[পূর্বকথনের পর]
এইবারে বুদ্ধদেব যে শিক্ষাদান করলেন সেই শিক্ষা গ্রহণ করে সমবেত ভক্তবৃন্দ তাঁদের আপনাপন ভ্রান্ত অবলোকন হতে মুক্তি পেলেন।
বুদ্ধদেব বললেন, “উজ্জ্বলতার ধারণা ব্যতিরেকে প্রকৃতপক্ষে উজ্জ্বলতার কোন অস্তিত্ব নেই; দিনের আলোয় দরজার দিকে তাকালে যে আলো উজ্জ্বল রূপে প্রতিভাসিত হয়, তা প্রকৃতপক্ষে কি?”


“এই আলোকোজ্জ্বলতার কারণ সূর্য নয়, যদিও সূর্য আছে বলে উন্মুক্ত স্থানে আমরা আলোর উজ্জ্বলতা প্রত্যক্ষ করি । আলোর উজ্জ্বলতার অনুভূতিকে উৎসমুখে যদি নিয়ে যাও, তবে কোথায় গিয়ে , কোন উৎসে ফিরিয়ে দেবে? সূর্যে নয় নিশ্চয়ই। তাকে ফিরিয়ে দেবে যে মন দেখেছে তার কাছে, সেইখানে।
“কেননা, তোমার উজ্জ্বলতার অনুভূতিকে যদি উৎসমুখ বলে সূর্যের কাছে ফিরিয়ে দিতে, আর তারপর একথা বলে বেড়াতে যে উজ্জ্বলতার উৎস সূর্য, তবে ভেবে দেখো সূর্যাস্তের পর যখন সূর্যের আলো আর থাকে না, তখন অন্ধকারও তোমার আর অনুভূত হবার কথা নয়। অনুভূতিবোধ যাকে বল, সে প্রকৃতপক্ষে আমাদেরই তন্মাত্র মন। সূর্যের ঔজ্জ্বল্য কি চাঁদের নিষ্প্রভতা যাকে অবলোকন করি তা যেন সেই তন্মাত্র মনের ওপরে ভাসমান তরঙ্গমাত্র।
“তোমাদের কান কি আলোর উজ্জ্বলতা অনুভব করে? করে না তো। তোমাদের চোখ জানে কি স্তব্ধতা বা শব্দের অনুভূতি কেমন ? অতএব একটা ব্যাপার জেনো, আমাদের ইন্দ্রিয় যা অনুভব করে তার উৎস তন্মাত্র মনে নয়, তার উৎস সেই সব ইন্দ্রিয়েতেই।


“যেমন ধর, আনন্দ, তোমার চোখ যে সুর্যের উজ্জ্বলতা অনুভব করে, সেই উজ্জ্বলতার উৎস তন্মাত্র মনে নয়, কেননা তন্মাত্র মন আলোতেও নেই, অন্ধকারেও নেই, সে আছে তোমার চোখে, তার অস্তিত্ব তোমার চোখের নিমিত্ত।


“তুমি তো একথা জান আনন্দ, ওই যে শত সহস্র বছর ধরে অগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে আছে, আমরা যাকে সূর্য বলে জানি, সেই তেজোময়তা, যা তোমার চোখ, শরীর, অন্তরাত্মা অনুভব করে, তারও উৎস কিন্তু তন্মাত্র মনের পরম শূন্যতায় নয়, যা অগ্নির তাবৎ অবস্থা কি অগ্নির অবিদ্যমানতারও অতীত, সে আছে শুধু চোখে, দেহে, মনে; চোখের, দেহের, মনের জন্যই।


“আনন্দ, তোমার যদি শরীর না থাকত, তোমার কাছে পৃথিবীরও কোন অস্তিত্ব থাকত না; তুমি ভেদ করে চলে যেতে। এ-ই তোমার সূর্য।
“আনন্দ, বাস্তবিক অর্থে, শরীর নেই তাই পৃথিবীরও বুঝি অস্তিত্ব নেই, একথা বলা যতটাই বাতুলতামাত্র, তেমনি শরীর আছে, তাই পৃথিবীর অস্তিত্ব আছে, এই কথা বলাও একই রকম অর্থহীন। কারণ সর্বত্র একই দর্শণ, সর্বত্রই সেই একই শূন্যতা। এ-ই তোমার সূর্য।
বুদ্ধদেবের মুখে এমন অদ্ভুত বাণী শ্রবণ করে শিষ্যগণ অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁরা কিছুই প্রায় না বুঝতে পেরে কেমন ভয়বিহ্বল হয়ে পড়লেন, তাঁরা বুদ্ধদেবের কাছ থেকে আরেকটু সহজবোধ্য কথা শোনার আশা করেছিলেন। এই অজ্ঞান জগতের হৃৎকমলে যে আন্তরিক আস্পৃহা বিদ্যমান, বুদ্ধদেব তাকে মানতেন। তাই, সেই আস্পৃহাকে মেনে নিয়ে, তাঁর শিষ্যদের ঐকান্তিক ইচ্ছাপূরণের নিমিত্ত তিনি বললেন,
“হে মোর একনিষ্ঠ ভক্তগণ! আনন্দ জানতে চায় কিভাবে সে তার মনের অবলোকনের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করবে। এ সেই অবলোকন, যা নিত্য, যা আপাত প্রপঞ্চের সমস্ত কিছুতে অচঞ্চল, যে তার তন্মাত্র মনের স্বরূপ। ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি ওকে সঙ্গে করে এক অতীন্দ্রিয় চূড়ান্ত দিব্য দর্শণে নিয়ে যাব। আর তা করব বলে, আমি এই মুহূর্তে আমার তথাগতের দর্শণ, তা সাময়িক পরিত্যাগ করব। তথাগত দর্শণ সেই অতীন্দ্রিয় দিব্য দর্শণ যা সম্যক বুদ্ধ-জগতে সর্বত্রগামী। অতএব এস আনন্দ, আমার সঙ্গে এস, চল, আমরা সূর্য চন্দ্রের প্রাসাদে যাই, দেখ দেখি সেখানে কিছু দেখতে পাও কিনা যা আমাদের দিব্য তন্মাত্র মনের অধীন? চল যাই সুমেরু পর্বতের চারপাশের পর্বতের স্বর্ণশিখরে, ভাল করে দেখ আনন্দ, কি দেখতে পাচ্ছ? দেখতে পাচ্ছ কি সমস্ত রকমের ঔজ্জ্বল্য, সমস্ত প্রকার মহিমার বহিঃপ্রকাশ, তথাপি আমাদের তন্মাত্র মনের কিছুরই দর্শণ হয় না। আচ্ছা বেশ, আরেকটু কাছে যাই, চল মেঘের কাছে যাই, পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে দেখতে পাচ্ছ আনন্দ, লক্ষ্য করছ ঝোড়ো হাওয়া বইছে, ধূলো উড়ছে, পর্বত, জঙ্গল, বৃক্ষরাজি, নদীসমূহ, পশুপাখী, গাছপালা, সবই দৃশ্যমান, অথচ কিছুই আমাদের তন্মাত্র মনের অংশ নয়।
“আনন্দ, এ সমস্ত বস্তু, কি দূর কি নিকট, তোমার নয়নের তন্মাত্রতায় অবলোকিত হচ্ছে, তাদের নানান রূপ, তথাপি তোমার তন্মাত্র মনের যে অবলোকন, সে অভেদ। এ থেকে মনে হয় না কি যে, দৃশ্য অবলোকনের এই যে অদ্ভুত তন্মাত্রতা, এই যে না স্থাবর না জঙ্গম অবস্থা, এ-ই আমাদের মনের স্বরূপ?”
এই কথা শুনে আনন্দ জানতে চাইলেন যদি তাই হয়, যদি দৃশ্য অবলোকনের ক্ষমতা, যদি দৃষ্টি অনুভব, তার স্বাভাবিক ক্ষমতাবলে দ্যাবাপৃথিবী পরিব্যাপ্ত করে, তবে এখন, এই এখন, যখন তিনি আর বুদ্ধদেব একই সভাগৃহে অবস্থিত, তখন তাঁদের দৃষ্টি কেমন ভাবে, দেওয়াল, আর ঘরেতেই আপাত সীমাবদ্ধ? দেওয়ালের ওপারে কি আছে তাতে দৃষ্টি আটকায় কি করে?
“আনন্দ, এই যে প্রাচীর উঠেছৈ, আর চোখের দৃষ্টি আটকে ওপারে কিছু দেখা যায়না, বা ধর প্রাচীর যদি না থাকত, বা ভেঙে যেত তাহলে সব কিছু দেখতে পেতে, বা আলোকোজ্জ্বল তাই সব দেখা যাচ্ছে, বা অন্ধকার তাই কিছু দেখছি না, তাদের সঙ্গে দৃশ্য অবলোকনের সারবত্তার কোন সম্পর্ক নেই । এই যে নানারকম পরিবর্তনশীল অবস্থা, তা আমাদের “দর্শণ অবলোকনের” অংশও নয়। দর্শণ অবলোকন আমাদের তন্মাত্র মন, সে মহাশূন্যের মতন, সে না স্থাবর না জঙ্গম।
“আনন্দ, প্রাচীর আছে তাই বলে প্রাচীর প্রকৃত শূন্যতাকে আড়াল করে না, আবার প্রকৃত শূন্যতাও প্রাচীরের অবয়বকে নিশ্চিহ্ন করে না। “
তখন বুদ্ধদেব বললেন, “মনে কর আনন্দ, তুমি আর আমি বাগানে গিয়ে চারপাশ অবলোকন করতে থাকলাম, চন্দ্র-সূর্য দেখলাম, আরো নানান প্রকার বস্তু অবলোকন করলাম, কিন্তু এমন কোন “বস্তু” নেই যা কিনা দর্শণের অনুভূতি, যা আমাদের কেউ দেখাতে পারে। কিন্তু, এই যে নানান প্রপঞ্চ, তাদের মধ্যে তুমি আমাকে এমন কিছু দেখাতে পারবে কি যা আমাদের দৃষ্টির অনুভূতির বাইরে?”
আনন্দ বললেন, “হে প্রভু! সত্য, আমি বুঝতে পেরেছি যে তাবৎ বস্তু, ক্ষুদ্র কি বৃহৎ, যেখানেই তাদের প্রকাশ হোক, তারা সবই দৃষ্টির অবলোকনের অধীন।”
বুদ্ধদেব আনন্দের সঙ্গে একমত হয়ে বললেন, “ঠিক তাই আনন্দ, ঠিক তাই।”
তখন সেখানে সমবেত অপেক্ষাকৃত নবীন শিষ্যগণ – বয়োবৃদ্ধ যাঁরা ধ্যান সমাপ্ত করেছেন, তাঁরা বাদে – বুদ্ধদেব ও আনন্দের এই কথোপকথন শ্রবণ করে, এর মর্মার্থ অনুধাবন না করতে পেরে হতবিহ্বল হয়ে, কিছুটা ভীত হয়ে, নিজেদের সম্বিৎ হারিয়ে ফেললেন।
তথাগত তাঁদের শান্ত করে বললেন, “হে মোর ভক্তগণ! পরম ধর্মগুরু যা শিক্ষা দিয়েছেন তা একান্তই তাঁর আন্তরিক বাণী, এতে অতিকথন বা অদ্ভুত কিছু নেই। এতে অহেতুক প্রহেলিকাও কিছু নেই। এ শিক্ষা নিয়ে বিচলিত হয়ো না, এতে অহেতুক দুঃখ কি আহ্লাদেরও কিছু নেই, বরং একে গভীরভাবে বিচার করে দেখো।”
[চলবে]

জেগে ওঠ-১৬-শূন্যতা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments