আনন্দ: “আমার দ্রষ্টা মন তবে নিশ্চয়ই আমার চোখ ঢেকে রাখা স্ফটিকের পাত্রের মত।


বুদ্ধদেব: “তাই যদি হবে, দৃষ্টি যদি দ্রষ্টার কেবল মনে থাকে, তবে তো তোমার চোখ তুমি আয়নার সাহায্য ছাড়াই দেখতে পেতে।”


আনন্দ: “ভগবন, তাহলে হয়ত আমার দ্রষ্টা মন আমার দুই চোখ আর দ্রষ্টব্য বস্তুর মাঝামাঝি কোথাও আছে।


বুদ্ধদেব: আনন্দ, এখন তোমার মনে হচ্ছে মন কোন কিছুর মাঝখানে রয়েছে। দ্রষ্টা মন কেমন করে চোখ ও দ্রষ্টব্য বস্তুর মাঝামাঝি অবস্থান করবে, যখন দ্রষ্টা মন ও চোখ যেন একে অপরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে?”


আনন্দ: “কিছুকাল আগে, ভগবন যখন মৌদগল্যায়ণ, সুভূতি, পূর্ণ, ও সারিপুত্র – এই চার মহাজ্ঞানীর সঙ্গে ধর্মালাপ করছিলেন, আপনাদের বাক্যালাপ আমি কান পেতে শুনেছিলাম। ভগবন বলেছিলেন, চেতন, দ্রষ্টা, বিজ্ঞানী মনের কোন বিশেষ স্থানে অস্তিত্ব নেই, না সে অন্তরে অধিষ্ঠিত, না সে বাইরে অবস্থিত।”


বুদ্ধদেব: “আনন্দ! বিজ্ঞানী, দ্রষ্টা, চেতন মনের স্থির অবস্থান কোথাও নেই; না ইহজগতে, না উন্মুক্ত প্রান্তরে, না জলে, না স্থলে, না সে পক্ষ বিস্তার করে উড্ডীয়মান, না সে চলমান, সে কোথাও নেই।”


এই কথা শুনে সভামধ্যে আনন্দ তাঁর আসন থেকে উথ্থান করলেন। তাঁর গলবস্ত্র সামলে, ডান জানুতে ভর করে নতজানু হলেন, দুই হাত জোড় করলেন, শ্রদ্ধাভরে বুদ্ধদেবকে প্রণাম করে বললেন।


“ভগবন! যদিও আপন অধ্যয়নবলে আমি বহু জ্ঞান লাভ করেছি, তথাপি মনের কলুষতা ও আশ্লেষ হতে আমি মুক্ত হতে পারিনি। তাই বারবণিতাগৃহের মায়াজাল আমি ছিন্ন করতে অক্ষম হয়েছি। আমার মন বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল, আমি কলুষতার পারাবারে নিমজ্জিত হতে চলেছিলাম। এখন আমার দৃষ্টি উন্মুক্ত হয়েছে, আমি বুঝেছি আমার সঙ্গে যা হয়েছে আমার অজ্ঞানতাবশত সৎ চিৎ-এর সম্যক উপলব্ধি হয়নি তাই হয়েছে। হে প্রভু, আমাকে ক্ষমা ও করুণা করুন। আমাকে যথার্থ পারমার্থিক পথ দেখান। সেই পথ, যে পথে আমার অতীন্দ্রিয় ধ্যানের উপলব্ধি হবে, যে পথে আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ হবে, যাতে আমি কুপ্রলোভন হতে, জন্ম জন্মান্তরের বেদনা হতে মুক্ত হতে পারি।”


বুদ্ধদেব তখন সভাকে সম্বোধন করে বললেন, “অনাদি অনন্তকাল ধরে, জন্ম-জন্মান্তরে, সকল চেতন প্রাণী নানান রকম মায়ার জড়িয়ে পড়েছে; প্রাণীকূল আপন আপন কর্মহেতু তাদের স্বভাব অনুযায়ী আবদ্ধ: যেন দর্ভিকার বীজপত্র – তাদের উন্মোচন করা মাত্রেই তিনটি বীজ একত্রিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।


“দুটি মূল তত্ত্ব উপলব্ধি না করতে পারার কারণে ধার্মিকগণ পরম জ্ঞান অর্জন করতে অক্ষম হন। একই কারণে কারো কারো পূর্ণ অর্হতত্ব অপূর্ণ থেকে যায়, আবার কারো কারো নবীন সাধুর ন্যায় অর্ধ সত্যের উপলব্ধি হয়; আবার কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়ে অসৎ চর্চায় নিবেশিত হয়ে পড়ে। এ যেন পাথর আর বালুকারাশি দ্বারা সুখাদ্য রন্ধনের ব্যর্থ প্রয়াস: অগণিত কল্প ধরে চেষ্টা করে গেলেও সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে।


“এই দুই তত্ত্ব হল:
“এক, অনাদি অনন্তকাল ধরে চলে আসা জন্ম জন্মান্তর পুনর্জন্মের মূল কারণ অনুধাবন। এই তত্ত্ব অনুধাবন করলে সেখান থেকে সচেতন প্রাণীসমূহের মনের ভিন্নতা বোঝা যায় । উপলব্ধি হয় যে যুগ যুগ ধরে সকল চেতন প্রাণী তাদের সীমিত, কলুষিত ও বিপন্ন মনকেই সৎ চিৎ বলে ভ্রম করে।


“দুই, বোধি ও নির্বাণের অভিন্নতার যে কারণ অনাদি অনন্তকাল ধরে বিরাজমান, তাকে উপলব্ধি করা। এই তত্ত্বকে আপন অন্তরে গ্রহণ করে তাকে সম্যক ভাবে আপন অন্তরের আলোকে উপলব্ধি করে, সেই একত্রতার সারমর্মকে নানাভাবে আবিষ্কার করা, তাকে উপলব্ধি করা, তাকে আপন অন্তরে বিকশিত করা। তোমরা যে সেই সারতত্ত্ব বিস্মৃত হও তার কারণ তোমরা তোমাদের অন্তরের শুদ্ধ চেতন মনকেই বিস্মৃত হও, সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে সে যে অন্তরে আছে, সেই ব্যপারটাকেই তোমরা ভুলে যাও। আর তাই, আনন্দ, তুমি ও আর সকল চেতন প্রাণী অজ্ঞানতাবশত দুঃখে ও অস্তিত্বের নানান অবস্থায় নিপতিত হও।”


এবার তথাগত মুষ্টিবদ্ধ একটি হাত তুললেন, তুলে আনন্দকে বললেন, “আনন্দ, আমার মুষ্টিবদ্ধ হাতের দিকে তাকাও। আমার এই মুষ্টিবদ্ধ হাত দর্শণে তোমার আপন সৎ চিৎ-এর কি উপলব্ধি হচ্ছে?”


আনন্দ বললেন, “এই যে চিন্তনকারী, যুক্তিবাদী সত্তা, যে সত্তা আমাকে আপনার জ্যোতির্ময় উত্তোলিত মুষ্টিবদ্ধ হস্ত দর্শণ করতে সক্ষম করছে, একেই আমি “আমার মন” বলি।”


বুদ্ধদেব আনন্দকে ধমকে বললেন, “যত্তসব বাজে কথা আনন্দ, তোমার সত্তাকে তোমার মন বলে বসলে, এ যে একেবারেই ভুল।”


আনন্দ হাত জোড় করে উঠে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বললেন, “কেন প্রভু, আমার সত্তা যদি আমার মন নাই হবে, তবে আর কে আমার মন হতে পারে?আমিই আমার মন! আমি যদি আমার মন-বোধ-উপলব্ধি-চেতন পরিত্যাগ করি, তাহলে তো আমি বা আমার মন বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না!”


এই কথা শুনে পরমজন স্নেহভরে আনন্দের মাথায় তাঁর হাত রাখলেন ও বললেন, “আচ্ছা এই যে আমি আমার হাতের মুষ্টি এবার সরিয়ে নিলাম, এর যে দৃশ্য তা তো তোমার চিন্তা ও যুক্তি থেকে এক্ষণে অদৃশ্য হয়েছে, তাতে কি তোমার মনও শূন্যে বিলীন হয়ে গেল, নাকি অসম্ভব একটা কিছুতে পর্যবসিত হল, যেমন কচ্ছপের লোম বা শশকের শৃঙ্গের মতন কিছু একটা হয়ে গেল?”


“যেহেতু তোমার মন সেই সব দৃশ্যের স্মৃতি আর আমার মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখার চেতনা, এই দুই উপলব্ধির তফাৎ করেই চলেছে, অতএব সে তো শূন্যে বিলীন হয়ে যায়নি।


“আনন্দ ও সমবেত শিষ্যগণ! এই যে আনন্দ বলছে যে সে নিজেই তার মন, এই ব্যাপারটির পরিপ্রেক্ষিতে বলি, আমি তোমাদের সর্বদা এই শিক্ষা দিয়ে এসেছি যে তাবৎ প্রপঞ্চ কেবল তন্মাত্র মনের বহিঃপ্রকাশমাত্র, তার বেশী কিছু নয়। তোমরা যাকে সত্তা বল, এও তাই, তন্মাত্র মনের বহিঃপ্রকাশ বই কিছু নয়।


“আমরা যদি সমগ্র মহাজগতের তাবৎ বস্তুনিচয়ের উৎপত্তি পরীক্ষা করে দেখি, দেখব যে সকলই এক আদি সারাৎসারের বহিঃপ্রকাশ । কি অতি ক্ষুদ্র তৃণ, কি কোন সূত্রের গ্রন্থি, সমস্ত কিছু। বিবচনা করে দেখলে দেখবে সমস্ত কিছুর আদিতে সেই এক সারাৎসার।


“সমুদ্রে যে তরঙ্গ ওঠে, তার সারাৎসার সমুদ্র। এই রকম করে ভাবলে, মনের যে চিন্তা, তার সারাৎসার, মন।


“এই যে আমাদের সত্তা, তাবৎ বস্তুনিচয়, আপন সত্তার ক্রমাগত পরিবর্তনশীলতা, এর কোন কিছুই নিত্য নয়। সমস্ত বস্তু আর চিন্তার মতন, এরা সব তরঙ্গ; এরা যেইমাত্র বিলীন হয়, পুনরায় তোমাদের জিজ্ঞাসা করি, যেইমাত্র এরা বিলীন হয়, অমনি তোমার মনও কি শূন্যে বিলীন হয়, নাকি অলীকপ্রাপ্ত হয়, যেন কূর্মের পৃষ্ঠদেশে রোম, বা শশকের মস্তকে শৃঙ্গের ন্যায় অবাস্তব হয়ে যায়?


“মনের সারাৎসারও যদি এদের সঙ্গেই বিলীন হত, তবে তো আর কিছুরই অস্তিত্ব থাকত না, কোন চেতন প্রাণের প্রশ্নই উঠত না।


“মনের সারাৎসার শূন্যে বিলীন হয় না, কারণ সে প্রপঞ্চের অতীত; কারণ কোনটা সত্তা কোনটা সত্তা নয়, সে এই সব ভেদাভেদের সে উর্দ্ধে! সে অভেদ ।


“মন যেইমাত্র বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে বিভেদ নির্ণয় করতে শুরু করে, মহাবিশ্বজগৎ থেকে আরম্ভ করে ক্ষদ্রাতিক্ষুদ্র ধুলিকণা, যাকে সূর্যালোক ভিন্ন প্রত্যক্ষ করা যায় না, অমনি তাদের অস্তিত্ববোধ হয়, ঠিক যেমন সমুদ্রে তরঙ্গ ওঠে।


“আমরা সমুদ্রের তরঙ্গ সম্বন্ধে জানি, যে, এই যে দৃশ্যমান জগৎ তাকে আমরা সর্বব্যাপী মহামানস-সারাৎসার-সমুদ্রে তরঙ্গের মতন দেখি; আমরা এইটুকু জানি যে এই তরঙ্গ অস্তিত্বের ত্রিগুণের সমন্বয় – তারা এইরকম: এক সে তন্মাত্র, ক্ষণস্থায়ী; দুই, সে চঞ্চল, অশান্ত, দুঃখী, বিব্রত, সদা সঞ্চরমাণ; তিন, অনস্তিত্ব, তার প্রকৃতপক্ষে কোন অস্তিত্ব নেই: ঢেউ যেমন, হাওয়ার কারণে জলের রূপের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একই রকম ভাবে প্রপঞ্চময় বিশ্ব যাকে দেখতে পাই সে অজ্ঞানতার কারণে জাত মানস সারাৎসারের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।


“তাই, আনন্দ, আমার উত্তোলিত মুষ্টি দর্শণে ‘যে’ তোমাকে তোমার মানস অস্তিত্বের সারাৎসারের সন্ধান দিয়েছে, সে আমার মুষ্টি দর্শণে তোমার বিভেদ-সৃষ্টিকারী মনের বিভিন্নতা দর্শণের হ্যাঁ বা না কোনটাই নয়; দুটোই কেবল তরঙ্গ বই কিছু নয়। সকল দৃশ্যমানতার উৎস তোমার সারাৎসার মন, সমুদ্র যেমন তরঙ্গের উৎস।
“যতদিন পর্যন্ত তুমি এই নানান রকম ভেদাভেদ সৃষ্টিকারী ইন্দ্রিয়-মস্তিষ্ক-মন কে সারাৎসার মন বলে ভুল করবে, যতকাল তুমি এই বস্তুতে বস্তুতে বিভেদ সৃষ্টিকারী অনিত্য মনের চিন্তাভাবনাকে আঁকড়ে ধরে রাখবে, যতদিন তুমি মায়াময় ছলনাকে সত্য বলে গ্রহণ করবে, ততদিন জাগতিক মোহ থেকে তোমার মুক্তি হবে না; চীরকাল এই দুঃখচক্রের দাসত্বে বাঁধা পড়ে থাকবে। এই নশ্বর, চঞ্চল, অশুভ, জগৎ সংসার, যা সত্যের মহোজ্জ্বল জ্যোতিষ্কে কলঙ্কমাত্র, তার মায়াজাল থেকে তোমার নিস্তার নেই।

আনন্দ কাঁদছেন।

আনন্দ তাঁর শিক্ষার ও বিরক্তিপ্রকাশের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। স্বীকার করলেন, এই দুটোই তাঁর কাছে মস্ত বাধা।
[চলবে]

জেগে ওঠ – ১৩ – সুরঙ্গমা সূত্র ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments