাঁরা বুদ্ধের দর্শণ প্রার্থনা করলেন ও তাঁকে মহারাজ প্রসেনজিত যে মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছেন তার সম্বন্ধে জানালেন। সে যজ্ঞে পাঁচশো করে ষাঁড়, বকনা-বাছুর, ছাগ, মেষ, প্রভৃতি পশুকে বেঁধে যজ্ঞশালায় বলিদানের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তাদের পিছনে ক্রীতদাস ও খুচরো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে এমন সব মানুষকে রীতিমত চাবকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে বেচারারা চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলিদানের প্রস্তুতির কাজ করে যাচ্ছে, এসব দৃশ্য তাঁরা স্বচক্ষে দেখে এসেছেন। এই রকম একটি অশুভ মারণযজ্ঞের আয়োজন হচ্ছে, এই কথা শুনে মহামানবের উপলব্ধি হল যে মানুষ চীরকাল স্রেফ মূর্খতা, অজ্ঞানতা, অচেতনতার কারণে অধঃপাতে যায়।
“মেষাদি পশু, যারা দুধ দিয়ে তোমাদের পাত্র ভরিয়ে রাখে, তাদের হত্যা করে, তাদের নির্যাতিত জীবনের মাংসভক্ষণ অনিষ্টকর, পাপকাজ। যে মূর্খ হাত সার্বিক শূন্যতায় কসাইয়ের ছুরি ধরে আছে, জন্ম জন্মান্তর ধরে সে শোণিতসিক্ত হয়ে ভুগবে । হে মোর ভ্রাতা, ভিক্ষুগণ, আর কত পাপ, আর কত অনিষ্ট, আর কত সদয় ঋষভ ও অন্যান্য পশুদের হত্যালীলা, করুণ অসহায় তাদের যে দু-চোখ, আর কত উন্মত্ত হত্যালীলায় বলি দিয়ে রক্তপান চলবে, শুধু পুনর্জন্মের আশায়,বার বার সেই আত্ম স্বর্গ আর যন্ত্রণাভোগে ফিরে আসা!
“মানুষ যা কিছু যজ্ঞে উৎসর্গ করে, একবারে, কি দায়ে পড়ে বছরভর ধরে, পুণ্যলাভের আশায়, সেসবের মূল্য এক কানাকড়িও নয়।
“সমস্ত প্রাণী শাস্তির ভয়ে কম্পিত, সমস্ত প্রাণীই তাদের জীবনকে ভালবাসে, মনে রেখো তোমরাও সেই অন্যান্য প্রাণী অপেক্ষা পৃথক কিছু নও, অতএব হত্যা কোর না, আর কাকেও বলি হতে দিও না।
“যে আপন সুখের সন্ধানে অপরাপর প্রাণী, সেই প্রাণী যারা সুখের সন্ধান করে, তাদের হত্যা করে সুখ পেতে চায়, সেও কখনোই মৃত্যুর পরে সুখ লাভ করবে না।
“যিনি অন্য জীবিত প্রাণীকে আঘাত করেন তিনি ধার্মিক নন; যে মানুষ অন্য প্রাণীর প্রতি করুণা করেন, তিনিই প্রকৃত ধার্মিক।
“আমরা তো যন্ত্রণা থেকেই উত্তরণ চাই, কেন আমরা অন্যদের যন্ত্রণা দেব?
“মনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা চাই যাতে নিষ্ঠুরতা, নির্দয় হত্যার চিন্তামাত্র ঘৃণার উদ্রেক করবে। তা না হলে জন্ম জন্মান্তরের দুঃখভোগের বন্ধন থেকে মুক্তি নেই।
“নিতান্ত আন্তরিক সাধু-সন্ন্যাসী, জ্ঞানীজন, তাঁরা যখন খুব সরু একটা পথ ধরে হাঁটবেন, তখনো, পথের দুপাশে গজিয়ে ওঠা তৃণেও যেন না পা পড়ে, সেইভাবে সন্তর্পণে পদচারণা করবেন।
“এই ধরণের একান্ত আন্তরিক ভিক্ষুগণেরই মোক্ষ লাভ হবে, সেই সব ভিক্ষু, যাঁরা পূর্বজন্মকৃতকর্মের ঋণ শোধ করেছেন, যাঁরা আর কোনভাবেই মনন, সহন, পীড়নের ত্রিজগতে আর আবদ্ধ নন ।
“যে মানুষ ধার্মিক, যে মানুষ অন্যের মুক্তির আশা করেন, তিনি কি করে পশুমাংস ভক্ষণ করে নিজে বেঁচে থাকার কথা ভাবেন, বা ভাবেন কি করে যে পরজন্মে কিছু লাভ করবেন?
“তাই ধর্মে নিবেদিত সমস্ত মানুষ এই একটা ব্যাপারে যত্নবান হবেন যে, কারুর প্রতি সামান্যতম নিষ্ঠুরতাটুকু প্রদর্শণ করবেন না।”
রাজার কানে এইসব কথা গেল। মহারাজ শুনলেন যে বুদ্ধদেব যাগযজ্ঞ-বলিদানকে কসাইগিরি অপেক্ষা অন্য কিছু মনে করেন না। মহারাজ আবার বুদ্ধের সকাশে ফিরে এলেন। বুদ্ধকে প্রণাম করলেন, কুশল জিজ্ঞাসা করলেন, করে তাঁর পাশে বসলেন।
“মহাত্মা গৌতম কি দাবী করেন না যে তিনি সার্বিক ও পূর্ণ আলোকপ্রাপ্ত হয়েছেন?”
“যদি সত্যিকারের আলোকপ্রাপ্ত, এমন কেউ থেকে থাকেন, তো সে আমিই। আমি নির্দ্বিধায় ঘোষণা করছি যে আমি সম্যকরূপে বোধিপ্রাপ্ত, আলোকপ্রাপ্ত।”
“কিন্তু প্রভু গৌতম, আপনার মত তো আরো কত সাধু সন্ন্যাসী ব্রাহ্মণ আছেন, তাঁদের নিজস্ব সম্প্রদায়ও আছে, শিষ্য শিষ্যারা আছেন, মহা তত্ববিদ সব পণ্ডিত রয়েছেন। আমি যখন তাঁদেরও এই একই প্রশ্ন করি, কই তাঁরা তো দাবী করেন না যে তাঁরা সম্যকরূপে বোধিপ্রাপ্ত। তাহলে? মহামতি গৌতম বয়েসে নবীন, ধর্মের জীবনে নতুনই বলা চলে।”
“নবীন, এই কারণে, চারটি প্রাণীকে কখনো অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করতে নেই,” বুদ্ধদেব বললেন, “জানেন তাঁরা কারা?
“রাজপুত্র।
“সর্প ।
“অগ্নি ।
“সন্ন্যাসী ।
“মহারাজ, নবীন বলে এই চার প্রাণীকে কখনো তাচ্ছিল্য বা অবজ্ঞা করতে নেই।”
এই কথা শুনে মহারাজ প্রসেনজিৎ এইরূপ বললেন,
“ধন্য, প্রভু, ধন্য! যেন লুপ্ত বস্তু উদ্ধার করা হল, যেন পথহারা পথিককে পথ প্রদর্শন করা হল, যেন তমিস্রায় আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলিত হল যাতে চক্ষুষ্মান মানুষ বহিরঙ্গের রূপ দর্শণ করতে পারে, তেমন, আপনি, হে প্রভু, আমার সামনে সত্যের উন্মোচন করলেন। আমি, এই আমিও, ধর্মে ও সংঘে শরণ নিলাম। পরমজন যেন আমায় শিষ্যত্বে গ্রহণ করেন; আজ হতে আজীবন আমি আপনার শরণ নিলাম।”
এবং মহারাজ কথা রেখেছিলেন, বুদ্ধদেব ও মহারাজ প্রসেনজিৎ সমসাময়িক জীবন অতিবাহিত করেছিলেন।
আলোকিত জন খুব সহজ সরল জীবনযাপন করতেন। উষাকালে উঠতেন, উঠে কারো সাহায্য ছাড়াই স্নান-সজ্জা সারতেন । তারপর প্রাত্যহিক খাবার সময় পর্যন্ত একাকী ধ্যান করতেন। যখন খাবার সময় হত, যথাযথ পোষাক পরিধান করে, ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে, একাকী বা শিষ্য পরিবৃত হয়ে নগরে কি গ্রামে বেরিয়ে পড়তেন। বেরিয়ে যে গৃহে অন্ন গ্রহণ করতেন, সেখানকার গৃহস্বামী ও গৃহের অন্যান্যদের সঙ্গে তারা যতটুকু বুঝতে সক্ষম, সেই অনুযায়ী, আধ্যাত্মিক আলোচনা করতেন। আশ্রমে ফিরে এসে হয় তাঁর আসনে বসে থাকতেন, নাহলে বৃষ্টির সময় কুটিরে অপেক্ষা করতেন যতক্ষণ না পর্যন্ত সমস্ত আশ্রমিক, সাধুরা তাঁদের খাওয়া শেষ করতেন । তারপর আশ্রমিকদের তত্বশিক্ষা দিতেন। নাহলে কি বিষয়ে ধ্যান করতে হবে বলে দিতেন। বা তাদের সব রকম চিন্তাকে স্তব্ধ করার শিক্ষা দিতেন, মনকে সব রকম চিন্তা থেকে নিরত করার উপদেশ দিতেন, এমনকি সমস্ত চিন্তার উৎস যে চিন্তা, তাকেও স্তব্ধ করার উপদেশ দিতেন, এই চর্চাই নির্বাণের পথের পাথেয়। শিষ্যরা তারপর তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিতেন, নিয়ে যে যার আপন পছন্দমত জায়গায় গিয়ে ধ্যান করতেন। যখন খুব গরম পড়ত, তখন বুদ্ধদেব শুয়ে সামান্য বিশ্রাম নিতেন, ডান পাশে কাত হয়ে শুয়ে (সিংহাসন অবস্থায়), এক জানুর ওপর আরেক জানু রেখে, মাথার তলায় হাত রেখে শুতেন। সবাইকে বুদ্ধ এইভাবেই শুতে পরামর্শ দিতেন, নিজেও এইভাবে শুয়ে থাকতেন বলে তাঁকে কখনো কখনো শাক্যসিংহ নামেও অভিহিত করা হত। দুপুরে এই যে অবস্থায় শুয়ে থাকতেন, তাতে কিন্তু তিনি ঘুমোতেন না, এমনকি ধ্যানও করতেন না, বিশ্রামের সময় শুধুই বিশ্রাম করতেন। বিশ্রামই তখন বিষয়।
দ্বিপ্রহরে আশেপাশের গ্রাম নগর থেকে যারা দেখা করতে আসত তাদের সঙ্গে বক্তৃতার ঘরে দেখা করতেন; নাহলে গাছের ছায়ায় তাদের সঙ্গে দেখা করতেন। তাদের প্রতি বুদ্ধদেবের অপার করুণা ছিল, যার যেমন বুদ্ধি-সামর্থ্য, প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী তাদের উপদেশ প্রদান করতেন। যেমন একবার, এই রকম একটা সাক্ষাতে, বিশাখা নামে এক নারী একপাশে বসে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করছিলেন। তাঁর পৌত্রি সদ্য মারা গেছে, এ শোক তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না, তাই বুদ্ধদেবের কাছে এসে হাউ হাউ করে কাঁদছেন। বুদ্ধদেব জিজ্ঞাসা করলেন শ্রাবস্তীনগরে কতজন থাকেন।
“ভগবান, লোকে বলে সাত গুণ এক কোটি লোক থাকে”
“ধর সবাই যদি তোমার নাতনির মত হত, তাদের ভালবাসতে না?”
“নিশ্চয়ই বাসতাম প্রভু।”
“আর শ্রাবস্তীনগরে দিনে কত লোক মারা যায় জান?”
“বহু লোক, প্রভু।”
“তাহলে তো কখনো এমন সময় হবে না যখন তুমি কারো না কারোর জন্য কান্নাকাটি করবে না।”
“ঠিক বলেছেন, প্রভু।”
“তবে কি দিবারাত্র কান্নাকাটি করেই জীবন কাটাবে?”
“বুঝেছি প্রভু, ঠিক বলেছেন।”
“যাও, আর শোক কোর না।”
দিনের শেষে, যেদিন প্রয়োজন হত, স্নান করতেন। করে, কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে ধর্মতত্বের কূট বিষয়সমূহ আলোচনা করতেন। মনস্তত্বের কি কৌশলে নানান মানুষের নানান বদ্ধ ধারণা, প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ধর্মতত্বের নানান দিক কি করে বোঝান যায় তাই দেখাতেন, শেখাতেন। “বুদ্ধগণ নানা উপায়ে নানান যন্ত্রে তাঁদের প্রকৌশল প্রকাশ করেন, তথাপি বুদ্ধরূপী যান একমেবাদ্বিতীয়ম, সেখানে তূরীয় শান্তি।
মরদেহের ইহজন্মের কি বিগত জন্মের সকল প্রকার আচার আচরণই বুদ্ধগণ অবগত আছেন, তাই বিভিন্ন পন্থায় তাঁরা মানুষকে আলো দেখান। এমনই তাঁদের ধীশক্তি।”
বুদ্ধদেব রাত্রির প্রথম প্রহর এইভাবে শিক্ষা দিয়ে অতিবাহিত করতেন। কখনো কখনো সাধুদের কাছে চলে যেতেন, গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, “কি নিয়ে আলোচনা করছেন সাধুগণ, কি নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন?”
বাকী সন্ধ্যে বারান্দায় বা সামনে পায়চারি করতেন, ধ্যান করতেন, আনন্দ তাঁর পিছনে তাঁকে পায়চারি করে অনুসরণ করত।
বলতেন, “যদি কোন মানুষ নিজেকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করতে চায়, তাকে নিজের দিকে সাবধানে নজর দিতে হবে। রাত্রির তিন প্রহরের অন্তত এক প্রহরে জ্ঞানীজন নিজের প্রতি নজর রাখেন।”
তারপর রাতে শুয়ে পড়তেন।
“একান্ত বসনে, একাকী শয়নে, একাকী পদচারণায়, এবং একাকী নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে, অরণ্যের প্রান্তদেশে, মানুষ সুখী হোক”, একথা ধম্মপদ (ধর্মের পদচারণা) বলেছেন।
“কূপ খননকারীরা যেমন যেখানে চায়, সেখানে তারা জলকে নিয়ে যেতে পারে; ব্যাধ যেমন ইচ্ছে তেমন করে শর প্রক্ষেপ করে, সূত্রধর নিজের ইচ্ছামত কাঠ কেটে আসবাব তৈরী করতে পারে, মহৎ লোকও তেমনি নিজেই নিজেকে গড়ে নিতে পারেন।” – ধম্মপদ

জেগে ওঠ – ১০- বুদ্ধের প্রাত্যহিক জীবন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments