[পূর্ব প্রকাশিতের পর]
বৈশালী থেকে পরম পুণ্যজন এবার শ্রাবস্তীতে গেলেন।
এইখানে জেতবনের ধ্যানগৃহে বুদ্ধদেব তাঁর বারোশো শিষ্যকে সুরঙ্গমা সূত্র শিক্ষা দিয়েছিলেন । এ এক মহতী শিক্ষা যাতে শিষ্যদের মনের নানা রকমের বিহ্বলতা, নানা প্রশ্নের সমাধান মিলেছিল। যাঁরা মার্গে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর সন্ন্যাসী, তাঁরা তাঁদের ধ্যানের সময় নানা রকমের সন্দেহের, নানা রকমের তাত্ত্বিক সমস্যার সম্মুখীন হতেন; সুরঙ্গমা সূত্রের অবতারণায় তাঁদের সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলেছিল ও সন্দেহের নিরসন হয়েছিল। পরম জন বড় যত্ন সহকারে এই মহাসূত্রের অবতারণা ও ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই সূত্র এক পরম সূত্র; এই সূত্রই তথাগতের নিগূঢ় পন্থা; সেই মহাসূত্র শ্রবণ করে নবীন সন্ন্যাসীগণও পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করলেন, ও তৎক্ষণাৎ অপার জ্ঞানের পারাবারে অবগাহন করলেন।
আনন্দকে কেন্দ্র করে সেদিন একটা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিল। এবং এই ঘটনাকে নিয়েই তত্ত্ব আলোচনার সূত্রপাত। মহারাজ প্রসেনজিৎ সেদিন সকালে বুদ্ধদেব ও তাঁর প্রধান বোধিসত্ত্ব-মহাসত্ত্বদের (এঁঁরা পরম জ্ঞানীজন) নিয়ে তাঁর রাজপ্রাসাদে একটি বিশেষ ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন। আনন্দ সে সময়ে ছিলেন না, জেতবন থেকে দূরে অন্য কোন এক প্রদেশে কার্যোপলক্ষে গিয়েছিলেন। নবীন, প্রবীণ, সমস্ত সাধুদের অন্য একটি জায়গায় নিমন্ত্রণ ছিল। আনন্দ ফিরে এসে দেখেন আশ্রমে কেউ নেই। তাই তিনি শ্রাবস্তীনগরে ভিক্ষাপাত্র হাতে অন্নের অন্বেষণে বেরিয়ে পড়লেন। গৈরিক বসন পরিহিত আনন্দ পাত্র হাতে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছেন, এই দৃশ্য দেখে জনৈকা বারবণিতার প্রকৃতি নামে সুন্দরী যুবতী কন্যা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হল। প্রকৃতি তার মায়ের কাছে আব্দার করে বসল যে তিনি যেন যে কোন উপায়ে, যে কোন মায়াবলে, এই অনিন্দ্যকান্তি যুবক সন্ন্যাসীটিকে তাদের গৃহে, তার কক্ষে নিয়ে আসেন। আনন্দ স্বভাবত দিব্যকান্তি, পরম রমণীয়, তার উষ্ণ স্বভাব; ফলে যা হবার হল, প্রকৃতির মায়ের ভ্রমণিকা মায়ার খেলায় পড়ে আর প্রকৃতির সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে সে কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকৃতির কক্ষে হাজির হল।
বুদ্ধদেব ততক্ষণে ধ্যানগৃহে ফিরে এসেছেন। এসে সাধুদের সঙ্গে বসে তাদের গ্রীষ্মকালীন ধ্যান প্রার্থনা নিয়ে আলোচনা করছেন, কোন কোন সাধু তাঁদের উপশথ স্বীকারোক্তি করবেন তার প্রস্তুতি হচ্ছে; এদিকে বুদ্ধদেব কিন্তু আনন্দ কোথায় কি করছেন, তাঁর সঙ্গে কি হচ্ছে, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। সেইমত, তিনি তাঁর “অন্য আনন্দ”, তাঁর সবর্ক্ষণের সঙ্গী, জ্ঞানালোক বিচ্ছুরণকারী মহা বোধিসত্ত্ব, মঞ্জুশ্রীকে, ধরণী মন্ত্র উচ্চারণের নির্দেশ দিয়ে, প্রকৃতিদের বারগৃহে পাঠিয়ে দিলেন, যাতে আনন্দ যেন মোহজালে আচ্ছন্ন না হয়ে পড়েন, কোন প্রলোভনে পা না দিয়ে বসেন। যেই মঞ্জুশ্রী প্রভুর নির্দেশ অনুযায়ী ধরণীমন্ত্র উচ্চারণ করলেন, আনন্দ অমনি তাঁর সম্বিৎ ফিরে পেলেন, ও উপলব্ধি করলেন যে তিনি স্বপ্ন মায়ায় আচ্ছন্ন। মঞ্জুশ্রী তখন আনন্দ আর প্রকৃতি, দুজনকেই বুদ্ধের কাছে ফিরে যেতে পরামর্শ দিলেন ও তাঁরা দুজনে মঞ্জুশ্রীর সঙ্গে বুদ্ধদেবের কাছে ধ্যানগৃহে ফিরে গেলেন।
আনন্দ যখন বুদ্ধদেবের কাছে ফিরে এলেন, এসে তিনি বুদ্ধের কাছে পরম শ্রদ্ধাভরে আভূমি প্রণত হলেন। প্রণাম করে আনন্দ নিজেকে দোষ দিয়ে বললেন, তাঁর এখনো সম্যক আলোকপ্রাপ্তি হয়নি, ছি ছি, এ কি করলেন, তাঁর যে সৎ চিৎ, পরমাপ্রকৃতি, সেই স্বরূপ কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে মোহজাল তাকে উত্তোলন করে তাঁর স্বরূপ উন্মোচন করতে পারলেন না; পারলেন না কেননা তাঁর পূর্বজন্মের প্রথম থেকেই তিনি বড় বেশী শব্দ-বাক্যের পঠন পাঠনেই সময় দিয়েছেন; কাজেই সম্যক স্থিতিশীলতা আর অটল স্থিতাবস্থায় তাঁর মন সংযুক্ত হতে পারেনি। সেই স্থিতাবস্থা, যা অপার শান্তির পারাবার, তাতে মন বসেনি বলেই তিনিও প্রকৃতির মোহ কাটাতে পারেননি, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম, নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না, না করে জন্ম মৃত্যুর ক্রমাগত বয়ে চলা কালচক্রের পাশবিক প্রবৃত্তিতে তিনিও জড়িয়ে পড়লেন, বহির্জগতের আকর্ষণে, ভিক্ষুজীবন ছেড়ে। আনন্দ বুদ্ধের কাছে আকুল ভাবে প্রার্থনা করতে লাগলেন, দশদিকে অপরাপর তথাগতগণের প্রতি প্রার্থনা করলেন, যেন তিনি সম্যক বোধি প্রাপ্ত হতে পারেন। এই সম্যক বোধি তিনটি পরম গুণের সমষ্টি – ধ্যান, সমাধি, ও সমাপত্তি (ধ্যানে যে তূরীয় অবস্থা প্রাপ্তি হয়, সমাপত্তি সেই অতীন্দ্রিয়বোধ)।
সেই সভাগৃহে সমবেত জনতা একযোগে ও উৎসুকচিত্তে অপেক্ষা করে রইলেন বুদ্ধদেব আনন্দকে কি বলেন দেখবার জন্য। একযোগে সকলে গুরুদেব কে প্রণিপাত করলেন। করে সকলে যে যার আসন গ্রহণ করলেন। সকলে নিঃশব্দে শান্ত মনে বুদ্ধদেবের পুণ্য শিক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন ।
বুদ্ধদেব বললেন, “আনন্দ! ও আর যারা যারা আজ এই মহৎ ধর্ম সমাবেশে উপস্থিত আছেন! আপনারা সকলে নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে কি কারণে জীবাত্মা অনাদি অনন্তকাল জন্ম জন্মান্তর ধরে জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্মের কালচক্রে আবর্তিত হয়ে চলেছে । কারণ তারা পরম মানসের সার তত্ত্ব আর তার সপ্রভ উজ্জ্বল জ্যোতি কখনো উপলব্ধি করেনি।
উল্টে, চীরটা কাল ধরে তারা মিথ্যা অহংবোধ, মায়া আর ক্ষণিকের সামান্য চিন্তায় নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। এই করে করে আদি অনন্তকাল ধরে মৃত্যু আর পুনর্জন্মের কালচক্রে ক্রমাগত নিজেদের জড়িয়ে রেখেছে।
“অথচ উচিৎ তথাগতের সঙ্গে একাত্ম হবার; সেই তথাগত, যাঁরা অনাদি-অনন্তকাল ধরে তথতায় নিবেশিত; তাঁরা সর্বপ্রকার মানসজ জটিলতায় অনুদ্বিগ্ন, স্থিতচেতন; এদিকে ওদিকে উথ্থিত চিন্তায় তাঁরা কোন রকম বৈষম্য করেন না।
“আনন্দ, তোমাকে একটা প্রশ্ন করি। মন দিয়ে শোন। একদা, যখন আমার প্রতি তুমি প্রথম নির্ভর করতে শুরু করেছিলে, তখন বলেছিলে আমার মধ্যে তুমি বত্রিশটি গুণ অবলোকন করেছিলে, মনে আছে?
এবার তবে আমি তোমায় প্রশ্ন করি, “কিসে তোমার দৃষ্টির চেতনা হয়েছিল? কি দেখেছিলে? কে সেই জন যে প্রীত হয়েছিল?”
আনন্দ বললেন, “সেই সময় আমার যে প্রীতিবোধ হয়েছিল, সে প্রীতিবোধ আমার চোখ দিয়ে, আর আমার মন দিয়ে। যেই মাত্র আমার চক্ষুদ্বয় দর্শণ করেছিল, তৎক্ষণাৎ আমার মন প্রসন্নতার অনুভুতি বোধ করেছিল।”
বুদ্ধ বললেন, “আনন্দ, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার প্রসন্নতার অনুভূতি চোখে যেমন সজাত হয়েছিল, আবার মনেও সজাত হয়েছিল। আনন্দ, তোমার যদি জানা না থাকে কোথায় দর্শণের অনুভূতির উৎস আর কোথায় মনের ক্রিয়ার উৎস, তোমার পক্ষে ইহজাগতিক মোহ, আসক্তি, কলুষতাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
“আনন্দ! তোমার যদি জানা না থাকে যে কোথায় তোমার আপন দৃষ্টি নামক অনুভূতিবোধের উৎস, তোমার অবস্থা হবে সেই রাজার মতন। সেই রাজা, যার রাজত্বে দস্যুরা উপদ্রব করত, আর রাজা চাইতেন তাদের দমন করতে, কিন্তু পারতেন না; কারণ, রাজা জানতেনই না যে ঠিক কোথায় দস্যুরা আত্মগোপন করত। কাজেই অজ্ঞের মতন, নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ঘুরে মরবে।
“আচ্ছা এবার একটা কথা জিজ্ঞাসা করি? তোমার চোখ আর মনের কথা হচ্ছিল, তুমি কি জান কোথায় তাদের সেই গোপন কক্ষ? কোথায় তারা লুকিয়ে থাকে?”
আনন্দ উত্তর দিলেন, “মহাপ্রভু! জীবনের তাবৎ দশ অবস্থায়, যেখানে আর যাই হোক, চোখ থাকে আননমণ্ডলের সুমুখ ভাগে, আর আর মন লুকিয়ে থাকে শরীরের অভ্যন্তরে!”
বুদ্ধদেব আনন্দকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যে সভাগৃহে বসে উন্মুক্ত কক্ষ দিয়ে বাইরের দিকে দেখছ আনন্দ, সর্বপ্রথমে কি দেখছ?”
আনন্দ: “প্রথমেই আমি আমার প্রভুকে দেখতে পাচ্ছি, তৎপরে দেখি সমবেত মান্যবর শ্রোতৃবৃন্দ, সেই সব দেখার পরই দেখতে পাচ্ছি উদ্যান ও বৃক্ষরাজি।”
বুদ্ধদেব: “এই যে বাইরের দিকে তাকিয়ে নানান রকমের দৃশ্য অবলোকন করছ, এক থেকে আরেক কে আলাদা করে দেখতে পাচ্ছ, কি কারণে এই বোধ জাগছে?”
আনন্দ: “কারণ, সভাগৃহের দ্বারটি যে উন্মুক্ত।”
বুদ্ধদেব: “দৃষ্টি যদি সত্যিই তোমার শরীরের অভ্যন্তরে থাকত আনন্দ, ঠিক একই রকম ভাবে তুমি সর্বাগ্রে শরীরের অভ্যন্তরকে দেখতে পেতে, আর সেটা দেখার পরই তুমি বাইরের জগৎকে দেখতে পেতে, যেমন সভায় আমরা সবাই দেখছি। কিন্তু এমন কোন চেতন জীব নেই যে একসঙ্গে শরীরের অভ্যন্তর আর বহির্জগৎকে দেখতে পায়।”
আনন্দ প্রণাম করে বললেন, “আমার মন তবে নিশ্চয়ই আলোকবর্তিকার মত; আলো বহির্জগৎকে প্রজ্জ্বলিত করে কিন্তু আমার শরীরের অভ্যন্তরকে সে প্রজ্জ্বলিত করতে পারে না।”
বুদ্ধদেব: “তাই যদি হবে, তোমার মন তোমার শরীরবোধকে বোঝে কি করে? যেমন, এই যে দৃশ্য দেখছ, বোঝাই যাচ্ছে যে অক্ষিগোলক তোমার শরীরে, আর দেখার অনুভূতি তোমার মনে, আর এই দুজনার পারস্পরিক বোঝাপড়া নির্ভুল; তাহলে এই যে বললে মন শরীরের বাইরে, তা তো তবে অসম্ভব।”
আনন্দ: “কিন্তু প্রভু, দ্রষ্টা মন কোথাও তো থাকবে!”
বুদ্ধদেব: “কোথায় সে, আনন্দ?”

[চলবে]

জেগে ওঠ – ১২ – সুরঙ্গমা সূত্র ১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments