[পূর্ব প্রকাশিতের পর]
তারপর আনন্দ জানতে চাইলেন, বৃহৎ মনের উপলব্ধি যখন মৃত্যু ও পুনর্জন্ম থেকে মুক্ত, তবুও কেন মানুষ তাদের মনের স্বরূপ বিস্মৃত হয়, কেনই বা তারা “বিপরীতমুখী বিহ্বলতায়”, অজ্ঞানতার তত্বে কাজ কর্ম করে।
বুদ্ধদেব তাঁর বাহু প্রসারিত করলেন, করে তাঁর আঙুলগুলো নীচের দিকে নির্দেশ করে অদ্ভুত কি এক মুদ্রা প্রদর্শন করলেন। করে আনন্দকে প্রশ্ন করলেন, “আনন্দ, এই ভঙ্গিমাকে যদি নিম্নমুখী বলি, কাকে তুমি উর্দ্ধমুখী বলবে?”
“ভগবন, আঙুল উপরের দিকে তুলে ধরলে তাকে উর্দ্ধমুখী বলব।”
বুদ্ধদেব সহসা হাত ঘুরিয়ে আনন্দকে বললেন, “হাত ঘুরিয়ে আঙুল উপরের দিকে কি নীচের দিকে নির্দেশ করলে যদি অবস্থানের ব্যাখ্যা করা যায়, কি উর্দ্ধমুখী, কি নিম্নমুখী, যে যেভাবে দেখে সেইভাবে, তবে জেনে রেখো যে সার্বজনীন তন্মাত্র মন, যে সর্বত্র সদাসর্বদা সব হয়ে আছে, যে তথাগতের গর্ভ, যে পরিপূর্ণ ধর্মকায়া, তাকেও অবস্থাভেদে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপলব্ধি করা যায়; অস্তিত্বের অতীত নির্বাণকল্পে, তথাগতের পরম বোধিরূপে (সমুজ্জ্বল, পরম, শূন্য, অমর), অথবা সংসাররূপে, ইহজাগতিক, অসৎ, মরজগৎ, তমসাচ্ছন্ন, দুঃখময়, অজ্ঞানতার মায়ায় আচ্ছন্ন বিভেদকারী মস্তিষ্কগত মনরূপে, “বিপরীতমুখী অবস্থান”।
আনন্দ ও অন্যান্য সভাসদগণ এই কথা শুনে অবাক হয়ে বুদ্ধদেবের দিকে অপলক নেত্রে চেয়ে রইলেন। মনের বিপরীতগত অবস্থান বলতে বুদ্ধদেব কি বোঝাতে চাইছেন? তাঁরা এই যে বুদ্ধদেবকে নিজের চোখে দর্শণ করছেন, পরম শূন্য কিছু তো দেখছেন না, এ তো তাহলে মনের “বিপরীতমুখী অবস্থানের” কারণে!
বুদ্ধদেবের হৃদয়ে আনন্দ ও অন্যান্য সভাসদগণের প্রতি অপার করুণার সঞ্চার হল। তিনি তখন তাঁদের বুঝিয়ে বললেন, “হে মোর শিষ্যগণ! আমি কি বার বার তোমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছি না যে মনের ধারণা, ও ক্রমাগত পরিবর্তনশীল প্রপঞ্চময় এই জগতের সমস্তকিছু কার্যকারণ প্রসূত, মনের নানারকম ধারণা, সমস্তই মনের বহিঃপ্রকাশ, তোমাদের শরীর ও মন, সে সকলই পরম, তন্মাত্র, সর্বগামী, আনন্দময়, আলোকিত, রহস্যময় তন্মাত্র সার মানসের বহিঃপ্রকাশ বই আর কিছু নয়।
“স্বপ্নের মত, সমস্ত কিছু তোমাদের মনে ঘটে চলেছে।
“যে মুহূর্তে স্বপ্ন দেখা শেষ হয়ে তোমরা জেগে উঠবে, তোমাদের মন আদিম শূন্যতার পরমতায় ফিরে যাবে।
“সত্যি বলতে কি, তোমাদের মন এখনই সেই পরম, নিষ্কলুষ শূন্যতায় প্রত্যাবর্তন করেছে, এই জগৎ সামান্য মায়াময় সামান্য প্রতিচ্ছায়া বই আর কিছু নয়।
“তোমরা কি করে এত সহজে এই অপূর্ব, পূর্ণালোকিত, সম্যক পবিত্র যে মন, তাকে ভুলে যাও?” এই বলে বুদ্ধদেব অল্প কথায় বিশ্বের জন্মরহস্য ব্যাখ্যা করলেন, “উন্মুক্ত স্থান অদৃশ্য এক নিষ্প্রভতা বই কিছু তো নয়। স্থানের এই অদৃশ্য নিষ্প্রভতা যখন অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যায়, তখন অবয়বের মত দেখায়। অবয়বের এই যে অনুভূতি, এই অনুভূতি সে কালক্রমে মায়াময় ও প্রপঞ্চের একটা যদৃচ্ছ ধারণায় পরিণত হয়। এইভাবে প্রপঞ্চের একটা মিথ্যা কাল্পনিক ধারণার শারীর চেতনার, উদ্ভব হয়।
“অতএব, মনের অভ্যন্তরে, স্ব-এর মস্তিষ্ক মন দেখলে, এই যে এতসব কার্য-কারণ তালগোল পাকিয়ে রয়েছে, তারা আবার নানান রকমের দল বেধে আছে, এরা যখন বিশ্বের প্রক্ষিপ্ত বিষয়ের সঙ্গে জুড়ে যায়, সেখান থেকে ভীতি আর আকাঙ্খা জেগে ওঠে। মনের স্বাভাবিক অনড় যে প্রশান্তি, ভীতি আর আকাঙ্খা তাকে ভেঙে দেয়, ভেঙে হয় আবেগ নয় প্রবল ভীতি, হয় মর্ষ, নয় ক্রোধের জন্ম হয়। আর তোমরা সবাই এই গোলমেলে আত্ম-সচেতনতার ধারণাকে নিজের মনের স্বরূপ বলে ধরে নিচ্ছ।
“যেইমাত্র একে তোমার মনের স্বরূপ বলে গ্রহণ করলে, তুমি বিহ্বল হয়ে পড়বে, মনে করবে যে মন শরীরেরই অংশ, ভাববে যে আর সমস্ত বহির্জগতের যা কিছু, পর্বত, নদী, উন্মুক্ত স্থান, গোটা বিশ্ব তোমার শরীরের বাইরে। এতে বিস্ময়ের কি আছে?
“বিস্ময়ের আর কিছু আছে কি যে, এই যে সমস্ত কিছু, তাবৎ প্রপঞ্চ, যা মিথ্যা ধারণা করলে, তার যে অস্তিত্ব তোমার পরম আলোকিত তন্মাত্র মনে, তাও বুঝলে না?
“কেমন জান? তোমরা অনন্ত শান্ত মহাসমুদ্রের জল ছেড়ে একটা ছোট্ট ঢেউকে আঁকড়ে ধরলে, এই ঢেউটাকে শুধু আঁকড়ে নিলে তাই নয়, তাকেই অনন্তকোটি সমুদ্রের জলের সামগ্রিক রূপ বলে মেনে নিলে। এই হতবিহ্বলতায় নিজেদের বোকাস্য তস্য বোকা প্রতিপন্ন করলে। আমার আঙুল নাড়িয়ে তাকে ওপরেই ওঠাই বা নীচেই নামাই, তাতে তো আমার হাতের অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয় না। সেই রকম, তুমি মনের স্বরূপ ভুলে যাও বা না যাও, তাতে তো মনের সৎ চেতনা/ধারণার কোন পরিবর্তন হয় না। কিন্তু জগৎ একটা তফাৎ নির্ণয় করে ফেলে – বলে যে এই হাত ওপরে উঠল, এই হাত নীচে নামল, এই মনের অবস্থা নির্বাণের পরমতা, আবার এই সে সংসারের পাঁকে পড়েছে। পরম মন যেহেতু কোন প্রকার ধারণার উর্দ্ধে, যারা এই দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে তাদের করুণা ছাড়া কিই বা করা যেতে পারে?”

আনন্দ, বুঝেছেন যে তাঁর এই নিয়ত পরিবর্তনশীল ভেদবুদ্ধিকারী, মস্তিষ্কগত মনের মূল এক অবিচল পরম মন, জানতে চাইলেন যে, এই যে মন দিয়ে তিনি তাঁর গুরুদেবের পরম মনের শিক্ষাকে নিজের মত করে বুঝছেন, ভেদাভেদ করছেন, সেই মন আর পরম মন একই কিনা।
বুদ্ধদেব উত্তর দিলেন, “আনন্দ! শিক্ষা দিতে গিয়ে যখন একবার আঙুল তুলে চাঁদের দিকে দেখালাম, তখন ভাবলে আমার আঙুলই বুঝি চাঁদ। সেই, যা আমার শিক্ষা তোমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে, তাকে যদি তোমার নিজের মন বলে ভাব, তাহলে, সে যখন এই শিক্ষাকে একপাশে সরিয়ে রাখবে, সেই মন, তখনো সে তার ভেদবুদ্ধিকে রেখে দেবে। তা তো সে করে না।
“এ যেন এক পথিক। পথিক সরাইখানায় এসেছে এক রাত থাকবে, চীরকাল সেখানে সে রইবে না। কিন্তু সরাইখানার যে মালিক, সে কিন্তু চীরকাল সেখানেই থাকবে, সে তো আর কোথাও চলে যাচ্ছে না। এও তাই। বিভেদ-দর্শণকারী মস্তিষ্কগত মন যদি তোমার পরম মনই হবে, তবে সে অনিত্য, সে অপরিবর্তনীয়। দেখ যেই আমার কন্ঠস্বর থেমে যাবে, অমনি তারও এই এক কে আরেকটি থেকে পৃথক করে দেখার ব্যাপারটা থেমে যাবে, তাহলে সে আর পরম মন হল কি করে?
“তোমার মস্তিষ্ক-মন, যে কিনা মহাসমুদ্রে তরঙ্গ, আর তার মহামন, যে কিনা সমুদ্র স্বয়ং, তাদের উভয়েরই একটি একমেবাদ্বিতীয়ম রূপ আছে, একটাই স্বরূপ।”
আনন্দ বললেন, “প্রভু, যদি আমার বিভেদ দর্শণকারী মস্তিষ্ক-মন আর তার যে নির্যাস (পরম মন) তার একই উৎস, তবে, কেন, সেই পরম মন যা সমুদ্রসদৃশ, যাকে ভগবন আমার মস্তিষ্ক-মনের সঙ্গে এক বলে মনে করেন, কেন তা তার আদিরূপে ফিরে যায় না?” এই বলেই আনন্দ উপলব্ধি করলেন যে, তিনি এমন এক আদিচেতনার কথা বলছেন যার কোথাও “ফিরে” যাবার নেই।
[চলবে]

জেগে ওঠ – ১৫: পরম মনের স্বরূপ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments