[পূর্ব প্রকাশিতের পর]
একদিন আনন্দ পরমারাধ্য জনকে জিজ্ঞাসা করলেন নারীসঙ্গে কেমন ভাবে আচরণ করতে হয়।
“তাঁদের সম্পূর্ণরূপে পরিহার কোর, আনন্দ।”
“কিন্তু প্রভু, তাঁরা যদি আমাদের কাছে আসেন?”
“তাঁদের সঙ্গে বাক্যালাপ কোর না আনন্দ।”
“তাঁরা যদি প্রশ্ন করেন, তখন?”
“সদাজাগ্রত থাকবে, আনন্দ।”

তারপর পরম জন বললেন, “যখন নারীদের সঙ্গে বাক্যালাপ করবে, তাঁরা যদি বয়োজ্যেষ্ঠ হন, তাঁদের মাতৃজ্ঞানে সম্বোধন করবে, তাঁরা যদি বয়ঃকনিষ্ঠ হন, তাঁদের ভগ্নিসমা জ্ঞান করবে।”
আম্র নামে এক সুন্দরী নগরবধু, বৈশালীর ধনাঢ্য বণিকদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থলাভ করেছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন যে তাঁর সুবিশাল প্রাসাদ ও আম্রকুঞ্জ বুদ্ধদেব ও তাঁর শিষ্যদের দান করবেন। আম্র পরমাসুন্দরী, প্রস্ফুটিত গোলাপ ফুলের ন্যায় তাঁর গাত্রবর্ণ, তায় সঙ্গীত-নৃত্য পটিয়সী; নারীর উচ্চ রূপকলা যা যা থাকার তাঁর সবই ছিল, এতৎসত্ত্বেও আম্র নিজের জীবন সদ্ধর্মে উৎসর্গ করতে চাইছিলেন। তিনি মহৎ জনের কাছে তাঁর শিষ্যদের জন্য প্রাসাদ ও কানন দান করবেন এই বার্তা পেশ করলেন। বুদ্ধ তা সমাদরে গ্রহণ করলেন।
আম্রকানে একদিন বুদ্ধদেব উপবেশন করছেন, এমন সময় আম্র বার্তা পাঠালেন যে তিনি দেখা করতে চান। বুদ্ধদেব রাজি হলেন।
আম্র তখন সপারিষদ দর্শণের পথে আসছেন।

“এই যে রমণী,” সমবেত শিষ্যদের বুদ্ধদেব বললেন, “ইনি অসামান্যা সুন্দরী, ধর্মপথের পথিক মানুষদের মুগ্ধ করার ক্ষমতা ধরেন; অতএব আপন আপন মস্তিষ্ক স্থির রাখবেন! আপন প্রজ্ঞায় অচঞ্চল ও নিবেদিত থাকবেন আপনারা।”
“নারীসঙ্গে লিপ্সায় আপ্লুত, উত্তেজিত, কামোন্মত্ত হয়ে তাঁদের অভিপ্রায় আর মোহজালে আবদ্ধ হওয়ার চেয়ে বরং বাঘের মুখে কি ঘাতকের তরবারীর কোপে পড়াও শ্রেয়। তাঁদের অভিপ্রায় জন্মের অভিপ্রায়, মৃত্যুর ফাঁদ পাতা তাতে।
“চলমান কি স্থিত হয়ে, বসে কি শুয়ে, নারী তাঁর রূপ প্রদর্শণ করতে চান।
“পুরুষ পুরুষই; কাম মোহ থেকে সে মুক্ত নয়; পূর্ব কর্মহেতু সে কামজনিত কার্য থেকে মুক্ত নয়। আবার নারী জন্মদাত্রী, পুনর্জন্মের আধার; পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, কর্মহেতু পরস্পর পরস্পরের শিকার; পরস্পর পরস্পরের নিমিত্ত কর্মেই যেন মিলিত ও বিচ্ছিন্ন; তাতে কোন “আমিত্ব” নেই না বলার, অহং, আনন্দ, আর মৃত্যরূপ যাঁতাকলের চাকায় ক্রমাগত নিষ্পেষিত হতে হতে তারা ঘুর্ণায়মান ।
“তবে এ কেমন ধরনের আনন্দ, শূন্যতাকে আলিঙ্গন করে ইন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করার অসম্ভব প্রয়াস। উন্মত্ত হৃদয়ের কোন তৃপ্তি নেই, কোন কিছুতেই সে তুষ্ট হয় না। কোমরভাঙ্গা প্রয়াসেও সে তৃপ্ত হয়না।
“জীবনের পাত্র তলশূন্য এক বিভীষিকা, এ যেন স্বপ্নময় অবাস্তব, কারণাতীত তৃষ্ণার নিবারণহেতু বৃথা সুরাপান। অবাস্তব, অসম্ভব।
“শূন্য আকাশের পানে তাকান! কামোন্মত্ত মানুষ কেমন করে একমুঠো আকাশ করতলগত করবে?
“ঐ স্বপ্নদেখা জড়বৎ মানুষটা কি উপায়ে যে অবধ্য তাকে বধ করবে?
“সর্বদিকে সকলই সদাসর্বদা শূন্যময়, জাগো, জেগে ওঠ!
“মন নির্বোধ, মনের ক্ষমতা সীমিত, এই সমস্তই যেন স্বপ্নে দেখা অলীক বিষয়কে বাস্তব বলে ভ্রম করা। যেন, সমুদ্রের গভীরতা অজ্ঞানতারূপী বায়ুপ্রবাহে আন্দোলিত হয়ে চলেছে ।
“নারী জন্ম দিতে চায়, কর্মহেতু সে একাকীত্ব ও বন্ধ্যাত্বকে ভয় পায়, অথচ এ পৃথিবী বন্ধ্যা নারীর সন্তান অপেক্ষা কিছুমাত্র অধিক বাস্তব নয়।
“চিত্রার্পিত হলেও নারী তার রূপের, সৌন্দর্য্যের প্রদর্শনকেই সবচেয়ে অধিক গুরুত্ব দেন, অতএব পুরুষের হৃদয়হরণ।
“কি উপায়ে নিজেদের সংযত রাখবেন? নারীর অশ্রুজল ও ওষ্ঠাধরের হাসি উভয়কেই শত্রুবৎ জ্ঞান করবেন, মনে রাখবেন নারীর ন্যুব্জ অবয়ব, আনত বাহুডোর, বিক্ষিপ্ত কেশদাম, এ সমস্তই পুরুষের হৃদয়হরণের উপায়।
“তাই যদি হয়, না জানি তাঁর সযত্ন লালিত সৌন্দর্যের প্রতি আরো কত না সতর্ক হওয়া চাই; বিশেষ করে তিনি যখন তাঁর রমণীয় আভরণসম্বলিত শরীর প্রদর্শণ করে মূর্খ পুরুষের সঙ্গে হাস্যরস করবেন, তখন তো বিশেষ করেই সতর্ক হওয়া চাই।
“আহ, অনিত্য শরীরের দূঃখরূপ, ভয়ংকর কদর্য অবয়ব অনুধাবন না করতে পেরে শুধু বহিরঙ্গের কথা ভেবে ভেবে মন কতই না কুচিন্তায়, কত না চাঞ্চল্যে আন্দোলিত হয়।
“অথচ শরীরের অভ্যন্তরের এই কদর্য রূপ বিবেচনা করলে সমস্ত কামলালসাগত মনোবৃত্তির অন্ত হয়।
“এই বিষয়সমূহ যথাযথ বিবেচনা করলে, এদের সীমা পরিসীমার কথা খেয়াল রাখলে দেখবেন স্বর্গের অপ্সরাদের দেখলেও আর কামজনিত আমোদের উদয় হবে না।
“যদিচ পুরুষের কামভাব প্রবল, এই কামের প্রাবল্যকেই ভয় পেতে হয়। অতএব আন্তরিক প্রচেষ্টারূপী ধনুর্বাণ হাতে তুলে নিন, তার জ্যা-তে পূর্ণজ্ঞানের শলাকারূপী শর রোপন করুন, সৎ চিন্তার শিরস্ত্রাণে মস্তকে আবৃত করে পঞ্চকামের বিরুদ্ধে স্থিরসঙ্কল্প হয়ে যুদ্ধে রত হন।
“নারী দেহ দর্শণমাত্রে মনে কামভাবের উদয়, কি নারীর প্রতি কামলোলুপ দৃষ্টি প্রক্ষেপণ, এ অপেক্ষা লৌহতপ্ত শলাকায় চোখ উপড়ানো শ্রেয়স্কর!
“নারীসৌন্দর্য়যের প্রতি কামভাবে পুরুষের মন কলুষিত হয়। পৌরুষ এমনই যে কর্মহেতু পুরুষের মন স্বভাবত দগ্ধ হয়; তারপর জীবনের শেষপ্রান্তে উপনীত হয়ে, সারাজীবন নারীসঙ্গে নিজেকে নিম্নগামী করে, কামলালসার ফাঁদে পড়ে সে কুপথে যায়।
“সারাজীবন ক্ষুদ্র গৃহকোণে অতিবাহিত করে বার্ধক্যে সে যখন উপনীত হয়, তখন তার মুখে হাজারো ধর্মের মন্ত্র, কতই না তার অনুতাপ।
“ভয় পেতে হলে কুমতিপূর্ণ সেই অনুতাপের দিনগুলোকে ভয় পান। ত্রস্ত হন, নিজের মনে নারীর ছলনাকে প্রশ্রয় দেবেন না।
“সাধুর যেন পুনর্জন্ম না হয়; দ্বাদশ যেমন এক ডজন, তেমন জন্ম মানেই মৃত্যু!
“মন স্থির রাখুন, নারীর দেহের দিকে কামদৃষ্টি কখনো নিক্ষেপ করবেন না।
“একবার মনে মনে কল্পনা করুন ব্রাহ্মণ কি কায়স্থ কি ক্ষত্রিয় গোত্রের একটি পনেরো কি ষোল বছরের কিশোরীর ন্যায় ভরা যৌবনবতী এক রমণী; না তিনি দীর্ঘাঙ্গী, না তিনি খর্বকায়া; না তিনি কৃশা, না তিনি স্থুলকায়া; না তিনি কৃষ্ণা, না তিনি অতি উজ্জ্বলবর্ণা; এই রূপে তিনি কি অপরূপা নন? এই রূপ দর্শণে মনে যে আনন্দের বোধ উদয় হয় – সে আনন্দ শুধুই বহিরঙ্গজনিত আনন্দ।
“এবার মনে করুন, সেই একই রমণী, এবার তিনি অশীতিপর, কি নবতিপর, কি শতবর্ষ তাঁর বয়স; এখন তিনি লোলচর্মা, বয়সের ভারে ন্যুব্জা, শীর্ণা, ভগ্নদন্তা, কোনমতে যষ্টিতে ভর করে চলেছেন; কি মনে হয় তখন, সাধুগণ? তাঁর পূর্বের সেই রূপমাধুরী এখন সকলই অস্তমিত – এখন তাঁর হীনাবস্থা, তাই নয়?
“আবার, এই রমণী, কল্পনা করুন, অসুস্থ, সর্বাঙ্গে ক্ষতবিক্ষত শরীর, অন্যের উপর নির্ভরশীল, কোনমতে বেঁচে আছেন – কি মনে হয় সাধুগণ? তাঁর পূর্বের সেই রূপমাধুরী এখন সকলই বিগত – এখন তাঁর হীনাবস্থা, তাই নয়?
“আবার ধরুন, এই রমণীর দেহ, শ্মশানে পড়ে আছে, একদিন, দুদিন, তিনদিন হয়ে গেছে, বর্ণহীন, শরীর ফুলে গেছে, পচন ধরেছে, কাক-পক্ষীতে, শেয়ালে কুকুরে টানাটানি করে ঠুকরে খাচ্ছে, নয়ত রক্তাক্ত কঙ্কাল, সেখান থেকে মাংসের টুকরো ঝুলছে, নয়ত, অস্থিসমূহ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, কোথাও বা স্তুপীকৃত হয়ে পড়ে আছে, এই করে বছরভর পার হয়ে গেল, হাড় মাংস ধুলোয় মিশে যাচ্ছে দিন কে দিন।
“ তখন কি মনে হয়, সাধুগণ?
“এই যে সেই সময়ের, যুবা বয়সের দিব্যকান্তি – কোথায় সে সব হারিয়ে গেছে, এখন তার জায়গায় হীন অবয়ব।
‘কিন্তু, এই সার সত্য। দেহের, অবয়বের এই হীনতা। হন্যমান শরীর।”

অম্রা আশ্রমে আসছেন, সেই মত সজ্জিতা হয়ে এলেন। সাধারণ বস্ত্র পরিধান করে, যাতে কারো মনে উত্তেজনার লেশমাত্র না উদয় হয়, এমন সামান্য সাজসজ্জা করে বুদ্ধের কাছে শান্ত মনে এলেন। সঙ্গে করে মহৎ জন ও তাঁর শিষ্যদের জন্য খাবার ও পানীয় প্রভৃতি নিয়ে এলেন।
বুদ্ধদেব তাঁকে সমাদর করে বললেন, “হে নারী! আপনার হৃদয় শান্ত ও স্বচ্ছ, আপনার অবয়ব নিরাভরণ; আপনি বয়সে কনিষ্ঠা ও ধনসম্পদে পরিপূর্ণা, আপনি সুন্দরী ও প্রতিভাময়ী;
“এমন একজন মানুষ, যিনি যথার্থই ধর্ম গ্রহণ করতে প্রস্তুত, সত্যি বলতে কি, সহজে এমন মানুষের দেখা মেলে না।
“যিনি মহাপণ্ডিত, তিনি পূর্বজন্মহেতু প্রজ্ঞাবান হয়ে জন্মেছেন, তিনি পরমানন্দে ধর্মপথ অবলম্বন করছেন, এ সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়; কিন্তু নারী, যাঁরা সংকল্পে সামান্য, ততটা দৃঢ় নন, সামান্য যাঁদের প্রজ্ঞা, যাঁরা প্রেমে তদ্গত, আবার এদিকে পুণ্যচিত্তের অধিকারী, এমন মানুষের সহজে দেখা মেলে না।
“জগতে পুরুষ জন্মগ্রহণ করেন। যথাযথ চিন্তায় একান্তে ধর্মে আনন্দ প্রকাশ করেন, অর্থ ও রূপের অনিত্যতা সম্বন্ধে অবধান করেন, তারপর ধর্মকেই শ্রেষ্ঠ আভরণ বলে স্বীকার করেন।
“এমন পুরুষ মনে করেন, জগতের দোষ এই পথেই স্খালন করা সম্ভব; মনে করেন বাল-বৃদ্ধের জীবনের অবস্থার পরিবর্তন এই পথেই হবে। ধর্মপথে চললে, অন্য লোকের যে দুরবস্থা, তাতে তিনি পড়বেন না, তা তাঁকে স্পর্শ করবে না, এই তাঁর বিশ্বাস।
“তবে তাঁকেও দুঃখ ভোগ করতে হয়, যেহেতু বহির্জগতের ওপর নির্ভর করেন। যেখানে তিনি আপন শক্তিতে ভাস্বর, সেখানে তিনি পরমানন্দ অনুভব করেন।
“কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। তাঁর প্রসববেদনার উৎসই অপর কেউ; অপরের ঔরসজাত সন্তানের তিনি ধাত্রী; এইসব বিবেচনা করলে নারীকে দূরে সরিয়ে রাখাই বিধেয়।”

অম্রা বললেন, “হে করুণাময় প্রভু! আমি অজ্ঞান নারী; তবুও একান্তভাবে, আন্তরিক ভাবে নিজেকে দান করতে চাই।” এই বলে তিনি ভিক্ষুণিসংঘে যোগদান করলেন।

পরম করুণাময় এবার বৈশালী থেকে শ্রাবস্তীতে গেলেন।
[চলবে]

জেগে ওঠ – ১১: বুদ্ধদেব ও আম্র(পালী)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments