জেগে ওঠ-১৭-অবলোকন ও ভ্রান্তি

তখন মঞ্জুশ্রী উঠে সমবেত শিষ্যমণ্ডলীর হয়ে জানতে চাইলেন, এই যে আমরা যা কিছু দেখি আমাদের দৃষ্টির চেতনার জন্যই তাদের অস্তিত্ব, নাকি তারা আমাদের দৃষ্টি চেতনার অংশ, এই দ্বিধাবোধ যদি বুদ্ধদেব বুঝিয়ে বলেন, এই বলে বললেন, “এমন করে বুঝিয়ে বলুন যাতে সব ভাইয়েরা প্রাঞ্জল করে বুঝতে পারেন, সহজ ভাবে কিন্তু বোঝানো চাই।”

বুদ্ধদেব উত্তর দিলেন, “মঞ্জুশ্রী ও অন্যান্য শিষ্যগণ: দৃষ্টির অনুভূতি যেখানে মহাসমুদ্র, দেখা যেখানে সেই সমুদ্রের বুকে ওঠা তরঙ্গমাত্র, সেখানে দেখা চেতনার অংশ নাকি নয়, এই নিয়ে দ্বিধাবোধের কিছু আছে কি?”

“তথাগতগণ মহাবিশ্বের দশদিকে অবস্থান করেন, মহাপ্রাজ্ঞ গণের সঙ্গে মিশে তাঁরা বাক্যে কি বাক্যরহিত অবস্থায় শিক্ষা প্রদান করেন; যেহেতু তাঁরা সতত পরমানন্দে নিবেশিত, তাঁরা সকল বস্তুর কার্যকারণ ও তার সম্বন্ধে ধারণাকে আকাশকুসুম জ্ঞান করেন, তাদের সৎ কি আপন অস্তিত্ব বলে কিছু থাকে না, তাদের সবটাই কারণজাত তাৎক্ষণিক এক কাল্পনিক অবস্থামাত্র।

“এই যে অভূতপূর্ব, আলোকিত দৃষ্টিচেতনা, বস্তু কি বস্তুর অবলোকন, এ সবই তন্মাত্র মনের অংশ।

“তাই, কেউ যখন বহি:প্রকাশকে দেখে, যা কিনা চেতনার সঙ্গে বস্তুর সংযোগে জাত কাল্পনিক কুসুমসম, তখন সে যেন খেয়াল রাখে যে এ সবই মায়া, এতে কোন রকম দ্বিধাবোধের অবকাশ নেই, দুতিন রকম মানে করার কিছু নেই।

তখন আনন্দ, বুদ্ধদেবের এই য়ে শিক্ষা — দৃষ্টির সৎ অবলোকনেই তাঁর আপন তন্মাত্র মন, আর নানারকম দৃশ্যের বহিঃপ্রকাশ খুব সূক্ষ্মভাবে দেখলে এর অংশ কেননা তাদের স্ব-প্রকৃতি বলে কিছু নেই, তারা মহাসমুদ্রে উথ্থিত তরঙ্গমাত্র, অজ্ঞানতাবশত তাদের উৎপত্তি ও নিবৃত্তি — এর প্রতি পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করে জানতে চাইলেন, এ সমস্ত বোধ কিভাবে কাজ করে, তিনি আপন হৃদয়ে যা বিশ্বাস করেন কিভাবে তাকে নিজের মনে অনুধাবন করবেন ।

এই কথা শুনে বুদ্ধদেব কেমন করে চোখ মায়ার ছলনায় ভোলে তার ব্যাখ্যা করলেন। “আনন্দ, আমাদের চোখ মায়াবশত ভুলের ফাঁদে পড়ে। তন্মাত্র যে মন, সে কিন্তু পড়ে না । যে মানুষের চোখের রোগ, সে প্রদীপের শিখার চারপাশে আলোর ছটা দেখতে পায়, এ আলোর ছটা তার তন্মাত্র অবিচল মন কিন্তু তৈরী করে রাখে নি, এ বোধ তার চোখের অসুস্থতা-হেতু মস্তিষ্ক-গত মনের ভেদবুদ্ধিপ্রসূত । আবার দেখ, সুস্থ চোখ শূন্যে কাল্পনিক গোল গোল বলের মত চলমান ছবি দেখে। অতএব একটা ব্যাপার জেনো, চোখ যেহেতু স্বাভাবিকভাবেই মায়ার দর্শণে আবিষ্ট, তাই চোখ দিয়ে তুমি যা দেখ তা সবই মায়ার তরঙ্গমাত্র। অনাদি অনন্ত কাল ধরে চোখে দেখা ব্যাপারটা এমনই হয়ে আসছে। তোমার যে চোখের দৃষ্টি আদৌ আছে, এই-ই তোমার কর্ম, তোমার অন্যকালে অন্যত্র অজ্ঞান কার্যের উত্তরাধিকার তুমি বয়ে চলেছ।

“তবে আনন্দ এ নিয়ে বিচলিত হয়ো না। শুধু সময়ের অপেক্ষা, তুমি তোমার দৃষ্টি ত্যাগ করবে, তখন তো দৃষ্টি ত্যাগ করেই দিয়েছ।

“আনন্দ, এ চোখ নামক জ্ঞানেন্দ্রিয়ই কেবল নয়, আর পাঁচটা জ্ঞানেন্দ্রিয় — কান, নাক, জিহ্বা, শরীর, মস্তিষ্ক, এরা সবই প্রকৃতিগতভাবে মায়াবী, সব মিথ্যা, যতদিন বাঁচবে শ্বাস নেবে, ততদিন তোমাকে মায়ার ছলনায় ভুলিয়ে বেড়াবে।

“এস, তোমায় দেখাই তোমার ষড়েন্দ্রিয় কেমন করে তোমাকে মায়ার ছলনায় ভুলিয়ে রেখেছে, কেমন করে তোমার উজ্জ্বল, পূর্ণ, শুদ্ধ, নিগূঢ়, ঐশ্বরিক সৎ পরম শূন্য তন্মাত্র মনকে ভুলিয়ে দেয়।

“দিনের বেলায় যেইমাত্র চোখ খুলে খালি চোখে আকাশের দিকে তাকাবে, অমনি কাল্পনিক ছোট ছোট গোলা নয়ত কুসুম যেন চলে ফিরে বেড়াচ্ছে দেখতে পাবে; আরো অদ্ভুত দৃশ্য যেমন সূর্যের তেজ থেকে উদ্গত কণা যেন ছুটে আসছে, ছোট ছোট আলোর ঝিকমিকি, সব যেন সূর্যের আলোরই অংশ; কিন্তু কোথায় এই কাল্পনিক কুসুমের উৎস? আনন্দ, সহজ করে বললে এ সমস্তই মায়া। কেন মায়া? কারণ এই কাল্পনিক পুষ্পনিচয় যদি দৃষ্টির অংশ হত, তাহলে তাদেরও দেখার, দেখতে পাবার ক্ষমতা থাকত,ঠিকক তোমার চোখের জ্যোতির মতন, তুমি তাদের মাধ্যমে নিজেকে দেখতে পেতে। বা, যদি ধর এরা শূন্যেরই অংশ হত, তারা শূন্যেই আসত যেত হারাত কোথাও, তখন আর বলতে পারতে না যে শূন্য বলে কিছু আছে। একটা ব্যাপার স্থির জেনো আনন্দ, শূন্য আছে। আর এই যে দেখা, সেই দৃষ্টি যেন তন্মাত্র মনের গভীরে স্বপ্নহীন বিভোর নিদ্রা থেকে জেগে ওঠে, আর দৃশ্য অবলোকন করা তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আনন্দ, কল্পনার কুসুমেরা একেকটি অসুস্থ ধোঁয়াশার ঈঙ্গিতমাত্র, আর আমরা তাকেই “সতেজ দৃষ্টিশক্তি” বলি। আর এই দৃষ্টিই অনাদি অনন্তকাল ধরে সজাগ প্রাণীকে মিথ্যা মায়ায় ভুলিয়ে এসেছে।

“তোমার “মনে হওয়ার” যে অনুভূতি, এও তাই। শরীরী মায়ার মিথ্যা অনুভূতি।”

“তা কেমন করে হবে প্রভু?”

“আনন্দ, শরীর মিথ্যা মায়ার ফাঁদে ভুল করে, মহামানসের অন্তর্নিহিত চেতনায় কোন ভুল হয় না। অসুস্থ শরীরে মানুষ বেদনা অনুভব করে, তার অবিচল তন্মাত্র মনে কিন্তু বেদনার কোন অনুভূতি নেই, শারীরিক-মন, দেহগত-মস্তিষ্কগত-মন শরীরের অসুস্থতাহেতু এই ভেদভাব করেছে। আবার একই রকম ভাবে, সুস্থ শরীর যে স্পর্শ অনুভব করে, এও কাল্পনিক, শূন্য। তাই জানবে যে, শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যেহেতু স্পর্শের একটা মিথ্যা অনুভূতি থাকে, শরীর দিয়ে যা যা অনুভব কর তার সবটাই মিথ্যা তরঙ্গ বই কিছু নয়। অনাদি অনন্তকাল ধরে শরীরের সঙ্গে এইটাই হয়ে আসছে, তোমার শরীর বলে যে কিছু আছে, তোমার কর্মের হেতু, তোমার অন্যত্র অজ্ঞানতার উত্তরাধিকার।

“তবে আনন্দ এ নিয়ে বিচলিত হয়ো না। শরীর ত্যাগ শুধু সময়ের অপেক্ষা, তখন তো শরীর ত্যাগ করেই ফেলবে।

“দুহাতের তালু যখন ঘষাঘষি কর, মসৃণতার বোধ জাগে, উষ্ণতার বোধ প্রতীত হয়, খসখস কি শীতলতা বোধ হয়, কোথায়ইবা এই নানান রকম অনুভূতিবোধের উৎপত্তি? আনন্দ, সহজ করে বললে এ সমস্তই অদ্ভুত মিথ্যা মায়ার অনুভূতিবোধ। কেন জান? কারণ স্পর্শের অনুভূতি যদি হাতের অংশ হত, তাহলে সদাসর্বদা স্পর্শের অনুভূতি পাওয়া যেত, স্পর্শের অনুভূতি পাবার জন্য তালু ঘর্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে হত না। বা, এমন যদি হত যে স্পর্শের অনুভূতি শরীরের অংশ না হয়ে শরীরাতীত কিছু, শূন্যের অংশ হত, তাহলে তাকে সদাসর্বদা শরীরের সর্বত্র অনুভব করতে, শুধু তালু ঘষে নয়।

“নিশ্চিত জেনো, এ শূন্য, আর স্পর্শ করার পর, অনুভূতি তন্মাত্র মনের গভীরে স্বপ্নহীন নিদ্রা থেকে জেগে ওঠে, আর স্পর্শের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হয়। আনন্দ, স্পর্শের অনুভূতি একটা অসুস্থ ধোঁয়াশার চিহ্নমাত্র আমরা যাকে “সুস্থ শরীর” বলে থাকি, যা সচেতন প্রাণীদের অনাদি অনন্তকাল ধরে শারীরি অনুভূতির মিথ্যা মায়ার ছলনায় ভুলিয়ে এসেছে।

“তোমার শ্রবণ-অনুভূতিও তাই: কানের মিথ্যা অনুভূতি।”

“কেমন করে, প্রভু?”

“আনন্দ, কান মিথ্যা মায়ার ফাঁদে ভুল করে, মহামানসের অন্তর্নিহিত চেতনায় কোন ভুল হয় না। কানের অসুখে মানুষ মাথার মধ্যে গর্জন শুনতে পায়, তার অবিচল তন্মাত্র মন কিন্তু এ গর্জনের উৎস নয়। এ তার রুগ্ন কানের কারণে তার শারীরিক-মস্তিষ্ক-গত মনের ভেদবোধ। একই রকম ভাবে সুস্থ কান, শূন্যে শব্দ শোনে, যে শব্দ অস্তিত্বহীন। অতএব জেনো, কান যেহেতু তার স্বাভাবিক ক্ষমতাহেতু শব্দের মায়ায় মিথ্যা অবলোকনে আবিষ্ট, কান দিয়ে যা কিছু শুনতে পাও তার সবটাই মায়াতরঙ্গ। কানের সঙ্গে অনাদি অনন্তকাল ধরে এমনটাই হয়ে এসেছে, কান যে তোমার আছে, তা তোমার কর্মহেতু, অন্যকালে অন্যত্র তোমার অজ্ঞানতাহেতু কৃতকর্মের উত্তরাধিকার।

“কিন্তু আনন্দ, এ নিয়ে তুমি যেন বিচলিত হয়ো না, কান ত্যাগ করা শুধু সময়ের অপেক্ষা, আর তখন তো তুমি এ কান ত্যাগ করেই ফেলেছ।

“আমার ঘণ্টাধ্বনি যখন তুমি শুনতে পাও, তখন তথাকথিত শব্দতরঙ্গ তোমার কর্ণপটাহে আঘাত করে তাই তুমি ঘন্টার আওয়াজ শুনতে পাও, কিন্তু এই তথাকথিত শব্দের উৎস কি? আনন্দ,সহজ কথায় এ এক মিথ্যা অবাস্তবতা।

কেন?

কারণ শব্দের উৎস যদি কান হত, তাহলে স্বভাবত শব্দের উৎস ঘন্টা নয়, সেক্ষেত্রে কানে সদাসর্বদা ঘন্টাধ্বনি শুনতে পেতে, তার জন্য ঘন্টা বাজানোর দরকার হত না। বা যদি ধর ঘন্টাতেই শব্দের উৎস হত, ঘন্টা থেকেই শব্দতরঙ্গের উৎস

(চলবে)

জেগে ওঠ-১৭-অবলোকন ও ভ্রান্তি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments