জেগে ওঠ – ১৯ – পৃথিবীর স্বরূপ

বুদ্ধদেব বললেন, “আনন্দ, যেমন তুমি বললে, এই পৃথিবীতে প্রকারভেদ, আর পরিবর্তনশীলতা, যার সঙ্গে আমাদের বিষয়ী মন তার ষড়েন্দ্রিয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট, তার প্রকাশ চারটি বৃহৎ বিষয়বস্তকে নিয়ে (ক্ষিতি, অপ, মরুৎ, তেজ); আরো তিনটি বিষয়বস্তু — ব্যোম, ধারণা, চেতনা — সব মিলিয়ে সাত বস্তুর সমব্যাহার। ক্ষিতি দিয়ে শুরু করি।

“ক্ষিতি (ধরিত্রী) কেন বুদ্বুদ? আনন্দ, প্রশ্ন রাখা যেতে পারে যে বুদ্বুদের অভ্যন্তর শূন্য নাকি শূন্য নয়? ধরিত্রী যেহেতু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণার সমন্বয়ে গঠিত, যাকে অণু পরমাণু অবধি অনন্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্তরে ভাবা যেতে পারে, তাই প্রতিটি অণুতে যেন বিশ্বেরই প্রকাশ। জ্ঞানীজন তাই উপলব্ধি করেন যে চোখের পাতায় পাতায় মহাবিশ্বের উপস্থিতি, গঙ্গার অযুত বালুকারাশি যেমন অনন্ত, তাঁরাও তেমনি অনন্ত। আনন্দ, বলতো এই অপ্রাকৃৎ বিশাল শূন্যতায় কি হয়ে চলেছে?

“ভাল করে তাকিয়ে দেখ আনন্দ! তাবৎ বস্তুকে ভেদ করে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে দেখ আনন্দ, দেখবে সর্বত্র সুপ্রাচীন বুদ্ধগণের অপার করুণাহৃদয়ের প্রকাশ। একেই বলা হয় যথাভূতম, তাবৎ বস্তুনিচয়কে তাদের মতন করে দেখা।

“মাটির চরিত্রকেই ভেবে দেখ। খুব গোদাভাবে দেখলে দেখবে সে ভূপৃষ্ঠকে ঢেকে রেখেছে। আবার খুব সূক্ষ্মভাবে বিচার করে দেখলে মাটি শূন্যে অবস্থিত ধূলির অণুপরমাণু , কেবল তাই নয়, চোখ যা যা দেখতে পায় সব কিছুই এইরকম আদিম প্রাথমিক তত্ত্বে নামিয়ে আনা যায়, যা চোখে দেখি সবটাই কেবল মাটি, মাটি বই কিছু নয়। তোমার তো জানা কথা আনন্দ, এই যে পৃথিবী, অনুপরমাণুর ধূলিধূসরিত এই শূন্যময়তা, তাকে যদি সত্যি সত্যি মহাশূন্যের পরম শূন্যতায় নামিয়ে এনে দেখা যেত, তবে সেই অবাংমনসগোচর পরমতা থেকে দৃষ্টির প্রপঞ্চও তখন প্রকাশ পেত।

“আনন্দ, ভূমির তন্মাত্রিক চরিত্র আসলে মহাশূন্যের শূন্যতা বই আর কিছু নয়, সত্যিকারের মহাশূন্যতা; আবার মহাশূন্যের তন্মাত্রিক চরিত্র প্রকৃত ভূমি, তার সৎ চরিত্র।

“তথাগতের অনজাত গর্ভে সর্ব বস্তুর অজাত অবস্থাই শেষ ও পরম অনুভূতি, মহাশূন্য আর দর্শণ চিরনবীন, সদসৎ, সে মহাবিশ্বের সর্বত্রগামী, সদাসর্বদা কর্মহেতু সদা প্রকাশমান, সজাত প্রাণীর অজ্ঞানতার কৃতকর্মহেতু তাকে দৃষ্টি কি স্বপ্ন বলে ভ্রম করে। মানুষ, মনসিজ প্রাগৈতিহাসিক দৈত্যপ্রায় প্রেতচ্ছায়া, জানেনা তার আপন অস্তিত্বের তত্ত্ব, অতএব প্রাকৃতিক কার্যকারণে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে, ভাবে পৃথিবীর বুঝি আপন কোন অন্তর্লীন চরিত্র আছে, তাকে প্রকৃতি বলে, ধরিত্রী-মাতা বলে জ্ঞান করে, তাদের নিজস্ব দেহাতীত মানসরূপ ধারণ করায়, মনে করে এসবের স্রস্টা বুঝি আপন রূপকল্পে একে গড়েছেন, তারপর তার অস্তিত্বকে নিজেদের মত করে “সময়ের” মাপে বিচার করে, অণু, পল, ক্ষণ, আপনাপন অনুভূতি, সবই মানুষের নিজের চেতনাগত মনের,বাক্যের ধারণার এক থেকে আরেকটিকে পৃথক করে দেখার প্রয়াস, এসবের সত্যিকারের কোন অর্থ নেই।

“আনন্দ, এই অণু-পরমাণু-ধূলিকণা কোথা থেকে আসে, কোথায়ই বা যায়, কোথায়ই বা তার অবস্থান?” কেউ যেন তোমাকে ডেকে বলছে, “দৃষ্টি নিবি? নে না! কত দৃষ্টি তোর চাই, যত দৃষ্টি চাস, নিয়ে নে!” অথচ তুমি কারো কাছে কিছু চাও নি। যেস্থানে পৃথিবীর জন্ম, সেস্থান সর্বত্র বিরাজমান, পৃথিবী সর্বত্র বিরাজমান। অস্যার্থ, পৃথিবীর আপন অস্তিত্ব প্রমাণ করে অণুপরমাণু আর তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের সূত্রেই আমাদের কাছে পৃথিবীর প্রকাশ। কে বা কারা, তারা কিভাবে একসঙ্গে মিলে পৃথিবীর জন্ম দিয়েছিল? তন্মাত্র মনই ধরিত্রী নামক প্রপঞ্চের উৎস।”

আনন্দ জানতে চাইলেন, “প্রভু, জল উপাদান, সেই সম্বন্ধে কিছু বলুন ।”

পরম জন বললেন, “জল কেন মায়া, আনন্দ? প্রশ্ন করা যেতে পারে যে স্বপ্ন সত্যি না মিথ্যা?”

(চলবে)

জেগে ওঠ-১৯-পৃথিবীর স্বরূপ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments